ইতিহাস

পুরুলিয়া নাম হল কিভাবে

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের মেদিনীপুর বিভাগে অবস্থিত সব থেকে পশ্চিমে অবস্থিত পুরুলিয়া জেলা ৷ ১৯৫৬ সালে পূর্বতন বিহার রাজ্যের মানভূম জেলার সদর মহকুমাটি বাংলা ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে  পুরুলিয়া জেলা নামে পশ্চিমবঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়। পুরুলিয়া হল ভারতবর্ষের পশ্চিমবঙ্গের এমন একটি জেলা যেটি ভাষা আন্দোলনের ফলে গঠিত হয়েছিল৷ ব্রিটিশ শাসনকাল থেকেই শুরু হয়েছিল জেলা ভাঙার ইতিহাস। ব্রিটিশ রাজত্বে পাঁচেট, ঝালদা, প্রভৃতি অঞ্চলগুলির জমিদার ছিল স্বাধীন। সাধারণ মানুষ তাদের রাজা হিসেবে মানতেন৷ ১৭৬৫ সালে বাংলা বিহার ওড়িষ্যার দেওয়ানি লাভ করে ব্রিটিশ সরকার। ১৭৬৭ সালে ব্রিটিশদের অনুপ্রবেশ ঘটে বাংলায়৷ বেশ কয়েক বছরপর লর্ড কর্ণওয়ালিস ‘ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তর প্রবর্তন করেন তার ফলে এই অঞ্চলগুলির ভূমি ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে৷ ধীরে ধীরে এইসব অঞ্চলে কৃষিব্যবস্থার উন্নতি হতে থাকে জঙ্গলাকীর্ণ পার্বত্য এলাকাকে এখানকার অধিবাসীরা বাসযোগ্য করে গড়ে তোলে। ব্রিটিশরা এখানকার উন্নতি দেখে সেটিকে অধিগ্রহণ করতে চায়৷ ব্রিটিশদের এই অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় এখানকার আদিবাসীরা। জমির অধিকার নিয়ে ১৭৬৭ সালে শুরু হয় ‘ চুয়াড় বিদ্রোহ ‘। চুয়াড় বিদ্রোহের ফলস্বরূপ পুরুলিয়া জেলার জন্ম হয়েছিল।

পুরুলিয়া নাম হল কিভাবে সে প্রসঙ্গে বিভিন্ন মতবাদ আছে। যেমন একটি মত অনুসারে এই নামটি সম্ভবত “পেরুয়া” বা “পেরুলা” থেকে৷ “পেরুল” একটি দ্রাবিড় শব্দ যার অর্থ ‘নদী’ বা ‘জল’। দ্রাবিড় ভাষায় “পারু” শব্দের অর্থ ‘নুড়ি’ বা ‘পাথরের চাঁই ‘ এবং “লা” বা “ওলা” শব্দের অর্থ হল ” মধ্যে “। তাহলে সব মিলিয়ে দাঁড়াল ” পুরুলিয়া ” শব্দের অর্থ- পাথুরে ডাঙার মধ্যে অবস্থিত গ্রাম বা শহর৷ এই জেলার ভূপ্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য দেখলে দেখা যাবে সত্যিই এখানকার ভূমিরূপ বন্ধুর, খাড়া পাহাড়চূড়া ও নিচু উপত্যকা নিয়ে গঠিত।

আরেকটি মত অনুসারে শুরুতেই কিন্তু পুরুলিয়া জেলার অস্তিত্ব ছিল না৷ অঞ্চলটি প্রথমে অঙ্গ বঙ্গ কলিঙ্গের মধ্যে ভাগাভাগি করে ছিল। প্রাচীন বৈদিক ও সংস্কৃত সাহিত্যে ভারতবর্ষ কখনও পাঁচভাগে কখনও সাতভাগে ভাগ করা হয়েছে। বেশীর ভাগ জায়গায় পাঁচ ভাগের কথাই লেখা। ভাগগুলি ছিল প্রাচ্য বা পূর্ব ভারত, পাশ্চাত্য বা পশ্চিম ভারত , উত্তর পশ্চিম ভারত, উত্তর ভারতের মধ্যাঞ্চল এবং দক্ষিণাপথ বা দাক্ষিণাত্য। রামায়ণ ও মহাভারতের যুগে দামোদর ও সুবর্ণরেখার নদীর মধ্যবর্তী অঞ্চলে আরও দুটি রাজ্যের উদ্ভব ঘটেছিল আগে থেকেই যাদের অস্তিত্ব ছিল। সেদুটি হল- সুক্ষ এবং তাম্রলিপ্ত।

বিশিষ্ট ঐতিহাসিক সুভাসচন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের মতে পুরুলিয়া একসময় ‘পশুভূমি’ নামে পরিচিত ছিল৷ প্রাচীন কালে পুরুলিয়ার নাম ছিল বজ্রভূমি, আটবিদে, ঝাড়িখন্ড, জঙ্গলমহল ও মানভূম। ঊনবিংশ শতাব্দীতে তেইশটি পরগনা নিয়ে গঠিত হয়েছিল এই জঙ্গলমহল জেলা৷ বর্তমান পুরুলিয়া জেলার নাম একসময় ছিল মানভূম৷ ‘মান’ হল একটি রাজবংশের নাম৷ মানভূম সিংভূম ও উড়িষ্যার কিছু অংশ জুড়ে ছিল এই রাজনংশের রাজত্ব৷ এই অঞ্চলের জনগোষ্ঠী ও স্থাননামের ক্ষেত্রে ‘মান’ শব্দের আধিক্য দেখা যায়৷ মানভূম সংক্রান্ত নামকরণের ইতিহাস ঘাঁটলে আরও জানা যায় দ্রাবিড় আদিবাসীবলা মাল মালে ও মালার নাম অনুসারে নাম হয়েছে মানভূম।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন