ধর্ম

দুর্গাপূজার চালচিত্র

প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় দুর্গাপুজায়  চালচিত্র ব্যবহার করা হত। চালচিত্র হল সাবেকি দুর্গা প্রতিমার উপরিভাগে অঙ্কিত দেবদেবীর কাহিনিমূলক পটচিত্র, যা প্রধানত অর্ধগোলাকৃতি হয়। চালচিত্রে পঞ্চানন শিব, মহিষাসুর বধ, নন্দীভৃঙ্গী, শুম্ভ-নিশুম্ভের যুদ্ধ প্রভৃতি কাহিনির ধারায় বর্ণিত থাকে। এই চিত্রকলার একটি নিজস্ব রূপরেখা ও শৈলীগত দৃঢ় বুনিয়াদ রয়েছে। শিল্পীদের ভাষায় এই চালচিত্র হল ‘‘পট লেখা’’, যা বাংলার পটচিত্রের একটি বিশেষ ধারা।

 চালচিত্র শব্দের ‘‘চাল’’ শব্দের অর্থ আচ্ছাদন। প্রতিমার চালির উপরে আঁকা হয় বলে এর নাম চালচিত্র। বীরভূমের দুর্গা পটের উপর আচ্ছাদন হিসেবে এটি ব্যবহার করা হয়।  প্রতিমার চালির বিভিন্নতার উপর নির্ভর করে প্রতিমার চালচিত্রকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন বাংলা চালি, খোপচালি, টানাচৌড়ি, মঠচৌড়ি ও মার্কিনিচালি।

বাংলা চালি

বাংলা চালি

১) বাংলা চালি- বঙ্গদেশের সর্বাধিক পুরোনো চালি। মনে করা হয় কৃষ্ণনগরের মৃৎশিল্পীরা এই চালির আবিষ্কারক। এই চালি কিছুটা অর্ধচন্দ্রাকার যা একচালার প্রতিমার মূল কাঠামোয় দেবীপ্রতিমার পেছনে উপরের দিকে যুক্ত থাকে। এই চালি কিন্তু প্রতিমার একচালার কাঠামোর চেয়ে অনেক বড় হয়। এতটাই বড় যে অর্ধচন্দ্রাকার এই চালি কাঠামো ছাড়িয়ে কাঠামোর বাহিরে দুই পাশে কিছুটা ঝুলে থাকে।চালিতে যে চালচিত্র ব্যবহার করা হয় তাতে মহাদেব ও শ্রীশ্রীচণ্ডী বর্ণিত কাহিনী অঙ্কন করা থাকে। বর্তমানে মূলত কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে দুর্গাপ্রতিমায় এই “বাংলা চালি” ব্যবহার করা হয়।-এছাড়াও কৃষ্ণনগরের রায়বাড়ির দুর্গাপ্রতিমায় “বাংলা চালি” ব্যবহার করা হয়। “বাংলা চালি” ব্যবহৃত হয় এমন প্রতিমাগুলি নির্মিত হয় প্রাচীন বাংলা রীতিতে। কখনও সম্পূর্ণ  মাটিতে তৈরি হয় দেবীর পরনের শাড়ি। সেই শাড়িতে সোনার গহনার কাজ করা হয়। দেবীর বাহন হিসেবে থাকে দেবসিংহ বা গোধা।

২) মঠচৌরি চালি-  একচালার দেবী প্রতিমার পেছনে তিন শিখর বিশিষ্ঠ চালার নিচের দিকে আবার তিনটি অর্ধচন্দ্রকার চালা থাকে। পেছনের শিখর তিনটি কিছুটা দ্রাবিড় স্থাপত্য-এর আদলে তৈরি মন্দিরের গোপুরমের বা প্রবেশ তোরণের মত। “বাংলা চালি”তে কোনো পৃথক তিন শিখরের অস্তিত্ব নেই। পরিবর্তে একটানা একটি অর্ধাচন্দ্রাকার চালি ছিল। কিন্তু, এই চালিতে তিন শিখর যুক্ত তিনটি অর্ধচন্দ্রাকার চালি বর্তমান। এই তিন শিখর বিশিষ্ট চালা শাক্তশাস্ত্র গুলির সত্ত্ব-রজ:-তম গুণকে ইঙ্গিত করছে। শ্রীশ্রীচণ্ডী তে দেবীকে “ত্রিগুণাতিকা” বলা হয়েছে। এই ত্রিগুণ হলো সত্ত্ব, রজ: এবং তম। এই ত্রিগুণা দেবীর তিনটি পৃথক পৃথক রূপ রয়েছে যথাক্রমে লক্ষী, সরস্বতী ও দুর্গা। শাক্তদর্শন অনুযায়ী একত্রে ত্রিদেবীর আরাধনায় হলো দুর্গোৎসব। বঙ্গদেশে দুর্গোৎসবের ক্ষেত্রে, এই ত্রিদেবীর আরাধনা একচালার প্রতিমাতে অনুষ্ঠিত হয়, কিন্তু মঠচৌরি চালিতে এই তিনটি পৃথক শিখর বিশিষ্ট তিনটি অর্ধচন্দ্রাকার চালির মাধ্যমে ত্রিদেবীর উপর অধিকতর গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। কলকাতার হাটখোলার দত্তবাড়িতে মঠচৌরি চালির ব্যবহার দেখা যায়। যে সকল দুর্গাপ্রতিমায় এই চালি ব্যবহার করা হয় সেই সব প্রতিমার প্রাচীন বাংলা রীতিতে নির্মিত। প্রতিমার পরনে মাটির শাড়ি থাকে। পটুয়ার তুলিতে জীবন্ত হয়ে ওঠে এই শাড়ি। রং তুলি দিয়ে শাড়িতে আঁকা শ্রীশ্রীচণ্ডীর কাহিনী। সাবেক ডাকের সাজের প্রতিমায় দেবীর বাহন হিসেবে থাকে দেবসিংহ বা গোধা।

টানাচৌরি চালি

টানাচৌরি চালি

৩) টানাচৌরি চালি- তিন শিখর বিশিষ্ট মঠচৌরি চালি থেকে তিনটি অর্ধচন্দ্রাকার চালা সরিয়ে ফেললে যে নতুন চালা তৈরি হয় তাকে বলে টানাচৌরি চালি। অর্ধচন্দ্রাকার অংশটি থাকে না পরিবর্তে পরপর তিনটি শিখর একটানা একটি সরলরেখায় বসানো থাকে বলেই এই চালির নাম “টানাচৌরি”।এই চালির তিনটি শিখরও শাক্তদর্শনের সত্ত্ব রজ ও তম গুণের প্রতীক। শুধুমাত্র বাংলার “চৌধুরী” উপাধি যুক্ত জমিদার বাড়ীগুলি এই চালি ব্যবহার করে বলে এটাকে “চৌধুরী”দের নিজস্ব চালি বলা হয়। তাই এর অপর নাম “চৌধুরী চালি” । কলকাতার সাবর্ন রায় চৌধুরী পরিবারের ৮ টি দুর্গাপুজোর মধ্যে অধিকাংশ পুজোর প্রতিমা এই চালি ব্যবহার করে। এছাড়া হাওড়ার আন্দুল রাজবাড়ী এই চালি ব্যবহার করে।

মার্কিনি চালি

মার্কিনি চালি

৪) মার্কিনি চালি- বর্তমানে পারিবারিক ও সার্বজনীন সাবেকি পুজোগুলির অধিকাংশ পুজোর প্রতিমাই এই চালা রীতি অনুসরণ করে।এই চালি অনেকটাই আধুনিক স্থাপত্য ঘেঁষা। একচালার প্রতিমার পেছনে অর্ধবৃত্তাকার একটি চালা থাকে, অর্ধ অর্ধবৃত্তকার চালা শেষ হলে দুইপারে দুটি থাম শুরু হয়ে ভূমি স্পর্শ করেছে। ব্রিটিশ আমলে চালির ব্যবহার সর্বাধিক বেড়েছিল। 

কালের স্রোতে চালচিত্র হারিয়েছে তার আভিজাত্য এবং শিল্প-সূক্ষ্মতা। দিনে দিনে উধাও হয়েছে তার সাবেক জৌলুস। আজ শুধু যেন নিয়ম রক্ষার্থে টিকে আছে চালচিত্র। দিনে দিনে কমে আসছে চালচিত্র-শিল্পীও। আর যাঁরা টিকে আছেন তাঁরা কোনও রকমে পেটের দায়ে ধরে রেখেছেন প্রাচীন এই শিল্পকে। পটশিল্পীদের মতে, সময়ের সঙ্গে সে ভাবে বাড়েনি পটের দাম। আর ক্রেতারাও চালচিত্রের জন্য বেশি খরচ করতে নারাজ। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে এবং মফসসলে এর চাহিদা আছে।

আবার চালচিত্রের বিষয়বস্তু অনুসারে একে কয়েকভাগে ভাগ করা যায়, যেমন কৈলাসী, দশাবতারী, বৃন্দাবনী, রামচন্দ্রী ইত্যাদি। তবে বাংলার বনেদি বাড়ির প্রতিমায় কৈলাসী ও দশাবতারী চালচিত্রের অধিক প্রচলন। চালচিত্রের মূল বিষয়বস্তু হল শিবদুর্গা, কৈলাস, শিব অনুচর নন্দীভৃঙ্গী, মহিষাসুর বধ, দশাবতার ইত্যাদি। বীরভূম জেলার হাটসেরান্দির সূত্রধর সমাজে এই ধরনের এক বিশেষ চিত্রসম্ভার দেখা যায়, যাকে দুর্গা পট বলা হয়। তবে এখানে দুর্গা প্রতিমার বদলে দুর্গা পটেই পূজার্চনা করা হয়। দুর্গা পটের উপর অর্ধবৃত্তাকার চালচিত্র থাকে। এই ধরনের চালচিত্রে রাম, সীতা, শিব, নন্দীভৃঙ্গী, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শুম্ভ-নিশুম্ভ অঙ্কিত থাকে। কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির রাজরাজেশ্বরী দুর্গার চালচিত্রের মধ্যে অনন্যতা লক্ষ্য করা যায়। এখানকার চালচিত্রে মাঝখানে থাকে পঞ্চানন শিব ও পাশে পার্বতী, তার একপাশে থাকে দশমহাবিদ্যা ও অন্য পাশে দশাবতার। ভারতীয় সংগ্রহালয়ের প্রাক্তন অধিকর্তা বলেছেন- বাংলায় বিভিন্ন ধরনের চালচিত্রের প্রয়োগ আছে ও তাদের মধ্যে বিভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। মঠচৌরি চালির চালচিত্রে দেবীর অবয়বগুলি থাকে উপর থেকে নিচে, একটির নিচে অপরটি। আবার সাবেক বাংলা চালিতে সেগুলো থাক থাক করে আলাদা আলাদা ভাবে থাকে। অন্য দিকে, মার্কিনি চালিতে পটচিত্রগুলি থাকে পাশাপাশি।

তথ্যসূত্র


  1. ২২শে সেপ্টেম্বর ২০১৭ সালে বর্তমান পত্রিকায় 'শীতেই শুরু হয় বনেদি বাড়ির পুজোর প্রস্তুতি' শিরোনামের প্রবন্ধ
  2. বাংলায় পটের দুর্গা, দীপঙ্কর ঘোষ, আনন্দ পাবলিশার্স (২০১৫)।
  3. দুর্গার রূপে রূপান্তরে, পূর্বা সেনগুপ্ত, মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড (২০১৬)
  4. বঙ্গে শারদোৎসব ও ব্যতিক্রমী দুর্গাপূজা, শিবশংকর ঘোষ, প্রভা প্রকাশনী।
  5. দুর্গাপূজা ও কিছু কথা, সনজিৎ ঘোষ, অর্পিতা প্রকাশনী।
  6. https://www.anandabazar.com/

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!