ইতিহাস

সরলা দেবী চৌধুরানী

সরলা দেবী চৌধুরানী (Sarala Devi Chaudhurani) ছিলেন একজন খ্যাতনামা ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামী।  ভারতের প্রথম মহিলা সংগঠন ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল প্রতিষ্ঠা তাঁর হাত ধরেই হয়েছিল। সম্ভবত বাংলা থেকে ভারতীয় স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদানকারী প্রথম মহিলা ছিলেন তিনি। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় রচিত “বন্দেমাতরম” গানটির সুর সরলা দেবীই তৈরি করেছিলেন।

১৮৭২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর কলকাতার জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে সরলা দেবী চৌধুরানীর জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম জানকীনাথ ঘোষাল এবং মায়ের নাম স্বর্ণকুমারী দেবী। জানকীনাথ বেঙ্গল কংগ্রেসের (Bengal Congress)  সেক্রেটারি ছিলেন এবং কংগ্রেসের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। স্বর্ণকুমারী দেবী ছিলেন একজন প্রখ্যাত সাহিত্যিক। সরলা দেবীর দাদু ছিলেন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং ছোটমামা ছিলেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সরলা দেবী চৌধুরানীর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়  বেথুন স্কুলে। ১৮৮৬ সালে তিনি  এন্ট্রান্স পরীক্ষা পাস করেন এবং বেথুন কলেজে এবং তারপর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৮৯০ সালে তিনি ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পাস করেন এবং পদ্মাবতী গোল্ড মেডেল লাভ করেন। সেই সময় যে কজন মহিলা স্নাতক স্তরে পড়াশোনা করেছিলেন সরলা তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন। একটি সূত্রে বলা হয়েছে তিনি কিছুদিনের জন্য তাঁর ভাইদের সাথে বিজ্ঞানও পড়ে ছিলেন যেখানে তাঁর শিক্ষক ছিল স্বনামধন্য চিকিৎসক মহেন্দ্রলাল সরকার।

পড়াশোনা  শেষ করে সরলা দেবী  কলকাতা ছেড়ে মহীশুরে ছেড়ে চলে যান । সেখানেই সরলার দেবীর কর্মজীবন শুরু হয়  মহারানী গার্লস স্কুলে শিক্ষকতার মাধ্যমে। জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি  নারীদের মধ্যে তিনিই প্রথম  যিনি বাইরে গিয়ে চাকরি করেছিলেন। এক বছর পর তিনি আবার কলকাতায় ফিরে আসেন  এবং ‘ভারতী’ পত্রিকায় লেখালেখি শুরু করেন এবং এই সময় থেকেই তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের সাথে জড়িয়ে পড়েন। সরলা দেবী সম্ভবত প্রথম বাঙালি নারী ছিলেন যিনি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে যোগদান করেছিলেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় এরপরে আরও অনেক মহিলা এই আন্দোলনে যোগদান করেন। তিনি মনে করতেন একমাত্র আগ্রাসন এবং অস্ত্রের দ্বারাই ব্রিটিশ শাসন নির্মূল করা যাবে।

১৮৯৫ সাল থেকে তিনি তাঁর মা স্বর্ণকুমারী দেবীর সাথে যুগ্মভাবে ভারতী পত্রিকা সম্পাদনা করতে শুরু করেন। ১৮৯৯ থেকে ১৯০৭ অবধি তিনি এককভাবে এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন। সেই সময় ভারতী পত্রিকা ছিল বাংলা সাহিত্যের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পত্রিকা। এই পত্রিকাকে  সরলা দেবী স্বাধীনতা সংগ্রামে একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহার করেছিলেন। তখনকার সময়ের মহিলাদের দ্বারা সৃষ্টি করা হস্তশিল্পকে আরও উজ্জীবিত এবং অনুপ্রাণিত করার জন্য ১৯০৪ সালে তিনি কলকাতার বউবাজার এলাকায় ‘লক্ষ্মী ভান্ডার’ নামক একটি সংস্থা গড়ে তোলেন।

১৯১০ সালে তিনি ভারত স্ত্রী মহামন্ডল (All India Women’s Organization) নামক আরেকটি সংস্থা তৈরি করেন। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন এটিই ভারতের প্রথম সর্বভারতীয় সংস্থা যেটি শুধুমাত্র নারীদের জন্য তৈরি হয়েছিল। এটির কর্মকাণ্ড সারা দেশজুড়ে ছড়িয়ে ছিল। নানা রাজ্যে এর শাখা বিস্তৃত ছিল যেমন দিল্লি, করাচি, হায়দ্রাবাদ, অমৃতসর, লাহোর, এলাহাবাদ, কানপুর ইত্যাদি। জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এই সংস্থায় নারীদের শিক্ষা দেওয়া হত এবং হাতের কাজ শেখানো হত। এই সময় তিনি স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য একটি গুপ্ত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই প্রতিষ্ঠানের সাথে সেই সময় অনেক তরুণ বিপ্লবীরা যুক্ত ছিলেন। স্বাধীনতা সংগ্রামের উপর তিনি একটি বইও লেখেন, যার নাম ছিল ‘অহিতাঙ্গিকা’।

সরলা দেবী একজন দক্ষ সংগীতশিল্পীও ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের অনেক গানের সুরের খসড়া তিনি তৈরি করে দিয়েছিলেন। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের রচিত “বন্দেমাতরম” গানটির সুর সরলা দেবী তৈরি করেছিলেন। সেই সময় এই গানটি স্বাধীনতা আন্দোলনের মন্ত্র হয়ে ওঠে। বর্তমানে এই গানটি ভারতের জাতীয় স্তোত্র। এ ছাড়াও বহু দেশাত্মবোধক গান তিনি লিখেছিলেন ও সুরারোপ করেছিলে।

১৯০৫ সালের ১০ অক্টোবর পারিবারিক চাপে পড়ে তেত্রিশ বছর বয়সে সরলা দেবী রামভূজ দত্ত চৌধুরীকে বিয়ে করতে  বাধ্য হন। রামভূজ একজন আইনজীবী, সাংবাদিক এবং স্বাধীনতা সংগ্রামী ছিলেন। তিনি দয়ানন্দ সরস্বতীর দ্বারা নির্মিত আর্য সমাজের একজন সদস্য ছিলেন। বিয়ের পর সরলা দেবী পাঞ্জাবে চলে যান এবং সেখানে তাঁর স্বামীকে উর্দুতে প্রকাশিত জাতীয়তাবাদী সাপ্তাহিক কাগজ ‘হিন্দুস্তান’ সম্পাদনা করতে সাহায্য করেন। এই কাগজটি পরে ইংরেজিতে প্রকাশিত হয়। এখানে তিনি বিধবাদের জন্য ‘বিধবা শিল্পাশ্রম’  তৈরি করেন  যেখানে বিধবাদের  পড়াশোনা শেখানো হত এবং  অন্যান্য কাজও শেখানো হত  যার দ্বারা তাঁরা  স্বনির্ভর হতে পারেন।

অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য রামভূজকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে। সেই সময় মহাত্মা গান্ধী তাঁদের পাঞ্জাবের বাড়িতে অতিথি হিসেবে যান। এরপরই গান্ধী এবং সরলা দেবীর মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ একটি সম্পর্ক গড়ে ওঠে। সরলা দেবী গান্ধীজীর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। ভবিষ্যতে সরলা দেবীর একমাত্র সন্তান দীপক গান্ধীজীর নাতনি রাধাকে বিয়ে করেন। সরলা দেবীর সাথে সেই সময়কার বহু স্বাধীনতা সংগ্রামীর যোগাযোগ ছিল যাঁদের চিন্তাভাবনা তাঁকে খুব প্রভাবিত করেছিল। এও শোনা যায় যে স্বামী বিবেকানন্দ সরলা দেবীকে বলেছিলেন বিদেশে গিয়ে নারী স্বাধীনতা সম্বন্ধে সেখানকার মানুষকে সচেতন করতে। কিন্তু নানা কারণে তা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। যদিও তিনি সারা ভারতবর্ষ ঘুরে নানা জায়গায় স্বাধীনতা আন্দোলন সম্পর্কে বক্তৃতা দিয়েছিলেন। স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহারের জন্য তিনি সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন।

একটা সময় তিনি নেতাজী সুভাষচন্দ্র বোসের দ্বারাও খুব প্রভাবিত হয়েছিলেন যার ফলে তাঁর গান্ধীবাদী স্বামীর সাথে তাঁর মতৈক্য তৈরি হয়। এছাড়াও আরও নানা সমস্যার কারণে তিনি তাঁর স্বামীর থেকে আলাদা হয়ে যান। এরপর তিনি বেশ কিছুদিন একটি আশ্রমেও ছিলেন।

১৯২৩ সালে স্বামীর অসুস্থতার খবর পেয়ে সরলা দেবীর তাঁর সেবা-শুশ্রূষা করার জন্য মুসৌরিতে চলে যান। সেই বছরই তাঁর স্বামী  মারা যান। এরপর তিনি হিন্দুস্তান পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব বেশকিছুদিন একাই বহন করেন। এই সময় থেকেই তিনি নানান সামাজিক কাজ এবং আধ্যাত্মিকতার সাথে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৩০ সালে তিনি আবার কলকাতায় ফিরে এসে আবার ভারতী পত্রিকার সম্পাদনার কাজ শুরু করেন।১৯৩০ সালে তিনি কলকাতায় মেয়েদের জন্য একটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত করেন। এই স্কুলের নাম ছিল শিক্ষা সদন। ১৯৩৫ সালের পর তিনি জনজীবন থেকে অবসর নিয়ে আধ্যাত্মিক জীবনে প্রবেশ করেন এবং বৈষ্ণব গুরুদেব বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীর দ্বারা দীক্ষিত হন। ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৪৩ সালের মধ্যে দেশ পত্রিকায় সরলা দেবীর আত্মজীবনী ‘জীবনের ঝরাপাতা’ প্রকাশিত হয়। এই বইটি পরে নানা ভাষায় অনূদিত হয়।

সরলা দেবীর ১৯৪৫ সালের ১৮ আগস্ট তিয়াত্তর বছর বয়সে মৃত্যু হয়।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।