ভূগোল

ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করা হয় কিভাবে

সুপার সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় হল ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রে সৃষ্টি হওয়া প্রচন্ড বৃষ্টি ও বজ্র বিদ্যুৎসহ ঘূর্ণাবর্ত যা নিরক্ষীয় অঞ্চলে নিম্নচাপের ফলে উৎপন্ন হয়। এই ঘূর্ণিঝড়ের ফলে নিরক্ষীয় অঞ্চলে উৎপন্ন তাপ মেরু অঞ্চলের দিকে প্রবাহিত হয়। এই ধরনের ঝড়ে বাতাস প্রবল বেগে ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে যায়। সেই কারণে এই বায়ু প্রবাহকে ঘূর্ণিঝড় বলা হয়।

ঘূর্ণিঝড়ের ঘূর্ণন উত্তর গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে এবং দক্ষিণ গোলার্ধে ঘড়ির কাঁটার দিকে হয়ে থাকে। এই ঘূর্ণিঝড় আবহাওয়ার একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এর ফলে পৃথিবীতে তাপমাত্রার ভারসাম্য রক্ষিত হয়। পৃথিবীতে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৮০ টি ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়। কিন্তু এর অধিকাংশই সমুদ্রে মিলিয়ে যায়। খুব অল্প সংখ্যক ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড়ের উপকূলে আঘাতের ফলে স্থলভাগে প্রচন্ড প্রাকৃতিক দুর্যোগের তৈরি হয় যার ফলে স্থলভাগে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে থাকে। অঞ্চল ভেদে ঘূর্ণিঝড়ের বিভিন্ন নাম রয়েছে, যথা – সাইক্লোন, হারিকেন, টাইফুন ইত্যাদি। এই সমস্ত ঘূর্ণিঝড়েরও আবার বিভিন্ন নাম রয়েছে। মূলতঃ প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়কে আলাদাভাবে চিহ্নিত করার উদ্দেশ্যেই এই নামকরণের প্রয়াস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তীকালে পর্যায়ক্রমে পূর্ব-মধ্য-পশ্চিম এবং দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূল এবং অস্ট্রেলিয়া অঞ্চল, আটলান্টিক মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরে উৎপন্ন  ঘূর্ণিঝড়গুলোর নামকরণ শুরু হয়।

আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুসারে যে মহাসাগরে ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়, তার অববাহিকায় থাকা দেশগুলি তার নামকরণ করে। মোট ১১টি সংস্থা ঘূর্ণিঝড়ের নাম ঠিক করে। আবহবিদদের মতে, সাধারণ মানুষের কাছে ঝড় সম্পর্কে তথ্য পৌঁছে দিতে হলে একটা সহজ নাম থাকা দরকারি। তা না হলে একই সময় একই সমুদ্রে একাধিক ঝড় থাকলে চিহ্নিত করতে সমস্যা হয়। ঝড় চলে গেলেও একই সমস্যায় পড়েন আবহবিদরা। অতীতে কোনও ঝড়ে কোনও জাহাজ ডুবে গেলে সেই জাহাজের নামে হত ঝড়ের নাম অথবা যে জায়গায় ঝড় আছড়ে পড়তো সেই জায়গার নাম অনুসারে ঝড়ের নামকরণ হত। কখনওবা বিভিন্ন সংখ্যা দিয়ে ঝড়গুলোকে শনাক্ত করা হতো। আবার কখনো কখনো অক্ষাংশ দ্রাঘিমাংশর ওপর ভিত্তি করেও নাম রাখা হত। কিন্তু এই সমস্ত সংখ্যা সাধারণ মানুষের কাছে ছিল দুর্বোধ্য। ফলে সাধারণ মানুষ, মৎস্যজীবী, বা নৌযানগুলোকে ঝড়ের পূর্বাভাস দেওয়া বা সতর্ক করা কঠিন হয়ে যেত। তাছাড়া ঘূর্ণিঝড়ের নাম রাখলে তাতে যে শুধু সাধারণ মানুষ উপকৃত হয় তা নয়; বিজ্ঞানী, প্রচারমাধ্যম, বিপর্যয় মোকাবিলা দল প্রভৃতিরও সুবিধা হয়। নির্দিষ্ট নাম ব্যবহারের ফলে একটি নির্দিষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের বর্তমান অবস্থান নির্ধারণ, তীব্রতা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে, একই অঞ্চলে সৃষ্ট একাধিক ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষেত্রে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয় তা দূর করতেও সুবিধা হয়। এছাড়া সতর্কবার্তা দেওয়া সহজ হয়।এই সমস্ত সমস্যার সমাধানের জন্য ২০০০ সালে ঝড়ের নামকরণের জন্য নিয়ম বানানো হয়।

ওয়ার্ল্ড মেটেরোলজিক্যাল অরগানাইজেশন (World Meteorological Organisation (WMO)) এবং ইউনাইডেট নেশনস ইকোনমিক অ্যান্ড সোশ্যাল কমিশন ফর এশিয়া এন্ড দ্য প্যাসিফিক-এর (United Nations Economic and Social Comission for Asia and the Pacific) সদস্য দেশগুলি ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ শুরু করে। এর মধ্যে রয়েছে ভারত, বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, মায়ানমার, ওমান, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও থাইল্যান্ড।এই সমস্ত দেশের কাছ থেকে ঝড়ের নাম চাওয়া হয়। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার বৈঠকে আবহাওয়া কর্মকর্তারা আগে থেকে আলোচনা করে নেন কি নাম হবে। পরে পর্যায়ক্রমে সেই তালিকা থেকে ঝড়ের নাম বাছাই করা হয়।

তবে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণের ক্ষেত্রে কতগুলো নিয়ম মেনে চলা হয়। প্রথমতঃ প্রস্তাবিত নামগুলি যেন কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তি বা কোন ধর্মীয় ভাবনা সংস্কৃতি অথবা লিঙ্গ পক্ষপাতদুষ্ট না হয়।দ্বিতীয়তঃ নামগুলি যেন পৃথিবীর কোন জনগোষ্ঠী বা সমষ্টি ভাবনায় আঘাত না করে। তৃতীয়তঃ নামের মধ্যে রুক্ষতা নির্মমতা প্রকাশিত যেন না হয় । চতুর্থতঃ নামগুলি হবে সংক্ষিপ্ত সহজে উচ্চারণ করা যায় এমন এবং সর্বগ্রহণযোগ্য। পঞ্চমতঃ নামের সর্বোচ্চ দৈর্ঘ্য আট অক্ষরের বেশী হবেনা। ষষ্ঠতঃ প্রস্তাবিত নামের সঙ্গে উচ্চারণ নির্দেশিকা এবং ভয়েস ওভার দিতে হবে। সপ্তমতঃ নামগুলি পুনরাবৃত্তি হবে না।

প্রতিটি দেশের ৮টি করে নাম বাছাই করে মোট ৬৪টি ঝড়ের নামকরণ করা হয়। বঙ্গোপসাগর এবং আরব সাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ করে এই ৮টি দেশ। ২০০৪ সাল থেকে বঙ্গোপসাগর ও আরব সাগরের উপকূলবর্তী দেশগুলিতে ঘূর্ণিঝড়ের নামকরণ শুরু হয়। প্রথম তালিকায় ঘূর্ণিঝড়ের প্রথম নাম হয় ‘অনিল’। এই নামটি রেখেছিল বাংলাদেশ। ঘূর্ণিঝড়টি আছড়ে পড়েছিল ভারতের গুজরাটে। এরপর তালিকা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ের নাম দেওয়া হয়েছে। সেই তালিকায় শেষ নাম ‘আমফান’ বা ‘উম্পুন’। যার অর্থ দৃঢ়তা, শক্তি বা স্বাধীন চিত্ত। ২০০৪ সালে থাইল্যান্ড এই নামটি দেয়। ২০২০ সালে ২০ মে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে, উড়িষ্যার কিছু অংশে এই বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড় ‘আমফান’ ‌আঘাত হানে এবং তারপর বাংলাদেশের দিকে চলে যায়। এই বছরই ৩ জুন মহারাষ্ট্রে ‘নিসর্গ’ নামক ঘূর্ণিঝড় আছড়ে পড়ে।
২০১৮ সালে ওই আটটি দেশের সঙ্গে যোগ করা হয় আরও ৫টি দেশকে। এই দেশগুলি হল- ইরান, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরশাহী এবং ইয়েমেন। মোট ১৩টি দেশের থেকে চাওয়া হয় নতুন নাম। দেশপিছু ১৩টি করে নাম নিয়ে তৈরি হয় ১৬৯টি ঝড়ের নামের তালিকা। প্রতিটি তালিকার শুরুতে আগের তালিকার শেষ নামটি যুক্ত করা হয়। পরবর্তী তালিকা অনুসারে আমফানের পরের ঝড়ের নাম হবে ‘নিসর্গ’। এই নাম দিয়েছে বাংলাদেশ। তার পরের ঘূর্ণিঝড়টির নাম হবে ‘গতি’ (ভারত) ও গতির পরের ঘূর্ণিঝড়টির নাম হবে নিভার (ইরান)। পৃথিবীতে মোট ১১টি সংস্থা ঘূর্ণিঝড়ের নাম ঠিক করে। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়া অঞ্চলে অনেক আগে থেকেই ঝড়ের নামকরণ করা হত। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে ঝড়ের নামকরণ চালু হয়েছে অনেক পরে।বর্তমান তালিকায় ভারতের দেওয়া ১৩ টি নাম রয়েছে। নামগুলি হল – গতি, তেজ, মুরাসু, আগ,ভ্যোম, ঝড়, প্রবাহ, নীর, প্রভাঞ্জন, ঘূর্ণি, অম্বুদ, জলধি এবং ভেগা (Gati, Tej, Murasu, Aag, Vyom, Jhar (pronounced as ‘Jhor’), Probaho, Neer, Prabhanjan, Ghurni, Ambud, Jaladhi and Vega)।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।