সববাংলায়

ক্ষুদিরাম বসু

বিভাগঃ ,

ক্ষুদিরাম বসু পরাধীন ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত। মাত্র আঠারো বছর বয়সে হাসিমুখে ফাঁসি বরণ করে তিনি ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অমর শহীদে পরিণত হন। তৎকালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সিতে ব্রিটিশদের অত্যাচারী বিচারব্যবস্থা এবং বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে তিনি যুগান্তর দলের সশস্ত্র বিপ্লবী ধারায় যুক্ত হন। কুখ্যাত ব্রিটিশ ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ডকে হত্যার উদ্দেশ্যে মজফফরপুর হামলা এবং পরবর্তীতে হাসি মুখে ফাঁসি বরণ করার ঘটনা ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব জাগরণ সৃষ্টি করেছিল। তাঁর অসীম সাহসিকতা, দেশপ্রেম এবং আত্মত্যাগ তৎকালীন বাংলার ঘরে ঘরে কিশোর ও তরুণ সমাজকে বিপ্লবের মন্ত্রে দীক্ষিত করেছিল, যা পরবর্তীতে সশস্ত্র স্বাধীনতা আন্দোলনকে এক নতুন দিশা দান করে।

ক্ষুদিরাম বসুর জীবনী
ক্ষুদিরাম বসুর জীবনী নিয়ে তথ্যচিত্র দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন

১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির মেদিনীপুর জেলার কেশপুর থানার অন্তর্গত মোহবনী গ্রামে ক্ষুদিরাম বসুর জন্ম হয়। তাঁর পিতা ত্রৈলোক্যনাথ বসু নাড়াজোলে তহশিলদার ছিলেন। তাঁর মায়ের নাম লক্ষীপ্রিয়া দেবী। তিন কন্যার পর তিনি বাবা মায়ের চতুর্থ জীবিত সন্তান। এর আগে দুই পুত্র থাকলেও তারা অল্প বয়সে মারা যায়। তাই এই পুত্রের মৃত্যুর আশঙ্কায় তাঁর মা তৎকালীন লোকবিশ্বাস অনুযায়ী ক্ষুদিরামকে তাঁর বড় দিদি অপরূপা দেবীর কাছে তিন মুঠি খুদের বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। খুদের বিনিময়ে ক্রয়কৃত শিশুটির নাম পরবর্তীকালে ক্ষুদিরাম রাখা হয়। অল্প বয়সে বাবা মা মারা যাওয়ায় ক্ষুদিরাম বসু পরবর্তীকালে দিদি অপরূপা এবং ভগ্নিপতি অমৃতলাল রায়ের আশ্রয়ে মেদিনীপুরের তমলুক শহর এলাকায় বড় হতে থাকেন।

ক্ষুদিরামের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়েছিল তমলুকের হ্যামিল্টন হাই স্কুলে। পরবর্তীতে ১৯০৩ সালে তিনি মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন এবং অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করার পর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় ইতি টানেন। এই সময়ে মেদিনীপুরে প্রখ্যাত স্বাধীনতা সংগ্রামী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সাহচর্য পেয়ে ক্ষুদিরাম গভীরভাবে রাজনীতি ও বিপ্লবের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন।

১৯০৫ সালে লর্ড কার্জন কর্তৃক বঙ্গভঙ্গের ঘোষণার পর সমগ্র বাংলায় যে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী ও স্বদেশি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল, তরুণ ক্ষুদিরাম তাতে সক্রিয়ভাবে যোগ দেন। এই সময় তিনি সত্যেন বসুর নেতৃত্বে মেদিনীপুরে গঠিত গুপ্ত সমিতিতে যোগ দেন। সেখানে লাঠিখেলা, তরবারি চালনা এবং পিস্তল ব্যবহারের প্রশিক্ষণের পাশাপাশি রাজনৈতিক ও সামাজিক শিক্ষার অনুশীলন চলত। এই গুপ্ত সমিতির সদস্য হিসেবে তিনি বিলেতি কাপড় পোড়ানো, বিলাতি লবণবাহী নৌকা ডুবিয়ে দেওয়া এবং বিপ্লবী কার্যক্রমে অর্থ সংগ্রহের কাজ অত্যন্ত দক্ষতা ও সাহসিকতার সাথে পরিচালনা করতেন। এসব কর্মকান্ডে তাঁর সততা, নিষ্ঠা, সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া যায়।

১৯০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মেদিনীপুরে আয়োজিত ‘শিল্প ও কৃষি প্রদর্শনী’ চলাকালীন বিপ্লবী ক্ষুদিরামের তেজস্বী রূপ সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে। সত্যেন বসু রচিত ‘সোনার বাংলা’ নামক একটি সরকারবিরোধী ও বিপ্লবাত্মক ইশতেহার মেদিনীপুর এক্সিকিউটিভ প্রাঙ্গণে বিলি করার সময় এক ব্রিটিশ হাবিলদার আমজাদ আলী তাঁকে গ্রেপ্তার করার চেষ্টা করে। মাত্র ১৬ বছর বয়সের তরুণ ক্ষুদিরাম নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে সেই পুলিশ সদস্যের মুখে সজোরে আঘাত করে পালিয়ে যান। এই ঘটনার জন্য তাঁর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের মামলা করা হলেও কম বয়স ও প্রমাণের অভাবে আদালত তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করে। এই ঘটনার পর গুপ্ত সমিতির ভিতর তাঁর মর্যাদা বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং তিনি ব্রিটিশ প্রশাসনের নজরদারিতে চলে আসেন। পরবর্তীতে ১৯০৭ সালে তিনি মেদিনীপুরের কাছাকাছি নারায়ণগড় রেল স্টেশনের কাছে গভর্নরের বিশেষ ট্রেন লাইনচ্যুত করার উদ্দেশ্যে আয়োজিত মেদিনীপুর বোমার পরিকল্পনাতেও নেপথ্যে ভূমিকা পালন করেন।

১৯০৭ সালের শেষভাগে ক্ষুদিরাম কলকাতার মানিকতলায় বারীন্দ্রকুমার ঘোষ ও অরবিন্দ ঘোষের নেতৃত্বাধীন ‘যুগান্তর’ দলের কেন্দ্রীয় বিপ্লবী সংগঠনের সাথে সরাসরি যুক্ত হন। সেই সময় কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস কিংসফোর্ড স্বদেশী আন্দোলনকারীদের ওপর, বিশেষ করে শিশু-কিশোর বিপ্লবীদের ওপর কঠোর দণ্ড ও পক্ষপাতিত্বমূলক রায় দেওয়ার জন্য পরিচিত ছিলেন। বিপ্লবীরা কিংসফোর্ডকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথমে ১৯০৮ সালের মার্চ মাসে একটি বইয়ের ভেতর সুকৌশলে বোমা রেখে পার্সেল আকারে কিংসফোর্ডের কাছে পাঠানো হয়, কিন্তু কিংসফোর্ড পার্সেলটি না খোলায় সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। বিপ্লবীদের এই তৎপরতা বুঝতে পেরে ইংরেজ সরকার কিংসফোর্ডকে নিরাপত্তার স্বার্থে বিহারের মজফ্ফ‌রপুরে জেলা জজ হিসেবে বদলি করে দেয়। যুগান্তর দলের পক্ষ থেকে কিংসফোর্ডকে হত্যার চূড়ান্ত দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্ষুদিরাম বসু এবং বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীকে।

১৯০৮ সালের এপ্রিল মাসের শেষ সপ্তাহে ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী রিভলবার, বোমা এবং প্রয়োজনীয় অর্থ নিয়ে মজফফরপুরে পৌঁছান এবং একটি স্থানীয় ধর্মশালায় অবস্থান শুরু করেন। তাঁরা টানা কয়েক দিন কিংসফোর্ডের দিনপঞ্জি, গতিবিধি এবং ক্লাব হাউস থেকে যাতায়াতের পথ পর্যবেক্ষণ করেন। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল রাত প্রায় সাড় আটটা নাগাদ কিংসফোর্ড যখন ইউরোপিয়ান ক্লাব থেকে বের হচ্ছিলেন, তখন অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ক্লাব হাউসের বাইরে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে থাকা ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী তাঁর ফিটন গাড়ি লক্ষ করে একটি শক্তিশালী বোমা নিক্ষেপ করেন। বোমাটি বিকট শব্দে ফাটে এবং গাড়িটি সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। তবে দুর্ভাগ্যবশত সেই গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না; এতে ছিলেন কিংসফোর্ডের বন্ধু বিশিষ্ট আইনজীবী কেনেডির স্ত্রী মিসেস কেনেডি এবং তাঁর কন্যা। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মিসেস কেনেডি ও তাঁর মেয়ে নিহত হন।

ঘটনার পর স্থান ত্যাগ করে ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী আলাদা পথে খালি পায়ে ছুটতে থাকেন। ক্ষুদিরাম সারা রাত প্রায় ২৫ মাইল পথ পায়ে হেঁটে পরদিন ১ মে সকালে ওয়াইনি (Waini) রেল স্টেশনে পৌঁছান। সেখানে এক দোকানে জল খাওয়ার সময় পুলিশের সন্দেহ হলে ক্ষুদিরাম রিভলবার বের করার চেষ্টা করেন, কিন্তু দুই পুলিশ সদস্য তাঁকে চেপে ধরে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে তাঁর কাছ থেকে দুটি রিভলবার এবং ৩৭ রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে, প্রফুল্ল চাকী মোকামা ঘাটের কাছে পুলিশের কাছে ধরা পড়ার মুহূর্তে নিজের রিভলবার দিয়ে নিজেকে গুলি করে আত্মাহুতি দেন। গ্রেপ্তারের পর ক্ষুদিরাম সমস্ত দায় এককভাবে নিজের ওপর তুলে নেন এবং কোনও সহযোদ্ধার নাম প্রকাশ করা তো দূরের কথা, টানা পুলিশি অত্যাচারেও সংগঠনের কোনও গোপন তথ্য প্রকাশ করেননি।

বিচারের সময় আদালতে ক্ষুদিরামের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে লড়াই করেছিলেন কালীদাস বসু এবং আপিলে নরেন্দ্রনাথ বসু, কিন্তু ক্ষুদিরাম নিজে ছিলেন সম্পূর্ণ নির্ভীক ও অবিচল। বিচারক যখন তাঁকে মৃত্যুদণ্ডের নির্দেশ দেন, তখনো ১৮ বছর বয়সী ক্ষুদিরামের মুখে ছিল প্রফুল্ল হাসির রেখা। বিচারক অবাক হয়ে হাসি দেখে কারণ জানতে চাইলে তিনি শান্ত কণ্ঠে উত্তর দিয়েছিলেন যে, তিনি কেবল দেখতে চান কীভাবে বোমা তৈরি করতে হয় তা বিচারক জানেন কি না। মজফফরপুর ঘটনার মাত্র ৩ মাস ১১ দিন পর, ১৯০৮ সালের ১১ আগষ্ট ভোরে মজফফরপুর জেলে ক্ষুদিরাম বসুকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ফাঁসির মঞ্চে উঠে তিনি অত্যন্ত শান্তভাবে হাসিমুখে গলায় ফাঁসির দড়ি তুলে নিয়েছিলেন। তাঁর এই আত্মত্যাগ পরাধীন ভারতের তরুণদের মনে বিপ্লবের যে দাবানল জ্বালিয়েছিল, তা পরবর্তীকালে ভগৎ সিং, সূর্য সেনদের মতো হাজারো বিপ্লবীকে দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য জীবন উৎসর্গ করার প্রেরণা যুগিয়েছিল।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. Sarfarosh: A naadi Exposition of the lives of Indian Revolutionaries by K.Guru Rajesh.
  2. আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৬শে জানুয়ারি ২০১৫ সাল।
  3. https://en.wikipedia.org/wiki/Khudiram_Bose

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।