ভূগোল

মিশর

মিশর পতাকানীল নদের তীরে অবস্থিত মিশর, এর প্রতিটি বালুকণায় জড়িয়ে আছে ইতিহাসের গন্ধ। ফ্যরাও, পিরাপিড, মমি আর প্রাচীন সভ্যতার লীলাভূমি এই দেশ। আফ্রিকা মহাদেশের প্রান্তদেশে অবস্থিত এই দেশটি এশিয়ার সাথে সংযুক্ত। এই কারণে একে আফ্রিকার প্রবেশদ্বার বলা হয়ে থাকে৷

এই দেশের সরকারী নাম  মিশর আরব প্রজাতন্ত্র। মিশর নামের উৎপত্তি প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হল যে, প্রাচীন মিশরের ভাষায় দেশটির একটি নাম ছিল "কমেট" বা কালো মাটির দেশ। নীল নদের বন্যার সাথে বয়ে আনা উর্বর কালো মাটি যা মরুভূমির মাটি "deshret" অথবা "লাল জমি" থেকে আলাদা। দেশটি খুব শুষ্ক ফলে গরম পড়ে ভীষণ । শীতকালে খুব তীব্র শীত অনুভূত না হলেও বৃষ্টি হয়।

উত্তর আফ্রিকায় গাজা এবং লিবিয়ার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত প্রাচীন সভ্যতার বাহক মিশর। উত্তরে ভূমধ্যসাগর, দক্ষিণে সুদান, পূর্ব দিকে লোহিত সাগর  এবং পশ্চিমে লিবিয়া ঘিরে রয়েছে সমগ্র দেশটিকে। এর অক্ষাংশ ২৭.০০ ডিগ্রি উত্তর এবং দ্রাঘিমাংশ ৩০.০০ ডিগ্রি পূর্ব। ভারত মহাসাগর এবং ভূমধ্যসাগর-এর মধ্যে সমুদ্রপথে যোগাযোগ স্থাপন করেছে সুয়েজ খাল৷ মিশরের প্রধান নদী নীল নদ দেশটিকে দুইটি অসমান অংশে ভাগ করেছে। নীল নদের উপত্যকা ও ব-দ্বীপ অঞ্চলেই মিশরের বেশির ভাগ মানুষ বাস করেন৷ নীল নদকে কেন্দ্র করেই মিশরীয় সভ্যতা গড়ে উঠেছে।

মিশর ম্যাপ

মিশরের রাজধানী কায়রো যা আফ্রিকার সব থেকে বড় শহর। এই শহরের খুব কাছেই প্রাচীন মিশরীয় ব্যাবিলন শহর অবস্থিত ছিল বলে ধারণা করা হয়। নীল নদের ব-দ্বীপ এর শীর্ষে এই শহরের অবস্থান। নদীর অপর তীরে ছিল মিশরের প্রাচীন রাজধানী মেমফিস।

এই দেশের আয়তন ১,০০১,৪৫০ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে স্থলভাগের পরিমাণ ৯৯৫,৪৫০ বর্গকিলোমিটার এবং অবশিষ্ট ৬,০০০ বর্গকিলোমিটার জলাশয়। ২০১২ খ্রিষ্টাব্দের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ৮৩,৬৮৮,১৬৪ জন মানুষ মিশরে বসবাস করেন। আফ্রিকা মহাদেশের তৃতীয় এবং মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে জনবহুল দেশ হল এটি৷

মিশরের মুদ্রা হল মিশরীয় পাউন্ড। এই দেশের জাতীয় প্রতীক সালাদিনের ঈগল। (‘সালাদিন’ ছিলেন মিশর এবং সিরিয়ার প্রথম সুলতান।) জাতীয় পাখি হল সোনালি ঈগলএবং জাতীয় ফুল  ‘মিশরীয় পদ্ম’। এইটা জল পদ্ম নামেও পরিচিত।

মিশরের দাপ্তরিক ভাষা আরবি৷ মিশরের জনগণেরর অধিকাংশই এই ভাষাতে কথা বলে। মিশরে আরবি ভাষার বেশ কিছু স্থানীয় কথ্য উপভাষা প্রচলন আছে। মিশরের জিপসি সম্প্রদায়ের প্রায় অর্ধেক লোক জিপসি দোমারি ভাষাতে কথা বলেন। এছাড়াও এখানে আর্মেনীয় ভাষা, গ্রিক ভাষা এবং নীল নুবীয় ভাষা প্রচলিত। কিছু ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদিতে সীমিত পরিমাণে কপ্টীয় ভাষা ব্যবহার করা হয়। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও পর্যটন শিল্পে ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়ে থাকে৷

লিখিত ইতিহাস অনুসারে প্রায় ৩২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ থেকেই একটি সংহত রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে মিশর বিদ্যমান হয়ে আছে৷ ৬৪১ সালে আরব মুসলিমরা মিশরে আসলে মিশরের মানুষ দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে, তখন থেকেই মিশর মুসলিম ও আরব বিশ্বের একটি অংশ। আধুনিক মিশরের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী। মিশরের প্রধানমন্ত্রী ‘সাদ জঘলুল’ এবং প্রেসিডেন্ট ‘গামাল আব্দেল নাসের’-কে (১৯৫৪-১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দ) জাতির জনক বলা হয়। মিশর সুন্নি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ হলেও ৩টি স্বীকৃত ধর্ম রয়েছে এখানে। এই তিনটি ধর্ম হলো- ইসলাম, খ্রিষ্টান এবং ইহুদি। এছাড়া বাহাই ধর্মানুসারী অল্প কিছু থাকলেও স্বীকৃতি পায় না।

পিরামিডের দেশ মিশর ইসলামী শাসন আমলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের জন্য যেকোনো পর্যটকের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। ভ্রমণের জন্য এখানে অসংখ্য পর্যটন এলাকা আছে। মিশরীয় পিরামিড সহ এখানে রয়েছে নানা দর্শনীয় স্থান। প্রথমেই আসে আলেকজান্দ্রিয়ার নাম যেটি  মিশরের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগরী এবং মিশরের সর্ববৃহৎ সমুদ্রবন্দর। তারপর আসে প্রধান আকর্ষণ পিরামিড , স্পিংক্স, আবু সিম্বেল, কমকের মন্দির, ভ্যালী অফ দ্যা কিংস ইত্যাদি।

অঞ্চলভেদে মিশরীয় রন্ধনশৈলীতে মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার কিছু প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। মিশরীয় রন্ধনশিল্পে প্রচুর পরিমাণে ডাল, শাকসবজি এবং ফল ব্যবহৃত হয়। মিশরে মাংস খুবই ব্যয়বহুল তাই বিভিন্ন প্রকার নিরামিষভোজী খাবার স্থান দখল করে নিয়েছে। মিশরীয় রান্নায় সাধারণ মাংসের মধ্যে আছে খরগোশ, কবুতর, মুরগি এবং হাঁস। এগুলো সিদ্ধ করে ঝোল দ্বারা বিভিন্ন প্রকার স্ট্যু এবং স্যুপ প্রস্তুত করা হয়। ঝলসানো বা গ্রিলের জন্য ভেড়া এবং গরুর মাংস ব্যবহৃত হয়। কোফতা, কাবাব, গ্রিল কাটলেট ইত্যাদিকে মাশউইয়াত বলে অভিহিত করা হয়ে থাকে৷ কলিজার স্যান্ডউইচ আলেক্সান্দ্রিয়ায় বিশেষত্ব যা শহরাঞ্চলে ফাস্টফুড হিসেবে জনপ্রিয়। গরু এবং ভেড়ার মগজও মিশরে বিশেষ জনপ্রিয়।

মিশরের জাতীয় খেলা ফুটবল আর যেই খেলোয়াড় ফুটবলের জাদুবলে সারা বিশ্ব কে মজিয়ে রেখেছেন তিনি হলেন মহম্মদ সালাহ৷ যিনি একজন ফরওয়ার্ড হিসেবে জনপ্রিয় এবং মিশরীয় জাতীয় দল-এ খেলে থাকেন।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!