সাধারণভাবে দেখা যায় প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে কোনও জাহাজ ডুবে যায় বা ওই জাহাজের যাত্রীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু মেরি সেলেস্ট এমন একটি জাহাজ যে নিজে প্রায় অক্ষত থাকলেও তার মধ্যে থাকা ১০ জন আরোহী কোনও অজ্ঞাত কারণে নিখোঁজ হয়ে গেছে। কী হয়েছিল এই মেরি সেলেস্ট জাহাজের যাত্রীদের সঙ্গে? কী কারণে এই জাহাজের নাবিকরা জাহাজ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল? জাহাজ ছাড়ার পর তারা কোথায় গেল? এমনই প্রশ্ন ঘোরে মেরি সেলেস্ট জাহাজকে নিয়ে। ১৮৭২ সালে আটলান্টিক মহাসাগরে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা আজও গবেষক, ইতিহাসবিদ ও রহস্যপ্রেমীদের সমানভাবে আকৃষ্ট করে।
মেরি সেলেস্ট (Mary Celeste) ইতিহাসের অন্যতম বিখ্যাত ‘ঘোস্ট শিপ’ বা পরিত্যক্ত জাহাজ হিসেবে পরিচিত। এই জাহাজটি ১৮৬১ সালে কানাডায় তৈরি করা হয়। প্রথমে এই জাহাজের নাম রাখা হয়েছিল অ্যামাজন। প্রথম সমুদ্রযাত্রার পর থেকেই এই জাহাজটির সঙ্গে একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটতে শুরু করে। এই জাহাজের ক্যাপ্টেন নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছিল। এছাড়া কানাডার কেপ ব্রেটন দ্বীপে এই জাহাজটি সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়েছিল। এই ক্ষয়ক্ষতির পর জাহাজের মালিকরা জাহাজটি বিক্রি করে দেয়। আমেরিকান ব্যবসায়ী রিচার্ড ডব্লিউ. হেইনস এই জাহাজটি কিনে জাহাজের নতুন নাম রাখেন মেরি সেলেস্ট। পরবর্তী কয়েক বছর ধরে জাহাজটি মেরামত করার পর, তারপর আবার ওই জাহাজটি সমুদ্রযাত্রার উপযুক্ত হয়ে ওঠে।
নতুন রূপে মেরি সেলেস্ট জাহাজটি ১৮৭২ সালের ৭ নভেম্বর নিউইয়র্ক বন্দর থেকে ইতালির জেনোয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। ওই জাহাজে ছিলেন ক্যাপ্টেন বেঞ্জামিন ব্রিগস (Benjamin Briggs), তাঁর স্ত্রী সারাহ ব্রিগস, দুই বছরের কন্যা সোফিয়া এবং ৭ জন অভিজ্ঞ নাবিক – সব মিলিয়ে মোট ১০ জন। ব্রিগসের সমুদ্রযাত্রার সময় জাহাজটি প্রতিকূল আবহাওয়ার মুখে পড়েছিল বলে ধারণা করা হয়। তবে জাহাজটির বড় কোনও ক্ষতির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তারপর থেকে ওই জাহাজটির আর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি।
১৮৭২ সালের ৫ ডিসেম্বর প্রায় এক মাস পর আটলান্টিক মহাসাগরেব্রিটিশ জাহাজ ‘ডেই গ্রাটিয়া’ (Dei Gratia) দেখতে পায় মেরি সেলেস্ট জাহাজকে। গ্রাটিয়ার নাবিকরা ওই জাহাজে প্রথমে কোনও মানুষ দেখতে না পেয়ে অবাক হয়। তবে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, জাহাজে কোনও মানুষ না থাকলেও সেই সময় মেরি সেলেস্টের কিছু পাল খোলা ছিল এবং সেটি ধীরে ধীরে জিব্রাল্টারের দিকেই ভেসে চলেছিল। এছাড়া ব্রিটিশ নাবিকরা সেখানে ছয় মাসের খাবার, নাবিকদের জামাকাপড় সবই যথাস্থানে দেখে আশ্চর্য হন। এই জাহাজের ১০ জন যাত্রীর পাশাপাশি নিখোঁজ ছিল শুধু একটি মাত্র লাইফ বোট।
মেরি সেলেস্ট জাহাজের কোনওরকম ক্ষয়ক্ষতি না হলেও জাহাজের অতগুলো মানুষ গেল কোথায়, তা নিয়ে শুরু হয়েছিল নানা জল্পনা। ওই মানুষগুলোর নিখোঁজ হওয়ার পিছনে বিভিন্ন কাহিনী ও রহস্যময় গল্প শোনা যায়। অনেকের মতে, সামুদ্রিক দানবের হামলায় ওই জাহাজের যাত্রীদের মৃত্যু হয়েছিল। আবার কেউ মনে করে, ওই জাহাজটি জলদস্যুদের কবলে পড়েছিল। অনেকে বিশ্বাস করে, নাবিকরা নেশাগ্রস্ত হয়ে জলে ভেসে গিয়েছিল। কিছু মানুষের মতে, সামুদ্রিক ঝড়ের কারণে বা জাহাজের সংরক্ষিত অ্যালকোহলের ব্যারেল থেকে গ্যাস লিক হওয়ার গুজবে আতঙ্কিত হয়ে নাবিকেরা লাইফবোটে করে পালিয়ে গিয়েছিল। অনেকে আবার মনে করে, নাবিকরা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ করে একে অন্যকে হত্যা করেছিল। তবে এই ধারণাগুলোর সমর্থনে কোনও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।
মেরি সেলেস্ট জাহাজের মানুষদের নিখোঁজ হওয়ার পিছনে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ কাহিনী জড়িয়ে রয়েছে ক্যাপ্টেন ব্রিগসকে কেন্দ্র করে। ক্যাপ্টেন ব্রিগস মনে করেছিলেন যে, তাঁর জাহাজে জল ঢুকে শীঘ্রই সেটি ডুবে যেতে পারে। তাই তিনি জাহাজটি পরিত্যাগ করার আদেশ দিয়েছিলেন। তবে এই কথা স্বীকার করে নিতে হয় যে, ওই যাত্রীরা আর কখনও সমুদ্রের তীরে ফিরতে পারেনি। হয়তো ওই লাইফ বোটে করে পালিয়ে যাওয়ার সময় কোনও দুর্ঘটনার কারণে সকলের মৃত্যু হয়েছিল।
ব্রিটিশ নাবিকরা মেরি সেলেস্ট জাহাজ উদ্ধারের পর সেখানে কোনরকম সহিংসতা বা কোনও মূল্যবান বস্তু হারানোর চিহ্ন খুঁজে পায়নি। তাই এই জাহাজের রহস্যময়তার পিছনে জলদস্যুদের আক্রমণের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করা হয়। এছাড়া এই জাহাজের মধ্যে বিদ্রোহের কোনও চিহ্ন ছিল না। নাবিকদের পরিবারের কাছ থেকে জানা গেছে যে, বিদ্রোহ করার মতো কেউ জাহাজে ছিল না। তাই জাহাজে নাবিকদের বিদ্রোহের যুক্তিকেও শেষ পর্যন্ত বাদ দিতে হয়।
জাহাজে ১,৭০০ ব্যারেল বাণিজ্যিক অ্যালকোহলের বেশিরভাগটাই অক্ষত থাকলেও অনেক গবেষকের মতে, কিছু ব্যারেল থেকে বের হওয়া অ্যালকোহলের বাষ্পের কারণে বিস্ফোরণের মতো শব্দ বা কম্পন সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে। সেই আতঙ্কেই নাবিকেরা জাহাজ ত্যাগ করেছিলেন। এই তত্ত্বটি বর্তমানে অনেকে গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা বলে মেনে নিয়েছেন।
এখানে লাল ওক কাঠের তৈরি নয়টি ব্যারেলে অ্যালকোহল ছিল না বা সেগুলো থেকে অ্যালকোহল বেরিয়ে গিয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। আর বাকি সাদা ওক কাঠের তৈরি ব্যারেলগুলো পাওয়া যায় অ্যালকোহলে পূর্ণ অবস্থায়। কিন্তু এই নয়টি ব্যারেল কীভাবে খালি হল আর বাকিগুলো কীভাবে অক্ষত রয়ে গেল সেই বিষয়ে সঠিক উত্তর এখনও পাওয়া যায়নি।
ব্রিটিশ নাবিকরা যখন মেরি সেলেস্ট জাহাজ উদ্ধার করে তখন ওই জাহাজের ডেকে কিছু পরিমাণ জল পাওয়া গিয়েছিল। তবে তাতে আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু ছিল না। সেখানে জল পরিমাপের জন্য ব্যবহৃত সাউন্ডিং রডটি পাওয়া গিয়েছিল। এর থেকে বোঝা যায় যে, জাহাজটি পরিত্যাগ করার আগে এটি ব্যবহার করা হয়েছিল। জাহাজটি মোটামুটি অক্ষত থাকলেও একটি বিল্জ পাম্পে সমস্যা দেখা দিয়েছিল এবং সেটি পরীক্ষা করার জন্য খুলে রাখা হয়েছিল। অনেক গবেষকের মতে, পাম্পের এই সমস্যা এবং জাহাজে জল ঢোকার আশঙ্কাই ক্যাপ্টেন ব্রিগসকে জাহাজ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেছিল। অন্যান্য তত্ত্বগুলির মধ্যে এই তত্ত্বকেই সবচেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করা হয়।
অধিকাংশ গবেষকের মতে, জাহাজের যাত্রীরা লাইফবোটে করেই স্বেচ্ছায় জাহাজটি ত্যাগ করেছিলেন। আবহাওয়া ভালো থাকা সত্ত্বেও অভিজ্ঞ নাবিকেরা কেন লাইফবোটে উঠলেন, তা আজও অজানা। জাহাজের লগবুকের শেষ নথিভুক্ত তথ্য থেকে দেখা যায়, নিজেদের অবস্থান নির্ণয়ের জন্য তাঁরা বারবার দিক-নির্দেশনা যাচাই করেছিলেন। দিক নির্দেশনার বিষয়ে সমস্যা, জাহাজের ভিতরে জল জমার আতঙ্কের কারণে হয়ত ক্যাপ্টেন, তাঁর পরিবার এবং বাকি নাবিকেরা শুধুমাত্র জরুরি কিছু কাগজ নিয়ে জাহাজ ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন। এখানেও প্রশ্ন রয়েছে যে, একটি মাত্র লাইফ বোট কীভাবে এতগুলো মানুষের খাবার, জল বহন করতে সক্ষম হল? মেরি সেলেস্টের নাবিকদের অন্তর্ধান আজও পৃথিবীর অন্যতম অমীমাংসিত রহস্য হয়ে আছে।
মেরি সেলেস্টের রহস্যটি আরও জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ১৮৮৪ সালে আর্থার কোনান ডয়েলের ‘J. Habakuk Jephson’s Statement’ নামের ছোটগল্প প্রকাশের পর। সেই গল্পে জাহাজটির নাম ‘Marie Celeste’ লেখা হয়েছিল, যা পরে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে ‘Mary Celeste’ নামে পরিচিত হয়ে যায়।
‘ডেই গ্রাটিয়া’ জাহাজের নাবিকরা মেরি সেলেস্ট জাহাজটি খুঁজে পাওয়ার পর জাহাজটিকে প্রায় ৮০০ মাইল দূরে অবস্থিত জিব্রাল্টারে নিয়ে যান। তাঁরা এই জাহাজ উদ্ধারের জন্য সালভেজ পুরস্কার (salvage award) দাবি করেন। সেখানে জিব্রাল্টারের ভাইস অ্যাডমিরালটি কোর্ট (Vice Admiralty Court)-এর তত্ত্বাবধানে একটি তদন্ত পরিচালিত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মেরি সেলেস্টের রহস্যের পিছনে কোনও যুক্তি নির্ভর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরবর্তীকালে এই জাহাজের অভিশপ্ত ইতিহাসের কারণে ও বীমার টাকার জন্য ১৮৮৫ সালে ইচ্ছাকৃতভাবে একে ডুবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। জাহাজটি পরিকল্পনামাফিক পুরোপুরি ডোবেনি এবং তদন্তে বীমা জালিয়াতির চক্রান্ত প্রকাশ্যে আসে। এই ঘটনায় মেরি সেলেস্ট জাহাজটি প্রবাল প্রাচীরে আটকে যায় এবং এমনভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল যে তা আর মেরামত করা সম্ভব হয়নি। তাই মেরি সেলেস্ট জাহাজকে সেখানেই পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রাখা হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান