বিজ্ঞান

গ্রীনল্যান্ড সার্ক

প্রাণীজগতে আয়ু বিষয়ে গবেষণা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীদের হাতে উঠে এসেছে এক অদ্ভুত তথ্য। সুবিশাল মহাসাগরের গভীরে এই প্রাণীর গড় বয়স আমাদের বয়সের প্রায় ৮গুন বেশি! অন্তহীন মহাসাগরের বুকে নিহিত থাকা সেই প্রাণীটির নাম “গ্রীনল্যান্ড সার্ক” (Greenland Shark)। বিজ্ঞানসম্মত নাম সমনিওসাস মাইক্রোসেফালাস (Somniosus Microcephalus)।

বিরল এবং প্রায় বিলুপ্ত এই গ্রীনল্যান্ড সার্ক হাঙ্গর প্রজাতির মধ্যে সবচেয়ে বড়। এদের গড় আয়ু ৩৯২ বছর। জীবনের এই সুবিশাল পর্যায়ের জন্য এদের নাম দেওয়া হয়েছে স্লিপার সার্ক (Sleeper Shark)। বয়সের নিরিখে অভিজ্ঞ এই বিরল প্রাণীটিকে শুধুমাত্র আটলান্টিক ও আর্কটিক মহাসাগরের সীমাবদ্ধ অঞ্চলেই বিচরণ করতে দেখা যায়। ১০০০ থেকে ১৪০০কিলোগ্রাম ওজনের এই বৃহৎ সার্ক আকৃতিতে ২১ ফুট থেকে ২৪ ফুট [৬.৪ মিটার থেকে ৭.৩ মিটার] লম্বা হতে পারে। আকারে বড়ো হওয়ায় গ্রীনল্যান্ড সার্ক গতির দিক থেকে খুবই ধীর গতির প্রাণী। মহাসমুদ্রের অতলে ঘণ্টায় ১.২২ থেকে ২.৬ কিলোমিটার গতিতে বিচরণ করে। সমিনিওসিডিয়ে পরিবারের এই হাঙ্গরদের পুরুষ অপেক্ষা মহিলা সার্করাই আকারে বড় হয়। মহাসাগরের গর্ভের এই দানবরা ধূসর রঙ্গের হওয়ায় এদের গারি সার্ক বা গ্রে সার্ক নামেও চিহ্নিত করেছেন মেরিন বিজ্ঞানীরা।

জীবনের অতল সমুদ্রে এই এপেক্স প্রিডেটাররা মাছ খেয়েই জীবন অতিবাহিত করে। কিন্তু চমকের বিষয় এরা মাছ শিকার করে না। মহাসাগরের স্রোতে পচাগলা প্রাণী দেহ ভেসে এলে তার গন্ধে আকৃষ্ট হয় এবং তা ভক্ষণ করে মহাসাগরকে পরিষ্কার রাখার কাজে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করে। তাই এদের স্ক্যাভেঞ্জার সার্ক (Scavenger Shark) নাম দেওয়া হয়েছে। গ্রীনল্যান্ড সার্ক প্রতি বছরের শীতকালীন ঋতুতে মিলনের জন্য ২৬০ কিলোমিটার মাইগ্রেট করে। মহাসমুদ্রের গভীরতায় ৮০ ডিগ্রী অক্ষরেখার দিকে মুখ করে জীবন সঙ্গীর সন্ধানে শুরু করে দীর্ঘ যাত্রা। কিন্তু বছরের এই নির্দিষ্ট সময় কিভাবে এরা সঠিক পথ বেছে নিয়ে আমেরিকার উপকূলে প্রতি বছর ফিরে যায় তা বিজ্ঞানীদের কাছে এখনও অধরা। গ্রীনল্যান্ড সার্করা বছরে ১টি মাত্র শাবককের জন্ম দেয়। যার মহাসাগরের অভ্যন্তরের নানা বাধা প্রতিকূলতা পেরিয়ে বেঁচে থাকাটাই অনেক সময় সঙ্কটের মুখে পড়ে। তাই এই প্রজাতির সংখ্যা ক্রমশ কমতে কমতে বিপদের মুখে।

সম্প্রতি সমুদ্র বিজ্ঞানীরা যে গ্রীনল্যান্ড সার্কের নমুনা পরীক্ষা করছেন, অনুমান করা হচ্ছে তার বয়স ৫১২ বছর। পরীক্ষাতে ধরা পড়েছে গভীর মহাসাগরের আঁধারে থাকায় এরা প্রায় দৃষ্টিশক্তিহীন। কারণ মহাসাগরের অভেদ্য গভীরতায় কপেপড নামক একধরণের বায়লুমিনিসেন্ট ছত্রাক এদের চোখে বাসা বাঁধে। কপেপড ছত্রাক চক্ষূরস শুষে খাওয়ায় হাঙ্গরদের চোখের স্বাভাবিক ক্ষমতা হ্রাস পায়। তাই দৃষ্টিশক্তিহীন সার্করা ইকো-লোকেশানের সাহায্যই দিক নির্ণয় করে। জীবনের সুবিশাল পর্যায় তাই এদের অন্ধ হয়েই কাটাতে হয়।

অনন্ত জীবনকালের নানা সমস্যার সম্মুখীন হয়েই এরা মহাসাগরের অতলে জীবন অতিবাহিত করে চলেছে। পৃথিবীর গভীরতায় বিরল এই সার্করা পরিবর্তিত প্রাকৃতিক পরিবেশ ও গ্লোবাল ওয়ারমিং-এর জন্য মহাসমুদ্র বক্ষ থেকে এদের সংখ্যা ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। পৃথিবীর অতলে নানা পরিবর্তনের সাক্ষী গ্রীনল্যান্ড সার্করা মহাসাগরের অতলে শতাব্দীর পর শতাব্দী থেকে শোভা বর্ধিত করছে এভাবেই।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!