সববাংলায়

চারুশীলা দেবী

বিভাগঃ ,

বাংলার অগ্নিযুগের অকুতোভয় এক বিপ্লবী নারী চারুশীলা দেবী (Charushila Devi)। ক্ষুদিরামের সঙ্গে বিপ্লবী কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন তিনি। আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দিয়ে কারাবরণ করেছিলেন চারুশীলা দেবী। স্বদেশি আন্দোলনের জোয়ারে পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্রিটিশ-বিরোধী সংগ্রামে সামিল হওয়া ননীবালা দেবী, নেলী সেনগুপ্তা, কল্পনা দত্ত, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বীণা দাসের মতো বিপ্লবী নারীদের মধ্যে চারুশীলা দেবীও হয়ে উঠেছিলেন অন্যতম একজন।

১৮৮৩ সালে মেদিনীপুরে চারুশীলা দেবীর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম রাখালচন্দ্র অধিকারী এবং মায়ের নাম কুমুদিনী দেবী। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতা এবং গবেষক স্বনামধন্য ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের অন্যতম একজন ছাত্রী ছিলেন চারুশীলা দেবী। পড়াশোনায় তাঁর ছিল গভীর আগ্রহ। মাত্র বারো বছর বয়সেই মেদিনীপুর নিবাসী বীরেন্দ্রকুমার গোস্বামীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়।

বাংলার অন্যতম কিশোর বিপ্লবী ক্ষুদিরামের সঙ্গে চারুশীলা দেবীর আত্মীয়তার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। ছোটবেলাতেই ক্ষুদিরাম বাবা-মাকে হারান এবং তার ফলে মেদিনীপুরের নিকটস্থ হাবিবপুরে তাঁর দিদির বাড়িতেই তাঁকে আশ্রয় নিতে হয়। আর এই দিদির বাড়িতেই চারুশীলা দেবীর সঙ্গে পরিচয় হয় ক্ষুদিরামের। অনাথ ক্ষুদিরামের প্রতি চারুশীলা দেবীর অপার স্নেহ বর্ষিত হত। তাই মাঝেমধ্যেই ক্ষুদিরাম তাঁর বাড়িতে থাকতেন। বয়সে মাত্র ছয় বছরের ছোট ক্ষুদিরামকে তিনিই রক্ততিলক পরিয়ে দেশের জন্য আত্মবিসর্জন এবং স্বদেশি আন্দোলনে যোগদানের প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছিলেন। ফলে ক্ষুদিরামের বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের পিছনে চারুশীলা দেবীর প্রত্যক্ষ অনুপ্রেরণা ও অবলম্বন ছিল। ১৯০৫ সালে ক্ষুদিরাম যোগ দিয়েছিলেন স্বদেশি দলে। ঠিক এর পরের বছর ১৯০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মেদিনীপুরের পুরনো কেল্লার সামনে ‘বন্দেমাতরম’ পুস্তিকা বিলি করার সময় পুলিশ ক্ষুদিরামের হাত থেকে পুস্তিকা কেড়ে নিলে ক্ষুদিরাম প্রতিবাদস্বরূপ পুলিশের গায়ে হাত তোলেন এবং যথারীতি গ্রেপ্তার হন। রাজা নরেন্দ্রলাল খান অনেক অর্থ দিয়ে এই মামলা পরিচালনা করায় ক্ষুদিরাম ছাড়া পেয়েছিলেন। অনুশীলন সমিতির সদস্য হিসেবে ক্ষুদিরাম যখন কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে যাবেন ১৯০৮ সালে, তার আগে তিনি কিছুদিনের জন্য চারুশীলা দেবীর বাড়িতেই বাস করেছিলেন। কিংসফোর্ড হত্যার চেষ্টার পরিপ্রেক্ষিতে মামলা শুরু হলে চারুশীলা দেবীর বাড়িতে পুলিশ তদন্ত করেছিল। ক্ষুদিরাম এই সময় আত্মগোপন করেছিলেন।

১৯২১ সালে মেদিনীপুরে অসহযোগ আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধী, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ এলে তাঁদের অনুপ্রেরণায় চারুশীলা দেবী একটি মহিলা সমিতি গড়ে তোলেন। মেদিনীপুর জুড়ে নারী জাগরণের জোয়ার আসে। এরপরে কলকাতায় প্রশিক্ষণ নিতে যান এবং পরে আবার মেদিনীপুরে ফিরে গিয়ে মহিলা সমিতির কাজে যোগ দেন তিনি। ১৯৩০ সালে আইন অমান্য আন্দোলনের প্রাক্‌-মুহূর্তে লবণ আইন ভঙ্গের সময় চারুশীলা দেবী অংশগ্রহণ করেন। এই সময় নরঘাটের একটি জনসভায় চারুশীলা দেবী, জ্যোতির্ময়ী গাঙ্গুলী প্রমুখরা বক্তব্য রাখেন। ঠিক এই সময় পুলিশবাহিনী সভা করতে নিষেধাজ্ঞা জারি করলে জ্যোতির্ময়ী দেবীর আহ্বানে গ্রামের এক অতিসুন্দরী ষোড়শী পতিতা এগিয়ে আসেন সভা করার উদ্দেশ্যে এবং তাঁর অনুপ্রেরণায় আরো আটশো জন গ্রাম্য মহিলা এসে দাঁড়ান সভামঞ্চের সামনে। তারপর সভা শেষ করে লবণ তৈরির স্থানের উদ্দেশ্যে রওনা হলে শুরু হয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর লাঠিচার্জ। সেই লাঠিচার্জে এক বালকের চোখ ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যায়। কিন্তু আন্দোলন থামেনি। পরের দিন জ্যোতির্ময়ী দেবীর সঙ্গে চারুশীলা দেবীও কাঁথি, কালীনগর প্রভৃতি স্থানে সভা করতে থাকেন। তাঁদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সাধারন মানুষ আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দিতে থাকেন। বে-আইনি লবণ তৈরি করার অপরাধে ঝড়েশ্বর মাঝির কারাদণ্ড হলে তাঁর মায়ের কাছে গিয়ে চারুশীলা দেবী এবং জ্যোতির্ময়ী দেবী জানতে পারেন যে পুলিশ তাঁদের আটশো মণ ধান মাঠের মধ্যে ফেলে নষ্ট করেছে। পুকুরেও কিছু ধান ফেলে দিয়েছে পুলিশ। ফলে তাঁদের অতি কষ্টে ফলানো ফসল নষ্ট করে অন্নকষ্টে ফেলে দিয়ে পুলিশ যে অপরাধ করেছে তার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন ঝড়েশ্বর মাঝির মা এবং তিনিও লবণ আইন ভঙ্গ করতে চান বলে ইচ্ছাপ্রকাশ করেন চারুশীলা দেবীর কাছে। চন্দ্রাকরে বে-আইনি সভা আয়োজন এবং জনগণকে সমবেত করে ব্রিটিশ বিরোধী চক্রান্তে সামিল হওয়ার জন্য চারুশীলা দেবীর নামে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। সেখান থেকে পালিয়ে যান চারুশীলা দেবী এবং খড়গপুরে এসে আত্মগোপন করেও শ্রমিক ইউনিয়নের একটি সভা আহ্বান করেন তিনি। এই সভার মধ্য দিয়ে সত্যাগ্রহীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ করতে চান তিনি এবং সংগৃহীত অর্থ নিয়ে কাঁথির উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। রাত্রি দুটো নাগাদ কাঁথিতে অন্নদা চৌধুরী হাতে সংগৃহীত অর্থ তুলে দেন চারুশীলা দেবী। ১৯৩০ সালের ৭ আগস্ট বে-আইনি একটি শোভাযাত্রা পরিচালনা করার অপরাধে ব্রিটিশ পুলিশ চারুশীলা দেবীকে গ্রেপ্তার করে। বিচারে ছয় মাসের কারাদণ্ড ঘোষিত হয়। মেদিনীপুর জেলে থাকাকালীন বিধবা মহিলাদের নিজে হাতে রান্না করার অধিকার আদায়ের দাবিতে অনশন করেছিলেন তিনি। প্রথমে এই দাবি মানতে না চাইলেও জেল কর্তৃপক্ষ চারুশীলা দেবীর এই দাবি অবশেষে মানতে বাধ্য হয়।

মেদিনীপুরে বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনার অপরাধে ১৯৩০ সালে চারুশীলা দেবী বাড়ি তিন মাসের জন্য বাজেয়াপ্ত করেছিল ব্রিটিশ পুলিশ এবং এই সময়েই তাঁর বাড়ি থেকে গয়না, টাকাকড়ি, কাপড়-চোপড় ও অন্যান্য বেশ কিছু জিনিস চুরি হয়। মনে করা হয় পুলিশই সেইসব জিনিস গোপনে সরিয়ে নিয়েছিল। ১৯৩১ সালের শেষে রাজবন্দি হিসেবে এক মাসের জন্য আটক রাখা হয় চারুশীলা দেবীকে। মোট ছয় মাস পরে জেল থেকে ছাড়া পেয়ে তিনি আবার আইন অমান্য আন্দোলনে যোগ দেন ১৯৩২ সালে। ফলে পুনরায় দেড় বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন তিনি। দেড় বছর পরে কারামুক্তি ঘটে তাঁর এবং তখনও কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনের দৃপ্ত তেজ তাঁর মন থেকে নিভে যায়নি। আবারো পাবনায় গিয়ে রাজদ্রোহমূলক বক্তৃতা দেন চারুশীলা দেবী। ফলস্বরূপ পুনরায় এক মাস কারাবরণ করে মেদিনীপুরে ফিরে আসেন তিনি। ১৯৩৩ সালে বিপ্লবীদের হাতে ম্যাজিস্ট্রেট বাজ নিহত হলে চারুশীলা দেবীকে আট বছরের জন্য মেদিনীপুর থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং এই সময়ের মধ্যে তাঁর বাড়ি-ঘর, জমি সবই নিলামে বিক্রি হয়ে যায়। পুরীতেই ছিলেন চারুশীলা দেবী এই আট বছর। ১৯৩৮ সালে পুরী থেকে কলকাতায় ফিরে আসেন তিনি।

কপর্দকশূন্য অবস্থায় সেই সময় কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতেন চারুশীলা দেবী এবং এই অবস্থায় তাঁকে দেখে একদিন কলকাতা কর্পোরেশনের এডুকেশন অফিসার শৈলেন ঘোষ কর্পোরেশনের শিক্ষিকা হিসেবে তাঁকে কাজে নিযুক্ত করেন। বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত শোনা যায় তিনি শিক্ষিকা হিসেবেই কাজ করে গিয়েছিলেন।

চারুশীলা দেবীর মৃত্যুর সঠিক সময়কাল সম্পর্কে বিশেষ কোনও তথ্য পাওয়া যায় না।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading