ইতিহাস

জন লেনন

জন লেনন (John Lennon) একজন বিখ্যাত ইংরেজ গায়ক, গীতিকার এবং সুরকার যিনি ছিলেন বিখ্যাত ইংরেজ গানের ব্যান্ড ‘বিটলস’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং এই ব্যান্ডের সহ-প্রধান কণ্ঠশিল্পী, সহ গীতিকার এবং রিদম গিটারিস্ট। গীতিকার পল ম্যাককার্টনির সাথে তাঁর রচিত গানগুলি ইতিহাসে চির ভাস্বর হয়ে আছে।

১৯৪০ সালের ৯ অক্টোবর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের লিভারপুল শহরের এক হাসপাতালে জন লেননের জন্ম হয়। তাঁর পুরো নাম ছিল জন উইনস্টন লেনন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন তাঁর জন্ম বলে ব্রিটেনের জাতীয় নেতা উইনস্টন চার্চিলের নামানুসারে এই নামকরণ করা হয়। জনের বাবার নাম আলফ্রেড লেনন এবং মায়ের নাম ছিল জুলিয়া লেনন। আলফ্রেড ছিলেন একজন নাবিক। এই পেশার কারণে তাঁকে প্রায়ই বাড়ি থেকে দূরে দূরে থাকতে হত। জনের যখন চার বছর বয়স, তখন তাঁর বাবা-মায়ের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ হয়ে যায় এবং মা জুলিয়া অন্য একজনকে বিবাহ করেন। জন বড় হতে থাকেন তাঁর মাসি মিমি স্মিথের কাছে। কিন্তু মায়ের সঙ্গে জনের যোগাযোগ কখনো বন্ধ হয়ে যায়নি। পরবর্তী জীবনে জনের বিবাহ হয় সিনথিয়া পাওয়েল নামে এক মহিলার সঙ্গে। জুলিয়ান নামে একটি পুত্র জন্ম হয়। কিন্তু কয়েক বছর পরেই তাঁদের বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে গেলে জন লেনন আবার ইয়োকো ওনো নামে এক জাপানি মহিলাকে বিবাহ করেন। এই দম্পতির সিন নামে একটি পুত্র ছিল।

জনের প্রাথমিক পড়াশোনা শুরু হয় ডোভডেল প্রাইমারি স্কুলে। এখানকার পড়াশোনা শেষ করে তিনি ১৯৫২ সালে ভর্তি হন কোয়্যারি ব্যাঙ্ক হাই স্কুলে। জন ছিলেন একজন হাসিখুশি এবং প্রাণবন্ত বালক। তিনি মাঝে মাঝে হাস্যকর ব্যঙ্গচিত্র আঁকতেন, যেগুলি তাঁর নিজের প্রকাশিত স্কুল-ম্যাগাজিনে ‘ডেইলি হাউল’ নামে প্রকাশিত হত।

জনের বাবা ও মা দুজনেই ব্যাঞ্জো বাজাতে জানতেন। তাঁদের কাছেই ছোট্ট জন ব্যাঞ্জো বাজাতে শেখেন। ১৯৫৬ সালে জনের মা তাঁকে প্রথমবার গিটার কিনে দিয়েছিলেন। এটি ছিল একটি সস্তা গ্যালোটোন চ্যাম্পিয়ান। জনের মাসি মিমি গানবাজনা পছন্দ না করায় এই গিটারটি জনের নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এই বছরই জন কোয়্যারি ব্যাঙ্ক হাই স্কুলের নামানুসারে একটি আমেরিকান লোকসঙ্গীতের দল ‘কোয়্যারিম্যান’ প্রতিষ্ঠা করেন। জনের অনুরোধে তাঁর বন্ধু পল ম্যাককার্টনি এই দলে যোগদান করেন।

১৯৫৮ সালের ১৫ই জুলাই জনের মা জুলিয়া গাড়ি দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। মায়ের মৃত্যু কিশোর জনকে প্রবল আঘাত করে। তিনি এই শোক ভুলতে মদ্যপানে ডুবে যান। পরবর্তী দুই বছর তিনি এইভাবেই নেশায় ডুবে থাকেন এবং অন্ধ রাগ থেকে ঘন ঘন মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। মা জুলিয়ার স্মৃতি আজীবন তাঁর জীবনে একটি অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছিল। হাই স্কুলে জনের পরের বছরগুলিতে তাঁর আচরণে অনেক পরিবর্তন আসে। খারাপ ব্যবহারের জন্য মাসি মিমির সঙ্গেও তাঁর দূরত্ব তৈরি হয়। জন ও-লেভেলের পরীক্ষায় অকৃতকার্য হন এবং মাসি ও স্কুলের প্রধান শিক্ষকের হস্তক্ষেপে ভর্তি হন লিভারপুল কলেজ অফ আর্ট-এ। এখানে তিনি টেডি বয়-এর পোশাক পড়তেন। কিন্তু খারাপ আচরণের জন্য কলেজ শেষ হওয়ার আগেই তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছিল।

বন্ধু ম্যাককার্টনির বাবা তাঁদের বাড়িতে ‘কোয়্যারিম্যান’-এর মহড়ার জন্য অনুমতি দেন। জর্জ হ্যারিসন গিটারিস্ট রূপে এই দলে আসেন। এই সময়েই জন তাঁর প্রথম গানটি লিখেছিলেন, যেটি ছিল ‘হ্যালো লিটল গার্ল’। আর্ট কলেজে লেননের বন্ধু স্টুয়ার্ট স্যাটক্লিফ পরে বাদক হিসেবে এই দলে যোগ দেন। ১৯৬০ সালের প্রথমদিকে চার বন্ধু তাঁদের দলটির নাম পরিবর্তন করে রাখেন ‘দ্য বিটলস’। সেই বছরের আগস্ট মাসে বিটলস হামবুর্গে একটি ৪৮ রাতের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করে। তাঁদের একটি ড্রামবাদকের প্রয়োজন থাকায় পিট বেস্ট এই দলে যোগদান করেন। এই অনুষ্ঠানের পর ১৯৬১ ও ১৯৬২ সালে বিটলসের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অনুষ্ঠান হয়। হামবুর্গে থাকার সময়ই জন অন্য ব্যান্ডের শিল্পীদের মতো ‘পেলুড্রিন’ নামে একটি ড্রাগে আসক্ত হন এবং লম্বা অনুষ্ঠান চলাকালীন এটিকে গ্রহণ করতে থাকেন।

স্যাটক্লিফ হামবুর্গে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর বিটলসে নতুন সদস্য হয়ে আসেন রিঙ্গো স্টার। ১৯৬২ সালের অক্টোবরে মুক্তি পায় বিটলসের প্রথম একক সঙ্গীত ‘লাভ মি ডু’। ১৯৬৩ সালে আসে তাঁদের প্রথম অ্যালবাম ‘প্লিজ প্লিজ মি’। দুটি উপস্থাপনাই জনপ্রিয়তা পায়। ১৯৬৩ সালের প্রথমদিকে বিটলস মূলধারার সাফল্য অর্জন করে। যুক্তরাষ্ট্রের ব্রিটিশ রাজকর্মচারীদের আয়োজিত অনুষ্ঠান ‘রয়্যাল ভ্যারাইটি শো’-তে অংশগ্রহণ করে তারা। এক বছর পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘দ্য এড সুলেভান শো’তে আত্মপ্রকাশ করে বিটলস জনপ্রয়তার শিখরে ওঠে। এই সময় গান রচনার পাশাপাশি জন দুটি বই লিখেছিলেন, ‘ইন হিজ ওন রাইট’ এবং ‘দ্য স্প্যানিয়ার্ড ইন দ্য ওয়ার্কস’। ১৯৬৫ সালে বিটলস ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানের থেকে স্বীকৃতি লাভ করে এবং ‘অর্ডার অফ দ্য ব্রিটিশ এম্পায়ার’-এর সদস্য নিযুক্ত হয়।

এরপর আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি বিটলসকে। একের পর এক মুক্তি পেটে থাকে বিভিন্ন অ্যালবাম। এদের মধ্যে কয়েকটি হল, ‘হেল্প!’, ‘রিভলভার’, ‘এ হার্ড ডেস নাইট’, ‘রাবার সোল’, ‘ম্যাজিকাল মিস্ট্রি ট্যুর’, ‘এ ডলস হাউস’, ‘সামথিং নিউ’, ‘উইথ দ্য বিটলস’, ‘মিট দ্য বিটলস’, ‘বিটলস ফর সেল’ প্রভৃতি। মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তুমুল জনপ্রিয়তা পায় অ্যালবামগুলি। জনতার মুখে মুখে ফিরতে থাকে বিটলস তথা জন লেননের নাম। যেখানেই যুদ্ধ, দাঙ্গা, বর্ণবিদ্বেষের মতো ঘটনা ঘটেছে, গানের মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছেন জন। ক্রমশ প্রতিবাদী তরুণসমাজের মুখপাত্র হয়ে উঠছিলেন জন। মাটির কাছাকাছি আসার জন্য নিজের প্রাসাদোপম বাড়ি ছেড়ে বাস করেছেন কবিদের আস্তানা ‘গ্রিনউইচ ভিলেজ’-এ।

কিন্তু ১৯৭০-এ এসে বিটলসের জয়যাত্রা থেমে যায়। দলের অন্দরে শুরু হয় ব্যক্তিত্বের সংঘাত। নিজের মতো করে কাজ করতে চেয়ে দল ছেড়ে বেরিয়ে যান জন। তারপরই ভেঙে যায় ‘বিটলস’, ব্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে বাণিজ্যসফল দল। বিটলস ভেঙে যাওয়ার পর জন একক সঙ্গীতশিল্পী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। ১৯৭০ সাল থেকে তাঁর অনেকগুলি একক সঙ্গীতের অ্যালবাম মুক্তি পেয়ে ছিল। এর মধ্যে কয়েকটি হল, ‘ইমাজিন’, ‘মাইন্ড গেমস’, ‘ওয়ালস’ অ্যান্ড ব্রিজেস’, ‘রক এন রোল’ প্রভৃতি। দ্বিতীয় স্ত্রী ইয়োকো ওনোর সঙ্গেও তিনি কয়েকটি গান গেয়েছিলেন। এই অ্যালবামগুলি হল, ‘ইয়োকো ওনো/প্লাস্টিক ওনো ব্যান্ড’, ‘আনফিনিশড মিউজিক নাম্বার ওয়ান: টু ভার্জিনস’, ‘আনফিনিশড মিউজিক নাম্বার টু: লাইফ উইথ দ্য লায়ন্স’, ‘ওয়েডিং অ্যালবাম’, ‘সাম টাইমস ইন নিউ ইয়র্ক সিটি’, ‘ডাবল ফ্যান্টাসি’ ইত্যাদি।
শুধু গায়ক বা গীতিকার নয়, জনের অপর একটি পরিচয় হল, তিনি অনেক চলচ্চিত্রে অভিনয় ও সঙ্গীত পরিচালনাও করেছেন। জনের অভিনীত কয়েকটি ছবি হল, ‘এ হার্ড ডেস নাইট’, ‘লেট ইট বি’, ‘ইমাজিন’ ‘হেল্প!’ প্রভৃতি। জন তথা বিটলস সঙ্গীত পরিচালনা করেছিলেন এমন কয়েকটি ছবি হল, ‘দ্য বিটলস: এইট ডেস এ উইক’, ‘জন নেকেড’, ‘আই ওয়ানা হোল্ড ইওর হ্যান্ড’, ‘ইমাজিন’ প্রভৃতি। জন লেননের জীবনকথা নিয়েও তৈরি হয়েছে একাধিক সিনেমা। যেমন, ‘ইন হিজ লাইফ: দ্য জন লেনন স্টোরি’, ‘জন অ্যান্ড ইয়োকো: অ্যাবাভ আস অনলি স্কাই’, ‘জন অ্যান্ড ইয়োকো: দ্য লাভ স্টোরি’, ‘দ্য কিলিং অফ জন লেনন’, ‘চ্যাপ্টার ২৭ ‘, ‘নো হোয়্যার বয়’ প্রভৃতি।

সারাজীবনে অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মানে ভূষিত হয়েছেন জন লেনন। সঙ্গীত পত্রিকা ‘নিউ মিউজিকাল এক্সপ্রেস’ প্রদত্ত পুরস্কার (NME awards) পেয়েছেন একাধিকবার। ‘ডাবল ফ্যান্টাসি’ অ্যালবামের জন্য পেয়েছেন ‘গ্র্যামি পুরস্কার’ ও ‘জুনো পুরস্কার’। সারাজীবনের অবদানের জন্যও পেয়েছেন ‘গ্র্যামি পুরস্কার’। এছাড়াও এই পুরস্কারের জন্য তিনি অনেকবার মনোনীত হয়েছিলেন। বিভিন্ন আলাদা আলাদা অ্যালবামের জন্য অনেকবার পেয়েছেন ‘বি.এম.আই টিভি মিউজিক অ্যাওয়ার্ড’। ‘আই ওয়ান্ট টু হোল্ড ইওর হ্যান্ড’ এবং ‘ অ্যাক্রস দ্য ইউনিভার্স’ গানের জন্য পেয়েছেন ‘ও.এফ.টি.এ ফিল্ম অ্যাওয়ার্ড’। পেয়েছেন ‘স্টার অফ দ্য ওয়াক অফ ফেম’ পুরস্কার। ‘বিটলস’-এর জন্য পেয়েছেন রঙিন দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার ‘অস্কার’ও।

১৯৮০ সালের ৮ ডিসেম্বর রাতে একটি অনুষ্ঠান থেকে ফেরার সময় মার্ক চ্যাপম্যান নামে এক আততায়ী জন লেননকে পিছন থেকে গুলিবিদ্ধ করে। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে চিকিৎসকেরা জনকে মৃত ঘোষণা করেন। নিউ ইয়র্কের হার্টসডেলের ফার্নক্লিফ কবরস্থানে তার দেহাবশেষ দাহ করা হয়। স্ত্রী ওনো নিউ ইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্কে তাঁর চিতাভস্ম ছড়িয়ে দেন। সেখানে পরবর্তীকালে জন লেননের স্মৃতিতে গড়ে ওঠে ‘স্ট্রবেরি ফিল্ডস মেমোরিয়াল’।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন