ধর্ম

মকর সংক্রান্তি

মকর সংক্রান্তি সারা ভারতে বিভিন্ন নামে পরিচিত। পশ্চিমবঙ্গে এটি পৌষ সংক্রান্তি নামে পরিচিত।

কারও পৌষ মাস তো কারও সর্বনাশ। অনেক শুনেছি এই প্রবাদটি আমরা ছোট থেকে। সর্বনাশের বিপরীত হিসেবে প্রবাদটিতে পৌষ মাস এর ব্যবহার দেখে মনে হয় এই পৌষ মাসে শুভ কিছুই ঘটে, যা বাঙালি  জীবনে আনন্দ নিয়ে আসে।জানুয়ারি মাস পড়া মানেই বাঙালি জীবন জুড়ে চারটি প’এর প্রভাব দেখা যায়। পৌষ, পার্বণ, পিঠে, পুলি। পৌষ পার্বণ। বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বণের সবথেকে বড় পার্বণ। বাঙালি জীবনে ‘শুভ’ পৌষ মাসকে বিদায় না দিতে চেয়ে গ্রাম বাংলায় পৌষ সংক্রান্তির আগের সারা রাত জেগে থেকে ‘পৌষ জাগানো’ এবং সংক্রান্তির দিন নানান অনুষ্ঠানকে সামগ্রিকভাবে ‘পৌষ পার্বণ’ বলে। পাস্তা পিজা খাওয়া শহুরে বাঙালি জীবনে পৌষ পার্বণের প্রভাব একটু কম হলেও প্রভাব বুঝতে আমাদের যেতে হবে গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে। পৌষ সংক্রান্তির উৎসবের মধ্যে ঘুড়ি ওড়ানো আর পিঠে পুলি তৈরি সমার্থক। যদিও শহরে ঘুড়ি ওড়ানো তুলনামূলক ভাবে কম দেখা যায়। নতুন চালের গুঁড়ো, নতুন গুড়, নারকেল আর দুধ দিয়ে তৈরি করা হয় নানা ধরনের পিঠে এই সময়।পাড়ায় পাড়ায় প্রতিবেশীরা একে অন্যকে পিঠে খাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়। এই পৌষ মাসে গ্রাম বাংলার ঘরে ঘরে নতুন ধান ওঠে, যা এক অর্থে বাঙালির কাছে ‘নবান্ন’। খেতের পাকা ধান প্রথম ঘরে ওঠা উপলক্ষে পালিত হয় এই উৎসব।এরকমই একটি উৎসব ‘আউনি বাউনি’। হেমন্তকালে আমন ধান ঘরে প্রথম তোলার প্রতীক হিসেবে কয়েকটি পাকা ধানের শিষ ঘরে এনে কিছু নির্দিষ্ট আচার অনুষ্ঠান পালন করা হয়ে থাকে এই সময়। দু’-তিনটি খড় এক সঙ্গে লম্বা করে পাকিয়ে তার সঙ্গে ধানের শিস, মুলোর ফুল, সরষে ফুল, আমপাতা ইত্যাদি বেঁধে ‘আউনি বাউনি’ তৈরি করা হয়। এই ‘আউনি বাউনি’ ধানের গোলা, খড়ের চাল, ঢেঁকি, বাক্স-প্যাঁটরায় গুঁজে দেওয়া হয়। বছরের প্রথম ফসলকে অতিপবিত্র ও সৌভাগ্যদায়ক মনে করে একটি পবিত্র ঘটে সারা বছর ধরে সংরক্ষণ করা হয়। এই আচারটিকেই ‘আউনি বাউনি’ বলা হয়। এই সময় পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাংশে ও ঝাড়খন্ডের কিছু জেলায় টুসু পরব পালিত হয়।

পৌষ সংক্রান্তি আবার মকর সংক্রান্তি নামেও পরিচিত। কিন্তু এই মকর সংক্রান্তি ব্যাপারটি কি? ধর্মীয় ব্যাখ্যা অনুসারে মকর সংক্রান্তির এই মহাতিথিতেই মহাভারতের পিতামহ ভীষ্ম শরশয্যায় ইচ্ছামৃত্যু গ্রহণ করেছিলেন। আবার অন্য মত অনুযায়ী, এই দিনই দেবতাদের সঙ্গে অসুরদের যুদ্ধ শেষ হয়েছিল। বিষ্ণুদেব অসুরদের বধ করে তাঁদের কাটা মুন্ডু মন্দিরা পর্বতে পুঁতে দিয়েছিলেন, তাই মকরসংক্রান্তির দিনই সমস্ত অশুভ শক্তির বিনাশ হয়ে শুভ শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে আজও মানা হয়ে থাকে। আবার অন্য মতে, সূর্য এ দিন নিজের ছেলে মকর রাশির অধিপতি শনির বাড়ি এক মাসের জন্য ঘুরতে গিয়েছিলেন। তাই এই দিনটিকে বাবা ছেলের সম্পর্কের একটি বিশেষ দিন হিসাবেও ধরা হয়। ডায়না এল. এক, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারত বিশেষজ্ঞের মতে, মহাভারতেও এই মকর সংক্রান্তির মেলার (কুম্ভ মেলা) উল্লেখ পাওয়া গেছে।

এতো গেল ধর্মীয় ব্যাখ্যা। এবার জ্যোতিঃবিজ্ঞান কি বলছে দেখা যাক মকর সংক্রান্তির বিষয়ে। জড় বিজ্ঞান অনুযায়ী, সূর্যের গতি দুই প্রকার, উত্তরায়ণ এবং দক্ষিণায়ণ। ২১ ডিসেম্বর সূর্য উত্তরায়ন থেকে দক্ষিণায়নে প্রবেশ করে। এ দিন রাত সবথেকে বড় হয় আর দিন সবথেকে ছোট হয়। এর পর থেকে দিন বড় আর রাত ছোট হতে শুরু করে। মাঘ থেকে আষাঢ় পর্যন্ত ছয় মাস উত্তরায়ণ। আবার শ্রাবণ থেকে পৌষ মাস পর্যন্ত ছয় মাস দক্ষিণায়ণ। পৌষ মাসের সংক্রান্তিকেই বলা হয় উত্তর সংক্রান্তি বা মকর সংক্রান্তি। শাস্ত্র মতে উত্তরায়ণে মৃত্যু হলে মুক্তি প্রাপ্তি হয় এবং দক্ষিণায়ণে মৃত্যু হলে ঘটে পুনরাবৃত্তি অর্থাৎ তাঁকে আবার সংসারে ফিরে আসতে হয়। সূর্য এ দিনই ধনু রাশি থেকে মকর রাশিতে প্রবেশ করে। এর থেকেই মকর সংক্রান্তির উৎপত্তি।

এই মকর সংক্রান্তির আবার সারা ভারতে বিভিন্ন নাম। পশ্চিমবঙ্গে যা পৌষ সংক্রান্তি নামে পরিচিত।

আসামে- ভোগালি বিহু। নতুন ওঠা ধান, উপবাস, ভোজ এবং বহ্ন্যুত্সবের মধ্যে সাড়ম্বরে পালিত হয়  ‘ভোগালি বিহু’।

তামিলনাড়ুতে- পোঙ্গল- তামিলনাড়ুর পোঙ্গল উৎসবেও সূর্যের আরাধনা করা হয়। কৃষিকাজে শক্তি সরবরাহ করেন সূর্যদেব। তাই তাঁর আরাধনা। তামিল মাস মারগাঝির শেষ দিন থেকে পরের মাস থাই-এর তৃতীয় দিন, এই চার দিন ধরে চলে উৎসব।

পঞ্জাব, হরিয়ানা, হিমাচল প্রদেশ ও জম্মুতে- লোহ্রি

কর্নাটকে– মকর সংক্রমণ  

কাশ্মীরে- শায়েন-ক্রাত

মধ্যপ্রদেশে- সুকরাত

বিহার, ঝাড়খণ্ড ও উত্তরপ্রদেশে- খিচড়ি পর্ব

গুজরাতে- উত্তরায়ণ

নেপালে- মাঘে সংক্রান্তি

তাইল্যান্ডে- সোংক্রান

কাম্বোডিয়ায়-মোহা সোংক্রান

এবং মায়ানমারে-থিংইয়ান নামে পরিচিত।

এই ভাবে মকর সংক্রান্তিতে বিভিন্ন অঞ্চলের রকমারি আচার-অনুষ্ঠান এসে মিশেছে এবং এটি একটি সর্বভারতীয় উত্সবে পরিণত হয়েছে।

  • telegram sobbanglay

২ Comments

২ Comments

  1. Arijit Banerjee

    জানুয়ারী ১৬, ২০১৮ at ২২:৩৭

    Jallikattu is not banned anymore…..kindly check it…

  2. Pingback: টুসু পরব ।। তুসু পার্বণ | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

মহা শিবরাত্রি ব্রত



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বুনো রামনাথ - এক ভুলে যাওয়া প্রতিভা



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন