ইতিহাস

মানভূমে হিন্দি সংস্থাপনার্থে বিহার সরকারের ভূমিকা

ভাষাভিত্তিক প্রাদেশিকতার দাবিকে অগ্রাহ্য করে মানভূম বলপূর্বক বিহারে থাকলেও বাঙালি অধ্যুষিত হওয়ায় এবং তার পাশাপাশি প্রথম ভাষা ও মাতৃভাষা বাংলা হওয়ায় বিহারের হিন্দি-প্রভুত্বের কাছে মাথা নোয়াতে রাজি ছিলেন না মানভূমের বাঙালিরা। উল্টোদিকে মানভূমে হিন্দি ভাষা সংস্থাপনার্থে বিহার সরকারের ভূমিকা ছিল অনেকটা সেই প্রভু ভৃত্যের মত। তাই স্থানীয় বাসিন্দাদের চাহিদা অগ্রাহ্য করে বাঙালিদের উপর হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার জন্য একের পর এক নিয়ম, সার্কুলার জারি করা হয়েছে।এখানে আমরা মানভূম ভাষা আন্দোলনে বিহার সরকার এর ভূমিকার  কথা তুলে ধরব।

স্বাধীনতার পরে ১৯৪৮ সালে বিহার সরকার জোরজবরদস্তি স্কুলে হিন্দিকে পঠনপাঠনের মূল ভাষা করে তুলতে চাইল। প্রার্থনা সঙ্গীত হিসেবে ‘রামধুন’ বাধ্যতামূলক হল। সাইনবোর্ড থেকে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ – পুরোটাই হিন্দিতে না হলে স্কুলের যাবতীয় অনুদান বন্ধের হুমকি দেওয়া হল। কোনও ছাত্র-শিক্ষক ছাড়াই গোয়ালঘর বা বাড়ির বৈঠকখানায় রাতারাতি গজিয়ে উঠল হিন্দি স্কুল।ভূতুড়ে অনুদানের বন্যা বয়ে গেল। প্রমাণ –

সার্কুলার নং– /৪৮, ১৮/০৩/৪৮, শ্রী কানাইলাল, ডি. আই অফ স্কুল; বিষয়: ৭২টি আদিবাসী স্কুলকে হিন্দি স্কুলে পরিণত করা এবং তা বার্ষিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা।

সার্কুলার নং: ৭০০-১১-জি-এস-৪৮/৭০১/৫ আর-৬-৪৮ ১৮/০৩/৪৮; বিষয়: সমস্ত স্কুল পরিদর্শকের উদ্দেশে নির্দেশ—স্কুল অনুমোদনের শর্ত হবে রামধুন গান ও হিন্দি সাইনবোর্ড।

সার্কুলার নং: ৩৭০৪ ১৯-৪-৪৮; বিষয়: স্কুল হিন্দিভাষী না হলে অনুদান প্রত্যাহৃত হবে।

এ ধরনের অজস্র সার্কুলার রয়েছে।

মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদান সর্বজনস্বীকৃত। ১৯৪৫-’৪৬-এ কংগ্রেসের নির্বাচনী ইস্তাহার, ওয়ার্ধাতে জাতীয় শিক্ষা সম্মেলন ও হরিপুরা কংগ্রেসে ভাষাভিত্তিক রাজ্য গঠন অগ্রাধিকার পায়। এরপরও ১৯৪৯ সালে পুরুলিয়া জেলা স্কুলে বাংলা ও হিন্দি দু’টি বিভাগ থাকা সত্ত্বেও বাংলাকে বাদ দিয়ে শুধুমাত্র হিন্দিতে পঠনপাঠন শুরু হয়েছিল। পরিণামে শুরু হয় ছাত্র ধর্মঘট – ১১/১২/১৯৪৯ সারা শহরে বন্‌ধ পালিত হয়। বান্দোয়ানের চিরুডি ও বান্দুডাবর গ্রামে হিন্দির কুশীলবরা জনসভা করে ঘোষণা করতে থাকেন যে, মানভূমের ভাষা হিন্দি। হিন্দি শিখলে বাঁধ/কুয়া/পুকুর ও টাকা দেওয়ার লোভ দেখানো হয়।

পুলিস টুসু গায়ক, ১০ বছরের অন্ধ-বালক বাবুলালকে গ্রেপ্তার করে হাজারিবাগ জেল থেকে ভাগলপুর জেলে পাঠায়। পরে কোনও সঙ্গী ছাড়াই মাঝপথে তাকে ছেড়ে দেয়। মানভূম-জননী লাবণ্যপ্রভাকে বিহারি পুলিশ ও গুণ্ডারা চুল ধরে টেনে সম্ভ্রমহানির চেষ্টা করে। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নাকি আদালতের পর্দা চুরি করেছিলেন। শবরদের জন্য বলিপ্রদত্ত রেবতী ভট্টাচার্যকে পিটিয়ে জঙ্গলের মধ্যে মৃতপ্রায় অবস্থায় ফেলে রেখে যায় বিহারি পুলিস। লোকসেবক সঙ্ঘকর্মীরা তাঁকে উদ্ধার করেন। সে যাত্রায় প্রাণে বেঁচে যান রেবতী ভট্টাচার্য। বরাবাজার স্কুলে গোলমালের পর শ্রদ্ধেয় নেতা, স্বাধীনতা সংগ্রামী বিভূতিভূষণ দাশগুপ্তকে গুম করে দেয়। পরে অবশ্য জনগণের চিরুনি তল্লাশিতে তাঁর খোঁজ মেলে। সরকারি নির্দেশ, অনুশাসন, মায় কোর্টের শমন আসত হিন্দিতে। ১২-১৩ বছরের কিশোর সুধন্য মাহাতো ও হরিপদ মাহাতোকে বিহারি পুলিস জরিমানা করে – অপরাধ, তারা টুসু সত্যাগ্রহী। তাদের বাপ ঠাকুরদার সম্পত্তিও ক্রোক করা হয়; বাদ যায়নি ঢেঁকি-গোরু-মোষ। প্রতিবাদে টুসু গান রচিত হল:

সুধন্যার ঢেঁকি

দারোগার বউ ধানকুটে সবাই দেখি

 

এই ভাবেই স্বাধীন ভারতে বাঙালিদের উপর হিন্দি ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টায় বিহার সরকা্রের তত্ত্বাবধানে দিনের পর দিন নির্যাতনের পাশাপাশি হিন্দিভাষা প্রসার করার কাজ চালিয়ে যাওয়া হয়েছে আর অন্য দিকে বাংলাভাষাকে গলা টিপে হত্যা করার চেষ্টা হয়েছে। তবু, বাঙালি হেরে যায়নি, মানভূম ভাষা আন্দোলন চালিয়ে গেছে, এমনকি মাঝামাঝি একটা রফায় এসে মানভূম থেকে পুরুলিয়া জেলাকে বিচ্ছিন্ন করে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভূক্ত করা হলেও তাতে বিচ্ছিন্নতার বেদনা থেকে গিয়েছে।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

তথ্যসূত্র


  1. বর্তমান পত্রিকা, শ্রী মৃন্ময় চন্দ, ৫ ই জানুয়ারি ২০১৮ সাল।
  2. "ভাষা আন্দোলনে মানভূম", নন্দদুলাল আচার্য, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।
  3. Land of Two Rivers: A History of Bengal from the Mahabharata to Mujib - Nitish K Sengupta, Page 579।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন