ইতিহাস

সত্যচরণ লাহা

সত্যচরণ লাহা(Satya charan Laha) একজন ভারতীয় বাঙালি প্রকৃতি পর্যবেক্ষক যিনি পক্ষীবিদ হিসেবে বিখ্যাত। তিনি কলকাতা আলিপুর চিড়িয়াখানার প্রথম ভারতীয় সভাপতি, এশিয়াটিক সোসাইটি ও বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের আজীবন সদস্য ও লন্ডন জুলকজিক্যাল সোসাইটির ফেলো ছিলেন।

১৮৮৮ সালে উত্তর কলকাতার কৈলাস বসু স্ট্রিটের বিখ্যাত লাহা পরিবারে সত্যচরণ লাহার জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম অম্বিকাচরণ লাহা এবং মা কিরণবালা দেবী। কলকাতার এই লাহা পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা দুর্গাচরণ লাহার ভাই জয়গোবিন্দ লাহার পৌত্র ছিলেন সত্যচরণ লাহা।

উত্তর কলকাতার বিখ্যাত দুই শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান মেট্রোপলিটন কলেজ এবং প্রেসিডেন্সি কলেজের ছাত্র ছিলেন সত্যচরণ লাহা। ইতিহাস নিয়ে সত্যচরণ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। এছাড়াও আইন বিষয়ে পড়াশোনা করে তিনি বি.এল ডিগ্রি অর্জন করেন। ইতিহাস এবং আইন পড়ার ফাঁকে ফাঁকে তিনি প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করতেন, পাখিদের জীবনযাপন লক্ষ্য করতেন গভীর অনুধ্যানে। প্রকৃতিকে দেখা,পাখিদের দেখাই যেন ছিল তাঁর নেশা। ভারতের এবং আরো অন্যান্য দেশের বিভিন্ন ধরনের পাখি সম্পর্কে সত্যচরণের আগ্রহ জন্মেছিল ছাত্র থাকাকালীন। পরে সেই আগ্রহই তাঁকে বিশ্বের দরবারে পরিচিতি দেবে।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


সত্যচরণ লাহার প্রথাগত কর্মজীবন শুরু হয় ইণ্ডিয়ান স্ট্যাটিস্টিক্যাল ইন্সটিটিউট তথা আই.এস.আই-তে কোষাধ্যক্ষ হিসেবে। কিন্তু শুধু কোষাধ্যক্ষের চাকরিতেই নিজেকে সীমায়িত রাখেননি সত্যচরণ। ফলে তাঁর কর্মজীবনের বেশিরভাগটাই গড়ে উঠেছে পাখিদের নিয়ে গবেষণায়। দেশ-বিদেশের পাখি দেখার এই তীব্র আগ্রহের জন্য নানা সময় তাঁকে বহু জীবন বিপন্নকারী পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়েছে। তবু তিনি হাল ছাড়েননি। ১৯২৮ সালে বহু প্রজাতির পাখি সংগ্রহ করে সত্যচরণ লাহা কলকাতার কাছে আগরপাড়ায় একটি পাখি নিকেতন গড়ে তুলেছিলেন। সাধারণত খাঁচার বাইরেই পাখিকে পর্যবেক্ষণ করতে তিনি ভালোবাসতেন। এছাড়াও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে কোনো পাখিকে পোষ মানানোর পদ্ধতি বের করেছিলেন তিনি। খাঁচার বাইরে অরণ্যে উন্মুক্ত প্রকৃতির মধ্যে স্বাভাবিক অবস্থাতেও তিনি পাখিদের পর্যবেক্ষণ করতেন, হাতে নিয়ে বা খাঁচার মধ্যে পাখিকে বন্দী করে তার আচরণ সম্পর্কিত পর্যবেক্ষণ করতে পছন্দ করতেন না তিনি। অরণ্যে-জঙ্গলে তিনি যে সব পাখিদের দেখতে পেতেন তাদের আচার-আচরণ, দৈহিক বৈশিষ্ট্য, বাসা বানানোর পদ্ধতি, সন্তান পালনের ধরন এই সবই তিনি খাতায় নোট করে রাখতেন। পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা থাকতো তাঁর সেই নোটগুলিতে। তাঁর সেই সুচিন্তিত ও বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধগুলি দেশ-বিদেশের নামীদামী পত্র-পত্রিকায়, পিয়ার রিভিউড জার্নালে প্রকাশ পেয়েছে। সেইসব পত্রপত্রিকার মধ্যে ‘বম্বে জার্নাল অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি’, ‘এভিকালচার’ বা ‘ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ এভিয়ান সায়েন্স (আইবিস)’ অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য। আর বাংলার পত্র-পত্রিকাগুলির মধ্যে ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘মর্ম্মবাণী’ ইত্যাদিতে সরল বাংলায় তিনি পাখি বিষয়ক তথ্যসমৃদ্ধ লেখাগুলি লিখতেন। তিনি নিজেও ‘প্রকৃতি’ শিরোনামের একটি বিজ্ঞানবিষয়ক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চার প্রসার ঘটানোর জন্য এবং বলা ভালো বিজ্ঞানকে আপামর বাঙালি জনমানসে জনপ্রিয় করে তোলার জন্য তিনি এই পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত পরিভাষা নিয়ে বরাবরই বহু দুর্বলতা আছে। সত্যচরণ লাহার এই ‘প্রকৃতি’ পত্রিকা বাংলায় বিজ্ঞানবিষয়ক পরিভাষা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। এই বিজ্ঞান পত্রিকায় বাংলা পরিভাষা বিষয়ে একেন্দ্রনাথ দাস ঘোষ, জ্ঞানেন্দ্রনারায়ণ রায়, উমাপতি বাজপেয়ী প্রমুখদের নানাবিধ প্রবন্ধ প্রকাশিত হত। সত্যচরণ লাহা নিজেও বেশ কিছু বিজ্ঞানবিষয়ক প্রবন্ধ লিখতেন এই পত্রিকায়। শুধু প্রবন্ধই নয় এই পত্রিকায় বিজ্ঞানের নানা ছবিও ছাপা হত। বাংলা ভাষায় বিজ্ঞানচর্চার প্রয়াসী বিখ্যাত কিছু মানুষ যেমন চারুচন্দ্র ভট্টাচার্য্য, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, শ্রী বিনয় কুমার সরকার, শ্রী শিবনাথ সেন কবিরত্ন প্রমুখদের প্রবন্ধ প্রকাশিত হত এখানে।

সত্যচরণ লাহার বিজ্ঞানবিষয়ক লেখালিখির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ১৯২১ সালে প্রকাশ পায় তাঁর ‘পাখীর কথা’ নামক গ্রন্থটি। ১৯৩৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর অন্যতম শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ ‘কালিদাসের পাখী’। এছাড়া তাঁর ‘জলচারী’ বইটি প্রকাশ পায় ১৯৩৫ সালে। এই বইগুলি সবই বাংলা ভাষায় লেখা পাখি বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ বই। ‘পাখীর কথা’ বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন মহামহোপাধ্যায় পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। এই বইতে বিভিন্ন দেশের প্রাচীনকাল থেকে পক্ষী পালন প্রথার যে বিবর্তন ও রকমফের তা বর্ণনা করেছেন তিনি এবং একইসঙ্গে পাখি কোথায় পোষা ভালো – খাঁচায় নাকি মুক্ত অরণ্যে তা নিয়ে বিশ্লেষণী মত প্রকাশ করেছেন। পাখি পুষতে গেলে তার খাঁচা কেমন হওয়া উচিত, পাখির জীবনচক্রের নানা দিক সম্পর্কে এই বইতে সত্যচরণ লাহা পাঠকদের অবগত করাতে চেয়েছেন। আর সবথেকে আশ্চর্যের বিষয় এই যে কালিদাসের রচনাসম্ভারকে যে পক্ষী বিজ্ঞানের দৃষ্টি দিয়ে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে তা সত্যচরণ লাহা প্রমাণ করেছেন তাঁর কালিদাসের বিহঙ্গ-তত্ত্বে যা পরে ‘কালিদাসের পাখী’ নামে বই হিসেবে প্রকাশ পায়। ‘মেঘদূত’, ‘ঋতুসংহার’, ‘রঘুবংশ’ ও ‘কুমারসম্ভব’ ইত্যাদি কাব্যে উল্লিখিত চক্রবাক, হিরণ্যহংস, হারীত, শিখী, পারাবত, চাতক ইত্যাদি পাখিদের সুনিপুণ বৈশিষ্ট্যসহ বর্ণনা দিয়েছেন তিনি। ‘প্রকৃতি’ পত্রিকায় তাঁর ‘মহাভারতের পাখী’, ‘অতিকায় সরীসৃপ’ ইত্যাদি প্রবন্ধ এবং ‘হংস’, ‘পাখীর বাসা’ নামের ধারাবাহিক রচনা প্রকাশ পেয়েছিল।

পুরুলিয়া জেলার পাখিদের নিয়ে সত্যচরণ লাহা সাহিত্য পরিষদ পত্রিকায় ‘পুরুলিয়ার পাখী’ নামে একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ লিখেছিলেন। মনে রাখতে হবে পুরুলিয়ায় পাখিদের জন্য একপ্রকার প্রাকৃতিক অভয়ারণ্যের পরিবেশ রয়েছে যেখানে তাঁর পাখি পর্যবেক্ষণের বিশেষ সুবিধে ছিল। ইংরাজি ভাষায় সত্যচরণ লাহা বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণামূলক প্রবন্ধ রচনা করেন শুধুমাত্র পাখিদের বিষয়ে। ১৯৩৫ সালে আইবিস পত্রিকায় তিনি লেখেন ‘Note on the Occurance of some hitherto unrecorded Birds in Central and South Bengal’। আবার ঐ একই পত্রিকায় ১৯২৪ সালে সত্যচরণ লাহা লেখেন ‘Some Observations on Pyrrhulauda grisea’ শীর্ষক একটি প্রবন্ধ। সবশেষে উল্লেখ করতে হয় কলকাতা ও সিমলার থ্যাকার, স্পিঙ্ক অ্যাণ্ড কোম্পানি নামক প্রকাশনা থেকে ‘Pets Of Bengal’ নামে তাঁর একটি অত্যন্ত স্মরণযোগ্য বইয়ের কথা। এই বইয়ের প্রস্তাবনা লিখেছিলেন ‘এভিকালচার’ পত্রিকার সম্পাদক ড. গ্রাহাম রেনশ আর বইয়ের অলংকরণ করেছিলেন এন. কুশারী। বাংলার পাখিদের বিষয়ে এই বইটি পক্ষীতত্ত্বের মৌলিকত্ব ও স্বাতন্ত্র্যে সমুজ্জ্বল।

সারাজীবন ধরে পাখিদের নিয়ে নিরন্তর গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে বিভিন্ন বিখ্যাত দেশীয় ও বৈদেশিক সংস্থা থেকে উপাধি ও সম্মান পেয়েছেন সত্যচরণ লাহা। ইংল্যাণ্ডের বিখ্যাত ‘লণ্ডন জুলজিকাল সোসাইটি’র ফেলোশিপ পেয়েছিলেন তিনি। এছাড়া কলকাতার এশিয়াটিক সোসাইটি এবং বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের আজীবন সদস্যপদ ছিল তাঁর। ১৯৩৬ সালে ভারতের ইণ্ডিয়ান ন্যাশনাল একাডেমির ফেলো হিসেবে নির্বাচিত হন সত্যচরণ লাহা। আর সবথেকে গর্বের বিষয় হল কলকাতার আলিপুর চিড়িয়াখানার প্রথম ভারতীয় সভাপতি ছিলেন তিনি। ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ অরনিথোলজিস্ট ইউনিয়নের সদস্যপদও লাভ করেন সত্যচরণ লাহা।

১৯৮৪ সালের ১১ ডিসেম্বর সত্যচরণ লাহার মৃত্যু হয়।

তথ্যসূত্র


  1.  ‘বিস্মৃতপ্রায় বাঙালি বিজ্ঞানী’,রণতোষ চক্রবর্তী, আগরতলা জ্ঞান বিচিত্রা, ২০০৫, পৃষ্ঠা ৯৫-৯৬
  2. https://bigganpotrika.com/
  3. https://www.literacyparadise.com/
  4. https://en.wikipedia.org/
  5. https://www.anandabazar.com/
  6. https://archive.org/

3 Comments

3 Comments

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে জানা-অজানা তথ্য


নেতাজী

ছবিতে ক্লিক করে দেখুন এই তথ্য