ধর্ম

কলকাতার বনেদি বাড়ির পূজা

দুর্গাপূজাই কলকাতার বৃহত্তম ধর্মীয় উৎসব। বর্তমান কলকাতার সবথেকে প্রাচীন দুর্গাপূজাটি হয় বড়িশার সাবর্ণ রায়চৌধুরী বাড়িতে।কলকাতার দ্বিতীয় প্রাচীনতম দুর্গাপূজাটি হল শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজা। বিংশ শতাব্দীতে কলকাতায় বারোয়ারি বা সার্বজনীন পূজা জনপ্রিয় হয়। কিন্ত তাই বলে বনেদি বাড়ির পূজা এখনও মানুষের কাছে ভালই জনপ্রিয়।  কলকাতার নামকরা পুরনো পূজাগুলোর মধ্যে প্রথম সারিতে আছে শোভাবাজার রাজবাড়ি, হাটখোলার দত্ত, পাথুরিয়াঘাটা, লাহাবাড়ির পূজা, ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাড়ির পূজা, মালিক বাড়ির পূজা ইত্যাদি।

প্রাণকৃষ্ণ হালদারের পূজাঃ কলকাতার ইতিহাস ঘাঁটলে সবচেয়ে পুরনো পূজা বলতে পাওয়া যায় বাগবাজারের প্রাণকৃষ্ণ হালদারের পূজা। কষ্ঠিপাথরের খোদাই করা সেই মূর্তির সঙ্গে ছেলেমেয়ে নন, ছিলেন জয়া আর বিজয়া নামে দুই সঙ্গিনী। সে প্রায় ৪০০ বছর আগের কথা।

রানি রাসমণির পুজাঃ রানি রাসমণি শুদ্ধাচারে তাঁর জানবাজারের বাড়িতে দুর্গাপূজা শুরু করেন। ১৮৬১ সালে তাঁর মৃত্যুর পর রানির জামাতাগণ নিজ নিজ বাসভবনে রানির প্রদর্শিত পথেই দুর্গাপূজার আয়োজন করতে থাকেন। প্রথমের দিকে এ পূজায় পশুবলির চল ছিল। ১৯০৩ সাল থেকে পশুবলির প্রথা বন্ধ করে দিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। রানীর বাড়ির সবচেয়ে বড় আকর্ষণের বিষয়টি হলো সিঁদুর খেলা। এছাড়াও এখানকার কুমারী পূজা বিখ্যাত। প্রিন্স দ্বারকানাথ, কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও প্রতি বছর এ পূজায় আসতেন। প্রচলিত আছে, শ্রী রামকৃষ্ণ একবার সখীর ছদ্মবেশে এই পূজা দেখতে এসেছিলেন।

বেহালার সাবর্ণ রায় চৌধুরীর পূজা

বেহালার সাবর্ণ রায় চৌধুরীর পূজা

বেহালার সাবর্ণ রায় চৌধুরীর পূজাঃ ১৬১০ সাল থেকে সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার বড়িশায় তাঁদের আদি বাসভবনে দুর্গাপূজার আয়োজন করে আসছেন। এটিই সম্ভবত কলকাতার প্রাচীনতম দুর্গোৎসব। বর্তমানে এই পরিবারের সাত শরিকের বাড়িতে সাতটি দুর্গাপূজা হয়। এগুলির মধ্যে ছয়টি বড়িশায় ও একটি বিরাটিতে। ১৬২৬ সালে রাজা মানসিংহ লক্ষ্মীকান্ত মজুমদারকে মুগরা খাশপুর, পৈকান, কলকাতা, আর হেটেগড়ের জমিদারি দেওয়ার সঙ্গে দিয়েছিলেন রায়চৌধুরী উপাধিও। উল্লেখ্য, এখানকার আরেকটি ইতিহাস হলো, এই জমিদার বাড়ির আটচালায় বসে ১৬৯৮ সালের ১০ জুন গোবিন্দপুর, সুতানটি, কলকাতা—এই তিনটি গ্রাম ইংরেজদের কাছে বিক্রি করেন মাত্র ১৩০০ টাকায়। বেহালা-বড়িশার সখেরবাজার থেকে একটা রাস্তা বাঁক নিয়ে সোজা চলে গেছে সার্বণপাড়ায়। সেখানে এখনো পূজা হয়। পূজা হয় দুর্গাভক্তি-তরঙ্গিনী মতে।

শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজা

শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজা

শোভাবাজারের রাজবাড়ির পূজাঃ ১৭৫৭ সালে শোভাবাজার রাজবাড়িতে নবকৃষ্ণ দেব দুর্গাপূজা শুরু করেন। এ পূজায় নিমন্ত্রিত থাকতেন লর্ড ক্লাইভ, ওয়ারেন হেস্টিংসের মতো ব্রিটিশ প্রশাসকরা। তবে ১৭৯০ সালে স্থান পরিবর্তন করে পূজাটি বর্তমানে ৩৬-এ নবকৃষ্ণ স্ট্রিটে চলে আসে। সেই থেকেই এ বাড়িতে চলছে পূজা। শোভাবাজার রাজবাড়ির পূজার অতীতে রয়েছে কবিগানের আসর। সারা রাত ধরে গান গাইতেন অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, হরিঠাকুর, ভোলা ময়রার মতো কবিয়ালরা। পূজার শেষে থাকতো যাত্রাপালার আয়োজন। আজও পূজার আয়োজন করা হয় রাজবাড়ির পুরনো দালানে। রাজা নবকৃষ্ণ দেবের আমল থেকে যে ছাঁচে প্রতিমা গড়া শুরু হয়েছিল, আজও তা হয়ে আসছে।

লাহাবাড়ির পূজাঃ ঈশ্বর প্রাণকৃষ্ণ লাহা প্রায় ২০০ বছর আগে এই পূজা শুরু করেন। কথিত আছে স্বপ্নে পারিবারিক দেবী জয়া জয়া মায়ের নির্দেশেই পূজা আরম্ভ হয়। এই পূজা লাহা বাড়ির পূজা নামে বিখ্যাত। এদের দুর্গা শিবনেত্র। শিবের কোলে তার অধীষ্ঠান। রিপু বলি এদেরও হয়। পূজা শুরু হয় সপ্তমীতে নাটমন্দিরে জয়া জয়া মা-এর অধীষ্ঠানের পরে। দশমীতে যখন মা বেরিয়ে যান তারপর থেকে মূল ফটক বন্ধ থাকে। বিসর্জনের পরে একজন বাইরে থেকে চেঁচিয়ে ৩ বার মা কে ডাকেন, মা ভিতরে থেকে গেছেন কী না জানতে। নিশ্চিত হলে তবে দরজা খোলে।

ছাতুবাবু-লাটুবাবুর পূজা

ছাতুবাবু-লাটুবাবুর পূজা

ছাতুবাবু-লাটুবাবুর পূজাঃ এ বাড়ি পূজার কথা বলার আগে অবশ্যই কলকাতার এই দুই ‘বাবু’র কথা বলা দরকার। এই দুই ‘বাবু’ কলকাতা ‘বাবু কালচার’- এর এক অনন্য নিদর্শন। ছাতুবাবুর আসল নাম আশুতোষ আর লাটুবাবুর আসল নাম প্রমথনাথ। তাদের ছিল এক অদ্ভূত শখ, বুলবুলির লড়াই। শোনা যায়, ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রশিক্ষক এনে বুলবুলিদের লড়াই শেখাতেন এই বাবুরা। এর জন্য অর্থ খরচের কোনো সীমা ছিল না। ছাতুবাবু-লাটুবাবুর পূর্বপুরুষ বাবু রামদুলাল দে ১৭৮০ সালে থেকেই তার বিডন স্ট্রিটের বাড়িতে যে পূজার প্রচলন করেন তাই পরে ছাতুবাবু-লাটুবাবুর পূজা নামে খ্যাত। এদের ঠাকুরদালান গঙ্গামাটির তৈরি। এখানে অসুরসহ মা-দুর্গা এবং তার সন্তানদের সাজানো হয় মঠচুবড়ি আর্টে। এ পূজার বিশেষত্ব হচ্ছে, দশদিন ধরে পূজা চলে। এ বাড়ির দেবীর বাহন সিংহের দেহে আছে ঘোড়ার মুখ। প্রতিমার পেছনের চালচিত্রটিও অন্য ধরনের।। লক্ষ্মী- সরস্বতী পূজিত হন জয়া-বিজয়া রূপে। আর থাকেন শিব, রাম, হনুমান। প্রতিপদ থেকে ষষ্ঠী পর্যন্ত ঘট পূজা করা হয়। সপ্তমীতে কলাবউ স্নান করিয়ে মূর্তিপূজা শুরু। শুরুর দুই বছর পরে এক অষ্টমীতে বলির জন্য আনা ছাগশিশু রামদুলালের পায়ের ফাঁকে বাঁচার জন্য আশ্রয় নেয়। এই ঘটনার পরে প্রাণী বলি বন্ধ হয়ে যায়। আখ ও চালকুমড়ো বলি হয়। বিজয়া দশমীর দিন নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর চল আছে এ বাড়িতে।

হাটখোলার দত্তবাড়ির পূজাঃ পূজায় শোভাবাজার বাড়ির সঙ্গে বরাবরের টক্কর দিত হাটখোলার দত্তরা। নিমতলা স্ট্রিটে জগৎরাম দত্ত এই পূজার প্রচলন করেন। পরে পূজার দায়িত্ব নেন ঈশ্বর দেব প্রসাদ। ১৫ দিন ধরে চলে দেবীর বোধন। সিংহের মুখ হতো ঘোড়ার মতো। চালচিত্রের উপরে রাধাকৃষ্ণ আর নিচে নিশুম্ভ যুদ্ধের বর্ণনা আঁকা। মাথায় থাকত দুটি টিয়া। রিপু বলির নামে ফল, সবজি বলি হতো। বাইজি থেকে সপুত্র মহিলা সব কিছুতেই ছিল টেক্কা দেওয়ার লড়াই। লড়াই চলত ভাসানের মিছিল বা ঘাটের লড়াই নিয়ে। ভাসানে উড়ত দুইটি নীলকণ্ঠ।  আরও একটি বিশেষত্ব আছে সাবেকি এ বাড়ির পূজায়। এখানে ক্ষীরের পুতুল দেওয়া হয় পূজার প্রসাদ হিসেবে।

পাথুরিয়াঘাটার পূজাঃ পাথুরিয়াঘাটায় প্রায় ১৬৫ বছরের পুরনো দুর্গা পূজার সূত্রপাত রামলোচন ঘোষের হাতে। ৩ চালার ঠাকুর আর ঘোড়া মুখের সিংহ এই পূজায়। ষষ্ঠী ও নবমীতে কুমারী পূজা ছাড়া সধবা পূজাও হয়। এদের শিল্পী ও ঢাকিরাও আসত পরিবারের মধ্যে থেকেই। ৭০-৮০ বছর হলো এখানে বলি বন্ধ।

মল্লিক বাড়ির পূজাঃ অন্যতম বিখ্যাত মল্লিক বাড়ির পূজার শুরু ১৯২৫ সালে। অভিনেতা রঞ্জিত মল্লিক বর্তমানে এ পূজার পরিচালনা করেন। পূজা উপলক্ষে ভবানীপুরের বাড়িতে সমস্ত আত্মীয়রা জড়ো হন।

মিত্র বাড়ির পূজাঃ উত্তর কলকাতার মিত্র বাড়ির পূজায় এসেছিলেন গান্ধীজি। ১৮০৭ সালে রাধাকৃষ্ণ মিত্র এ পূজার প্রচলন করেন। গান্ধীজী ছাড়াও এ পূজায় এসেছেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস, নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, দেশপ্রিয় যতীন্দ্র মোহন সেনগুপ্ত, জহরলাল নেহরু, ইন্দিরা গান্ধী, রাষ্ট্রপতি রাজেন্দ্র প্রসাদ, সরোজিনী নাইডু, মওলানা আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ।

হাওড়া পণ্ডিত মহাশয়ের বাড়ির পূজাঃ হাওড়া পণ্ডিত সমাজের সভাপতি মুরারী মোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে পূজা শুরু হয় ৩৫০ বছর আগে। মা এখানে কন্যারূপে পূজিত হন। বাড়ির মেয়েরা পূজার বৈদ্যের জন্য মুড়কি, নাড়ু তৈরি করেন। সারা বছর বাড়িতে যা রান্না হয় সপ্তমী থেকে নবমী সেই সমস্ত পদ রান্না করে মায়ের ভোগ নিবেদন করা হয়। অষ্টমীর দিন সন্ধি পূজার পর একটি থালায় সমান করে সিঁদুর দিয়ে চৌকির ওপর মূল বেদীর তলায় একটি কাঠির সাহায্যে রাখা হয়। দশমীর দিন ওই থালায় মায়ের হাত, পা কিংবা পদ্মের চিহ্ন পাওয়া যায়।

তথ্যসূত্র


  1. পূজা-বিজ্ঞান, স্বামী প্রমেয়ানন্দ, উদ্বোধন কার্যালয়, কলকাতা, ১৯৯৯
  2. নতুন বাংলার মুখ পত্রিকা, শারদোৎসব সংখ্যা ১৪১৪ বঙ্গাব্দ (২০০৭)
  3. বাংলাদেশে দুর্গাপুজো, ইমদাদুল হক মিলন, বর্তমান (রবিবারের ক্রোড়পত্র), ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৮
  4. https://www.taleof2backpackers.com/bonedi-bari-durga-puja-in-kolkata/

১ Comment

1 Comment

  1. অরবিন্দ বন্দ‍্যোপাধ্যায়​

    অক্টোবর ৬, ২০১৯ at ৯:২৭ পূর্বাহ্ণ

    অতুলনীয় রচনা। পরবর্তী কালে যখন ভারতবর্ষে বাংলাভাষায় কথা বলার লোক আর থাকবেনা, এবং “অধুনালুপ্ত”বাঙালী জাতির ইতিহাস লেখার জন্যে ওপার বাংলা থেকে তথ্য আহরণ করতে হবে, তখন “বাবু কালচারের” এই মনোজ্ঞ বিবরণ অত্যন্ত মূল্যবান দলিল হয়ে উঠবে।

    সবিনয়ে নিবেদন করি, এই ইতিহাসাশ্রিত লেখাটির পাশাপাশি যদি এমন একটি লেখা থাকতো, যাতে গ্ৰাম বাংলার দরিদ্র বাঙালীর আনন্দোৎসবের ছবিটি পাওয়া যেত, তাহলে মন্দ হতোনা। “গ্ৰামবাংলার গরীব বাঙালীর দুর্গাপূজো” নাম হলে আরও ভালো হতো।
    আগামীতে এরকম একটি লেখার কথা ভাবা যেতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!