হেমচন্দ্র দাস কানুনগো (Hemchandra Das Kanungo) একজন বাঙালি বিপ্লবী যিনি আলিপুর বোমা মামলায় অভিযুক্ত বিপ্লবীদের মধ্যে অন্যতম। তিনিই প্রথম প্যারিস থেকে বোমা তৈরির কৌশল শিখে এসে বাংলার মাটিতে বসে বোমা তৈরি করেন। অনুশীলন সমিতি, যুগান্তর দলের তরুণ বিপ্লবীদের বোমা তৈরির প্রশিক্ষণও তিনিই দিতেন। কলকাতার কাছেই মুরারিপুকুরে তিনি যুগান্তর দলের হয়ে একটি বোমা কারখানা তৈরি করেছিলেন। ঐ কারখানাতে তৈরি বোমার প্রথমটি নিক্ষেপ করা হয় চন্দননগরে এবং আরেকটি বোমা বইয়ের মধ্যে বিশেষ পদ্ধতিতে রেখে পাঠানো হয়েছিল কিংসফোর্ডের কাছে তাঁকে হত্যার জন্য। যদিও কিংসফোর্ড হত্যার এই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত অসফল হয়। জার্মানির স্টুটগার্ট শহরে বসে ভারতের প্রাথমিক জাতীয় পতাকার অন্যতম নকশাকার ছিলেন হেমচন্দ্র কানুনগো। পেশায় মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলের অঙ্কন শিক্ষক হেমচন্দ্রকে আলিপুর বোমা মামলায় যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরিত করা হয়। ভারতের সশস্ত্র বিপ্লব প্রচেষ্টার বিস্তৃত বিবরণ নিয়ে তাঁর লেখা ‘বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা’ বইটি ১৯২৮ সালে প্রকাশিত হয়।
১৮৭১ সালের ৪ আগস্ট অবিভক্ত মেদিনীপুর জেলার রাধানগর গ্রামে হেমচন্দ্র কানুনগোর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ক্ষেত্রমোহন কানুনগো এবং তাঁর মায়ের নাম কমলেকামিনী কানুনগো। হেমচন্দ্রের মা কমলেকামিনী ছিলেন দাঁতন থানার খণ্ডরুই গ্রামের জমিদার কালীপ্রসন্ন সিংহ গজেন্দ্র মহাপাত্রের বোন। হেমচন্দ্রের বাবার আদি নিবাস ছিল ওড়িশার জজপুরে এবং তাঁদের পারিবারিক পদবি ছিল ‘দাস’। হেমচন্দ্রের বাবা মূলত জমি জরিপের কাজে রাধানগরে এসেছিলেন এবং এই কাজের জন্যেই তাঁদের উপাধি হয় ‘কানুনগো’। পরে এই উপাধিই তাঁদের পদবির স্থান পায়।
স্থানীয় বড়মোহন মধ্য ইংরেজি স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষালাভ করেন হেমচন্দ্র কানুনগো এবং তারপর মেদিনীপুর টাউন স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন তিনি। এরপরে মেদিনীপুর কলেজে এফ.এ ক্লাসে ভর্তি হন তিনি। এই সময় বড় মামার উৎসাহে কলকাতার ক্যাম্পবেল মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়তে ভর্তি হন। কিন্তু পরিবারের সকলের অনিচ্ছাসত্ত্বেও মাঝপথেই ডাক্তারি পড়া ছেড়ে দিয়ে আর্ট স্কুলে ভর্তি হন হেমচন্দ্র। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার অভ্যাস ছিল তাঁর এবং আঁকার হাতও ছিল বেশ পটু। কিন্তু আর্ট স্কুলের শিক্ষাও সম্পূর্ণ করেননি তিনি। শেষ পরীক্ষাটি দেওয়ার আগেই চাকরিতে যোগ দেন তিনি। পরবর্তীকালে তমলুকের পাঁচবেড়িয়ার শরৎকুমারী দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। তাঁদের দুই কন্যা ও এক পুত্রসন্তান জন্মালেও অচিরেই দুই কন্যার মৃত্যু হয়।
প্রথমে মেদিনীপুর স্কুলের অঙ্কন শিক্ষক হিসেবে হেমচন্দ্র কানুনগো তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। পরে মেদিনীপুর কলেজে রসায়নবিদ্যার ডেমনস্ট্রেটর হিসেবে কাজে যোগ দেন তিনি। কিছুদিন পরে সব চাকরি ছেড়ে দিয়ে ছবি আঁকাকেই পেশা হিসেবে বেছে নেন হেমচন্দ্র। কিন্তু শুধু ছবি এঁকে পেট চলছিল না। অন্নসংস্থানের আশায় মেদিনীপুর জেলা বোর্ডে চাকরি নেন তিনি। এই সময় থেকে রাজনারায়ণ বসুর ভ্রাতুষ্পুত্র বিখ্যাত বিপ্লবী জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসুর অনুপ্রেরণায় গুপ্ত বিপ্লবী সমিতিতে যোগ দেন তিনি। সেই দলের নাম ছিল ‘অনুশীলন সমিতি’। ১৯০২ সালে তাঁর সঙ্গে অরবিন্দ ঘোষের পরিচয় ঘটে। পরবর্তীকালে ১৯০২ সালে মেদিনীপুরের অনুশীলন সমিতি এবং কলকাতার সমিতি একত্রে যুক্ত হয়। মেদিনীপুরে তাঁর মামারবাড়ির সংলগ্ন একটি বাগানে হেমচন্দ্র তরুণ বিপ্লবীদের অস্ত্রশিক্ষা দিতেন। প্রাথমিক পর্ব থেকেই স্বাধীনতা সংগ্রামীদের অস্ত্রগুরু হিসেবেই পরিচিতি গড়ে ওঠে তাঁর। ১৯০৩ সালে মেদিনীপুরে আসেন ভগিনী নিবেদিতা এবং তাঁর উদ্যোগে এখানে আরেকটি আখড়ার উদ্বোধন ঘটে। ভগিনী নিবেদিতার শিক্ষা অবলম্বন করে দুই বন্ধু যথাক্রমে জ্ঞানেন্দ্রনাথ বসু এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে সঙ্গে নিয়ে সক্রিয় সশস্ত্র বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হন তিনি। বঙ্গভঙ্গের আগে অনুশীলন সমিতির সেভাবে কোনও কার্যকলাপ ছিল না, কিন্তু বঙ্গভঙ্গের পর থেকে ইংরেজদের দমননীতি আরও প্রকট হলে অনুশীলন সমিতির কলকাতা শাখার নেতৃবৃন্দ সকলেই ব্রিটিশ নিধনের পরিকল্পনা করে।
বিবাহিত হয়েও নিশ্চিন্ত জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ছেড়ে বৈপ্লবিক পদক্ষেপে সামিল হন হেমচন্দ্র কানুনগো। পূর্ববঙ্গের কুখ্যাত লাট ব্যামফিল্ড ফুলারকে হত্যার জন্য হেমচন্দ্র পূর্ববঙ্গ ও আসামের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিভ্রমণ করেন, কিন্তু সেই হত্যা পরিকল্পনা ফলপ্রসূ হয়নি। অনুশীলন সমিতির সাংগাঠনিক দুর্বলতা বুঝতে পেরে এবং অস্ত্রশস্ত্র নির্মাণ তথা বিপ্লবী আক্রমণের ব্যাপারে প্রভূত জ্ঞান অর্জনের জন্য তিনি পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে জমানো অর্থে ১৯০৬ সালে ইউরোপ চলে যান। প্যারিসে পৌঁছে তিনি সেখানকার গুপ্ত বিপ্লবী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং এই সময়পর্বে সব অর্থ নিঃশেষিত হলে জার্মানিতে শ্যামজি কৃষ্ণবর্মার সঙ্গে দেখা করেন তিনি। শ্যামজি কৃষ্ণবর্মা হেমচন্দ্রের এই আবেদনে সাড়া দিয়ে তাঁকে লণ্ডনের ‘ইণ্ডিয়া হাউস’-এ ভারতীয় আবাসিক ছাত্রদের আশ্রমে কাজ করতে বলেন। সেখানেই এক ভারতীয় রত্ন ব্যবসায়ী সর্দারসিংজি রাওজি রানার সাহায্যে নিজের উদ্যোগে একটি ছোটখাট রসায়নাগার তৈরি করে সেখানে বোমা তৈরি নিয়ে নানাবিধ পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে থাকেন হেমচন্দ্র। এই রাওজি রানাই রাশিয়া এবং পোল্যান্ডের বিপ্লবীদের কাছ থেকে বোমা তৈরির ব্লু প্রিন্ট ইংরেজিতে অনুবাদ করে তা সাইক্লোস্টাইল কপি করে হেমচন্দ্রকে দিয়েছিলেন।
ইতিমধ্যে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের নজরে পড়ার কারণে প্যারিসে পালিয়ে আসতে হয় হেমচন্দ্রকে। প্যারিসে এক স্বদেশপ্রেমিক ব্যবসায়ীর সূত্র ধরে বিখ্যাত প্রবাসী বিপ্লবী মাদাম কামার সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তাঁর। বিপ্লবী নেত্রী মাদাম কামার সাহায্যে ফরাসি সমাজতন্ত্রী বিপ্লবী গুপ্ত সমিতির সঙ্গে কাজ করতে থাকেন হেমচন্দ্র কানুনগো। জার্মানির স্টুটগার্ট শহরে ভারতীয় জাতীয় পতাকার নক্শা প্রস্তুত করতে শুরু করেন হেমচন্দ্র কানুনগো। হেমচন্দ্র কানুনগো ভারতের বাইরে বসে ভারতের প্রথম জাতীয় পতাকা তৈরি করেছিলেন। তাঁকে সাহায্য করেছিলেন মাদাম ভিকাজী কামা এবং শ্যামজী কৃষ্ণবর্মা। ১৯০৭ সালে স্টুটগার্টের আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক কংগ্রেসে মাদাম কামা সেটি উত্তোলন করেন। তবে ভারতের প্রথম জাতীয় পতাকা নিয়ে এই তথ্য ইতিহাসে অবহেলিত এবং উপেক্ষিত। যাইহোক, ফ্রান্স, সুইজারল্যাণ্ড প্রভৃতি জায়গায় বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত থেকে বোমা তৈরি ভালভাবে শিখে ফেলেন তিনি।
১৯০৭ সালে দেশে ফিরে আসেন হেমচন্দ্র। কলকাতার ‘যুগান্তর’ দলের নেতা বারীন্দ্র কুমার ঘোষের সহায়তায় কাজ করতে শুরু করেন তিনি। যদিও বারীন ঘোষের সঙ্গে বেশ কিছু বিষয়ে মতানৈক্য ছিল হেমচন্দ্রের। কলকাতার কাছে মুরারিপুকুরে বারীন্দ্র ঘোষের পৈত্রিক বাগানবাড়িতে একটি বোমা কারখানা তৈরি করে সেখানে বোমা বানাতে থাকেন হেমচন্দ্র কানুনগো। তাঁর তৈরি প্রথম বোমাটি ফরাসি অধিকৃত চন্দননগরের প্রশাসনিক প্রধানের উপর নিক্ষেপ করা হয়, কিন্তু ভাগ্যক্রমে মেয়র বেঁচে যান। তাঁর তৈরি দ্বিতীয় প্রচেষ্টাটি ছিল আরও রোমাঞ্চকর এবং ভয়ানক। Herbert Broom রচিত ‘Commentaries on the Common Law: Designed as introductory to its Study’ নামের ১০৭৫ পৃষ্ঠার একটি বইয়ের মাঝখান থেকে ৬০০ পাতা নিখুঁতভাবে কেটে ক্যাডবেরি কোকোর কৌটোর ভিতর পিকরিক অ্যাসিড এবং ফালমিনেট অব মার্কারি সহযোগে তৈরি বারুদ ভরে এবং একটি স্প্রিং লাগিয়ে বইটি বন্ধ অবস্থায় তিনি কিংসফোর্ড সাহেবের কাছে পাঠান তাঁকে হত্যার জন্য। বিপ্লবী পরেশ মৌলিক সরকারী কর্মী পরিচয়ে কিংসফোর্ডের বাড়িতে বইটি পৌঁছে দেন। কিন্তু ভাগ্যক্রমে সেই বইটি খোলেননি কিংসফোর্ড, ফলে সে যাত্রায় তিনিও বেঁচে যান। এরপর কিংসফোর্ডকে হত্যার জন্য আরেকটি বোমা তৈরি করেন হেমচন্দ্র। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল তাঁর তৈরি বোমাই ছুঁড়েছিলেন বিখ্যাত বিপ্লবী ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকী। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এবারেও কিংসফোর্ড মারা যাননি, তাঁর বদলে মিসেস কেনেডি ও তাঁর মেয়ের মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনায় ব্রিটিশ পুলিশ সচকিত হয়ে ১৯০৮ সালের ২ মে নাগাদ মুরারিপুকুর বাগানবাড়িতে খান্না-তল্লাশি চালায় এবং অন্য আরও কয়েকজন বিপ্লবীর সঙ্গে হেমচন্দ্র কানুনগোও গ্রেপ্তার হন। তাঁদের বিরুদ্ধেই শুরু হয় বিখ্যাত আলিপুর বোমা মামলা। মামলার বিচারে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তর হয় হেমচন্দ্রের। আলিপুর বোমা মামলার আসামি হিসেবে তিনিই ছিলেন একমাত্র বিপ্লবী যিনি শত প্ররোচনা সত্ত্বেও পুলিশের কাছে কোনও বিবৃতি দেননি। অনেকে মনে করেন ক্ষুদিরামের ফাঁসি নিয়ে রচিত বিখ্যাত গান ‘একবার বিদায় দে মা’ -তে ব্যবহৃত ‘অভিরাম’ আসলে হেমচন্দ্র কানুনগো।
১৯২১ সালে জেল থেকে ছাড়া পান হেমচন্দ্র। এরপর কিছুদিন ছবি এঁকে জীবিকানির্বাহ করতে থাকেন তিনি। ক্রমেই তাঁর মানসিক স্থিতি খারাপ হতে থাকে। পরে মানবেন্দ্রনাথ রায়ের দলেও কিছুদিন কাজ করেছেন তিনি। শেষ জীবনে নিজের গ্রাম রাধানগরের বাড়িতে ছবি এঁকে আর ছবি তুলে কাটাতে থাকেন হেমচন্দ্র কানুনগো।
তাঁর লেখা ‘বাংলায় বিপ্লব প্রচেষ্টা’ বইটি বাংলার সশস্ত্র বিপ্লবী কার্যকলাপের এক বিস্তৃত বিবরণ এবং এক প্রামাণ্য ঐতিহাসিক গ্রন্থ যা ১৯২৮ সালে প্রকাশ পায়।
১৯৫১ সালের ৮ এপ্রিল হেমচন্দ্র কানুনগোর মৃত্যু হয়।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।
তথ্যসূত্র
- শ্রীসুবোধচন্দ্র সেনগুপ্ত ও অঞ্জলি বসু, ‘সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান’, সাহিত্য সংসদ, মে ১৯৬০, কলকাতা, পৃ ৬০৪-৬০৫
- স্বাধীনতা যুদ্ধে অচেনা লালবাজার: অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের রোমহর্ষক বীরগাথা, সুপ্রতিম সরকার, আনন্দ পাবলিশার্স, আগস্ট ২০১৮ সংস্করণ, শুধু নামেই সুশীল, পৃষ্ঠা – ১৭
- https://en.wikipedia.org/
- https://www.midnapore.in/
- https://newsfront.co/
- https://www.anandabazar.com/


আপনার মতামত জানান