বেলারানী দত্ত হত্যা মামলা

বেলারানী দত্ত হত্যা মামলা

কলকাতা শহরে বিগত কয়েক দশকে বহু নৃশংস খুনের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু স্বাধীনতা-পরবর্তী কলকাতায় সবথেকে নৃশংস ঘটনা ছিল বেলারানী দত্ত হত্যা মামলা (Belarani Dutta Murder Case)। সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে দা-এর কোপ মেরে খুন এবং শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে টুকরো টুকরো করে কেটে ফেলার মত নৃশংসতা এই মামলা ছাড়া অন্য কোনও মামলায় খুব কমই দেখা গিয়েছে। ভারতের ইতিহাসে অপরাধের তদন্তে এই মামলাতেই প্রথম প্লাস্টিক সার্জারির সাহায্য নেওয়া হয়েছিল। ফলে সেদিক দিয়েও বেলারানী দত্ত হত্যা মামলা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

১৯৫৪ সালের ৩১ জানুয়ারি কলকাতার সেশন আদালতে দায়ের করা হয় বেলারানী দত্ত হত্যা মামলা। প্রথমে কলকাতা পুলিশের হোমিসাইড বিভাগের ইন্সপেক্টর সমরেন্দ্রনাথ ঘোষ টালিগঞ্জ থানায় এই হত্যা মামলার বিরুদ্ধে একটি অভিযোগ দায়ের করেন এবং পরে তিনিই ভারপ্রাপ্ত তদন্তকারী অফিসার হিসেবে আদালতে চার্জশিট পেশ করেন। এই মামলার প্রধান ও একমাত্র অভিযুক্ত ছিলেন বীরেন দত্ত। ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে মামলা চলেছিল আদালতে।

বেলারানী দত্ত হত্যা মামলা কলকাতার ইতিহাসে এক নৃশংস অধ্যায়। এই মামলার প্রধান অভিযুক্ত ৩৪ বছর বয়সী বীরেন দত্ত থাকতেন বজবজের একটি গ্রামে। পরে বাবা-মায়ের মৃত্যুর পরে তাঁর খুড়তুতো দুই দাদা নবনী দত্ত এবং যতীন্দ্র দত্তের ভবানীপুরের বাড়িতে চলে আসেন বীরেন। রামরিক ইনস্টিটিউশনে বালক বীরেনকে দাদারা ভর্তি করে দেয় পড়াশোনা করার জন্য। পড়াশোনার প্রতি একেবারেই মন ছিল না তাঁর। খারাপ সঙ্গে যাওয়ার কারণে দাদারা খুবই বকাবকি করতেন তাঁকে। কিন্তু তাতে রেগে গিয়ে ১৯৩৪ সালে দিদির শ্বশুরবাড়ি আন্দুলে চলে আসেন তিনি। সেখানে তাঁর বড় জামাইবাবু তাঁর নামে লিখে দেন কলকাতায় করা নতুন একটি ওষুধের দোকান – সাউথ ক্যালকাটা ফার্মেসি। এদিকে খুড়তুতো দাদা নবনী স্নেহবশত তাঁকে কলকাতায় নিয়ে আসেন আবার এবং তার কিছুদিন পরেই খুড়তুতো দাদার মেয়ে কমলার প্রতি আকর্ষণজনিত কারণে তাকে নিয়ে বাড়ি থেকে পালান বীরেন। সদানন্দ রোডের বাড়িতে তারা দুজনে গিয়ে ওঠেন, কমলাকে তিনিই নতুনভাবে বেলারানী নাম দিয়েছিলেন। পরিবারের কেউই এই সম্পর্ক মেনে নিলেন না, ফলে নবনীও তাঁর কন্যা কমলার সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ত্যাগ করেন। নামমাত্র আচার-সংস্কার করে স্বামী-স্ত্রী হিসেবেই দিন কাটাতে লাগলেন কমলা ও বীরেন। প্রথম সন্তান রথীন্দ্রনাথ হওয়ার পর সদানন্দ রোডের সেই বাড়ি ছেড়ে তাঁরা উঠে আসেন টার্ফ রোডের বাড়িতে। সেখানেই শ্রীকৃষ্ণ লেনের বাসিন্দা সরোজকান্তি বসুর কন্যা মীরার সঙ্গে তাঁর এক নতুন প্রণয় গড়ে ওঠে। বেলারানীকে না জানিয়েই তিনি মীরার সঙ্গে রেজিস্ট্রি বিবাহ করে ফেলেন এবং তারপর বহু বছর যাবৎ সুকৌশলে কাউকে কিছু না জানিয়েই দুটি সংসার চালাতে থাকেন তিনি। প্রথমে গোয়াবাগানে দিদির শ্বশুরবাড়িতে মীরাকে নিয়ে রাখছিলেন বীরেন দত্ত, কিন্তু পরে সেখানে তাঁদের প্রথম সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরেই মারা গেলে মীরার বহু অনুরোধে তাঁরা উঠে যান হরিশ মুখার্জী রোডের একটি ভাড়া বাড়িতে। ১৯৫৩ সালে তাঁদের আবার একটি পুত্রসন্তান জন্মায়। এদিকে নিউ থিয়েটার্স স্টুডিওয় যাতায়াতের সূত্রে বহু ছবিতে অভিনয়ও করেছিলেন বীরেন। তারপর রেসের মাঠ, মদ, জুয়া আর পতিতালয়ে যাতায়াতের নেশা পেয়ে বসলো বীরেনকে। কাজে-কর্মে মন থাকলো না, কর্মচারীদের উপর পুরো দোকানের ভার ছেড়ে দেওয়ায় ব্যবসাতেও মন্দা দেখা দিল। এই পরিস্থিতিতে বেলারানীর দ্বিতীয়বার সন্তানসম্ভবা হওয়ার খবর শুনেই নিজেকে সংযত রাখতে পারেননি বীরেন দত্ত। প্রথমে সন্তানকে নিজের বলে মানতে অস্বীকার করেন তিনি। কিন্তু তাতেও কাজ হাসিল হল না দেখে স্ত্রী বেলারানীকে খুনের পরিকল্পনা করেন বীরেন দত্ত। মীরাকে মিথ্যা কথা বলে পুত্র বোতনকে মৃত বন্ধুর অনাথ পুত্র সাজিয়ে হরিশ মুখার্জী রোডের বাড়িতে নিয়ে আসেন বীরেন। ১৯৫৪ সালের ২৭ জানুয়ারি, রাতে দোকান থেকে বাড়ি ফিরে খেতে বসে কথা কাটাকাটি শুরু হয় বীরেন আর বেলারানীর মধ্যে। ক্রোধোন্মত্ত বীরেন দত্ত রান্নাঘরে রাখা দা নিয়ে এসে সোজা কোপ বসিয়ে দেন বেলারানীর ঘাড়ে। রক্তে ভেসে যায় পুরো ঘর। অতি যত্নে সব রক্ত ধুরে মুছে আলমারির মধ্যে বেলার মৃতদেহকে ঢুকিয়ে রাখেন তিনি। ইতিমধ্যে বেলার শরীর থেকে সব গয়না খুলে নিয়েছিলেন তিনি। তারপর দিন দোকান থেকে বাড়ি ফিরে লাশ গুম করার পরিকল্পনা নিয়ে দা দিয়ে বেলার মৃতদেহের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আলাদা আলাদা করে কেটে দোকান থেকে আনা যুগান্তর খবরের কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে পরদিন সকালে তা বাজারের ব্যাগে করে নিয়ে গিয়ে কয়েকটা টুকরো কালীঘাট পার্কে, কয়েকটা কেওড়াতলা শ্মশানের শৌচালয়ের পাশে ফেলে আসলেন বীরেন। পুরো ঘর ভেসে গিয়েছিল রক্তে, ফিনাইল দিয়ে অনেকবার করে সেই ঘর ধোয়া-মোছা করেছিলেন তিনি। বেলার ব্যবহৃত কাপড়-প্রসাধনী সবই টালির নালায় ফেলে দিয়ে এলেন তিনি। আর বেলার গয়না মীরার সামনে আলমারিতে রাখতে যাওয়ার সময় বীরেন মীরাকে বলেন যে কোনও এক বন্ধু নাকি তার কাছে সেই গয়না বন্ধক রেখেছে। এই এত বড় নৃশংস হত্যা পরিকল্পনা অচিরেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে পুলিশের। ১৯৫৪ সালের ৩০ জানুয়ারি কালীঘাট পার্ক এবং কেওড়াতলা শ্মশানের ঐ অঞ্চল থেকে উদ্ধার হয় কাগজে মোড়া বেলারানীর ছিন্নভিন্ন দেহখণ্ড। ৩১ জানুয়ারি ময়নাতদন্তে জানা গেল যে প্রথমে ঘাড়ের কাছে ধারালো কিছু দিয়ে আঘাত এবং তারপরে শরীরের বাকি অংশে কোপ বসানো হয়েছিল। কিন্তু কিছুতেই তখনও পর্যন্ত মৃতা কে তা শনাক্তকরণ করা যাচ্ছিল না। বীরেন দা দিয়ে পুরো মুখের চামড়াই চেঁছে ফেলে দিয়েছিলেন। এখানেই বিখ্যাত প্লাস্টিক সার্জেন মুরারীমোহন মুখার্জীর সাহায্যে মোটামুটিভাবে মুখের একটা আদল খুঁজে পাওয়া যায়। নীলরতন সরকার হাসপাতালের মর্গে প্রায় দিন কুড়ি ঐ দেহ ফেলে রাখার পরে পুলিশ শরীরের কিছু অংশের অস্থিমজ্জা আর চুল সংরক্ষিত করে মৃতার সৎকার করে। বহু চেষ্টা, বহু সন্ধানের পরেও মৃতার আসল পরিচয় জানা যায়নি। ২৫ ফেব্রুয়ারি রাতে গাড়ি নিয়ে ফেরার সময় রাসবিহারীর কাছে সমরেন্দ্র ঘোষের চোখে পড়ে সাউথ ক্যালকাটা ফার্মেসি দোকানটা আর সেখানেই কথায় কথায় জানতে পারেন দোকানের মালিক গত এক-দেড় মাস ধরে দোকানে আসেন না। সেই থেকেই মালিকের নাম-ঠিকানা জেনে ঐ বছরই ২৭ ফেব্রুয়ারি ভোরবেলায় হরিশ মুখার্জী রোডের একটি বাড়ি থেকে চাদর মুড়ি দিয়ে বেরোতে দেখে বীরেন দত্তকে আটক করে পুলিশ। তারপর থানায় নিয়ে এসে নিরন্তর জেরার মুখে সব অপরাধ নিজের মুখে স্বীকার করে নেয় বীরেন।  ইতিমধ্যে টার্ফ রোডের বাড়ি থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছে দা যাতে চুল তখনও লেগে ছিল, ফিনাইলের বোতল এবং ফরেন্সিক পরীক্ষায় ধরা পড়ল মৃতা নারীর চুলের সঙ্গে ফিনাইলের বোতল বা সেই দা-তে লেগে থাকা চুল হুবহু এক। বাকি ছিল সমস্ত তথ্যপ্রমাণ মেলানো। সেই কাজটাও অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে করে ফেলেছিলেন তদন্তকারী অফিসার সমরেন্দ্রনাথ ঘোষ। টার্ফ রোডের বাড়ি থেকে উদ্ধার হওয়া শম্ভুনাথ পণ্ডিত হাসপাতালের বহির্বিভাগের টিকিটে লেখা অন্তঃসত্ত্বার প্রামাণ্য নথি, নির্দিষ্ট দিনের না পাওয়া যুগান্তর পত্রিকা এবং মৃতার পায়ের অস্বাভাবিক বড় পাতার জন্য পারিবারিক যোগসূত্র নির্ণয়ের কাজে নৃতত্ত্ব বিভাগের সহায়তায় এর প্রমাণাদি মেলানোর মধ্য দিয়ে সুনিপুণ চার্জশিট পেশ করেছিলেন সমরেন্দ্রনাথ। তাছাড়া বেলারানীর ছিন্ন উরুতে কাটা দাগ দেখে তাঁর মা-ই সেটি বেলারানীর মৃতদেহ হিসেবে শনাক্ত করেন।

কলকাতার সেশন আদালতে দায়ের হল বেলারানী দত্ত হত্যা মামলা। অভিযুক্ত বীরেন দত্তের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ২০১ ও ৩০২ ধারার অধীনে খুন ও প্রমাণ লোপাটের অভিযোগ দায়ের করা হল। বীরেনের উকিল নানাভাবে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছিলেন যে মৃতা বেলারানী দত্ত নন, বেলারানী তার প্রেমিকের সঙ্গে পালিয়ে গিয়েছেন। ছয় মাস ধরে সওয়াল জবাব চলে। অবশেষে বীরেনের উকিলের মিথ্যা প্রমাণ ও মিথ্যা মামলা সাজানো আদালতে ধরা পড়ে এবং আদালত বীরেনের মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করে। কলকাতা উচ্চ আদালত ও সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেও মৃত্যুদণ্ডের সাজা মকুব হয়নি বীরেনের। ১৯৫৬ সালের ২৮ জানুয়ারি আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে ফাঁসি দেওয়া হয় বীরেন দত্তকে। অপরাধ জগতের এক ঘৃণ্য পাশবিকতার নিদর্শন এই বেলারানী দত্ত হত্যা মামলা।  

তথ্যসূত্র


  1. সুপ্রতিম সরকার, 'গোয়েন্দাপীঠ লালবাজার', আনন্দ পাবলিশার্স, ২০১৮, পৃষ্ঠা ১১-২৬ 
  2. https://www.dailyo.in/
  3. https://www.tamilpokkisham.com/
  4. https://indianexpress.com/

আপনার মতামত জানান