ইতিহাস

মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়

পঞ্চাশের দশক নাগাদ বাংলা চলচ্চিত্রের সঙ্গীত জগতে যে আধুনিকতার ঢেউ এসেছিল তার অন্যতম কারিগর ছিলেন  মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। সুরের ভুবনে কেবল চলচ্চিত্র জগতেই নিজের প্রতিভার ছাপ রাখেননি তিনি, কীর্তন থেকে নজরুলগীতি সব আঙিনাতেই তাঁর ছিল অনায়াস পায়চারী।

১৯৩১ সালের ১১ই আগস্ট কলকাতায় জন্ম মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের। বাবা অতুলচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ছিলেন আর্কিটেকচারাল ইঞ্জিনিয়ার। মানবেন্দ্ররা ছিলেন সব মিলিয়ে দশ ভাই। গানবাজনা ছিল পরিবারে বহুকালের সঙ্গী। মানবেন্দ্রের বাবা এস্রাজ বাজাতেন। কাকা রত্নেশ্বর মুখোপাধ্যায় ছিলেন বিখ্যাত কীর্তনীয়া। কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে এনার বিশেষ সখ্যতা ছিল। কিশোর মানবেন্দ্রর কীর্তনে মুগ্ধ হয়ে নজরুল নিজে দু’টি গান শিখিয়ে দিয়েছিলেন — ‘সখী সাজায়ে রাখ লো পুষ্পবাসর’ আর ‘হে মাধব হে মাধব’। কাকা সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায় ও  মনোজেশ্বর মুখোপাধ্যায় দুজনেই ছিলেন মার্গ সঙ্গীতের ভক্ত। আরেক কাকা সত্যেশ্বর মুখোপাধ্যায় অবশ্য সব ধরনের গানেই অনুরক্ত ছিলেন। মানবেন্দ্রের ঠাকুর্দা ছিলেন গজেন্দ্রনাথ। তিনিও ভীষণ সঙ্গীত-রসিক মানুষ ছিলেন। থাকতেন রজনীকা‌ন্ত সেনের সঙ্গে এক মেসে।

১৯৫০-এর দশকেই মানবেন্দ্র বাংলা গানের মর্যাদাকে ভারতীয় ধ্রুপদী সংগীতের উচ্চতায় তুলে দিয়েছিলেন বলা যেতে পারে। মানবেন্দ্র তাঁর প্রথম বেসিক ডিস্ক “নাই চন্দন লেখা শ্রীরাধার চোখে নাই নাই শ্যামো রায়” দিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিলেন ১৯৫৩ সালে। এইচ.এম.ভি’র সহযোগিতায় তিনি তার দুটি রেকর্ড প্রকাশ করেন যার নাম ‘ফিরে দেখো না’ এবং ‘জানিনা তুমি কোথায়’। কীর্তনের সুরে এই গানগুলি লিখেছিলেন কাকা সিদ্ধেশ্বর মুখোপাধ্যায়। বাংলা চলচ্চিত্রে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাহিনী অবলম্বনে তৈরি ‘চাঁপাডাঙার বউ’-এ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে হাতেখড়ি।এর আগে অবশ্য ‘সাড়ে চুয়াত্তর’-এ ছোট্ট একটু আহির ভৈরো আলাপ গেয়েছিলেন। ১৯৫৮ সালে রবিন চট্টোপাধ্যায় দুটি প্রতিবন্ধী ছেলের গল্প ‘লালু ভুলু’ নামের একটি ছবির জন্য সংগীত রচনা করেছিলেন। ছবিটি বাংলায় অত্যন্ত সফল হয়েছিল এবং মানবেন্দ্র খুব দক্ষতার সাথে ‘যার হিয়া আকাশের নীল নীলিমায়’, ‘দুঃখ আমার শেষ করে দাও প্রভু’, গানগুলি গেয়েছিলেন। ‘নীলাচলে মহাপ্রভু’ ছায়াছবিতে ‘জগন্নাথ জগৎ বন্ধু’ কীর্তনটি গেয়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন। ‘মায়ামৃগ’তে গাওয়া ‘মেটেরিয়া মেডিকার কাব্য’ বাংলা ফিল্মি গানের জগতে একটি মাইলফলক বলা যেতে পারে।

মানবেন্দ্র নিজেও বেশ কয়েকটি বাংলা ছবিতে সুর রচনা করেছিলেন যার মধ্যে ‘মায়ামৃগ’, ‘বধু’,  যত মত তত পথ’, ‘জয় জয়ন্তী’, ‘গোধুলি বেলা’ উল্লেখযোগ্য ছবি। ‘গীতবীথিকা’ নামে একটি স্কুলে গান শেখাতেন। মেহদি হাসানের গজলের অসম্ভব ভক্ত ছিলেন। এই  মানবেন্দ্রের হাত ধরেই নজরুল গীতি বাংলা সঙ্গীত জগতে জনপ্রিয়তার শীর্ষে পোঁছয়। ওনার কণ্ঠে ‘এত জল ও কাজল চোখে’ আর ‘বউ কথা কও’ নজরুল সঙ্গীত এত এত জনপ্রিয় হল যে কোম্পানি স্পেশাল ইপি করতে ডাকলেন। লেবেলে লেখা হল ‘নজরুল গীতি’। সেই প্রথম বার। আগে লেখা থাকত ‘সঙ্গস অব কাজী নজরুল’।

জীবনে অভিনেতা হিসেবে একবারই অবতীর্ণ হয়েছেন ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে। শখ ছিল মিউজিক্যাল বায়োস্কোপে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছ থেকে ‘জলসাঘর’ কাহিনিটি কিনেছিলেন পাঁচশো টাকা দিয়ে কিন্তু করে উঠতে পারেননি। যেটি পরে করেছিলেন সত্যজিৎ রায়।

১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি প্রবাদ প্রতিম গায়ক তথা শিল্পী মানবেন্দ্র ম্যাসিভ হার্ট এট্যাকে মৃত্যু বরণ করেন। বাংলা সঙ্গীত জগতে মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের অবদান আমাদের হৃদয়ের অন্তঃস্থলে প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে চিরকাল।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।