বিজ্ঞান

আমরা খিদে পেলে বুঝতে পারি কিভাবে

“ক্ষুধার রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়, পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি”।কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য্যের কবিতার এই একটি লাইন‍ ‌‌‌ক্ষুধার অন্তর্নিহিত অর্থ যথার্থই প্রকাশ করে।কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ক্ষুধা বা খিদে পায় কেন? আর আমরা খিদে পেলে বুঝতে পারি কিভাবে।

গাড়ি চালাতে প্রয়োজন জ্বালানির আর শরীরের জন্য লাগে খাদ্য। গাড়ির ক্ষেত্রে ইন্ডিকেটর জানিয়ে দেয় কখন তেল ভরতে হবে, তেমন শরীরের ক্ষেত্রে খিদে পাওয়ার অনুভূতি জানিয়ে দেয় এবার শরীরের খাদ্য প্রয়োজন। আমরা যে খিদে পেলে বুঝতে পারি এই অনুভূতির পিছনে একসঙ্গে কাজ করে মস্তিষ্ক আর উদর। মস্তিষ্ক ও উদরের সম্মিলিত জটিল জৈব-রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ফলে আমরা খিদে পেলে বুঝতে পারি – সেই প্রক্রিয়ার কথাই এখানে ব্যাখ্যা করব।

আমাদের শরীরে লেপ্টিন (leptin) ও ঘ্রেলিন (ghrelin) নামক দুটি হরমোনের মূল কাজ খিদে নিয়ন্ত্রণ করা।এদের ক্ষুধা হরমোন (Hunger Hormone) বলে। ঘ্রেলিন পরিপাকতন্ত্র মূলত পাকস্থলীর এন্টারোএনডোক্রিন (enteroendocrine) কোষ থেকে নিঃসৃত হরমোন যার মাত্রা রক্তে বেড়ে গেলে মস্তিক নির্দেশ পায় এবার খেতে হবে। এই হরমোন শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। লেপ্টিন যা গ্রিক শব্দ লেপটস (leptos) থেকে এসেছে, এর অর্থ রোগা (thin)। লেপ্টিন মূলত মেদ কোষ ও ক্ষুদ্রান্ত্রের এন্টারোসাইট (enterocytes) নিয়ে গঠিত। মস্তিষ্ককে পেট ভর্তি বা খিদে পাচ্ছে না এই নির্দেশ দেয়। আমরা যখন খাওয়া শুরু করি এবং ধীরে ধীরে অনেকটা খেয়ে ফেলি, রক্তে এই দুই হরমোনের আপেক্ষিক পরিমানের হেরফের হয়। এই হেরফেরের খবর মস্তিষ্কের মাধ্যমে শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছানোর পর নির্দেশ যায় যে যথেষ্ট হয়েছে আর খাওয়ার প্রয়োজন নেই।

চিত্র ১

এটি বেশ জটিল একটা শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া। তবে বোঝার সুবিধার জন্যে ছবিতে (চিত্র ১) ঘ্রেলিন ও লেপ্টিন এর অনুপাতের হেরফেরের তুলনা দেওয়া হল। যখন ঘ্রেলিন কমে যায় এবং লেপ্টিন বেশি থাকে তখন খিদে পায় এবং এর উল্টোটা হলে খিদে মিটে গিয়ে পরিতৃপ্ত হই।

অন্য একটা গবেষণায় বিজ্ঞানীরা জানাচ্ছেন খিদে অনেকাংশে মানসিক ব্যাপার। প্লেটে কতটা পরিমান খাবার আছে তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ কি ধরণের খাবার আছে এবং সেই খাবারের প্রতি আমাদের চাহিদা ও ধারণা কতটা। অর্থাৎ কোনো ব্যক্তির সামনে লোভনীয় বিরিয়ানি ও সাধারণ ডালভাত রাখলে, বিরিয়ানির প্রতি আকর্ষণ থাকলে ওই ব্যক্তির খিদে বেশি লাগবে। সেই জন্য খিদে ও খাবারের প্রতি অনীহা অনেকটাই মস্তিষ্ক  নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়া। খাদ্যের মাধ্যমে সমস্ত জীব বেঁচে থাকার শক্তি পায়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই খাদ্যের মধ্যে থাকে গ্লুকোজ বা সেই জাতীয় কোনো শক্তি উৎপাদনকারী অনু। এরা কোষে কোষে পৌঁছায় এবং বিপাক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্যালোরি দেয়। আমাদের পরিপাকতন্ত্র এই রকম নানা প্রকার অনু কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন,ফ্যাট, ভিটামিন, মিনারেল ইত্যাদি খাদ্য থেকে শোষণ করে।পরিপাকতন্ত্রের মধ্যে থাকে বিভিন্ন গ্রহীতা যা নির্দিষ্ট পুষ্টি উপাদান (nutrient) শোষণ করে। এরা পাকস্থলী বা অন্ত্রে কোনো শোষণ যোগ্য পুষ্টি উপাদান না পেলে মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসে রক্তে হরমোন নিঃসরণের মাধ্যমে সংকেত পাঠায়। সেই মত হাইপোথ্যালামাস এনপিওয়াই(NPY) এবং এজিআরপি(AGRP) প্রোটিন উৎপন্ন করে যা আমাদের খিদের অনুভূতি সৃষ্টি করে। অপর দিকে সিএআরটি(CART) এবং আলফা-এমএসএইচ(Alpha-MSH) প্রোটিনের উৎপাদন আমাদের পেট ভরে গেছে এমনটা অনুভব করায়। সুতরাং আমাদের খিদে পেলে পরস্পর সংযুক্ত অনেকগুলি শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ ঘটে। তবে যথাযথ পরিমাণ কার্বোহাইড্রেট না খেলে বারবার খিদে পায়। এছাড়াও মানসিক কারণ, পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়া, জলের অভাব, শরীরে প্রোটিনের ঘাটতি ইত্যাদি নানা কারণে খিদের ইচ্ছে কম বেশি হয়। খাদ্যে যে জৈব রাসায়নিক উপাদানগুলো থাকে, তার মধ্যে জটিলতম গঠন ফ্যাট জাতীয় খাদ্যের। হজমের গন্ডগোলের জন্য ফ্যাট ঠিকমতো না ভাঙলে, দেহের বর্জ্যের সঙ্গে বেরিয়ে যায়। ফলে শরীরের চাহিদা মেটাতে আবারও খিদে পায়। স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য খিদে পেলে পরিমিত ও যথাযথ পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।