ইতিহাস

হিপোক্রেটিস

হিপোক্রেটিস

প্রাচীন গ্রিসে চিকিৎসাবিদ্যার অগ্রগতি যার হাত ধরে ঘটেছিল, তিনি চিকিৎসাবিদ হিপোক্রেটিস (Hippocrates)। তাঁকে সারা বিশ্বই আসলে চিকিৎসাবিদ্যার জনক হিসেবে মেনে নিয়েছেন। সেই প্রাচীনকালে মানুষের বিশ্বাস ছিল মানব শরীরের রোগ, অসুস্থতা ইত্যাদি কোনও দৈব ঘটনা, এর সঙ্গে জাগতিক কিছুর সম্পর্ক নেই। ফলত সেইসব রোগের চিকিৎসাও ছিল কুসংস্কারাচ্ছন্ন যাদুবিদ্যা নির্ভর। হিপোক্রেটিস প্রথম ব্যক্তি যিনি রোগের সঙ্গে এই দৈব যোগাযোগের ঘটনাটিকে অস্বীকার করে, কালা-যাদু, তন্ত্র-মন্ত্রের চিকিৎসাকে উপেক্ষা করে মানব শরীরের রোগের গভীর পর্যবেক্ষণ নিরীক্ষণ এবং উপসর্গ নির্ণয় ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। মোট কথা চিকিৎসাকে ধর্মের গণ্ডী থেকে বের করে এনেছিলেন তিনি। তাঁর উদ্ভাবিত ‘ফোর হিউমর’ তত্ত্ব চিকিৎসাশাস্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল যার মূল বক্তব্য হল রক্ত, কফ, কালো পিত্ত এবং হলুদ পিত্ত মূলত এই চারটি উপাদানই মানব শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। বেশ কয়েকটি রোগের প্রথম নির্ণায়ক ছিলেন তিনি, সেকারণে রোগগুলিকে তাঁর নামেও চিহ্নিত করা হয়। হিপোক্রেটিস ছিলেন প্রথম নথিভুক্ত বক্ষ শল্যচিকিৎসক এবং তাঁর কোনও কোনও চিকিৎসাপদ্ধতি আজও অনুসরণ করা হয়। তিনি চিকিৎসা অনুশীলনে নৈতিক মানদণ্ডের কথা বলেছিলেন। সেকারণে আজও ডাক্তারদের হিপোক্রেটিসের শপথ পাঠ করে চিকিৎসার প্রতি সততা এবং নৈতিকতা প্রদর্শনের অঙ্গীকার করতে হয়।

অধিকাংশ ঐতিহাসিকের মত, আনুমানিক ৪৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিসের কোস দ্বীপে অভিজাত অ্যাসক্লেপিয়াড পরিবারে হিপোক্রেটিসের জন্ম হয়। দ্বিতীয় শতাব্দীর এক গ্রিক চিকিৎসক সোরানাস প্রথম হিপোক্রেটিসের জীবনীগ্রন্থ রচনা করেছিলেন। হিপোক্রেটিস সম্পর্কে নানা ব্যক্তিগত তথ্য সে-বই থেকে জানা গেলেও তাঁর জীবন সংক্রান্ত তথ্য যথেষ্ট পরিমাণে পাওয়া যায় না। দশম শতাব্দীর ‘সুদা’ হিপোক্রেটিস সম্পর্কে কিছু তথ্যের উৎস। পরবর্তীতে জন জেটজেসের রচনা থেকেও জানা যায় তাঁর কথা। প্লেটোর রচনা ‘প্রোটাগোরাস’-এও হিপোক্রেটিসের উল্লেখ পাওয়া যায়। প্লেটোর ‘ফ্রেডাস’ থেকে জানা যায় তিনি একজন প্রশংসিত শিক্ষক ছিলেন যাঁর চিকিৎসা-সংক্রান্ত নিজস্ব মতবাদ ছিল। এমনকি অ্যারিস্টটলের প্রথম জীবনেও সম্ভবত জীবিত ছিলেন তিনি। অ্যারিস্টটল তাঁর ‘পলিটিক্স’ গ্রন্থে হিপোক্রেটিসের উল্লেখ করেছিলেন। জীবনীকার সোরানাস লিখেছিলেন যে, হিপোক্রেটিসের পিতা হেরাক্লাইডাস (Heraclides) নিজেও একজন চিকিৎসক ছিলেন এবং টিজানের কন্যা প্রক্সিটেলা (Praxitela) ছিলেন তাঁর জন্মদাত্রী মা। হিপোক্রেটিসের দুই পুত্রের কথা জানতে পারা যায়, তাঁদের নাম থেসালাস এবং ড্রাকো। এও জানা যায় যে, পলিবাস নামে একজন তাঁর জামাতা ও ছাত্র ছিলেন।

সোরানাসের মতে, হিপোক্রেটিস তাঁর পিতা এবং ঠাকুরদার কাছ থেকে চিকিৎসাবিদ্যা শিখেছিলেন। যন্ত্রণাক্লিষ্ট রোগীদের সান্ত্বনা দেওয়া এবং বাবার জন্য ভেষজ শিকড় ও অন্যান্য সরঞ্জাম এনে দেওয়ার কাজে সাহায্য করতেন তিনি। এছাড়াও প্রাক-সক্রেটিস যুগের গ্রিক দার্শনিক ডেমোক্রিটাস এবং খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর এক দার্শনিক ও লেখক গর্গিয়াসের সান্নিধ্যে এসেছিলেন বলে অনুমান করা হয় এবং তাঁদের সঙ্গে হিপোক্রেটিস অন্যান্য বিষয় অধ্যয়ন করেছিলেন বলেও মনে করা হয়ে থাকে। ছোটবেলায় অ্যাথলেটিক্সের প্রতিও ভীষণ আগ্রহী ছিলেন তিনি, এমনটা মনে করা হয়। এই অ্যাথলেটিক প্রশিক্ষণ তাঁকে ওষুধ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দিয়েছিল। নিজের পিতা এবং পিতামহ ছাড়াও তিনি সেলিমব্রিয়ার থ্রেসিয়ান চিকিৎসক হেরোডিকাসের কাছেও চিকিৎসাবিদ্যার পাঠ গ্রহণ করেছিলেন। অনেকে বলেন, হিপোক্রেটিস স্থানীয় কসের একটি স্কুলে পড়াশোনা করেছিলেন। শৈশবে প্রায় ১০ বছর ধরে তিনি গণিত, ইতিহাস, ধর্ম, সঙ্গীত ইত্যাদি অধ্যয়ন করেছিলেন। এছাড়াও গ্রিসে প্রাচীনকালে রোগ নিরাময়ের জন্য যেসব প্রতিষ্ঠান যা কিনা ‘আস্কলেপিয়ন’ (Asklepion) নামেও পরিচিত, তেমনই কোনও আস্কলেপিয়নে সম্ভবত হিপোক্রেটিস চিকিৎসা-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন। অনেকে বিশ্বাস করেন, যে, চিকিৎসাবিদ্যার অনুশীলনের জন্য তিনি হেরোডিকাসের সঙ্গে গ্রিকদেশীয় মূল ভূখণ্ড ছাড়াও সম্ভবত মিশর, লিবিয়া এবং ভারতসহ আরও নানা দেশে ভ্রমণ করেছিলেন। পরবর্তীকালে সমগ্র গ্রিস এবং এশিয়া মাইনর জুড়ে ছাত্রদের শিক্ষা প্রদানের জন্য তিনি ভ্রমণ করে বেড়িয়েছিলেন, এমনটাও মনে করেন অনেকে। এছাড়াও চিকিৎসাবিদ্যা অনুশীলন এবং শেখানোর জন্য তিনি থেসালি, থ্রেস এবং মারমারা সমুদ্র পর্যন্তও গিয়েছিলেন বলে মনে করা হয়। এও বিশ্বাস করা হয় যে, তিনি প্রায়শই কসে মেডিকেল স্কুলে পড়াতেন।

৪২০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে হিপোক্রেটিস গ্রিসের উত্তর দিকের বর্বর মানুষদের সঙ্গে পরিচিত হন এবং তাঁদের মধ্যে সংক্রমিত প্লেগের কথা জানতে পারেন। তখন তিনি জলবায়ু এবং বাতাসের গতিবিধি বিবেচনা করে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, এই রোগ গ্রিসেও আসবে এবং গ্রিসের শহরগুলিকে সতর্কবার্তাও পাঠিয়েছিলেন। এই রোগের চিকিৎসার জন্য গ্রিসের শহরগুলিতে ঘুরে বেড়াতেন তিনি। এই কাজে অংশগ্রহণ করেছিল তাঁর ছেলে এবং শিষ্যরাও। কথিত আছে এথেন্সের চারদিকে অগ্নিসংযোগ করে প্লেগ দূরীকরণের কাজ করেছিলেন তিনি। এথেন্স শহর তাঁর কাজের জন্য হিপোক্রেটিসকে সোনার মুকুট দিয়ে সম্মানিত করেছিল। যদিও এর সত্যতা নিয়ে সংশয় আছে। ম্যাসিডোনিয়ার রাজা দ্বিতীয় পার্ডিকাস-সহ অনেক বিখ্যাত মানুষের রোগ নিরাময়ের কৃতিত্ব দেওয়া হয় হিপোক্রেটিসকেই। হিপোক্রেটিসের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব ছিল তিনি কুসংস্কার এবং দৈববিশ্বাসের আবহ থেকে বের করে এনে মানবদেহের বিভিন্ন রোগকে গভীর পর্যবেক্ষণের আওতায় নিয়ে আসেন। যে ধরনের যাদুবিদ্যা, অলৌকিকতার দ্বারা আস্কলেপিয়ানের পুরোহিতরা রোগের চিকিৎসা করত তা দেখেছিলেন হিপোক্রেটিস এবং এই ধর্মীয় ঘেরাটোপ থেকে বার করে এনে তিনি রোগের উপসর্গ নির্ণয় এবং বিশ্লেষণ করে বাস্তব যুক্তি এবং উপযুক্ত পদ্ধতির মাধ্যমে চিকিৎসার অনুশীলন করতে শুরু করেছিলেন। সেকারণেই সকলে এক বাক্যে তাঁকে আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যার জনক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি চিকিৎসাবিদ্যাকে অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে স্বতন্ত্র একটি শৃঙ্খলা রূপে একটি পেশা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। প্লেটো লিখেছেন, হিপোক্রেটিস পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ অর্থাৎ চিকিৎসা করতেন।

এখানে উল্লেখ্য যে, প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতিকে অস্বীকার এবং তার বিরোধিতা করার ফলস্বরূপ হিপোক্রেটিসকে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য কারাবাসও করতে হয়েছিল। যদিও সেই সময়টিকেও কাজে লাগিয়েছিলেন তিনি। বন্দীদের ওপর গবেষণা চালিয়ে তিনি তাঁর চিকিৎসাচর্চা চালিয়ে গিয়েছিলেন। তাঁদের আচরণ, শারীরিক গঠনতন্ত্র বা অ্যানাটমি এবং রোগের লক্ষণগুলি পর্যবেক্ষণ করেছিলেন মনোযোগ সহকারে এবং নোটও নিয়েছিলেন। সেই সময় জেলে তাঁকে চিকিৎসাচর্চার অবসর দেওয়া হয়েছিল, কারণ কর্তৃপক্ষ তাঁর চেয়ে ভাল চিকিৎসক তখন পাওয়া যায়নি। সবচেয়ে জরুরি ব্যাপার হল, কারাগারে থাকার সময় তিনি মানব মৃতদেহ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে হিউম্যান অ্যানাটমি সম্পর্কে দুর্লভ জ্ঞান লাভ করেছিলেন। চিকিৎসাবিদ্যার ওপর লেখা তাঁর প্রথম বই ‘দ্য কমপ্লেক্স হিউম্যান অ্যানাটমি’তে এই তত্ত্ব তিনি উল্লেখ করেছিলেন যে, কোনও রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার আগে মানবদেহের সম্পূর্ণ জ্ঞান থাকা আবশ্যক। আসলে কীভাবে রোগের মোকাবিলা করতে হয় তা নিয়ে তৎকালীন গ্রিসের চিকিৎসা-বিদ্যালয়গুলি নিডিয়ান এবং কোয়ান এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। নিডিয়ান বিদ্যালয়গুলি মূলত রোগ নির্ণয়ের ওপর মনোযোগ দিলেও মানব শরীর সম্পর্কে তাঁদের ধারণা ছিল কেবল অনুমানভিত্তিক। কারণ প্রাচীন গ্রিসে মানুষের দেহ ব্যবচ্ছেদে নিষেধাজ্ঞা ছিল। ফলত নিডিয়ান স্কুল অফ মেডিসিন একটি রোগের কারণে যে অনেকগুলি সম্ভাব্য লক্ষণ দেখা দেয় তার সঠিক কারণ বুঝতে পারেনি। পাশাপাশি হিপোক্রেটিসকে কেন্দ্র করে চারপাশে হিপোক্রেটিক স্কুল বা কোয়ান স্কুল গড়ে উঠেছিল। তাঁরা চিকিৎসা এবং ঔষধশাস্ত্রকে বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণ এবং সমালোচনামূলক যুক্তির ভিত্তিতে কঠোরভাবে বৈজ্ঞানিক সমতলে স্থাপন করতে চেয়েছিলেন। তাছাড়া হিপোক্রেটিসের মানব শরীর সংক্রান্ত একটি স্বচ্ছ ধারণা থাকার কারণে সেই কাজ আরও সহজ হয়েছিল। হিপোক্রেটিসের চিকিৎসা সংক্রান্ত মতবাদগুলিই এই হিপোক্রেটিক স্কুল অফ মেডিসিনের মূল ভিত্তি। তিনিই প্রথম দেখিয়েছিলেন রোগ কোনও দৈব ব্যাপার বা দেবতাদের দ্বারা প্রদত্ত শাস্তি নয়, বরং তার প্রাকৃতিক কারণ আছে। মানুষের পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, তাঁর জীবনযাপন, মানসিক অবস্থা, খাদ্যাভ্যাস ইত্যাদি এর জন্য দায়ী। তাঁর ‘ফোর হিউমার’ তত্ত্ব এ প্রসঙ্গে উল্লেখযোগ্য। তিনি বিশ্বাস করতেন রক্ত, কফ, হলুদ পিত্ত এবং কালো পিত্ত শরীরের এই চারটি মূল উপাদানের ভারসাম্যহীনতার ফলেই রোগ উৎপন্ন হয় মানবদেহে। অনেকের মতে, পিতার সঙ্গে প্রাচ্য অঞ্চলে ভ্রমণের সময় এই তত্ত্ব শিখেছিলেন তিনি। আবার কেউ কেউ বলেন, মানুষের মৃতদেহ ব্যবচ্ছেদের পর এবং প্রাণীদের মৃতদেহ পর্যবেক্ষণের পর বিভিন্ন রঙের তরল প্রবাহিত হতে দেখে এই তত্ত্ব গড়ে তুলেছিলেন তিনি৷ চোখ এবং ত্বকের রঙ পরিবর্তন লক্ষ্য করবার জন্য হিপোক্রেটিস রোগীদের ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণের অভ্যাস গড়ে তোলেন এবং ছাত্রদের সর্বদা উপদেশ দিতেন রোগীকে দেখবার আগে যেন তাঁরা নিজের হাত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরিস্কার করে নেয়। তাঁর মতে, সমস্ত রোগে ঔষধের প্রয়োগ বাদ দেওয়া উচিত বা সর্বনিম্ন মাত্রায়, তথাকথিত হালকা ডোজের ওষুধ প্রয়োগ করা উচিত। কারণ তিনি মনে করতেন যে কোনও রোগের চিকিৎসা কোনও ব্যক্তির সামগ্রিক জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমেই করা যেতে পারে। তিনি বলেছিলেন, হাঁটাচলা একজন মানুষের সেরা ওষুধ। সুস্থ শরীরের জন্য খাদ্য এবং ব্যায়ামকে গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি৷ হিপোক্রেটিক মেডিসিন এই প্রকৃতির নিরাময় শক্তির ওপর নির্ভর করেছিল অনেকখানি। ওষুধ ব্যবহারের পরিবর্তে উপবাস এবং মধু ও ভিনিগারের মিশ্রণ সেবনের পরামর্শ দিয়েছিলেন তিনি। তবে চরম অসুস্থতায় শক্তিশালী ঔষধ ব্যবহার করতে হত তাঁকে, কিন্তু সাধারণ রোগের চিকিৎসায় তাঁর এই প্রাকৃতিক পদ্ধতি সফল প্রমাণিত হয়েছিল। হিপোক্রেটিক তত্ত্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ হল ‘ক্রাইসিস’। এটি হল রোগের অগ্রগতির একটি বিন্দু যেখানে প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ায় অসুস্থতা জয় করে রোগী জীবন ফিরে পাবে অথবা তার মৃত্যু ঘটবে।

‘অন দ্য ফিজিশিয়ান’ নামক একটি কাজে হিপোক্রেটিস উল্লেখ করেছিলেন চিকিৎসকদের শান্ত, ধৈর্যশীল এবং সৎ থাকতে হবে। গভীর মনোযোগ সহকারে পর্যবেক্ষণ এবং সেগুলি লিপিবদ্ধকরণের বিশেষ প্রয়োজন বলে মনে করতেন তিনি। নিজেও তিনি জ্বর, ব্যথা, মলত্যাগ ইত্যাদি অনেক উপসর্গের নোট রাখতেন। এমনকি তিনি মনে করতেন রোগীর পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কেও জানা প্রয়োজন চিকিৎসকের। কয়েকটি রোগ সর্বপ্রথম হিপোক্রেটিস বর্ণনা করেছিলেন বলে সেই রোগগুলিকে তাঁর নামে চিহ্নিত করা হয়। যেমন আঙুলের বিকৃতি বা ক্লাবিং রোগ (Clabbing) যেটি ফুসফুসের ক্যান্সারের একটি লক্ষণ। তিনি মুখের বিকৃতিরও প্রথম নির্ণায়ক যা মৃত্যুর পূর্বাভাস দেয়। এটি ‘হিপোক্রেটিক ফেস’ নামে পরিচিত। হিপোক্রেটিস অসুস্থতাগুলিকে ‘তীব্র’, ‘দীর্ঘস্থায়ী’, ‘স্থানীয়’ ইত্যাদি শ্রেণিতে ভাগ করেছিলেন এবং উত্তেজনা, পুনরুত্থান, সংকট ইত্যাদি কিছু শব্দও ব্যবহার করেছিলেন। হিপোক্রেটিসের আরেকটি প্রধান অবদান হল তাঁর লক্ষণবিদ্যা বা ‘সিমটোম্যাটোলজি’ (Symptomatology)। বক্ষের এম্পাইমা রোগের পূর্বাভাস প্রদান, অস্ত্রোপচার ইত্যাদি বিষয়েও তাঁর কৃতিত্ব অনস্বীকার্য। তিনিই প্রথম একজন নথিভুক্ত বক্ষের শল্যচিকিৎসক ছিলেন। বুকের প্রাচীরের ফোঁড়া নিষ্কাশনের জন্য সীসার পাইপের ব্যবহার করেন তিনি, যা আজও বৈধ। মানুষের মলদ্বারের অসুস্থতা এবং তার চিকিৎসাপদ্ধতি বর্ণনা করেন তিনি। ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় জীবনধারার পরিবর্তনেরই পরামর্শ দিতেন তিনি যা বর্তমানে ‘লাইফস্টাইল মেডিসিন’ নামে পরিচিত।

দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসাবিদ্যার উপর লিখিত এবং প্রদত্ত বহু গ্রন্থ, চিঠি এবং বক্তৃতার কৃতিত্ব দেওয়া হয় হিপোক্রেটিসকে। যদিও পণ্ডিতেরা লিখনশৈলী, বিষয়বস্তু, আঙ্গিক, দর্শন ইত্যাদির বিভিন্নতা এবং বৈচিত্র্য লক্ষ্য করে মনে করেন সেগুলি সবই হিপোক্রেটিসের লেখা নয়। তাঁর অনুগামী বা শিষ্যদের রচনার সংখ্যাই বুঝি অধিক। এগুলিকে সম্মিলিতভাবে ‘হিপোক্রেটিক কর্পাস’ বলা হয়। আনুমানিক ৪৪০ থেকে ৩৬০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে এগুলি রচিত। আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরিতে আগুন লাগলে এরমধ্যে ৭০টি চিকিৎসা সংক্রান্ত গবেষণামূলক পুস্তিকা রক্ষা পেয়েছিল। এই সংকলনের অন্তর্ভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পুস্তিকা হল ‘হিপোক্রেটিক ওথ’। এটি মূলত চিকিৎসা অনুশীলনের নীতিশাস্ত্রের একটি দলিল। চিকিৎসকদের সততা এবং নৈতিকতা বজায় রাখার নির্দেশস্বরূপ। তাই আজও ডাক্তাররা পেশায় প্রবেশের পূর্বে ‘হিপোক্রেটিক ওথ’ নিতে বাধ্য থাকেন।

৩৭০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রিসের লরিসায় হিপোক্রেটিসের মৃত্যু হয় বলে মনে করা হয়।

  • অফিস ও হোম রিলোকেশন

     

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

  • প্যাকার্স ও মুভার্স এর বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান 

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

ঈশ্বরচন্দ্র ও তাঁর পুত্রের সম্পর্ক



বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন