ভূগোল

পুরুলিয়া

আমাদের পশ্চিমবঙ্গ মূলত ২৩টি জেলাতে বিভক্ত। বেশীরভাগ জেলাই স্বাধীনতার আগে থেকে ছিল, কিছু জেলা স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে গঠিত, আবার কিছু জেলা একটি মূল জেলাকে দুভাগে ভাগ করে তৈরি হয়েছে মূলত প্রশাসনিক সুবিধের কারণে। প্রতিটি জেলাই একে অন্যের থেকে যেমন ভূমিরূপে আলাদা, তেমনি ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক দিক থেকেও স্বতন্ত্র। প্রতিটি জেলার এই নিজস্বতাই আজ আমাদের বাংলাকে সমৃদ্ধ করেছে।সেরকমই একটি জেলা হল পুরুলিয়া ।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মেদিনীপুর বিভাগের পশ্চিমে অবস্থিত জেলা হল পুরুলিয়া জেলা ৷ ১৯৫৬ সালে পূর্বতন বিহার রাজ্যের মানভূম জেলার সদর মহকুমাটি মানভূম বাংলা ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মানভূম ভেঙ্গে পুরুলিয়া জেলা নামে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়। এই জেলার নাম পুরুলিয়া হল কিভাবে জানতে পড়ুন এখানে

ভৌগলিক দিক থেকে দেখলে এই জেলা উত্তরে, পশ্চিমে ও দক্ষিণে ঝাড়খণ্ড রাজ্য, উত্তর-পূর্বে বর্ধমান জেলা, পূর্বে বাঁকুড়া জেলা ও দক্ষিণ-পূর্বে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার সঙ্গে সংযুক্ত। ভূপ্রকৃতিগত ভাবে এই জেলা বন্ধুর ভূমিভাগ, খাড়া পাহাড়চূড়া ও নিচু উপত্যকা দ্বারা গঠিত।

পুরুলিয়া জেলার উল্লেখযোগ্য নদীগুলি হল – কংসাবতী, দামোদর, সুবর্ণরেখা, কুমারী ইত্যাদি। ভূমির স্বাভাবিক ঢাল অনুযায়ী এই জেলার অধিকাংশ নদীই পূর্ব বা দক্ষিণ-পূর্বগামী। কংসাবতী বা কাঁসাই পুরুলিয়া জেলার প্রধান নদী। এই নদী অযোধ্যা মালভূমির উত্তর ঢাল থেকে উৎপন্ন হয়ে দক্ষিণপূর্ব দিক বরাবর প্রবাহিত হয়েছে। কুমারী নদী কংসাবতীর সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ উপনদী। মালভূমিতে উৎপন্ন বলে শীত ও গ্রীষ্মকালে এই জেলার নদনদীগুলিতে জল খুবই কম থাকে; কিন্তু বর্ষায় জলের পরিমাণ বৃদ্ধি পায়; এমনকি মাঝে মাঝে দুই কূল ছাপিয়ে বন্যাও দেখা দেয়।

৬২৫৯ বর্গ কিমি জায়গা জুড়ে অবস্থিত এই জেলা আয়তনের দিক থেকে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে চতুর্থ স্থান অধিকার করে৷ ২০১১ সালের জনগননা অনুসারে কম জনঘনত্ব বিশিষ্ট এই জেলায় প্রায় ২৯২৭৯৬৫ জন লোক বসবাস করেন৷ এই জেলার অধিবাসীরা মূলত বাঙালি ও সাঁওতাল। এখানে মূলত বাংলা (৮০.৫৬%) ভাষার প্রচলনই দেখা যায়, এছাড়া কুরমালী (৫.০৪%), সাঁওতালী (১১.১৭%) ও অন্যান্য ভাষার ব্যবহার দেখা যায়।

পুরুলিয়া জেলা তিনটি মহকুমাতে বিভক্ত, সেগুলি হল – পুরুলিয়া সদর, ঝালদা এবং রঘুনাথপুর। রঘুনাথপুর-আদ্রা, ঝালদা ও বলরামপুর এই জেলার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে পরিচিত।

পুরুলিয়া জেলার প্রাচীন ইতিহাস ঘাঁটলে জানা যায় এই জেলাতেই সূত্রপাত হয়েছিল বাংলার আদিবাসী বিদ্রোহের। সাঁওতাল, কোল, ভীল, চুয়াড় প্রভৃতি আদিবাসী উপজাতির নেতৃত্বে এই জেলায় ইংরেজ আমলে কৃষক বিদ্রোহ হয়েছিল । এছাড়া প্রাক-স্বাধীনতা ও স্বাধীনোত্তরকালে বাংলা ভাষা ও বঙ্গভূক্তির দাবিতে এই অঞ্চলে যে বিদ্রোহ হয়েছিল তা স্মরণীয়। ১৯৫৬ সালের আগে পুরুলিয়া জেলা বিহারের অন্তর্ভুক্ত ছিল। মানভূমে হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে বিহার সরকারের ভূমিকা যথেষ্ট ছিল। সেই সময় রাজনৈতিক ভাবে বিহারের স্কুল-কলেজ-সরকারি দপ্তরে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলে তখনই বাংলা ভাষা ফিরিয়ে আনার দাবিতে শুরু হয় আন্দোলন। আন্দোলন এর জোরেই ১৯৫৬ সালে ভারত সরকার মানভূম জেলা ভেঙ্গে একটি নতুন জেলা পুরুলিয়া গঠন করে৷

পুরুলিয়া জেলায় বেশ কিছু ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত স্থান রয়েছে যার ফলে এখানে পর্যটন শিল্প গড়ে উঠেছে৷ এখানকার অযোধ্যা পাহাড়, অযোধ্যা বাঁধ, জয়চণ্ডী পাহাড়, গড় পঞ্চকোট, বরন্তি, ঝালদা ইত্যাদি স্থানকে কেন্দ্র করে ভ্রমণ শিল্প গড়ে উঠেছে৷ অযোধ্যা পাহাড়ের গোর্গাবুরু পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ।

অযোধ্যা পাহাড় সম্পর্কে কিংবদন্তী আছে রাম ও সীতা বনবাসের সময় অযোধ্যা পাহাড়ে এসেছিলেন। এখানে এসে সীতা তৃষ্ণার্ত হয়ে পড়লে রাম নিজের তীরের সাহায্যে মাটি খুঁড়ে জল বের করে আনেন। সেই জায়গাটি সীতাকুণ্ড নামে পরিচিত। পর্বতারোহণ শিক্ষার্থীদের জন্য অযোধ্যা পাহাড় জনপ্রিয় গন্তব্যস্থল৷

এই জেলায় টুসু, ভাদু, করম পরব ইত্যাদি আঞ্চলিক উৎসব লক্ষ্য করা যায়৷ বাংলা অগ্রহায়ণ মাসের শেষ দিন থেকে শুরু হয় টুসু উৎসব আর শেষ হয় পৌষ সংক্রান্তি বা মকর-সংক্রান্তির পুণ্যলগ্নে। বাংলার একটি উল্লেখযোগ্য লোকউৎসব, এটি আসলে একটি কৃষিভিত্তিক উৎসব৷ টুসু উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ টুসু সঙ্গীত, লৌকিক ও দেহগত প্রেমের কাহিনী এই গানে ব্যক্ত করা হয় । পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলা হল ছৌ নাচের উৎপত্তিস্থল। এটি একপ্রকার ভারতীয় আদিবাসী যুদ্ধনৃত্য। এই নাচ পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড ও ওড়িশায় ভীষণভাবে জনপ্রিয়। এই নাচে এক বিশেষ মুখোশের ব্যবহার করা হয়, যা লোকশিল্পে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। এই মুখোশ পুরুলিয়াকে পশ্চিমবঙ্গের লোকশিল্পের দরবারে বিশেষ স্থান দিয়েছে । পশ্চিমবঙ্গে বেশ কিছু জেলায় পোড়ামাটির মন্দির দেখা যায়, তার মধ্যে পুরুলিয়ার স্থানও রয়েছে৷ পোড়ামাটির শিল্পকলায় সুসজ্জিত এই কারুকার্য স্থাপত্য শিল্পে একটি বড় দৃষ্টান্ত এনে দিয়েছে।

এই জেলার কৃতি সন্তানদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন – অতুলচন্দ্র ঘোষ, অরুণ চন্দ্র ঘোষ, ভাবপ্রিতানন্দ ওঝা, চুনারাম মাহাতো, গম্ভীর সিং মুরা, গোবিন্দ মাহাতো, লাবণ্য প্রভা ঘোষ, মহারাজা জ্যোতি প্রসাদ, নিবারণ চন্দ্র দাশগুপ্ত
রেভ হেমরিখ উফম্যান, সিন্ধুবালা দেবী, সারদা প্রসাদ কিস্কু প্রভৃতি।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


১ Comment

1 Comment

  1. অরবিন্দ বন্দ‍্যোপাধ্যায়​

    জুলাই ১১, ২০২০ at ০৯:১৮

    নিবারণচন্দ্র দাসগুপ্ত “পুরুলিয়ার গান্ধী” নামেও পরিচিত ছিলেন। তাঁর পুত্র, লোকসেবক সঙ্ঘের প্রাক্তন এমপি এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রথম যুক্তফ্রন্ট সরকারের মন্ত্রী বিভূতিভূষণ দাসগুপ্ত’র নাম লেখাটিতে না দেখে আশ্চর্য হলাম। বিভূতিবাবু সুলেখক এবং কবিও ছিলেন। পু্রুলিয়ার আর এক গৌরব ভজহরি মাহাতোর নামও থাকতে পারতো। তিনি বিভূতিবাবুর পর এমপি ছিলেন।

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।