ইতিহাস

মানভূম থেকে পুরুলিয়া জেলা সৃষ্টি

মানভূম ভাষা আন্দোলনকে ইতিহাসের প্রেক্ষিতে বিচার করতে হলে মানভূম জেলা গঠনের প্রাক-ইতিহাসে আলোকপাত আবশ্যিক। মানভূম থেকে পুরুলিয়া জেলায় রূপান্তরিত হতে কয়েক শতাব্দী ধরে এই এলাকার উপর বহুবার শাসকের কোপ নেমে এসেছে – বাঙালিকে লড়াই করে পেতে হয়েছে তার হকের বাসস্থান।

১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে  দ্বিতীয় শাহ আলম বক্সারের যুদ্ধে পরাজিত হলে তিনি  ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বিহার ও  উড়িষ্যা সমেত সমগ্র বাংলার দেওয়ানী দিতে বাধ্য হন। ১৭৬৭ সালে পুরুলিয়ার দক্ষিণাংশে ব্রিটিশের খাজনা আদায়কে কেন্দ্র করে (মানবাজার ও বরাবাজারে) রাজা বিবেকনারায়ণের নেতৃত্বে শুরু হয়েছিল চুয়াড় বিদ্রোহ। বিবেকনারায়ণের পরাজয়ের পর গঙ্গানারায়ণের নেতৃত্বে বিদ্রোহ চলেছিল আরও কিছুকাল। ১৭৭২ সালে নোয়াগড়, ঝালদা, পাঁচেত অঞ্চলকে যুক্ত করে পত্তন হল পাঞ্চেত জেলার। ১৮০৫ সালে পুরুলিয়া, ধানবাদ, ঝাড়গ্রাম, বর্ধমান ও বীরভূম জেলার কিছু অংশ এবং বাঁকুড়া—মোট ২৩টি পরগনা ও মহল মিলে তৈরি হল জেলা জঙ্গলমহল, সদর হল বাঁকুড়া। ১৮৪৫’এ ধলভূমকে মানভূম থেকে বিচ্ছিন্ন করে যুক্ত করা হল সিংভূমে। ১৮৭৯’র এক নয়া নির্দেশনামায় সুপুর-রাইপুর-ফুলকুসুমা সহ আটটি থানা মানভূম থেকে সরিয়ে জোড়া হল বাঁকুড়ায়। ১৮৩৩ সালে বিলুপ্ত হল জঙ্গলমহল। ভূমিষ্ঠ হল মানভূম জেলা। মানভূমের অন্তর্ভুক্ত হল ধানবাদ, পুরুলিয়াসহ ধলভূম ও বর্তমান বাঁকুড়ার রাইপুর-সুপুর-ভালাইডিহা-অম্বিকানগর-ফুলকুসুমা-সিমলাপাল প্রভৃতি। আয়তন ৭ হাজার ৮৯৬ বর্গমাইল, সদর মানবাজার। ১৮৩৩ থেকে ১৮৭৯ এই ৪৬ বছরে ৩ হাজার ৭৫৯ বর্গমাইল জায়গা খুইয়ে পুরুলিয়া ও ধানবাদ নিয়ে মানভূমের আয়তন হল ৪ হাজার ১৪৭ বর্গমাইল।

১৯১১ খ্রিষ্টাব্দে  বঙ্গভঙ্গ রদ হলেও বাংলা ভাষাভাষী সমগ্র মানভূম ও ধলভূম জেলাকে নতুন তৈরী বিহার-উড়িষ্যা রাজ্যের অন্তর্গত করা হয়। এই বিভক্তির ফলে ঐ অঞ্চলের নেতৃবৃন্দ প্রতিবাদ জানালেও ঐ সিদ্ধান্ত রদ হয়নি। জাতীয় কংগ্রেসের ১৯২০ খ্রিষ্টাব্দের  নাগপুর অধিবেশনে ভাষাভিত্তিক প্রদেশ পুনর্গঠনের দাবী আনুষ্ঠানিক ভাবে গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু ১৯৩৫ খ্রিষ্টাব্দে বিহারে জাতীয় কংগ্রেস মন্ত্রীত্ব লাভ করার পর ডঃ  রাজেন্দ্র প্রসাদের সভাপতিত্বে ‘মানভূম বিহারী সমিতি’ নামক এক সংগঠন গড়ে ওঠে। এর বিপরীতে মানভূম জেলার বাঙ্গালীরা ব্যারিস্টার পি আর দাসের সভাপতিত্বে ‘মানভূম সমিতি’ নামক সংগঠন তৈরী করেন। বিহার সরকার আদিবাসী ও উপজাতি অধ্যুষিত অঞ্চলে প্রাথমিক স্তরের বিদ্যালয় খুলতে শুরু করলে বাঙ্গালীরাও বাংলা স্কুল খুলতে তৎপর হয়ে পড়েন। এই সময় সতীশচন্দ্র সিংহ  রাঁচি, পালামৌ, সিংভূম ও মানভূম জেলা নিয়ে ছোটনাগপুর নামক এক নতুন প্রদেশ গঠন বা বাংলার সঙ্গে পুনরায় সংযুক্তির প্রস্তাব করেন।

১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে  ভারত স্বাধীনতা লাভ করার পর থেকে জাতীয় কংগ্রেসের ভাষাভিত্তিক রাজ্য পুনর্গঠনের নীতির বাস্তব রূপায়নের দাবিতে ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিকতা বেড়ে উঠতে শুরু করে। সেই পরিস্থিতিতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু দেশের স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তাকে বিবেচনা করে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে প্রদেশ গঠনের সুপারিশ করেন এবং সেই হিসেবে ভাষাভিত্তিক প্রদেশ কমিশন বা দার কমিশন নিয়োগ করেন। ১৯৪৮ সালের ডিসেম্বর মাসে কমিশন মত দেয় যে, স্বাধীনতার সাথে সাথে জাতীয় কংগ্রেস তাঁর অতীত অঙ্গীকার থেকে অব্যহতি পেয়েছে এবং শুধুমাত্র ভাষাভিত্তিক প্রদেশ গঠন না করে ভারতের ঐক্যবদ্ধতাকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। এই কমিশনের প্রতিবেদন খতিয়ে দেখার জন্য প্রধানমন্ত্রী, সর্দার বল্লভভাই প্যাটেল ও  পট্টভি সীতারামাইয়াকে নিয়ে গঠিত তিন সদস্যের এক উচ্চপর্যায়ের কমিটি নিয়োজিত হয়।

১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দ থেকে তৎকালীন  বিহার সরকার ঐ রাজ্যের মানুষদের ওপর  হিন্দী ভাষা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। প্রাথমিক স্তরে ও সরকারি অনুদান যুক্ত বিদ্যালয়ে হিন্দী মাধ্যমে পড়ানোর নির্দেশ আসে, জেলা স্কুলগুলিতে বাংলা বিভাগ বন্ধ করে দেওয়া হয় ও হিন্দীকে  বিহার রাজ্যের আনুষ্ঠানিক ভাষা হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

মানভূম জেলার বাংলাভাষী মানুষদের ক্ষোভ আঁচ করে জেলা কংগ্রেসের মুখপাত্র মুক্তি পত্রিকায় ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই মার্চ হিন্দী প্রচার, বাংলা ভাষাভাষীদের বিক্ষোভ ও মানভূম জেলার বঙ্গভুক্তির যৌক্তিকতা বিশ্লেষণ করে সম্পাদকীয় নিবন্ধ প্রকাশিত হল। এই বিষয়টি বিবেচনার জন্য ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে এপ্রিল  বান্দোয়ান থানার জিতান গ্রামে শ্রী অতুলচন্দ্র ঘোষের সভাপতিত্বে জেলা কমিটির অধিবেশন হলে সেখানে প্রতিনিধিদের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। ঐ বছর ৩০শে মে পুরুলিয়া শহরের অধিবেশনে মানভূমের বঙ্গভুক্তির প্রস্তাব ৫৫-৪৩ ভোটে খারিজ হয়ে গেলে  অতুলচন্দ্র ঘোষ সহ সাইত্রিশজন জেলা কমিটি থেকে পদত্যাগ করে ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ই জুন  পাকবিড়রা গ্রামে লোক সেবক সংঘ তৈরী করেন। বিহার সরকার বাংলাভাষীদের প্রতিবাদসভা ও মিছিল নিষিদ্ধ করলে  মানভূম জেলায় আন্দোলন তীব্র হয়ে ওঠে। লোক সেবক সংঘ ১৯৪৯ থেকে ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সত্যাগ্রহ আন্দোলন এবং ১৯৫৪ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই জানুয়ারি থেকে ৮ই ফেব্রুয়ারি টুসু সত্যাগ্রহ আন্দোলন করে।ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি এ আন্দোলনে সক্রিয় ভাবে যোগদান করে। হাজার হাজার বাংলাভাষী মানুষ কারাবরণ করে। এই সময় বেশ কয়েকটি  টুসু সঙ্গীত জনগনের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়েছিল। তার মধ্যে একটি হল,

শুন বিহারী ভাই

তোরা রাখতে লারবি ডাঙ্গ দেখাই

নতুন দিল্লি তে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের প্রথম মিটিং। ছবিতে ডান দিক থেকে কে.এম.পানিক্কর, সৈয়দ ফজল আলী (চেয়ারম্যান) এবং হৃদয়নাথ কুঞ্জরু। ১২ই ফেব্রুয়ারি ১৯৫৪ সালের ছবি।

রাজ্য পুনর্গঠন কমিশনের প্রথম মিটিং

এই আন্দোলনের ফলে ১৯৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ২৯শে ডিসেম্বর ভারত সরকার সৈয়দ ফজল আলির সভাপতিত্বে, হৃদয়নাথ কুঞ্জরু ও কবলম পানিক্করকে নিয়ে রাজ্য পুনর্গঠন কমিশন তৈরী করে। এই কমিশন ১৯৫৫ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই ফেব্রুয়ারি থেকে মানভূম জেলায় তদন্ত করে ঐ বছর ১০ই অক্টোবর তাঁদের বক্তব্য জমা দেন। তাঁদের বক্তব্যে মানভূম জেলা থেকে বাঙালী অধ্যুষিত এলাকাগুলি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ১৯টি থানা নিয়ে পুরুলিয়া জেলা নামে এক নতুন জেলা তৈরী করার প্রস্তাব দেন। তাঁরা মানভূম জেলা থেকে ধানবাদ মহকুমার ১০টি থানা ও পুরুলিয়া মহকুমার ২টি থানা বিহার রাজ্যে রেখে দেওয়ার প্রস্তাব করেন। অপরদিকে ধলভূম পরগণায় বাংলাভাষীদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্বীকার করেও যেহেতু ভিন্ন ভাষাভাষী মানুষ ঐ জেলায় বসবাস করেন সেই কারণে কমিশন জামসেদপুরকে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত করতে বা ধলভূম পরগণা ভেঙ্গে বাংলায় আনতে রাজি ছিলেন না। এই প্রস্তাবে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ থেকে ২০শে জুন বিহারপন্থীরা মানভূম জেলায় ধর্মঘটের ডাক দেন। অপরদিকে বাংলা ভাষা আন্দোলনকারীরা ধানবাদ বিহারের অন্তর্ভুক্তিতে খুশি ছিলেন না।

১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে জানুয়ারী  পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী  বিধান চন্দ্র রায় ও  বিহারের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী শ্রীকৃষ্ণ সিং পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার উভয় রাজ্যের সংযুক্তিকরণ করে পূর্বপ্রদেশ নামে এক নতুন প্রদেশ গঠনের প্রস্তাবনা করেন। তাঁরা প্রস্তাব দেন যে, ঐ প্রদেশের সরকারি ভাষা হিসেবে হিন্দী ও বাংলা উভয়েই স্বীকৃত হবে, মন্ত্রীসভা, বিধানসভা, পাবলিক সার্ভিস কমিশন একটি করে থাকলেও হাইকোর্ট থাকবে দুটি। এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে প্রবীণ কংগ্রেস নেতারা ছাড়াও বামপন্থী দলগুলিও প্রতিবাদ করেন। দুই রাজ্যে এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে সত্যাগ্রহ আন্দোলনের মধ্যে বিহার বিধানসভায় ২৪শে ফেব্রুয়ারী প্রস্তাবটি পাশ হয়ে যায়। লোক সেবক সংঘের কর্মীরা ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২০শে এপ্রিল পাকবিড়রা গ্রাম থেকে  বাঁকুড়া, বেলিয়াতোড়, সোনামুখী, পাত্রসায়র, খন্ডঘোষ, বর্ধমান, পান্ডুয়া, মগরা, চুঁচুড়া, চন্দননগর, হাওড়া হয়ে কলকাতা শহরের দিকে শান্তিপূর্ণ পদযাত্রা শুরু করে ৬ই মে কলকাতা পৌঁছায়, ৭ই মে মহাকরণ অবরোধের কর্মসূচী অনুসারে বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ পৌঁছে ৯৬৫ জন কারাবরণ করেন। এই ঘটনার তিন দিন আগে ৪ঠা মে উভয় রাজ্যের সংযুক্তির প্রস্তাবনা বাতিল হয়ে যায়।

১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই আগষ্ট বাংলা-বিহার সীমান্ত নির্দেশ বিল লোকসভায় ও ২৮শে আগষ্ট রাজ্যসভায় পাশ হয়। ১লা সেপ্টেম্বর এতে ভারতের রাষ্ট্রপতি সই করেন। এর ফলে ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ১লা নভেম্বর ২৪০৭ বর্গ মাইল এলাকার ১১,৬৯,০৯৭ জন মানুষকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নতুন জেলা পুরুলিয়া তৈরী হয়। সম্পূর্ণ ধানবাদ মহকুমা বিহার রাজ্যে রয়ে যায়।

তথ্যসূত্র


  1. বর্তমান পত্রিকা, শ্রী মৃন্ময় চন্দ, ৫ ই জানুয়ারি ২০১৮ সাল।
  2. "ভাষা আন্দোলনে মানভূম", নন্দদুলাল আচার্য, আনন্দবাজার পত্রিকা, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৮।
  3. Land of Two Rivers: A History of Bengal from the Mahabharata to Mujib - Nitish K Sengupta, Page 579।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!