সববাংলায়

ভবভূতি

বিভাগঃ , ,

প্রাচীন ভারতের সংস্কৃত সাহিত্যের বিশিষ্ট নাট্যকার ভবভূতি (Bhavabhuti)। সংস্কৃত ভাষায় রচিত তাঁর নাটকগুলি প্রাণবন্ত চরিত্রায়ণ, করুণ রস, নিপুণ বর্ণনা এবং আবেগের গভীর প্রকাশের জন্য বিখ্যাত হয়ে রয়েছে। তাঁর এই কাব্যিক প্রতিভার গভীর ছাপ লক্ষ করা যায় ‘উত্তররামচরিত’, ‘মালতীমাধব’ এবং ‘মহাবীরচরিত’ নাটকে। এই নাটকগুলির মধ্যে দিয়ে তিনি সংস্কৃত সাহিত্যে কালিদাসের যোগ্য উত্তরসূরির মর্যাদা পেয়েছিলেন। তবে অনেক সংস্কৃত সাহিত্যবিশারদ তাঁকে শুধু কালিদাসের একজন উত্তরসূরি নয়, বরং সাহিত্যিক মর্যাদায় কালিদাসের সমমর্যাদাসম্পন্ন নাট্যকার বলেও বিবেচনা করেছেন। তবে একথা স্বীকার্য যে, কালিদাসের প্রভাব থাকলেও ভবভূতি তাঁর নিজস্ব গম্ভীর ভাষাশৈলী, গভীর আবেগ ও নাট্যরীতির মাধ্যমে সংস্কৃত সাহিত্যে স্বতন্ত্র স্থান তৈরি করেছিলেন। প্রকৃতি, প্রেম, বিরহবোধ এবং অলংকারপ্রয়োগ তাঁর নাটকে নতুন মাত্রা লাভ করেছিল।

ভবভূতির জন্মের সময়কাল নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। তবে মোটামুটিভাবে ধরে নেওয়া হয় যে, অষ্টম শতকের প্রথমার্ধে বর্তমান মহারাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত বিদর্ভের পদ্মপুরায় এক ব্রাহ্মণ পরিবারে ভবভূতির জন্ম হয়। তাঁর প্রকৃত নাম ছিল শ্রীকণ্ঠ; ‘ভবভূতি’ ছিল তাঁর সাহিত্যিক উপাধি। ভবভূতির বাবার নাম ছিল নীলকণ্ঠ এবং মায়ের নাম ছিল জাতুকর্ণী। তিনি পিতামহ ভট্টগোপালের তত্ত্বাবধানে বেদ, উপনিষদ, সাংখ্য ও যোগ দর্শন, ব্যাকরণ, অলংকারশাস্ত্র, ছন্দ ও জ্যোতিষশাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেছিলেন।

এক নজরে ভবভূতির জীবনী:

  • সময়কাল: আনুমানিক অষ্টম শতাব্দী (৭০০–৭৬০ খ্রিস্টাব্দ
  • কেন বিখ্যাত: সংস্কৃত সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নাট্যকার ও কবি। ‘উত্তররামচরিত’, ‘মালতীমাধব’ এবং ‘মহাবীরচরিত’ নাটকের রচয়িতা।
  • স্বীকৃতি: নাটকে মানবীয় বিরহ ও শোকের গভীর প্রকাশের জন্য তিনি সংস্কৃত সাহিত্যে ‘করুণ রসের কবি’ নামে সমধিক পরিচিত।

বিদর্ভে বাকাটক রাজবংশের পতনের পর রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দিলে উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতার সন্ধানে তিনি উত্তর ভারতের বিখ্যাত পদ্মাবতী নগরীতে চলে আসেন। পদ্মাবতীতে অবস্থানকালেই নাট্যকার হিসেবে ভবভূতির প্রতিভার স্ফুরণ ঘটে এবং তিনি বিপুল জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। পরবর্তীতে তিনি কান্যকুব্জ বা কনৌজের পরাক্রমশালী রাজা যশোবর্মনের রাজসভায় স্থান লাভ করেন। দ্বাদশ শতাব্দীর কাশ্মীরের ঐতিহাসিক কলহন তাঁর সুপ্রসিদ্ধ ‘রাজতরঙ্গিণী’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, কবি ভবভূতি এবং প্রাকৃত ভাষার কবি বাকপতিরাজ উভয়েই কনৌজরাজ যশোবর্মনের রাজসভার অন্যতম উজ্জ্বল রত্ন ছিলেন। বাকপতিরাজ তাঁর প্রাকৃত মহাকাব্য ‘গৌড়বহো’-তে ভবভূতির সাহিত্যিক শ্রেষ্ঠত্ব ও কাব্যের গভীরতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। ধারণা করা হয়, যমুনা নদীর তীরবর্তী কালপি অঞ্চলে তিনি দীর্ঘ সময় সাহিত্যসাধনায় নিমগ্ন ছিলেন এবং উজ্জয়িনীর মহাকাল মন্দিরের বার্ষিক ধর্মীয় উৎসবে তাঁর নাটকগুলি প্রথম অভিনীত হয়েছিল।

তিনি মূলত তিনটি নাটক রচনার জন্য জনপ্রিয় হয়ে রয়েছেন। বাল্মীকির রামায়ণের উপাদানগুলিকে পুনর্গঠনের মাধ্যমে তিনি রচনা করেছিলেন ‘মহাবীরচরিত’। ভবভূতির লেখা প্রথম এই নাটক সাতটি অঙ্কে বিভক্ত ছিল। তবে এই নাটকের প্রথম পাঁচটি অঙ্ককে ভবভূতির রচনা বলে স্বীকার করা হলেও কিছু গবেষক শেষের দুটি অঙ্কের রচয়িতা সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এই ‘মহাবীরচরিত’-এ হিন্দু দেবতা বিষ্ণুর অবতার ও মহাকাব্য রামায়ণের নায়ক রামের প্রারম্ভিক জীবন বর্ণনা করা হয়েছে। এখানে রামের জন্ম থেকে শুরু করে বিশ্বামিত্রের অধীনে রামের সামরিক প্রশিক্ষণ, রাম-সীতার বিয়ে, লঙ্কার দশানন রাক্ষস রাজা রাবণের সঙ্গে যুদ্ধ এবং সবশেষে অযোধ্যার রাজা হিসেবে তাঁর রাজ্যাভিষেক পর্যন্ত কাহিনি চিত্রিত আছে।

এই নাটকটি সংস্কৃত রামায়ণের আদর্শে রচিত হলেও চরিত্র পরিকল্পনায় ভবভূতির স্বাতন্ত্র্য লক্ষ করা যায়। বাল্মীকি রামায়ণে রামের মানবিক সীমাবদ্ধতা ও দ্বিধার প্রকাশ দেখা গেলেও মহাবীরচরিতের রাম চরিত্রকে অনেক বেশি আদর্শায়িত ও প্রায় ত্রুটিহীন রূপে উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এই নাটকে সংযমের অভাবে বেশ কিছু ত্রুটি দেখা যায়। চরিত্রগুলির দীর্ঘ সংলাপ নাটকের সংহতি ও ঘটনাকে বিস্তৃত করে দেয়। স্বাভাবিকতার অভাবের জন্য অনেকেই এই নাটকের সমালোচনা করে।

ভবভূতির আরেকটি রচনা ‘মালতীমাধব’-এর কাহিনিতে কোন পুরাণ বা মহাকাব্যের প্রভাব লক্ষ করা যায় না, বরং এই নাটকের বিষয় একেবারে বাস্তব ও কঠোর। এখানে দেখা যায় বিদর্ভরাজ্যের মন্ত্রীপুত্র ধীরোদাত্ত যুবক মাধবের সঙ্গে পদ্মাবতী রাজ্যের মন্ত্রীকন্যা মালতীর প্রেম। তবে এই প্রেমে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে মালতীকে বিয়ে করতে চাওয়া পদ্মাবতী নগরের রাজার মহাসচিব নন্দন। রাজাও চাইতেন যে, তাঁর মন্ত্রীর কন্যা মালতীর সঙ্গে নন্দনের বিয়ে হোক। বিভিন্ন সমস্যার মধ্যে কামন্দকী নামক এক বৌদ্ধ ভিক্ষুণী মালতী ও মাধবের মিলন ঘটায়। এছাড়া এই নাটকে মূল কাহিনীর পাশাপাশি মদন্তিকা-মকরন্দের প্রণয়ের উপকাহিনিও দেখা যায়।

‘মালতীমাধব’ এমন একটি নাটক, যা প্রেম এবং ভয়ের উপাদানকে এমনভাবে মধুরতার সাথে একত্রিত করেছে, যার তুলনা সংস্কৃত সাহিত্যে খুবই বিরল।

তবে এই নাটকেও বেশ কিছু ত্রুটি লক্ষ করা যায়। এই নাটকের শেষের অংশকে অনেকটাই অবান্তর বলে মনে হয়। নাটকের ভাবের মধ্যে উচ্ছ্বাস ও কবিত্বের আধিক্য নাট্যগুণকে ক্ষুণ্ণ করেছে। এইসব ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও ‘মালতীমাধব’-এর কাহিনী বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এখানে তিনি মধ্যবিত্তের চরিত্র গঠনে ও সমাজজীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরার ক্ষেত্রে পারদর্শিতা দেখিয়েছেন, যা সংস্কৃত সাহিত্যে বিরল।

‘উত্তররামচরিত’ নাটক ভবভূতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ রচনা। এখানে তাঁর পরিণত নাট্য প্রতিভার প্রকাশ লক্ষ করা যায়। এছাড়া তিনি এই নাটক রচনার জন্য ‘করুণ রসের কবি’ আখ্যাও পেয়েছিলেন। এই নাটকের বিষয় হল রামের সিংহাসন লাভের পরবর্তী সময়কাল। সীতার বনবাস থেকে রামচন্দ্রের সঙ্গে সীতার পুনর্মিলন পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ব্যাপী ঘটনাপ্রবাহ এখানে তুলে ধরা হয়েছে। সাত অঙ্কের ‘উত্তররামচরিত’ নাটকে আলোকপাত করা হয়েছে রামের রাজ্যাভিষেক, সীতাকে পরিত্যাগ, যমজ পুত্র লব ও কুশের জন্মের কাহিনি। এরপর এখানে তুলে ধরা হয়েছে সীতার সঙ্গে রামের পুনর্মিলন ও সীতার অযোধ্যায় প্রত্যাবর্তনের ঘটনা। তবে এই নাটকে রামের সঙ্গে বাসন্তীর সাক্ষাৎ, ছায়া সীতা প্রসঙ্গ, লবের সঙ্গে চন্দ্রকেতুর সংঘর্ষ, বশিষ্ঠ, অরুন্ধতী এবং বিমাতাদের নিয়ে রামের বাল্মিকী আশ্রমে গমন, আলেখ্য দর্শন, তমসা ও মুরালার কথোপকথন ভবভূতির নিজস্ব সৃষ্টি। বাল্মিকী রামায়ণের সঙ্গে ভবভূতির উত্তররামচরিতের প্রধান পার্থক্য হল যে, রামায়ণ সীতার পাতালে প্রবেশের মাধ্যমে শেষ হলেও, উত্তররামচরিতে দেখা যায় সীতা অরুন্ধতীর সঙ্গে এসে রামের হাতে লব-কুশকে তুলে দেন। রামায়ণের বিয়োগান্ত পরিণতিকে ভবভূতি মিলনান্তক করে শেষ করেছেন, এখানে সীতার পাতালে প্রবেশের ঘটনাকে বাদ দেওয়া হয়েছে। তিনি দাম্পত্য প্রেমকে দুঃখের তপস্যায় বিশুদ্ধ করে আদর্শ প্রেমের রূপে গড়ে তুলেছেন। এদিক থেকে কালিদাসের সঙ্গে তাঁর খানিকটা মিল পাওয়া যায়। তবে জীবন সম্পর্কে ভোগ ও উল্লাসের দৃষ্টি ভবভূতির নয়, তাঁর লেখায় ফুটে উঠেছে বাস্তব প্রেম। ‘মহাবীরচরিত’ ও ‘উত্তররামচরিত’-এ রামের চরিত্রটি আলাদাভাবে প্রকাশিত হয়েছে। ‘উত্তররামচরিত’-এ রামকে একজন আদর্শ নায়ক হিসেবে নয়, বরং ব্যক্তিগত শোক ও জনসেবার কর্তব্যের মাঝে দ্বিধাবিভক্ত এক চরিত্র হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে। কিছু সাহিত্য সমালোচক এই নাটকের বিচ্ছেদ ও পুনর্মিলনের কাহিনির সঙ্গে উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ‘দ্য উইন্টার’স টেল’-এর তুলনা করেছেন।

ভবভূতির নাটকের বৈশিষ্ট্য হল যে, তিনি নাটকে হাস্যরস এড়িয়ে চলতেন, তাই তাঁর রচনায় বিদূষকের চরিত্র দেখা যেত না। তাঁর নাটকে সাধারণত এক গাম্ভীর্যপূর্ণ আবহ তৈরি হত। তিনি অতিপ্রাকৃত, বীভৎস এবং রোমান্টিক বিষয়বস্তু ফুটিয়ে তোলার জন্য ক্রোধ, আতঙ্ক ও বীরত্ব মিশিয়ে এক স্বতন্ত্র নাট্যরূপ তৈরি করতেন।

ভবভূতির রচনা অসাধারণ উপস্থাপনা, অলঙ্কৃত শব্দচয়ন এবং সংস্কৃত ভাষার দক্ষ ব্যবহারের এক ব্যতিক্রমী নিদর্শন ছিল। বাণভট্টের রচনা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে তিনি নাটকে বহুল পরিমাণে অলংকারের ব্যবহার করেছিলেন। এছাড়া তিনি নিজের রচনায় রূপক ও উপমার ব্যাপক ব্যবহার করতেন। ভবভূতির রচনার এই সকল বৈশিষ্ট্যের কারণেই বর্তমান পাঠকরাও তাঁর রচনা পড়ে মুগ্ধ হন।

ভবভূতির রচনার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হল প্রকৃতি চেতনা। প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতি এবং মানুষ পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। প্রকৃতিই মানুষের অনুপ্রেরণার উৎস। কবিরা সাধারণত প্রকৃতির মধুর ও কোমল রূপের বর্ণনা দেন, কিন্তু ভবভূতির প্রকৃতি বর্ণনা কিছুটা ভিন্ন ধরনের। ভবভূতির নৈসর্গিক চিত্র অঙ্কনে কোনো মাধুর্য নেই, আছে তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ। তিনি প্রকৃতির ভয়ঙ্কর ও বীভৎস রূপের সংমিশ্রণে প্রাকৃতিক দৃশ্যাবলী চিত্রিত করেছিলেন। ‘উত্তররামচরিত’ এবং ‘মালতীমাধব’-এ তিনি অন্ধকার অরণ্যের ভয়ঙ্কর দৃশ্য, রুক্ষ পর্বতশৃঙ্গের নির্জনতা, হিংস্র পশুদের বর্ণনা, জলপ্রপাতের মৃদু গুঞ্জন এবং ভয়ংকর শবদাহের দৃশ্য ইত্যাদি অনবদ্যভাবে প্রকাশ করেছিলেন। এক কথায় বলা যায় যে, তাঁর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছিল বহুমাত্রিক।

ভবভূতি রচিত তিনটি নাটকই উজ্জয়িনীতে মঞ্চস্থ করা হয়েছিল। ‘মহাবীরচরিত’-এ বীর রস, ‘মালতীমাধব’-এ শৃঙ্গার রস এবং ‘উত্তররামচরিত’-এ করুণ রসের প্রকাশ দেখা যায়। করুণ রসের প্রকাশ ও ভাববর্ণনায় ভবভূতি বিশেষ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন। তবে রসবোধ ও বুদ্ধিমত্তার অভাবের কারণেই তিনি কালিদাসকে অতিক্রম করতে পারেননি বলে মনে করা হয়।

প্রাচীন ভারতের এই নাট্যকারের সমসাময়িক কোন মূর্তি পাওয়া যায় না, তবে পরবর্তীকালে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নানা মূর্তি তৈরি করা হয়েছে। ভবভূতির জন্মস্থান পদ্মপুরার আশেপাশের স্থানীয় মানুষজন তাঁকে সম্মান জানানোর জন্য বিভিন্ন সংস্কৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নাট্যচর্চা কেন্দ্রে তাঁর আবক্ষ মূর্তি ও স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করেছে।

অষ্টম শতাব্দীর মধ্যভাগে, প্রায় ৭৫০ সাল থেকে ৭৬০ সালের মধ্যে উত্তর ভারতে ভবভূতির মৃত্যু হয় বলে মনে করা হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading