ভূগোল

চন্দননগর

পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্গত হুগলী জেলার একটি প্রসিদ্ধ ইতিহাস বিজড়িত জনপদ হল চন্দননগর (Chandannagar)। এটি আসলে চন্দননগর সাব-ডিভিশনের সদর দপ্তর এবং এই সম্পূর্ণ এলাকাটি কলকাতা মেট্রোপলিটান ডেভেলপমেন্ট অথরিটি অর্থাৎ কেএমডিএ-র অধীনস্থ।

ভৌগোলিক বিচারে চন্দননগর জনপদটি ২২.৮৭০ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৮.৩৮০ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে অবস্থিত। সমুদ্রতল থেকে ১০ মিটার উঁচু এই জনপদের উত্তরে চুঁচূড়া, দক্ষিণে ভদ্রেশ্বর, পূর্বদিকে বয়ে চলেছে হুগলী নদী এবং পশ্চিমে রয়েছে ধনিয়াখালী। পশ্চিমদিকে খলিসানি, দক্ষিণদিকে গোন্দালপাড়া আর উত্তরদিকে বোরো গ্রাম এই জনপদের মূল তিনটি গ্রামের মধ্যে অন্যতম।

চন্দননগর নামের পিছনে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ ইতিহাস। নামকরণের প্রকৃত কারণ বা উৎস কী তা নিয়ে বিদগ্ধমহলে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন এই জনপদ ভাগীরথী নদীর তীরে অনেকটা অর্ধেক চাঁদের মতো অবস্থানে থাকায় এর নাম ‘চন্দ্রনগর’ থেকে ‘চন্দননগর’ হয়েছে। আবার অনেক ঐতিহাসিক তথ্যে মেল বহু আগে ফরাসিদের এই অঞ্চলে চন্দনকাঠের ব্যবসা করার কথা। চন্দনকাঠের দেশ বলে অনেক জায়গাতেই এই জনপদকে অভিহিত করা হয়েছে যা থেকেও এই নামকরণ হতে পারে। সাহিত্যের ইতিহাস প্রণেতা ড. সুকুমার সেনের মতে, এই জনপদের মা চণ্ডীর মন্দিরের থেকে এর নাম হয় প্রথমে ‘চণ্ডীরনগর’ এবং সেখান থেকে কালের বিবর্তনে তা বদলে যায় চন্দননগরে। সমাজবিদ ও ঐতিহাসিক বিনয় ঘোষ আবার ভিন্ন মত পোষণ করে বলেছেন যে এই অঞ্চলে চন্দ্র রাজবংশের শাসনের সুবাদে এখানকার এইরূপ নামকরণ হয়েছে। ১৬৬০ সালে ফ্যান-ডেন-ব্রোকের মানচিত্রে প্রথম চন্দননগরের অবস্থান ও নামের উল্লেখ পাওয়া যায় এবং এরপরে ১৬৯৬ সালে তিনজন ফরাসির লেখা চিঠিতে চন্দননগরের নাম পাওয়া যায়। হ্যামিলটন সাহেব ১৭০৬ সাল নাগাদ এই জনপদকে ‘চরনগর’ বলে উল্লেখ করেন। সিরাজদৌল্লার আমলে এই অঞ্চলের নাম ছিল ফরাসডাঙ্গা। কারণ এই জনপদ ছিল ফরাসিদের অধিকৃত। ফরাসিরা যদিও এই অঞ্চলের নাম পরে লিখতো ‘Chandernagor’ যা পরে ব্রিটিশদের শাসনক্ষমতায় আসার পরে ‘Chandernagore’ নামে অভিহিত হতে শুরু করে।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


চন্দননগরের ইতিহাস মূলত ফরাসিদের আধিপত্য এবং বারেবারে ইংরেজদের হস্তান্তর ও দখলের ইতিহাসের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে সংলগ্ন হয়ে আছে। ঐতিহাসিকদের মতে এই জনপদ তৈরি হয়েছিল বোরো, খলিসানি এবং গোন্দলপাড়া নামের তিনটি ছোটো ছোটো গ্রামকে একত্রিত করে। প্রাচীন বাংলায় বিপ্রদাস পিপলাইয়ের লেখা ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যে বোরো গ্রামের নাম পাওয়া যায়। আবার মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর লেখা ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে পাওয়া যায় গোন্দলপাড়া গ্রামের নাম। ষোড়শ শতকে কবিরামের লেখা ‘দিগ্বিজয়-প্রকাশ’ গ্রন্থে প্রথম খলিসানি গ্রামকে মহাগ্রাম নামে উল্লেখ করা হয়েছে। ফরাসি ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির প্রথম ডিরেক্টর ব্যুরো ডেসল্যান্দ মোগল সম্রাট ঔরঙ্গজেবকে চল্লিশ হাজার মুদ্রার বিনিময়ে ১৬৮৮ সালে এই জনপদের অধিকার দখল করেন এবং এরপরে এই অঞ্চলে তিনি একটি কারখানা তৈরি করেন। সর্বপ্রথম ফরাসি বণিক দ্যুপ্লে এখানে বোরো কিষাণগঞ্জ গ্রামের ১৩ অরপাঁ অর্থাৎ এখনকার হিসেবে প্রায় ষাট বিঘে জমি কেনেন ৪০১ টাকার বিনিময়ে। সেটা ১৬৭৩-৭৪ সালের কথা। তিনি পাকাপাকিভাবে এই অঞ্চলে থাকতেও শুরু করেন। এই অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া তাঁর ব্যবসার কথা পৌঁছে যায় ফ্রান্সেও। ফ্রান্স থেকে একদল ব্যবসায়ী এই কিষাণপুরে এসে নবাব ইব্রাহিম খানের থেকে তাঁর অনুমোদনে ৯৪২ হেক্টর জমি কিনে ফেলেন। ফরাসিদের পাশাপাশি তখন ওলন্দাজরাও এখানে এসে ব্যবসা করছিল। ১৭৩০ সালে এই এলাকার প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন ফ্রাঁসোয়া দ্যুপ্লে এবং তাঁর আমলেই এই শহরে দুই হাজারেরও বেশি ইঁটের বাড়ি নির্মিত হয়। এই সময় ধীরে ধীরে এই জনপদের লোকসংখ্যা এক লক্ষে পৌঁছায়। ১৭৫৬ সাল পর্যন্ত এই চন্দননগর থেকেই ইউরোপে বিভিন্ন পণ্য রপ্তানি হতো। যশোর থেকে এ সময় চন্দননগরে এসে ওঠেন ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী যিনি এই জনপদকে আরো বৃহত্তর করে তোলেন। ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির সঙ্গে তিনি ব্যবসা-বাণিজ্য করতে শুরু করেন। ১৭৫৬ সালে যদিও ব্রিটিশ কোম্পানি ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর বাড়ি, অর্থ এবং প্রায় ৬৫ লক্ষ টাকা মূল্যের গহনার সঞ্চয় সবই বাজেয়াপ্ত করে নেয়। এখানে তিনিই কৃষ্ণের উপাসনার জন্য নন্দদুলাল মন্দির নির্মাণ করেন আর সেখানেই গুপ্তকক্ষে তাঁর প্রভূত সম্পদ লুকোনো ছিল যা লর্ড ক্লাইভ পরে উদ্ধার করেছিলেন। এই ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীই প্রথম চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজো চালু করেন। ১৭৫৬ সালে ফ্রান্স এবং ব্রিটেনের মধ্যে উপনিবেশ দখলের জন্য যুদ্ধ বাধলে কর্ণেল রবার্ট ক্লাইভ এবং সেনাধ্যক্ষ ওয়াটস চন্দননগরে বোমা নিক্ষেপ করেন এবং এই জনপদের দখল নেন। সময়টা ১৭৫৭ সাল। ১৭৬৩ সালে এই জনপদ আবার ফরাসিদের কাছে হস্তান্তরিত হয় এবং ১৭৯৪ সালে নেপোলিয়নের যুদ্ধের সময় তা আবার ব্রিটিশদের দখলে চলে আসে। ১৮১৬ সালে চন্দননগর আবার ফরাসিদের অধিকারে আসে। ফরাসি অধিকৃত পণ্ডিচেরির শাসনাধীনে ছিল এই চন্দনগর। ভারতে ফরাসি উপনিবেশগুলির জন্য একজনই গভর্নর নিযুক্ত ছিলেন। বিচারব্যবস্থার জন্য পণ্ডিচেরির প্রধান উচ্চ আদালত ছিল আর তাছাড়া চন্দননগরে বিচারের জন্য পণ্ডিচেরি থেকেই বিচারপতি আসতেন। বছরে একবার করে ফ্রান্সের একজন ইন্সপেক্টর এখানে আসতেন বিভিন্ন বিষয় পরিদর্শনের জন্য। চন্দননগরের ফরাসি বিচার ব্যবস্থায় অপরাধীদের মৃত্যুদণ্ডের শাস্তি ছিল গিলোটিনে চড়ানো। ঐতিহাসিক তথ্য অনুসারে, শেখ আবদুল ও হীরু বাগদি নামে দুই অপরাধীকে গিলোটিনে হত্যা করা হয়। ১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হলেও চন্দননগরে তখনো ফরাসি শাসন কায়েম ছিল। ১৯৫১ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তারিখে চন্দননগর ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং ১৯৫৪ সালে এই জনপদ পশ্চিমবঙ্গের মানচিত্রে যুক্ত হয়।

চন্দননগরের স্ট্র্যাণ্ড রোডের নামের ইতিহাসের পিছনে জড়িয়ে আছে দুর্গাচরণ রক্ষিতের নাম। এখনও এই স্ট্র্যাণ্ডের ঘাটে একটি স্মৃতিফলকে লেখা আছে ‘মসিঁয়ে দৌরগা চরণ রাকুইট’। আসলে ফরাসিদের উচ্চারণে দুর্গাচরণ রক্ষিত এইরূপ পরিবর্তিত হয়ে উল্লিখিত হয়েছে। এখানকার লালবাগানে তাঁর স্মৃতিরক্ষার্থে আজও দেখা যায় রক্ষিত ভবন। চন্দননগরের মেয়র ও গভর্নরের পদেও আসীন ছিলেন দুর্গাচরণ রক্ষিত যাঁকে ফরাসি সরকার ১৮৯৬ সালে ‘লিজিয়ঁ দ্য অনার’ সম্মানে ভূষিত করে। ভারতের প্রথম এই পুরস্কারপ্রাপক ছিলেন তিনিই।

একসময় বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের অন্যতম ঘাঁটি ছিল এই চন্দননগর। কলকাতা থেকে মাত্র তিরিশ কিলোমিটার দূরের এই জনপদে জন্মেছিলেন বিপ্লবী কানাইলাল দত্ত, রাসবিহারী বসু, মতিলাল রায়, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখ বিখ্যাত বিপ্লবীরা। মতিলাল রায় এখানেই স্থাপন করেছিলেন তাঁর বিপ্লবী সমিতি ‘প্রবর্তক সংঘ’ যেখানে রাসবিহারী বসুর তত্ত্বাবধানে বোমা পরীক্ষা হয়েছিল যে বোমা পরে ছোঁড়া হয় লর্ড হার্ডিঞ্জকে উদ্দেশ্য করে যা ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে আছে দিল্লি – লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে। এছাড়াও শ্রীশচন্দ্র ঘোষ, মণীন্দ্রনাথ নায়েক প্রমুখ বিপ্লবীদের জন্মস্থান এই চন্দননগর। আধুনিক বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সদ্য প্রয়াত বিখ্যাত অভিনেতা তাপস পাল এই জনপদেই জন্মগ্রহণ করেছেন।

বহু প্রাচীন এই জনপদের সাক্ষরতার হার ৮৯.৬৫ শতাংশ। চন্দননগরের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলি এবং কলেজগুলিই এর শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র বলে পরিগণিত। চন্দননগর কানাইলাল বিদ্যামন্দির, প্রবর্তক বিদ্যার্থী ভবন, খলিসানি বিদ্যামন্দির, নিত্যগোপাল মডেল হাই স্কুল, কৃষ্ণভাবিনী নারী শিক্ষা মন্দির, লালবাগান বালিকা বিদ্যালয়, ভোলানাথ দাস বালিকা বিদ্যালয়, প্রবর্তক নারী মন্দির ইত্যাদি স্কুলগুলি সবই রাজ্য শিক্ষা পর্ষদের অধীনে। এছাড়া চন্দননগর গভর্ন্মেন্ট কলেজ, খলিসানি মহাবিদ্যালয় এই জনপদে ডিগ্রি কোর্সের জন্য খুবই বিখ্যাত শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান। কারিগরি শিক্ষার জন্য চন্দননগরে স্থাপিত হয়েছে উইমেন্স পলিটেকনিক কলেজ এবং মানকুণ্ডুর স্যার জে.সি বোস স্কুল অফ ইঞ্জিনিয়ারিং।

চন্দননগরের বিখ্যাত উৎসবের মধ্যে রয়েছে একমাত্র জগদ্ধাত্রী পুজো। বলা হয় পুজোর সময় এখানে যে বিশাল শোভাযাত্রা বেরোয় তা বিশ্বে দ্বিতীয় দীর্ঘতম শোভাযাত্রা। চন্দননগরের দেবী মূর্তির শোলার নানা কারুকাজ এবং পটচিত্রের টানে বহু দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এখানে আসেন। পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে একমাত্র এই জনপদেই সবথেকে উচ্চতম সব জগদ্ধাত্রী মূর্তি নির্মিত হয় যা এখানকার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। এছাড়াও শ্রাবণ মাসে হাটখোলায় ভুবনেশ্বরী পুজো হয়ে থাকে।

হস্তশিল্প বা অন্য কোনো লোকশিল্পের খুব বেশি খ্যাতি না থাকলেও চন্দননগরের সূর্য মোদকের জলভরা তালশাঁস সন্দেশ এবং জগদ্ধাত্রী পুজার চোখ ধাঁধানো আলোকসজ্জা খ্যাতি রয়েছে গোটা ভারত জুড়ে।

সুপ্রাচীন এই জনপদের অলিতে-গলিতে ইতিহাস ছড়িয়ে আছে আর এই সব ঐতিহাসিক উপাদান খুঁজে নিতে গেলে, তার স্বাদ-গন্ধ উপলব্ধি করতে গেলে চন্দননগরের স্ট্র্যাণ্ড, চন্দননগর মিউজিয়াম, দ্য স্যাক্রেড হার্ট গির্জা, ফরাসি সমাধিস্থল অবশ্যই দেখতে হবে। এছাড়া পাতালবাড়ি, নন্দদুলাল মন্দির, নৃত্যগোপাল স্মৃতি মন্দির, সাবিনারা ঠাকুরবাড়ি, ম্যাঙ্গো গার্ডেন ইত্যাদি অবশ্যই দ্রষ্টব্য। চন্দননগর ঘুরতে এলে ফরাসিদের স্থাপত্যকীর্তি আর বাঙালি নবাবদের বিলাস-ব্যসনের ছবি যে কোনো বাঙালিকে মুগ্ধ করবে।

কলকাতা থেকে মাত্র তিরিশ কিলোমিটার দূরেই এই চন্দননগরে পা রাখলে মনে হবে যেন অতীত দিনের একটা ছোটোখাটো ফ্রান্স। ফরাসি কায়দায় গড়া বাড়ি-ঘর, খিলান, স্ট্র্যাণ্ডের সৌন্দর্য্য, সমাধিস্থল এখানে একদিন বাণিজ্য করতে পদধূলি পড়েছিল কোনো ফরাসি বণিকের। সেইসব লুপ্ত পদচিহ্নের স্মৃতি মনকে বিহ্বল করে তুলবে, নিজেকে সেই ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে দিতে মন চাইবে নিশ্চিত। আর তাই বারবারই ঘুরে আসতে হবে চন্দননগরে।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

আধুনিক ভ্রূণ বিদ্যার জনক পঞ্চানন মাহেশ্বরীকে নিয়ে জানুন



ছবিতে ক্লিক করে দেখুন ভিডিও