সববাংলায়

স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়

বিভাগঃ , ,

স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় (Sir Ashutosh Mukhopadhyay) একজন সুবিখ্যাত বাঙালি শিক্ষাবিদ যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি ছিলেন। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ছিলেন প্রথম ছাত্র যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দুটি বিষয়ে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন সেই বিরল প্রতিভাদের একজন, যাঁর নাম উচ্চারিত হলেই এক তেজস্বী এবং আপসহীন বাঙালির ছবি চোখের সামনে ভেসে ওঠে। তাঁকে বলা হয় ‘বাংলার বাঘ’ বা ‘বেঙ্গল টাইগার’। তবে এই উপাধি কেবল তাঁর গাম্ভীর্যপূর্ণ উপস্থিতির জন্য নয়, বরং ব্রিটিশ শাসনের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে শিক্ষার অধিকার ছিনিয়ে আনার যে লড়াই তিনি লড়েছিলেন, তার জন্যই তিনি এই সম্মানে ভূষিত হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন আধুনিক কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকৃত রূপকার।              

১৮৬৪ সালের ২৯ জুন কলকাতার ভবানীপুরে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জন্ম। তাঁর পিতা গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন তৎকালীন কলকাতার একজন অত্যন্ত নামকরা চিকিৎসক, যাঁর পসার ছিল আকাশচুম্বী। তবে কেবল চিকিৎসা নয়, গঙ্গাপ্রসাদের অনুরাগ ছিল সাহিত্যের প্রতিও। মা জগত্তারিণী দেবী ছিলেন এক পরম বিদুষী ও ধর্মপ্রাণ নারী। পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার জিরাট গ্রামে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পৈতৃক বাস। তাঁর দাদু পারিবারিক কারণে হুগলী জেলার এক ব্রাহ্মণ অধ্যুষিত গ্রাম দিগসুই থেকে জিরাটে এসে বসতি গড়েন। গঙ্গাপ্রসাদ জিরাটের বিত্তশালীদের সাহায্যে কলকাতায় ডাক্তারি পড়তে আসেন এবং পরে জিরাট গ্রাম ছেড়ে কলকাতার ভবানীপুরে বসতি স্থাপন করেন। 

আশুতোষ মুখোপাধ্যায় ১৮৮৫ সালে জোগমায়া দেবীকে বিবাহ করেন। তাঁদের সাত সন্তান ছিল — কমলা, রমাপ্রসাদ, শ্যামাপ্রসাদ, উমাপ্রসাদ, অমলা, বামাপ্রসাদ এবং রমলা। তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র রমাপ্রসাদ কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি হন। দ্বিতীয় পুত্র শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ছিলেন আইনজীবী, শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক কর্মী; তিনি ভারতীয় জনসংঘ প্রতিষ্ঠা করেন, যা আধুনিক ভারতীয় জনতা পার্টির প্রত্যক্ষ পূর্বসূরি। উমাপ্রসাদ হিমালয় অভিযাত্রী ও ভ্রমণসাহিত্যিক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। তাঁর ভ্রমণকাহিনি ‘মণিমহেশ’-এর জন্য তিনি সাহিত্য অ্যাকাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পৌত্র এবং রমাপ্রসাদের পুত্র চিত্ততোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা হাইকোর্ট ও বম্বে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। মুখোপাধ্যায় পরিবারই হল ভারতের প্রথম পরিবার যাঁরা কোন হাইকোর্টে টানা তিন প্রজন্ম বিচারপতি উপহার দিয়েছেন।   

আশুতোষের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় ভবানীপুরের চক্রবেড়িয়ার শিশু বিদ্যালয়ে। বিজ্ঞান ও সাহিত্যের আবহে আশুতোষ ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি গণিতের এমন সব জটিল রহস্য সমাধান করতেন যা অনেক অভিজ্ঞ অধ্যাপকের কাছেও ছিল দুরূহ। তাঁর এই গণিতপ্রীতি তাঁকে পরবর্তী জীবনে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। ছোটবেলায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ১৮৭৯ সালে ১৫ বছর বয়সে আশুতোষ মুখোপাধ্যায় প্রবেশিকা পরীক্ষায় দ্বিতীয় স্থান অধিকার করেন এবং প্রথম শ্রেণীর বৃত্তি পান। ১৮৮০ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন যেখানে সহপাঠী হিসেবে তিনি প্রফুল্ল চন্দ্র রায়নরেন্দ্রনাথ দত্তকে পান। ১৮৮৩ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ পরীক্ষায় প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হন। ১৮৮৫ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে প্রথম শ্রেণীতে এম.এ ডিগ্রি অর্জন করার পর তিনি প্রেমচাঁদ-রায়চাঁদ স্কলারশিপ পান। ১৮৮৬ সালে আবার তিনি পদার্থ বিজ্ঞানে এম.এ ডিগ্রি ‌অর্জন করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে এক সঙ্গে দুটি ডিগ্রি অর্জনকারী প্রথম ছাত্র হন।  মাত্র কুড়ি বছর বয়সেই তিনি এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্যপদ লাভ করেছিলেন, যা ছিল সেই যুগের এক অনন্য রেকর্ড। গণিতশাস্ত্রে তাঁর মৌলিক গবেষণাপত্রগুলি আন্তর্জাতিক স্তরে প্রশংসিত হয়েছিল এবং অনেকে মনে করেন, তিনি যদি সম্পূর্ণভাবে গণিতচর্চায় মনোনিবেশ করতেন, তবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন গণিতবিদ হিসেবে আরও বড় অবদান রাখতে পারতেন।।      

এক নজরে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের জীবনী:

  • জন্ম: ২৯ জুন, ১৮৬৪
  • মৃত্যু: ২৫ মে, ১৯২৪
  • কেন বিখ্যাত: আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রবাদপ্রতিম উপাচার্য, প্রখ্যাত গণিতবিদ এবং কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি। নির্ভীক চরিত্রের জন্য তাঁকে ‘বাংলার বাঘ’ বলা হয়।
  • পুরস্কার: ব্রিটিশ সরকার তাঁকে ‘স্যার’ ও ‘কাইজার-ই-হিন্দ’ স্বর্ণপদকে ভূষিত করে। এছাড়া কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘সরস্বতী’ ও ‘শাস্ত্ৰবাচস্পতি’ উপাধিতে সম্মানিত করে।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের কর্মজীবন শুরু হয় একজন‌ আইনজীবী হিসাবে। তিনি ছিলেন একজন স্বাধীনচেতা মানুষ। ১৮৮৮ সালে তিনি বি.এল ডিগ্রি লাভ করেন এবং তখন থেকেই আইনজীবী হিসাবে তাঁর পথ চলা শুরু। আইনজীবী হওয়ার পাশাপাশি তিনি তাঁর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে থাকেন। ১৮৮০ থেকে ১৮৯০ সালের মধ্যে বিভিন্ন জার্নালে তিনি উচ্চতর গণিতের ওপর প্রায় কুড়িটা মতো প্রবন্ধ প্রকাশ করেন । ইন্ডিয়ান অ্যাসোশিয়েসন ফর দি কালটিভেশন অব সায়েন্স (Indian Association for the Cultivation of Science ) এর সাথে তিনি সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন এবং ১৮৮৭ থেকে ১৮৯১ সালের মধ্যে তিনি গণিতের ওপর একাধিক বক্তৃতা দেন। তাঁর দুটি অসাধারণ অবদান হল ১৮৯৩ সালে প্রকাশিত জিওমেট্টি অব কনিক্স ( Geometry of Conics ) এবং ১৮৯৮ সালে প্রকাশিত ল অব পারপিচুইটিস ( Law of Perpetuities )। ১৯০৮ সালে তিনি ক্যালকাটা ম্যাথেমেটিক্যাল সোসাইটি ( Calcutta Mathematical Society ) প্রতিষ্ঠা করেন।

১৮৯৪ সালে তিনি আইনের উপর ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন এবং ১৮৯৮ সালে টেগর ল প্রফেসর হন। ১৯০৪ সালে তিনি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে নিযুক্ত হন এবং টানা দুই দশক সসম্মানে সেই দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর দেওয়া প্রতিটি রায় ছিল আইনের গভীর পাণ্ডিত্য এবং ন্যায়বিচারের এক সংমিশ্রণ। মাত্র ২৪ বছর বয়সে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন ফেলো হয়েছিলেন। ১৯০২ সালে লর্ড কার্জন তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় কমিশনের সদস্য হিসেবে নিযুক্ত করেন। ১৯০৬ সালে যখন তিনি প্রথমবারের মতো কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন, তখন থেকেই শুরু হয় এক নতুন অধ্যায়। তিনি লক্ষ করেন যে তৎকালীন বিশ্ববিদ্যালয় কেবল একটি পরীক্ষক সংস্থা, যেখানে ছাত্রদের মেধা যাচাই করার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হতো প্রশাসনিক কাজে। আশুতোষ সেই প্রথা ভেঙে বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রকৃত জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার কেন্দ্রে পরিণত করার শপথ নেন। তাঁর আমলেই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্নাতকোত্তর পাঠক্রম এবং বিজ্ঞান ও কলার বিভিন্ন শাখায় উচ্চতর গবেষণার সুযোগ তৈরি হয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষা ও গবেষণার একটি মুখ্য কেন্দ্রে পরিণত করেন।

উপাচার্য হিসেবে আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের শাসনকাল ছিল প্রকৃত অর্থেই এক বৈপ্লবিক যুগ। তিনি বিশ্বাস করতেন যে কোনো জাতির উন্নতি নির্ভর করে তার নিজস্ব ভাষায় শিক্ষা এবং উচ্চতর গবেষণার ওপর। তাই তিনি কেবল বিজ্ঞান নয়, মাতৃভাষা বাংলার প্রসারেও অগ্রণী ভূমিকা নেন। তাঁরই ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম এম.এ. স্তরে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য পড়ার সুযোগ তৈরি হয়। এর আগে বাংলা ভাষাকে উচ্চশিক্ষার স্তরে এমন মর্যাদা কেউ দেয়নি। এছাড়া তিনি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা শ্রেষ্ঠ মেধাবীদের কলকাতায় নিয়ে আসার উদ্যোগ নেন। তাঁরই আহ্বানে জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় এবং সি. ভি. রমণের মতো দিকপাল বিজ্ঞানীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার সুযোগ পেয়েছিলেন। বিশেষ করে সি. ভি. রমণকে মাদ্রাজের সরকারি চাকরি থেকে কলকাতায় নিয়ে এসে পালিত অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেওয়া ছিল আশুতোষের অসামান্য দূরদর্শিতার পরিচয়। তিনি সি. ভি. রমণকে বলেছিলেন যে, বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য অর্থের চেয়েও বেশি প্রয়োজন মেধার মূল্যায়ন এবং স্বাধীন পরিবেশ। তাঁর সেই সাহচর্যেই সি. ভি. রমণ পরবর্তীতে নোবেল পুরস্কার জয় করেন। আশুতোষ মুখোপাধ্যায় কেবল বিজ্ঞানীদের নয়, বরং ড. সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণাণ থেকে শুরু করে বিনয় কুমার সরকার—সকলকেই জ্ঞানচর্চার পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন।

আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের নির্ভীকতা এবং আপসহীন চারিত্রিক দৃঢ়তা ছিল প্রবাদপ্রতিম। ব্রিটিশ শাসকরা যখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসনে হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করেছে, আশুতোষ তখনই রুখে দাঁড়িয়েছেন। তৎকালীন বড়লাট লর্ড কার্জনের সঙ্গে তাঁর মতপার্থক্য ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে। সরকার যখন শর্ত দিয়েছিল যে আর্থিক সাহায্যের বিনিময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে বদল আনতে হবে, তখন আশুতোষ সিংহের মতো গর্জে উঠেছিলেন। তিনি পরিষ্কার মত দিয়েছিলেন যে, মাথা নত করে সাহায্য নেওয়ার চেয়ে ভিক্ষা করা ভালো, কিন্তু শিক্ষার স্বাধীনতা বিকিয়ে দেওয়া হবে না। তাঁর এই বজ্রকণ্ঠ পরাধীন ভারতবর্ষের মানুষকে আত্মমর্যাদা শিখিয়েছিল। এই অদম্য জেদ এবং চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের কারণেই তাঁকে ‘বেঙ্গল টাইগার’ বলা হতো। তিনি ছিলেন একাধারে কঠোর প্রশাসক এবং অন্যদিকে ছাত্রদের প্রতি অত্যন্ত দরদী। মেধাবী ছাত্রদের উৎসাহ দিতে তিনি কোন কার্পণ্য করতেন না। নিজের উপার্জিত অর্থের একটি বড় অংশ তিনি দরিদ্র ছাত্রদের বৃত্তির জন্য খরচ করতেন। তাঁর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগারটি ছিল সে সময়ের ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিগত সংগ্রহশালা, যা তিনি পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অকাতরে দান করে দিয়েছিলেন। তিনি মনে করতেন, জ্ঞান কেবল নিজের জন্য নয়, তা ছড়িয়ে দিতে হবে উত্তরসূরিদের মধ্যে।

তাঁর সমগ্র কর্মজীবনে তিনি অনেক শিক্ষামূলক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। ১৯১১ সালে ব্রিটিশ সরকার তাঁকে নাইটহুড সম্মানে ভূষিত করে। পালি, ফার্সি ও রুশ ভাষার মত বিভিন্ন ভাষায় দক্ষ হওয়ার জন্য বাঙালি পণ্ডিতেরা তাঁকে ‘সরস্বতী’ ও ‘শাস্ত্রবাচস্পতি’ উপাধিতে ভূষিত করেন। শিক্ষাক্ষেত্রে তাঁর অবদানের জন্য ভারত সরকারের ডাকবিভাগ ১৯৬৪ সালে তাঁর জন্মশতবর্ষে একটি স্ট্যাম্প চালু করে।

১৯২৪ সালের ২৫ মে পাটনায় স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading