ইতিহাস

মানভূম ভাষা আন্দোলন

বাংলা ভাষা আন্দোলন বলতে অনেকেই ২১ শে ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন বোঝেন বা যাঁরা একটু খোঁজ খবর রাখেন তাঁরা এর সঙ্গে বরাক উপত্যকা বাংলাভাষা আন্দোলন কেও ধরেন। এই সকলের আড়ালে চাপা পড়ে যাওয়া আরও একটি বাংলা ভাষা আন্দোলন আছে – যা ঐতিহাসিক কালানুক্রমে সবচেয়ে পুরনো বাংলা ভাষাভিত্তিক আন্দোলন। সেটি হল মানভূম ভাষা আন্দোলন । এখানে এই আন্দোলন নিয়ে সবিস্তারে জানবো।

 

বাংলা ভাষার দাবিতে ভাই

কোন ভেদের কথা নাই

এক ভারতে ভাইয়ে ভাইয়ে মাতৃভাষায় রাজ্য চাই

জন শাসন চাও যদিরে বাংলা বই আর গতি নাই

মোদের ভূমি মানভূমেতে

গড়িব রাম রাজ্যটাই

টুসু গান, শ্রী ভজহরি মাহাতো।।

মানভূম ভাষা আন্দোলনে নারী বাহিনীর অবিরাম গাওয়া এই গানটি যেন ছিল জীবনের মধুমাসের কুসুমছেঁড়া গাঁথামালার কাহিনী; পথের ক্লান্তি ভুলিয়ে যা একমুঠো শীতলতার ঝুরঝুরে মায়াবী আবেশের চাদর জড়িয়ে দিত। হেমন্তের মাঠভর্তি সদ্য কাটা সোনালি ধানখেতের উপর ঝুপসি কুয়াশা ক্রমশঃ গাঢ় হয়ে তার বিশাল ডানায় ঢেকে ফেলত চরাচর। সাততাড়াতাড়ি সন্ধে নেমে আসে, অন্ধকার ঘনায় আচম্বিতে। মানভূমের বাতাস হিমেল। গাঁয়ের বধূর শাঁখের ডাকে লক্ষ্মী এসে ভরে দিত সব্বাইকার গোলা। আকাশে বাতাসে পাকা ধানের বাসে বাসে তখন সবার নিমন্ত্রণ। ফসল কাটার ও তোলার পালা শেষ। সদ্য অতিক্রান্ত বাদনা পরব। সামনে নবান্ন। নীল শালুকে দোলা দিয়ে মানুষ রং ফানুসে ভেসে পড়ার জন্য উদগ্রীব। অকৃপণ প্রকৃতি, সমধিক উদার মানুষ। কার্পণ্য, মলিনতা নেই কোথাও! নিরবচ্ছিন্ন সুখ। পথের প্রান্তে দুই সখী বা প্রতিবেশীর দিনান্তের সুখদুঃখের এক চিলতে টুকরো কথায় ঠিকরে উঠছে টুসু গানের অনির্বাণ তরিকা। মুখে মুখে রচিত হচ্ছে বাংলাভাষার হীরক-শুভ্র বৈভবে সেঁকা সোঁদা মাটির গন্ধ মাখা টুসু গান।

ইঘর কাদা উঘর কাদা

তাই লাগাইছি আদালো

আদার বাসে ভাত খায় না

বড় ঘরের দাদা’…

কিংবা

বনে ফোটে বনফুল, বনকে করে আলা

বিটি ছায়ের বৃথাই জনম, শ্বশুরঘরের জ্বালা

বিশ্বাস-অবিশ্বাস-প্রেম-স্বপ্ন-বিরহ-বেদনা-হাড়ভাঙা খাটুনি-চোখের জলের মেদুর দোলাচলে টইটম্বুর টুসু গানের অমলিন ভাঁড়ার। বাঙলা ভাষার ফুরফুরে নির্ভার-নির্মেদ-নির্বাধ প্রজাপতি বিচরণ, মেঘের কোলে কোলে পালভাঙা নৌকোর মতো ডিগবাজি খেয়ে ভেসে চলা। হঠাৎই ছন্দপতন। ঘুঘু ডাকা ছায়ায় ঢাকা গ্রামে ঘনাল অশান্তির কালো মেঘ। শমন এল অনাহারের বেশে নয়, বিহারী হিন্দিভাষী হার্মাদদের অত্যাচার, জুলুমবাজিতে। মানভূমে হিন্দির স্বেচ্ছাচারিতায় বাংলা ভাষা হয়ে পড়ল কোণঠাসা; টুসু গানকে সঙ্গত করল বলির বাজনা। ১৯১১ সালে মানভূমের বিহারে অন্তর্ভুক্তির সময় থেকেই বাংলা ভাষার অবমাননার শুরু, বাংলাভাষীর মনে পুঞ্জীভূত ক্ষোভ-অসন্তোষের সূত্রপাতও তখন থেকেই। প্রেসিডেন্সি ভেঙে মানভূমকে ওই সময় জোড়া হয় বিহারে। মানভূম ভাষা আন্দোলন ব্যতিক্রমী, অনন্য আরও একটি কারণে। তা হল মানভূমের মহীয়সী নারীকুল। পুরুষদের সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে যাঁরা স্বাধীনতা ও বঙ্গভাষার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে বিপ্লবে-বিদ্রোহে সরব হয়েছিলেন।

৬ই মে ১৯৫৬ সাল, লোক সেবক সংঘের নেতৃত্বে মানভূম ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক মিছিল হাওড়া ব্রিজ অতিক্রম করছে।

মানভূম ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক মিছিল

ঐতিহাসিকতা এবং কালানুক্রমিকতার বিচারে মানভূমের ভাষা আন্দোলন ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি (বাংলাদেশের ভাষা শহিদ আন্দোলন) এবং ১৯৬১-র ১৯মে কাছাড় (বরাক উপত্যকার) আন্দোলনের অগ্রগণ্য। কারণ বাংলা ভাষার সন্তাপ-সঞ্জাত প্রথম গণ আন্দোলন নিঃসন্দেহে ১৯৪৮’এ শুরু হওয়া মানভূম ভাষা আন্দোলন। ১৯৫৬-র ১ নভেম্বর ১৬টি থানা নিয়ে হেটমুন্ড পুরুলিয়া জেলা বিহার থেকে পশ্চিমবঙ্গে ভূমিষ্ঠ হল। সম্পূর্ণ অনাদরে। কর্তিত, খণ্ডিত, বিকলাঙ্গ এই পুরুলিয়ার জন্ম স্থানীয় বাংলাভাষীর হৃদয়ে অবিরাম রক্তক্ষরণ ঘটিয়ে চলেছিল। ১৯৫৬’র ১ নভেম্বর বঙ্গভুক্তি দিবস হিসেবে পালিত হলেও নভেম্বর মাসটা জুড়েই চলেছিল প্রতিবাদ-আন্দোলন

মানভূমে বাংলা ভাষা আন্দোলন  ১৯১২ সালে শুরু হয়। তবে মানভূম ভাষা আন্দোলনকে ইতিহাসের প্রেক্ষিতে বিচার করতে হলে মানভূম জেলা গঠনের প্রাক-ইতিহাস জেনে নেওয়া প্রয়োজন (এখানে ক্লিক করে পড়ুন – মানুভূম থেকে পুরুলিয়া)।   ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে ভাষা আন্দোলন তীব্র ভাবে ছড়িয়ে পড়ে মানভূমের বাঙালিদের মধ্যে। ১৯৫৬ সালের আগে পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পুরুলিয়া জেলা বিহারের অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেই সময় রাজনৈতিক ভাবে বিহারের স্কুল-কলেজ-সরকারি দপ্তরে হিন্দি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। বাঙালিদের উপর জোর করে হিন্দি চাপিয়ে দিতে বিহার সরকারের নক্কারজনক ভূমিকা আলাদা নিবন্ধের দাবি রাখে, সেটি পড়তে এখানে দেখুন। সেই সময় জাতীয় কংগ্রেসের মাধ্যমে বাংলাভাষী জনগন হিন্দি ভাষার বিরুদ্ধে আন্দোলন করার চেষ্টা করে; কিন্তু, বাংলা ভাষার দাবি প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় পুরুলিয়া কোর্টের আইনজীবী  শ্রী রজনীকান্ত সরকার, শ্রী শরৎচন্দ্র সেন এবং শ্রী  গুণেন্দ্রনাথ রায় জাতীয় কংগ্রেস ত্যাগ করে জাতীয়তাবাদী আঞ্চলিক দল  লোকসেবক সঙ্ঘ গড়ে তোলেন। বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে তাঁরা সুদৃঢ় আন্দোলন করেন। ছবিটি ৬ই মে ১৯৫৬ সালে নেওয়া, লোক সেবক সংঘের নেতৃত্বে মানভূম ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক মিছিল হাওড়া ব্রিজ অতিক্রম করছে। এরপর ১৯৫৬ সালে ভারত সরকার মানভূম জেলা ভেঙ্গে  পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সঙ্গে একটি নতুন জেলা (বর্তমান পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পুরুলিয়া জেলা) সংযুক্ত করতে বাধ্য করেন।

তথ্যসূত্র


  1. বর্তমান পত্রিকা, শ্রী মৃন্ময় চন্দ, ৫ ই জানুয়ারি ২০১৮ সাল।
  2. "ভাষা আন্দোলনে মানভূম", নন্দদুলাল আচার্য, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।
  3. Land of Two Rivers: A History of Bengal from the Mahabharata to Mujib - Nitish K Sengupta, Page 579।

১ Comment

1 Comment

  1. Pingback: মানভূম ভাষা আন্দোলন ও রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন | সববাংলায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!