সববাংলায়

সারাগড়ীর যুদ্ধ

বিভাগঃ ,

সারাগড়ীর যুদ্ধ (Battle of Saragarhi) ব্রিটিশ ভারতের সামরিক ইতিহাসে অন্যতম এক বিখ্যাত যুদ্ধ। এই যুদ্ধে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ৩৬তম শিখ রেজিমেন্টের মাত্র ২১ জন শিখ সৈনিক ইশার সিং-এর নেতৃত্বে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত প্রায় দশ হাজার আফগান সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। বর্তমান পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়ায় ব্রিটিশদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ সারাগড়ীর সামরিক পোস্টে এই যুদ্ধ হয়েছিল। সারাগড়ীর যুদ্ধ সেনাবাহিনীর দায়িত্বজ্ঞান, আত্মত্যাগ, বীরত্ব ও তেজস্বীতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। এখনও পর্যন্ত সারাগড়ীর যুদ্ধের ইতিহাস প্রতিটি সৈনিককে উজ্জীবিত করে। এমনকি সারাগড়ীর যুদ্ধ শিখ ইতিহাসের প্রতীক হয়ে উঠেছে। এই বীরত্বকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ‘শেষ লড়াই’ বা ‘লাস্ট স্ট্যান্ড’ হিসেবে গণ্য করা হয়। সারাগড়ীর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ওই ২১ জন সৈনিককে সেই সময়কার সর্বোচ্চ বীরত্বপূর্ণ পুরষ্কার দেওয়া হয়েছিল। এছাড়া এখনও ভারতীয় সেনাবাহিনীর শিখ রেজিমেন্ট প্রতি বছর তাঁদের সম্মানার্থে ১২ সেপ্টেম্বর ‘সারাগড়ী দিবস’ পালন করে।

১৮৯৭ সালে ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ৩৬তম শিখ রেজিমেন্টের মাত্র ২১ জন শিখ সেনা এবং প্রায় দশ হাজার আফগান আফ্রিদি, ওরাকজাই ও পশতুন উপজাতি যোদ্ধাদের মধ্যে সারাগড়ীর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। সকাল ৯ টার দিকে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ প্রায় বিকেল পর্যন্ত চলেছিল।

উনিশ শতকের শেষের দিকে মধ্য এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ব্রিটেন ও রাশিয়ার মধ্যে নানা উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। এই সময় এশিয়ায় সাম্রাজ্য বিস্তার নিয়ে রাশিয়া ও ব্রিটেনের মধ্যে শুরু হয় ‘দ্য গ্রেট গেম’ বা ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। সেই সময় রাশিয়া মধ্য-এশিয়ায় সাম্রাজ্য বিস্তার করে ব্রিটিশ ভারতের দিকে এগিয়ে আসতে শুরু করে। তারা আফগানিস্তানের মাধ্যমে ব্রিটিশ অধ্যুষিত ভারতবর্ষে প্রবেশের চেষ্টা করছিল। এই কারণে সেই সময় ব্রিটেনের কাছে আফগানিস্তানের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। তাই ব্রিটিশরা এই অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করতে বেশ কিছু দুর্গ তৈরি করে। সেই দুর্গগুলির মধ্যে হিন্দুকুশ পর্বতমালার সামানা রেঞ্জের (Samana Range) ফোর্ট লকহার্ট এবং সুলাইমান রেঞ্জের ফোর্ট গুলিস্তান দুর্গ ছিল অন্যতম। তবে এই দুর্গ দুটি একে অপরের কাছাকাছি না হওয়ার জন্য মাঝপথে ছিল সারাগড়ী সামরিক পোস্ট। এই পোস্টটি বর্তমান পাকিস্তানের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের তিরাহ উপত্যকায় অবস্থিত ছিল। হেলিওগ্রাফিক সংকেত আদান-প্রদানের জন্য এই পোস্ট ব্যবহার করা হত। এখানে একটি সিগন্যালিং টাওয়ার ছিল, যেখানে সূর্যালোক ও আয়না ব্যবহার করে সিগন্যাল পাঠানো হত।

১৮৮৭ সালে কর্নেল জে. কুক (Colonel Jim Cooke) এবং ক্যাপ্টেন এইচ আর হোমের (Captain H. R. Holmes) নেতৃত্বে জাট শিখদের নিয়ে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর ৩৬ তম শিখ বাহিনী তৈরি করা হয়েছিল। ব্রিটিশরা সারাগড়ীর ওই অস্থির অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ নিলেও মাঝে মাঝেই পশতুন উপজাতীর মানুষরা ব্রিটিশদের উপর আক্রমণ করত। তাই ১৮৯৭ সালে লেফটেন্যান্ট কর্নেল জন হাউটনের নেতৃত্বে ৩৬তম শিখ রেজিমেন্টকে ব্রিটিশ ভারতের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তে পাঠানো হয়। সারাগড়ী ছাড়া সামানা পাহাড়, কুরাগ, সাঙ্গার, সাহতোপ ধরেও সেই সময় কিছু সেনা থাকত।

১৮৯৭ সালে আফগানরা আবার ব্রিটিশদের উপর আক্রমণ শুরু করে। তারপর ব্রিটিশদের খাইবার পাস নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে পশতুন উপজাতিদের আক্রমণ আরো জোরালো হয়। এরপর আফ্রিদি, ওরাকজাই, পশতুন নামক আফগান উপজাতিরা জোটবদ্ধ হয়ে সমানা রেঞ্জের একাধিক ব্রিটিশ দুর্গ আক্রমণ করে। তবে ৩৬তম রেজিমেন্টের শিখরা পশতুনদের সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দেয়। এরপর ১৮৯৭ সালের ১২ সেপ্টেম্বর সকাল ৯টার দিকে আফগান সেনারা জোরালো আক্রমণ করে। তারা খুব অল্প সময়ের মধ্যে ওই সারাগড়ীর ঘাঁটিটি ঘিরে ফেলে। তাই এই সময় দলনেতা হাবিলদার ইশার সিং-এর নির্দেশে সিগন্যালম্যান গুরুমুখ সিং তৎক্ষণাৎ তাঁদের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল জন হাউটনকে (Lt Col John Houghton) সাহায্যের জন্য আবেদন করেন। কিন্ত কর্নেল হাউটন এমন অতর্কিত আক্রমণের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। তাই সেই সময় তিনি কোনও রকম সাহায্য পাঠাতে পারবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছিলেন। এই পরিস্থিতিতে নিজেদের অবশ্যম্ভাবী পরাজয় জেনেও মাত্র ২১ জন শিখ প্রায় দশ হাজার সৈন্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারপর তারা শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত সারাগড়ীর ঘাঁটি রক্ষা করার সংকল্প গ্রহণ করে, যাতে আফগান সেনারা লকহার্ট ও গুলিস্তান দুর্গে পৌঁছাতে না পারে।

নানা তথ্য থেকে জানা যায় যে, সিপাহী গুরমুখ সিং ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই হেলিওগ্রাফের মাধ্যমে ফোর্ট লকহার্ট দুর্গে সংকেত পাঠিয়েছিলেন। সারাগড়ীর যুদ্ধে সিপাহী ভগবান সিং প্রথম শহীদ হন। তারপর নায়েক লাল সিং গুরুতর আহত হন। তবে তিনি যুদ্ধক্ষেত্র ত্যাগ না করে শেষ পর্যন্ত যুদ্ধ করেন। তারপর কয়েক ঘন্টা যুদ্ধ করার পরই শিখ সেনাদের গোলা-বারুদ ফুরিয়ে যায়। সেই সময় শিখ সৈন্যদের সাহস দেখে আফগান সেনারা অবাক হয়ে যায়। তারা সারাগড়ীর যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে আশেপাশের ঝোপঝাড়ে আগুন ধরিয়ে একটি ধোঁয়া তৈরি করে দুর্গের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সেই সময় ইশার সিং দুজন সিপাহীকে তাঁর সাথে রেখে বাকিদের ঘাঁটির ভেতরে আশ্রয় নিতে বলেন। আর তারপর বন্দুক যুদ্ধ ছেড়ে শুরু হয় হাতাহাতি লড়াই।

মাত্র পাঁচজন শিখ সেনা জীবিত থাকাকালীন আফগানরা সারাগাড়ীর ঘাঁটিতে প্রবেশ করেছিল। ওই ঘাঁটির গেটটি খোলার জন্য দুবার চেষ্টা করার পর ব্যর্থ হয়ে তারা ঘাঁটির দেয়ালের বিভিন্ন অংশ ভেঙে ফেলেছিল। এরপর ঘাঁটির ভেতরের স্তর ভেঙে ফেলার পর একজন ছাড়া সকল শিখ সৈন্যকেই তারা হত্যা করেছিল। এই সময় জীবিত ছিলেন কেবলমাত্র সিগন্যালম্যান গুরুমুখ সিং। তিনি সহযোদ্ধাদের অবস্থা বুঝে শেষ বার্তা পাঠিয়ে নিজেই হাউটনের থেকে যুদ্ধ করার অনুমতি আদায় করেছিলেন। তারপর সারাগাড়ীর ঘাঁটির ১৯ বছর বয়সি সর্বকনিষ্ঠ সৈনিক গুরুমুখ সিং যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কথিত আছে যে, শেষ পর্যন্ত এই গুরুমুখ সিংকে জীবিত পুড়িয়ে মেরেছিল আফগানরা। তবে তিনি মৃত্যুর আগে বহু শত্রু সেনাকে হত্যা করেছিলেন।

ওই ২১ জন সেনার মৃত্যুর পরে আক্রমণকারীরা সারাগড়ীর ঘাঁটিটি দখল করে তা ধ্বংস করে দিয়েছিল। এরপর তারা দুর্গের দিকে এগিয়ে চলে। কিন্তু আক্রমণের খবর পাওয়ার পর হাউটন তাঁর সৈন্যদল নিয়ে এগিয়ে আসতে শুরু করেন। সেই সময় তাঁরা যুদ্ধক্ষেত্রে পৌঁছে যায় ও আফগানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে দুর্গকে নিরাপদ করেন। নানা সূত্র থেকে জানা যায় যে, এই সময় হাউটন সারাগড়ীর কাছে ছড়ানো ছিটানো প্রায় ৬০০ মৃতদেহ পেয়েছিল। আর সারাগড়ী, গুলিস্তান দুর্গ এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ব্রিটিশদের পাল্টা আক্রমণে আফগানদের মোট হতাহতের সংখ্যা পৌঁছেছিল প্রায় ৪,৮০০-এ।

সিপাহী বিদ্রোহের পর ভারতীয় সৈন্যদের ইচ্ছা করে ব্রিটিশ সৈন্যদের তুলনায় পুরনো প্রযুক্তির অস্ত্র দেওয়া হত, যা দিয়েই শিখ সৈন্যরা চরম সাহসিকতার সঙ্গে সারাগড়ীর যুদ্ধ করেন। তাঁরা সারাগড়ীর যুদ্ধে ব্যবহার করেন মার্টিনি-হেনরি রাইফেল এবং তলোয়ারের মতো অস্ত্র। উন্নত অস্ত্র না থাকা সত্ত্বেও শিখ সেনাদের এই বীরত্ব আজও অবিস্মরণীয়।

ব্রিটিশরা এই ঘাঁটি পুনরুদ্ধার করার পর, সারাগড়ীর পোড়া ইটগুলি নিয়ে সেই মহান শিখ সৈনিকদের জন্য একটি স্তম্ভ তৈরি করেছিল। এছাড়া তাঁদের স্মরণ করে অমৃতসর, সারাগড়ী এবং ফিরোজপুরে স্মৃতিসৌধ হিসেবে গুরুদ্বারও তৈরি করা হয়েছিল। অমৃতসরের গুরুদুয়ারারের দেওয়ালে একটি মার্বেল পাথরে শহীদ ২১ জন সৈনিকের নাম খোদাই করা আছে। এই যুদ্ধে নিহত সকল নন-কমিশনড অফিসারকে মরণোত্তর ইন্ডিয়ান অর্ডার অফ মেরিট প্রদান করা হয়েছিল , যা ছিল সেই সময়কার ভারতীয় সৈনিক সর্বোচ্চ বীরত্বের পুরস্কার। এই পুরস্কারটি বর্তমানের পরমবীর চক্রের সমতুল্য। ভারতের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি যুদ্ধের জন্য সেনাবাহিনীর একটি পুরো ইউনিটের প্রত্যেক সদস্যকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। সারাগড়ীর সৈনিকদের সম্মানার্থে ভারতীয় সেনাবাহিনীর আধুনিক শিখ রেজিমেন্ট প্রতি বছর ১২ সেপ্টেম্বর রেজিমেন্টাল ‘ব্যাটেল অনার্স ডে’ হিসেবে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে উদযাপন করে। এছাড়া ভারতীয় সেনাবাহিনীর শিখ রেজিমেন্টের সবচেয়ে সুসজ্জিত এবং ঐতিহ্যবাহী ইউনিটগুলোর মধ্যে অন্যতম চতুর্থ ব্যাটালিয়ন ওই দিন সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে সারাগড়ী দিবস পালন করে। ভারত ছাড়াও এই নজিরবিহীন সাহসিকতার ঘটনা নাড়া দেয় গোটা বিশ্বকে। ১৮৯৭ সালে ২১ সেপ্টেম্বর ব্রিটিশ পার্লামেন্টের অধিবেশন চলাকালীন পার্লামেন্টের সদস্যরা এই বীরদের উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে সম্মান প্রদর্শন করেছিল।

সারাগড়ীর যুদ্ধের ১২০তম বার্ষিকী উপলক্ষে ২০১৭ সালে জয় সিং সোহালের একটি তথ্যচিত্র ‘সারাগড়ি: দ্য ট্রু স্টোরি’ স্ট্যাফোর্ডশায়ারের ন্যাশনাল মেমোরিয়াল আর্বোরেটামে প্রদর্শিত হয়। এছাড়া ২০১৯ সালে অনুরাগ সিং পরিচালিত এবং অক্ষয় কুমার অভিনীত ‘কেশরী’ সিনেমা সারাগড়ীর যুদ্ধকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading