ইতিহাস

রূপচর্চার ইতিবৃত্ত

সৃষ্টির উষালগ্ন থেকে সৌন্দর্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ ও আরো সুন্দর হয়ে ওঠার প্রবনতা লক্ষণীয়। সময় বদলেছে, বদলেছে মানসিকতা, দৃষ্টিভঙ্গি। প্রযুক্তি ও আধুনিকতা বদলে দিয়েছে পুরো বিশ্বকে, পাল্টেছে রূপচর্চার ইতিবৃত্ত – সেই নিয়েই আমাদের আলোচনা।

আদিম মানুষ বন্যপ্রাণী থেকে নিজেকে রক্ষা, আর বিরূপ প্রকৃতির সাথে খাপ খাইয়ে চলার জন্য এবং শিকারের সুবিধার্থে ব্যবহার করত মাটি পাথর থেকে আবিষ্কৃত রঞ্জক পদার্থ, যা দিয়ে বর্ণচোরা হতে মানুষ গায়ে আঁকত নানা উল্কি ও নকশা।

নিজেকে রঞ্জিত করার ধারণার উদ্ভব ঘটে সর্বপ্রথম মধ্য আফ্রিকায়। কিন্তু পরবর্তীতে মূলত খ্রিষ্টের জন্মেরও দশ হাজার বছর পূর্বে মিশরীয়রা সর্বপ্রথম এই সৌন্দর্যচর্চা ব্যাপারটি নিজেকে আকর্ষনীয় করে তোলার জন্য ব্যবহার করতে শুরু করে। তখন থেকেই বিভিন্ন আচার অনুষ্ঠান ও শেষকৃত্যে সাজসজ্জার প্রচলন শুরু হয়। মিশরের মমিগুলো তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ।

প্রসাধনী (কসমেটিক্স) শব্দটি এসেছে গ্রিক শব্দ ‘kosmeticos’ থেকে খ্রিস্টীয় ১৭ শতকে। মূলত গ্রীকরাই এই শিল্পকে দিয়েছে অনন্যমাত্রা। তাঁদের সৌন্দর্য ও প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি, যার আশির্বাদপ্রাপ্তরাই ছিল রূপ ও সৌন্দর্যের আধার। তারা মসৃণ, সাদাটে, স্বচ্ছ ত্বকের গুণকীর্তন করত। পরবর্তীতে রোমানরা এই ক্ষেত্রে অনেক অবদান রাখেন। ধীরে ধীরে সভ্যতার ক্রমবিকাশ ঘটার ফলে মধ্যপ্রাচ্য, চীন, জাপান, ইউরোপ, আমেরিকা এবং অস্ট্রেলিয়া সহ অন্যান্য দেশে প্রসাধনী শিল্পের বিকাশ ঘটে।

১৯০০ সালের দিকে অভূতপূর্ব স্থান দখল করে নেয় প্রসাধনী শিল্প। মেকাপ বা ত্বকের যত্ন বিষয়টি রীতিমত বিখ্যাত হয়ে ওঠে অভিজাত মহলে। ত্বকের রঙ সাদাটে রাখার প্রচলনই ছিল তখনকার রীতি। ১৯১০ সালে ইউরোপ ও আমেরিকায় ব্যাপক প্রসার ঘটে প্রসাধন সামগ্রীর। ‘দ্যা ডেইলী মিরর বুক’ এর মতে ‘প্রসাধনী শিক্ষিত ও অভিজাত শ্রেণীর ব্যবহারের জন্য’। ১৯২০ সালের দিকে বলিউড ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে ব্যাপক সাড়া জাগায় মেকাপের খুঁটিনাটি সবকিছু। প্রাচীন চীনে সাজগোজকে, সামাজিক শ্রেণীবৈষম্যের মাপকাঠি হিসেবে গণনা করা হত।

প্রকৃতি থেকে আহরিত বিভিন্ন মূল্যবান উপাদানই ছিল মানুষের সৌন্দর্যচর্চার নিত্যসঙ্গী। পশুর চর্বি থেকে তৈরী হত ত্বকের জন্য ময়েশ্চারাইজার যা বর্তমান যুগের স্কিন কেয়ার রুটিনে অপরিহার্য একটি জিনিস। অলিভ ওয়েল, নানারকমের খড়িমাটি, রঞ্জক পদার্থ, ফুলের নির্যাস, পশুর চর্বি, পাতার নির্যাস, সামুদ্রিক লবন, ফলের রস, সুগন্ধি, কয়লা, গোলাপজল, মধু, বিভিন্ন রকমের তেল ও মসলা, হেনা, জাফরান, (কথিত আছে রানী ক্লিওপেট্রা জাফরান মেশানো দুধে স্নান করতেন) ইত্যাদি নানা উপকরন প্রাচীনকাল থেকে এখন পর্যন্ত রূপচর্চার কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

প্রসাধনের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখব আজ থেকে ২০ হাজার বছর আগের ক্রো-ম্যানোরাই এই প্রসাধন রীতির সর্বজন স্বীকৃত প্রবর্তক। তখন মানুষ ছিল অজ্ঞ, কুসংস্কারাচ্ছন্ন, তারা বুঝত না, জানত না- আকাশে বজ্রপাত কেন হয়, দাবানল কেন জ্বলে। ঝড়-বৃষ্টি কেন হয়, বন্যা কেন তাদের ঘর-বাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যায় – এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ আর মৃত্যুকে তারা ভীষণ ভয় করত। ভয়ই ছিল তাঁদের নিয়ন্ত্রক। আর এই ভয়কে জয় করার জন্যে তাঁরা নানান রঙে-বর্ণে-অলঙ্কারে নিজেকে সাজিয়ে কল্পিত দেবতাকে সন্তুষ্ট করে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও ভয় থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করত। মেয়েরা তখন থাকত মন্ত্র সুরক্ষিত গুহায়। আর পুরুষরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বের হত শিকারে। গায়ে, মুখমন্ডলে রং-এর জাদু মেখে।

কালের প্রবাহে সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষ চাষ করতে শিখেছে। জাপানের নব্য প্রস্তর যুগে (খৃস্টপূর্ব ৪৫০০-২০০০) বা নীল নদের উপত্যকায় গড়ে উঠেছে চাষীদের ছোট ছোট বসতি। মিশরে শুরু হয়েছে প্রি-ডাইন্যাস্টি সভ্যতা। মানুষের মধ্যে জ্ঞান-বিজ্ঞানের পরিধিও ততদিনে বেড়েছে। ভয় কমেছে দুর্যোগের। তাঁরা নিজেদের ক্ষমতা উপলব্ধি করতে শুরু করেছে। ক্রমশ ভয় বিভক্ত হল দেখা এবং না দেখায়। এখন নীল নদে কবে প্লাবন আসবে, ঘন মেঘ কবে আকাশ ছেয়ে ফেলবে, মানুষ এখন তার গাণিতিক নির্ভুলতায় এর ভবিষ্যদ্বাণী করতে শিখেছে। সুতরাং এসবে তার ভয় নেই। তবু ভয় আছে মৃত্যুকে। একদিন অজ্ঞাত বিপদকে জাদু বলে দূরে রাখতে সে যে প্রসাধনের সূত্রপাত করেছিল, এখন তা-ই পরিব্যাপ্ত হয়েছে চেনা শত্রুদের বিরুদ্ধেও। হিংস্র পশু এবং তার চেয়ে হিংস্র ভিন্ন গোষ্ঠীর মানুষের বিরুদ্ধে ভয় পেয়ে নয় – ভয় দেখাতে বা আত্মগোপন করতে তারা মুখ ও সারা শরীর চিত্রিত করা আরম্ভ করল।

সময়ের বিবর্তনে ধীরে ধীরে এ সব ছোট ছোট গোষ্ঠীতে গড়ে উঠল পুরোহিত সম্প্রদায়। সাধারণ মানুষ ভাবতো এরা চির রহস্যময় মৃত্যুর রাজ্যের খবর এনে দেবে। বিপদে-আপদেও জনসাধারণকে পথ দেখাবে, উদ্ধার করবে। এরাই তখন হয়ে উঠল প্রসাধনের সর্বময় কর্তা। এভাবে প্রসাধন হল ধর্মের অঙ্গ। প্রসাধনের জটিলতাও বাড়ল। প্রাচীন মিশরীয়রা শরীরে উল্কি আঁকত। তারা রেড়ির বীজ থেকে তেল বের করে গায়ে মাখতো সূর্যের আলো থেকে চামড়া বাঁচাতে। এছাড়া তারা মুখ ও চোখের পাতা রাঙাতে শুরু করল বুনো রেড়ির তেলে সবুজ ম্যালাকাইট (তামার আকর) গুলে। মিশরের বেনী হাসান নামক স্থানে রয়েছে খুমোটোপের সমাধি। পুরাতাত্ত্বিকেরা এর মধ্যে খুঁজে পেয়েছেন এসব প্রসাধনের নিদর্শন। আর সমাধি গাত্রে অাঁকা রয়েছে এমন সব ছবি যা দেখে বোঝা যায় তখনকার দিনে দূর-দূরান্তে প্রসাধন সামগ্রীর ব্যবসা চলতো। মিশরে তখন চোখে কাজল দেয়ার প্রথা চালু হয়। কাজল সীসার এক রকম যৌগ যার ইংরেজী নাম গ্যালেনা। এই কাজল হল সূর্মার পূর্বসূরী, যা তৈরি অ্যানটিমনি ধাতু থেকে। পরবর্তীকালে অর্থাৎ ফারাওদের আমলে মিশরে চোখের পাতা বা ভ্রূ আঁকতে এর ব্যবহার অনেক বেড়ে গিয়েছিল। ফারাও আখেন-আটেনের রানী নেফারতিতি সূর্মা দেওয়া হরিণ চোখের জাদু দিয়ে বিচ্ছিন্ন উত্তর এবং দক্ষিণ নীল উপত্যকাকে সঙ্ঘবদ্ধ করেছিলেন এক সাম্রাজ্যের অধীনে। এর ফলে মিশরে কী পরিমাণ সমৃদ্ধি এসে ছিল তা বোঝা যায় নেফারতিতির জামাতা বিখ্যাত ফারাও তুতেন খামেনের সমাধি দেখে। এরও বহু পরে সর্বজনজ্ঞাত মিশর সম্রাজ্ঞী ক্লিওপেট্রার কাজল চোখের দৃষ্টি কী করে পৃথিবীর ইতিহাসটাই পাল্টে দিয়েছিল তা অনেকেরই অজানা নয়।

তৎকালীন মিশরে প্রসাধনী রং বলতে ছিল কালো এবং সবুজ রং। রামেসিস ও টলেমিদের সময় মেয়েদের ঠোঁটে এবং কপালে গেরি মাটি বা কারমাইন-এর লাল রং প্রসাধন চালু হয়। তখন সবুজ রং তৈরি হতো ম্যালাকাইট-এর পরিবর্তে সবুজ কপার হাইড্রো সিলিকেট দিয়ে। পিঁপড়ের ডিম বেঁটে তাঁরা চোখে রং করতো। কিন্তু এর ব্যবহার ছিল অভিজাত সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ।

শরীর রং করার এ ইতিহাস থেকে বোঝা যায় এক সময় হয়তো প্রথাটির ধর্মীয় তাৎপর্য ছিল গভীর। আবার সূর্যালোক থেকে শরীরের ত্বক রক্ষা এবং শারীরিক সৌন্দর্য বৃদ্ধির কথাও বাদ দেওয়া যায় না। হয়তো শেষ পর্যন্ত প্রসাধনে রং ব্যবহারের কারণ হিসেবে মানুষের সৌন্দর্যের অনুভূতিই প্রাধান্য লাভ করেছিল। এই সূত্রে শরীর রং করার আরেক বিকল্প প্রথাও উল্লেখযোগ্য- যার নাম উল্কি। অন্য বহু প্রসাধনের মতো উল্কি (শরীরকে রং দিয়ে চিত্রিত করা) প্রসাধনেরও উৎপত্তি প্রাচীন মিশরে- খৃস্টপূর্ব ৪ থেকে ২ হাজার বছরের মধ্যে। এরপর প্রথাটি ছড়িয়ে পড়ে পৃথিবীর সর্বত্র। আড়াই হাজার বছর আগে ক্রীট হয়ে গ্রীস, পারস্য, আরব এবং আরও প্রায় পাঁচ শত বছর পরে চীনে। চীন থেকে আইনুরা প্রথাটি জাপানে চালু করে। ক্রমশ জাপানী শিল্পীদের হাতে এটা কারুকলায় উন্নীত হয়। সেখান থেকে ছড়িয়ে পড়ে সুমাত্রা, বোর্নিও, ফিলিপাইনসহ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপসমূহে। নিউজিল্যান্ডের মাওরিদের মধ্যে উল্কির ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেখা যায়। এর উৎপত্তি পলিনেশিয়ায়। পরে অবশ্য প্রথাটি মাওরিদের সংস্কৃতির অঙ্গ হয়ে ওঠে। সেখানে উল্কির স্থানীয় নাম অ্যামোকো। ওরা বাদাম পুড়িয়ে সেই ছাই দিয়ে উল্কি করত। তাঁরা এত উল্কিপ্রিয় যে, প্রক্রিয়াটি যন্ত্রণাদায়ক হলেও তারা উল্কি আঁকতে যন্ত্রণা সহ্য করত। সৌন্দর্যবোধ ছাড়াও উল্কির ব্যবহার একেক দেশে একেক তাৎপর্য বহন করে। মালয়ের অধিবাসীরা কলেরার প্রতিষেধক হিসেবে শরীরে সাদা, কালো ও লাল রঙের উল্কি আঁকত। আবার আফ্রিকার কোনো কোনো আদিবাসী নারী নিজেদের বিধবা বোঝাতে ব্যবহার করে উল্কি। অ্যামেরিয়রা বিশ্বাস করত উল্কি দিয়ে শুধু এই জীবনে নয়, মৃত্যুর পরেও তাদেরকে ঠিক চিনে নিতে পারবে তাদের আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধবরা। রং দিয়ে উল্কি করে শরীরকে নানান রঙে সাজাবার উত্তাল তরঙ্গ মিশরের ফারাওদের যুগেও দেখা গিয়েছিল। ওল্ড টেস্টামেন্টে ‘পেইন্টেড লেডি’ জিজাবেলের কথা পড়ে মনে হয় বডি পেইন্টিং-এর প্রথাটি মিশর থেকে মধ্য প্রাচ্যে এসেছে।

কালের বিবর্তনে আজকের সভ্য জগতেও নারীর সৌন্দর্য প্রসাধনের পাশে উল্কির প্রচলন শুরু হয়েছে। তবে সেটি প্রাচীন প্রক্রিয়ায় শারীরিক নির্যাতন সহ্য করে নয়। অত্যন্ত সহজ উপায়ে আধুনিক নারীরাও উল্কি এঁকে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে থাকেন। আজকাল বিউটি পার্লারে গিয়ে মেয়েরা হাতে, গলায়, পায়ে ও গালে ফুল ফোঁটা এঁকে থাকেন। এগুলো অতীতের উল্কিরই বিকল্প পদ্ধতি। গ্রীসে মেয়েরা শরীরে রং-এর প্রলেপ ব্যবহার করত। ভূমধ্যসাগরীয় একরকম লতাগুল্ম থেকে অ্যালকানেট নামে লাল রং বের করে তাঁরা গালে লাগাত। আর মুখে এবং গায়ে সাদা রং-ও ব্যবহার করত। এ থেকেই হয়তো বা আধুনিক প্রসাধনে এসেছে গালে রুজ এবং ব্লাশার লাগানোর প্রচলন। আধুনিক প্রসাধনে এগুলো তৈরি করা হয়েছে বিভিন্ন রং-এ। গায়ের রং অনুসারে ব্যবহার করছে আজকের নারীরা সৌন্দর্যকে আরও ফুটিয়ে তুলতে, ব্যবহৃত হচ্ছে রুজ, ফেস পাউডার, ব্লাসারের মতো প্রসাধনী।

রূপ চর্চার ইতিহাস বলতে গেলে চারজন রমণীর নাম অবশ্যই আগে আসে। তাঁরা হলেন – মিশরের ক্লিওপেট্রা, বাইজানটিয়ার থিওডোরা, ফ্রান্সের মাদাম পঁপিদু এবং ভারতের মুঘল সম্রাজ্ঞী নূর জাহান।

কথিত আছে, ক্লিওপেট্রার অপরূপ সৌন্দর্য এবং বুদ্ধিমত্তা ছাড়াও তিনি ছিলেন বহুগুণের অধিকারিণী। ধাত্রী বিদ্যা ও ভেষজ বিদ্যায় পারদর্শী ছিলেন তিনি। ক্লিওপেট্রা প্রসাধন শিল্পকে পুরোহিতদের হাত থেকে ছিনিয়ে এনে একে চিকিৎসা বিদ্যার সাথে সংযোজন করেন। পরাক্রমশালী ফারাওদের সময় থেকেই প্রসাধনের ওপর পুরোহিতদের আধিপত্য কমতে শুরু করেছিল। ক্লিওপেট্রার মতো সুন্দরী লাবণ্যময়ী প্রসাধন বিশেষজ্ঞরা যখন ভেষজ বিদ্যার চর্চা শুরু করলেন তখন পুরোহিতদের জাদু মন্ত্র সম্পূর্ণ খসে পড়ল। তাছাড়া আজকাল মুখের চামড়া পেলব রাখতে মেয়েরা যে ‘ফেস মাস্ক’ নামক প্রসাধন ব্যবহার করে রানী ক্লিওপেট্রাই তার প্রবর্তক। মধু, ডিমের সাদা অংশ এবং ‘গাধার খুর’ নামে এক প্রকার গাছের পাতার রস মিশিয়ে তিনিই এই প্রাকৃতিক অভিনব ফেস প্যাকটি তৈরি করতেন। প্রাচীন মিশরীয় প্রসাধনে আইবিস, বিড়াল, কুমিরের রক্ত, কাঁকড়া, বিছার লেজ, ইঁদুরের নখ, গাধার খুর ইত্যাদি যতসব উদ্ভট উপাদানের নাম পাওয়া যায়, পরবর্তীতে আবিষ্কৃত হয় যে, এগুলো হল এক রকম উদ্ভিজ্জ উপাদানের আটপৌরে নাম।

খ্রীষ্টের সমসাময়িক রোমে প্রসাধন বিস্তারের বর্ণনা দিয়ে গেছেন দার্শনিক প্লিনি এবং কবি ওভিড, যাকে আজও ‘প্রসাধনের কবি’ নামে অভিহিত করা হয়। প্লিনির বই ‘ন্যাচারাল হিস্ট্রি’ থেকে জানতে পারা যায়, তখনকার দিনে মেয়েরা ঠোঁটে ‘লিপস্টিক’, চোখে ‘আইশ্যাডো’ ছাড়াও গালে ব্যবহার করত ভিনেগারে ভেজানো ‘পুপেসেরিয়াম’ নামে এক রকম শেকড়, যা থেকে পাওয়া যেতো রুজ কিংবা সিঁদুর। গায়ের রং ধবধবে সাদা করতে ব্যবহার করা হতো চক পাউডার। ওভিডও Ars Amatoria (art of love) নামে একটা বই লিখেছিলেন। সেখানে তিনি বলেছিলেন ‘Cure davit faciem; facies neglecta perbit’- অর্থাৎ উপযুক্ত যত্ন নিলে (রূপ পরিচর্যা করলে) সবাই সুন্দর; অবহেলা করলেই কুৎসিত। ওভিডের অধিকাংশ আলোচনা কেশ চর্চা নিয়ে। প্লিনির আলোচনা পারফিউম নিয়ে।

ষষ্ঠ শতাব্দীতে বাইজেনটাইন সভ্যতার প্রাক্কালে কনস্ট্যানটিনোপল (বর্তমান ইস্তাম্বুল) শহরটির পত্তনের পর অর্থনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক গুরুত্ব অনেকখানি বেড়ে যায়। ষষ্ঠ শতাব্দীতে সেখানে রাজত্ব করতেন খৃস্টান ধর্মাবলম্বী রাজা জাসটিনিয়ন, যিনি স্বপ্ন দেখেছিলেন দ্বিতীয় এক রোম সাম্রাজ্যের। সে স্বপ্ন তার সফল হয়নি। আর তারই রানী থিওডোরা আমাদের দিয়েছিলেন বিজ্ঞানভিত্তিক প্রসাধনের ধারণা। অসামান্য রূপের অধিকারিণী ছিলেন কনস্ট্যানটিনোপল শহরের হিপোড্রোমের ভাল্লুক পালকের মেয়ে। জন্ম তাঁর সাধারণ পরিবারে হলেও নারীত্বে তিনি ছিলেন মহিয়সী আর প্রসাধনে ছিলেন অসাধারণ জ্ঞানবতী। নানা রকম গাছ-গাছড়া নিয়ে তিনি নতুন নতুন প্রসাধন সামগ্রী তৈরি করতেন তাঁর নিজের গবেষণাগারে। এ ব্যাপারে রাজ চিকিৎসক ইতওস ছিলেন তাঁর সুযোগ্য সহকারী। এছাড়া তিনি ছিলেন প্রসাধন শিল্পের পৃষ্ঠপোষক।

একাদশ শতাব্দীতে কনস্ট্যানটিনোপলের সিংহাসনে আমরা আরেক সম্রাজ্ঞীর অধিষ্ঠান দেখতে পাই। জোই (Zoe) নামে। তিনি যৌবনকে ধরে রেখেছিলেন। সত্যি সত্যিই তাঁকে বলা হতো অনন্ত যৌবনা। তিনি পঞ্চাশ বছর বয়সে বাইজানটাইন সিংহাসনে তাঁর খুল্লতাত অষ্টম কনস্ট্যানটিনোপল-এর স্থলাভিষিক্ত হন। এই অনন্ত যৌবনা নারী নিজের আবিষ্কৃত প্রসাধন প্রণালী দিয়ে বার্ধক্যকে দূরে রেখেছিলেন। বাহাত্তর বছর বয়সে যখন তিনি মারা যান তখনও নাকি তাঁর মুখ দেখতে ছিল ষোড়শী তন্বীর মতো।

ভারতীয় উপমহাদেশে রূপচর্চার ইতিহাসও একইভাবে প্রাচীন। মহাকবি কালিদাসের অমর কাব্যগুলোয় আবরণ, আভরণ ও প্রসাধনে তৎকালীন বঙ্গ ললনাদের সৌন্দর্য কিভাবে বিকশিত হয়ে উঠত তার নিখুঁত বর্ণনা আমরা পাই। যেমন:

… “হস্তে লীলা কমলম্ অলকে বালকুন্দানুবিদ্ধং
নীতা লোধ্র প্রসব রজসা পান্ডুতাম্ আননশ্রীং।।

চুঢ়াপাশে নবকুরু বকং চারু কনে শিরিষং
সীমন্তে চ তুদুপগমজং যত্র নীণং বধুনাম্।।” …

গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর উপমহাদেশে যুক্ত হয় আরবীয় প্রসাধন চর্চা। সপ্তম থেকে চতুর্দশ শতাব্দীর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান – সব কিছুতেই এগিয়ে চলার জোয়ার বইছিল। সেসময় এক দিকে আমরা যেমন আবু সিনার মতো হেকিমের নাম শুনতে পাই, তেমনি ইসাক-ইবন মুরাদ বা হাজি-জৈন-আল আত্তার প্রভৃতি প্রসাধন বিশেষজ্ঞরাও সেসময় জন্মেছিলেন। মোঘলরা প্রসাধন চর্চায় এনেছিল নতুন উদ্যম। জাতি হিসেবে মোঘলরা ছিল জাঁকজমক প্রিয় এবং প্রসাধন বিলাসী।

মোঘল সম্রাজ্ঞী নূরজাহানের ছিল অনেক গুণ। তিনি সাহিত্য চর্চা করতেন, কবিতা লিখতেন, চিত্র শিল্পেও তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ছিল। নূরজাহান সুরুচিসম্পন্ন সাজগোজ অর্থাৎ প্রসাধন ব্যবহার করতেন। তিনি বিভিন্ন প্রসাধন সামগ্রীও তৈরি করতে পারতেন। বিশেষ করে সুগন্ধিদ্রব্য (Perfume) প্রস্তুত করতেন। বিভিন্ন ফুল থেকে নির্যাস নিয়ে তাদের সংমিশ্রণে নতুন নতুন সুগন্ধি তৈরি করা ছিল তাঁর শখ।

চিকিৎসা শাস্ত্রের ওপর যে প্রামাণ্য গ্রন্থ ম্যানডেভিল রচনা করে গেছেন তার চবিবশ পরিচ্ছেদেই রয়েছে প্রসাধন সংক্রান্ত আলোচনা। সেখানে সাবানের উল্লেখ আছে। বইটির দশটি অধ্যায়ে জরাকে ঠেকিয়ে রাখার উপায় লিপিবদ্ধ আছে। হেনরীর ছাত্র গাই-দ্য-শৌলক (১৩০০-১৩৬৮ খৃস্টাব্দ) প্রসাধন বিজ্ঞানের প্রভূত উন্নতি করেছিলেন। সে দেশে কসমেটিক সার্জারি চালু করার কৃতিত্বও তাঁর।

মধ্যযুগে ইংল্যান্ডে প্রসাধনের ব্যাপারটা অতীত ঐতিহ্য অনুযায়ী সম্পূর্ণরূপে চার্চের নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল। রানী প্রথম এলিজাবেথের সময় এর বাঁধন ছেঁড়ার প্রচেষ্টা শুরু হয়। যদিও রানী চার্চকে সন্তুষ্ট করতে ফরমান জারি করেছিলেন যে, কোনো রমণী যদি কৃত্রিম কেশ, স্পেনীয় হেয়ার প্যাড, মেক-আপ, ফলস হিপ, হাইহিল জুতো ব্যবহার করে সম্রাজ্ঞীর কোনো প্রজাকে প্রলুব্ধ করে বিবাহ করে তবে তাঁকে ডাইনীর সমান উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হবে; অথচ রানী এবং তাঁর বোন মেরী ছিলেন অত্যন্ত প্রসাধন প্রিয়। সুগন্ধির প্রতি রানীর এতই দুর্বলতা ছিল যে, পার্শ্বচরেরা সবসময় গায়ে গন্ধ মেখে ঘুরে বেড়াতো। শোনা যায়, এলিজাবেথ এতই প্রসাধন ব্যবহার করেছিলেন যে, পরবর্তীতে তাঁর ত্বকের অবস্থা খুবই খারাপ হয়েছিল – শেষ জীবনে তিনি লজ্জায় কারো সামনে খুব একটা বেরতেন না।

প্রসাধনের ব্যাপারে ইউরোপে নব জাগরণ এনেছিল ফ্রান্স। ফ্রান্সকে সমগ্র ইউরোপের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ধরা হত। তাই আজও ফরাসি পারফিউম সারা পৃথিবীর মধ্যে প্রথম স্থান দখল করে রেখেছে।

যদিও বাজারে নানা রকমের রাসায়নিক উপাদানে তৈরী প্রসাধনী পাওয়া যায়, তবুও চাহিদার দিক থেকে প্রাকৃতিক উপাদানের আবেদন এখনো আকাশচুম্বী। বঙ্গদেশ এই শিল্পে অনেক পিছিয়ে আছে এখনো, যদিও পর্যাপ্ত কাঁচামালে ভরপুর সমগ্র বঙ্গদেশ। আমাদের উচিত ভেজাল বা নকল পণ্য না বানিয়ে, নিজেদের মেধা, মনন ও গবেষনার সমন্বয়ে বঙ্গদেশের মানুষের ত্বকের ধরণ অনুযায়ী আবহাওয়ার দিকে নজর রেখে পণ্য তৈরী করা।

দেশ সীমানার গন্ডি পেরিয়ে প্রসাধনী শিল্প বহুল প্রচলিত ও উন্নত শিল্প হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। শুধুমাত্র সুন্দর দেখানোর জন্য নয়, বরং নিজেকে ভিন্নরূপে আবিষ্কার করা, নিজের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির ধারক হিসেবে সৌন্দর্যচর্চা এক শক্তিশালী মাধ্যম। শুধু ফর্সা বা সাদাটে নয় বরং যার যার নিজস্ব রঙের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নিজেকে আত্মপ্রত্যয়ী করে গড়ে তোলার প্রেরণা জোগায় আজকের প্রসাধনী শিল্প।

তথ্যসূত্র


  1. Beauty and Cosmetics 1550 to 1950, by Sarah Downing, Shire Publication (২০১২)।
  2. Inventing Beauty: A History of the Innovations that Have Made Us Beautiful by Teresa Riordan, Broadway (২০০৪)।
  3. Classic Beauty: The History of Make-up by Gabriela Hernandez, Schiffer publishing ltd (২০১৭)।
  4. Painted Faces: A Colourful History of Cosmetics by Susan Stewart, Amberley Publishing (২০১৮)।
  5. Facing Beauty: Painted Women & Cosmetic Art by Aileen Ribeiro, Yale University Press (২০১১)।
  6. Lifestyle of the Vedic People (Reconstructing Indian History and Culture) by Pranati Ghosal, D.K. Print World Ltd (২০০৬)।)

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!