গ্রীষ্ম বা বর্ষা কাল এলেই মশার উপদ্রব বেড়ে যায়। তবে এমন একটি বিষয় প্রায়ই লক্ষ করা যায়, একই ঘরে কয়েকজন মানুষ থাকলেও মশা যেন একজনকেই বেশি কামড়ায়। অনেকেই মজা করে বলেন, “মশার মনে হয় আমার রক্তই মিষ্টি লাগে!” কিন্তু এটি কি শুধুই কাকতালীয়, নাকি এর পেছনে কোন বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে? আজ এখানে জানব মশা কিছু মানুষকে বেশি কামড়ায় কেন?
আসলে বিজ্ঞান বলছে, মশা সত্যিই কিছু মানুষে অন্যদের তুলনায় বেশি আকৃষ্ট হয়। পৃথিবীর প্রায় ২০ মানুষ মশার কাছে বেশি আকর্ষণীয়। তবে এর সঙ্গে রক্তের স্বাদের কোনও সম্পর্ক নেই। মানুষের শরীর থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড, ত্বকের গন্ধ, শরীরের তাপমাত্রা, ত্বকে থাকা অণুজীব এবং কিছু ক্ষেত্রে জিনগত বৈশিষ্ট্য — এসব মিলিয়েই নির্ধারিত হয় একজন মানুষ মশার কাছে কতটা আকর্ষণীয় হবে, মানে বেশি মশার কামড় খাবে।
মশা মানুষকে খুঁজে পায় কীভাবে ?
প্রথমেই জানতে হবে মশা মানুষকে খুঁজে পায় কীভাবে। মশার দৃষ্টিশক্তি খুব প্রখর নয়। তাই মানুষকে শনাক্ত করার জন্য তারা মূলত ঘ্রাণশক্তি এবং তাপ অনুভব ক্ষমতার উপর নির্ভর করে। আমরা যখন শ্বাস-প্রশ্বাস নিই, তখন কার্বন ডাই-অক্সাইড বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে। দূর থেকেই মশা এই গ্যাস শনাক্ত করতে পারে এবং সেই দিকে উড়ে আসে। কাছাকাছি পৌঁছানোর পর তারা শরীরের তাপ, ঘামের গন্ধ এবং ত্বক থেকে নির্গত বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থের সাহায্যে কামড়ানোর জন্য উপযুক্ত স্থান খুঁজে নেয়।
এই কারণেই একজন মানুষের পাশেই আরেকজন বসে থাকলেও মশার আচরণ দু’জনের ক্ষেত্রে এক রকম হয় না।
কার্বন ডাই-অক্সাইডের ভূমিকা
যে ব্যক্তি বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করেন, তিনি সাধারণত মশার কাছে বেশি সহজে ধরা পড়েন। প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ শিশুদের তুলনায় বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গত করেন। একইভাবে লম্বা বা ভারী গড়নের মানুষ এবং যাঁরা পরিশ্রম করছেন, তাঁদের শরীর থেকে তুলনামূলক বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড বের হয়।
গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রেও একই বিষয় দেখা যায়। গবেষণায় জানা গেছে, গর্ভাবস্থায় শরীরের বিপাকক্রিয়া বৃদ্ধি পাওয়ায় তাঁরা তুলনামূলক বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড ত্যাগ করেন এবং শরীরের তাপমাত্রাও সামান্য বেড়ে যায়। ফলে তাঁদের প্রতি মশার আকর্ষণ অন্যদের তুলনায় কিছুটা বেশি হতে পারে।
শরীরের গন্ধের ভূমিকা
প্রত্যেক মানুষের শরীরের নিজস্ব একটি গন্ধ রয়েছে। এই গন্ধ কেবল ঘামের কারণে তৈরি হয় না। ঘাম নিজে প্রায় গন্ধহীন হলেও ত্বকের উপর থাকা অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়া ঘামের বিভিন্ন উপাদান ভেঙে নানা ধরনের রাসায়নিক পদার্থ তৈরি করে। এই রাসায়নিকগুলিই মূলত শরীরের স্বতন্ত্র গন্ধ সৃষ্টি করে।
ল্যাকটিক অ্যাসিড, অ্যামোনিয়া, ইউরিক অ্যাসিড এবং কিছু ফ্যাটি অ্যাসিডের মতো পদার্থ মশাকে আকৃষ্ট করতে পারে। যাদের শরীরে এই উপাদানগুলির মাত্রা তুলনামূলক বেশি থাকে, তাদের প্রতি মশার আকর্ষণও বাড়তে পারে। তবে এগুলো একা কাজ করে না; শরীরের তাপমাত্রা এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণের সঙ্গে মিলেই এগুলোর প্রভাব পড়ে।
ত্বকের অণুজীবের ভূমিকা
আমাদের ত্বকে অসংখ্য উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাস করে, যাদের একত্রে ‘স্কিন মাইক্রোবায়োম’ বলা হয়। এই অণুজীবগুলির গঠন প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে এক নয়। ফলে একজনের শরীরের গন্ধ আরেকজনের থেকে আলাদা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু ধরনের ব্যাকটেরিয়া এমন রাসায়নিক তৈরি করে যা মশাকে বেশি আকৃষ্ট করে, আবার কিছু ব্যাকটেরিয়া উল্টো মশার আকর্ষণ কমিয়ে দিতে পারে। তাই একই পরিবারের সদস্য হলেও একজন অন্যজনের তুলনায় বেশি মশার কামড় খেতে পারেন।
শরীরের তাপমাত্রার ভূমিকা
মশা সাধারণত উষ্ণ শরীরের দিকে বেশি আকৃষ্ট হয়। ব্যায়াম করার পর, দীর্ঘক্ষণ রোদে থাকার পর কিংবা জ্বরের সময় শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। সেই সঙ্গে ঘামও বেশি হয়। এই অবস্থায় মশার কাছে মানুষ আরও সহজে ধরা পড়ে।
অনেকেই লক্ষ করেন, সন্ধ্যায় হাঁটাহাঁটি বা খেলাধুলা বা ব্যায়াম করে ফেরার পর মশা যেন বেশি কামড়ায়। এর কারণ হল তখন শরীর থেকে একসঙ্গে বেশি কার্বন ডাই-অক্সাইড, তাপ এবং ল্যাকটিক অ্যাসিড নির্গত হয়।
পোশাকের রঙের ভূমিকা
সাম্প্রতিক কয়েকটি গবেষণায় দেখা গেছে, মশা শুধু গন্ধই নয়, কিছু রঙের প্রতিও বেশি আকৃষ্ট হয়। বিশেষ করে কালো, গাঢ় নীল, লাল এবং কমলা রঙের পোশাক তাদের বেশি আকর্ষণ করতে পারে। অন্যদিকে সাদা বা হালকা রঙের পোশাক পরলে সেই আকর্ষণ কিছুটা কম হতে পারে।
তবে এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ নয়। শরীরের গন্ধ, কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং তাপমাত্রার তুলনায় পোশাকের রঙের প্রভাব অপেক্ষাকৃত কম।
রক্তের গ্রুপের ভূমিকা
অনেকের ধারণা, O গ্রুপের রক্তের মানুষকে মশা বেশি কামড়ায়। কিছু বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এমন একটি প্রবণতার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও সব গবেষণায় একই ফল পাওয়া যায়নি। তাই বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, রক্তের গ্রুপের প্রভাব থাকলেও সেটি খুবই সীমিত। মশার আচরণ নির্ধারণে শরীরের গন্ধ, ত্বকের রাসায়নিক পদার্থ এবং কার্বন ডাই-অক্সাইডের ভূমিকা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
জিনগত বৈশিষ্ট্যের ভূমিকা
মানুষের জিন নির্ধারণ করে শরীরে কোন ধরনের রাসায়নিক কতটা তৈরি হবে এবং ত্বকের অণুজীবের গঠন কেমন হবে। তাই একই পরিবেশে থাকা দুই ব্যক্তির ক্ষেত্রেও মশার আকর্ষণ ভিন্ন হতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, কারও প্রতি মশার বেশি আকৃষ্ট হওয়ার পেছনে জিনগত কারণও আংশিকভাবে দায়ী।
মশার কামড় থেকে কীভাবে বাঁচবেন?
মশার কামড় এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায় হল ব্যক্তিগত সুরক্ষা এবং আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা। সন্ধ্যার পর লম্বা হাতা পোশাক পরা, মশারি ব্যবহার করা, দরজা-জানালায় জালি লাগানো এবং প্রয়োজনে অনুমোদিত মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করলে ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। পাশাপাশি বাড়ির আশপাশে কোথাও যেন জল জমে না থাকে, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি। কারণ জমে থাকা জল মশার বংশবিস্তারের প্রধান স্থান।
পরিশেষে বলা যায়, মশা কিছু মানুষকে বেশি কামড়ায় — এটি কোনও ভ্রান্ত ধারণা নয়, বরং বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত একটি বিষয়। তবে এর পিছনে একক কোনও কারণ কাজ করে না। শরীর থেকে নির্গত কার্বন ডাই-অক্সাইড, ত্বকের গন্ধ, স্কিন মাইক্রোবায়োম, শরীরের তাপমাত্রা, পোশাকের রঙ এবং জিনগত বৈশিষ্ট্য — এসব একসঙ্গে মশার আচরণকে প্রভাবিত করে। তাই কেউ যদি অন্যদের তুলনায় বেশি মশার কামড় খেয়ে থাকেন, তার অর্থ এই নয় যে তাঁর রক্ত মশার মিষ্টি লাগে; বরং তাঁর শরীর থেকে নির্গত বিভিন্ন প্রাকৃতিক সংকেতই মশাকে বেশি আকৃষ্ট করছে।
আশা করি বোঝা গেল, ‘মশা কিছু মানুষকে বেশি কামড়ায় কেন?’। বিজ্ঞানের এই ধরণের কার্য-কারণ সম্পর্ক বা “কেন” বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর জানতে এখানে দেখুন। আর আপনার মাথায় এরকম কোন প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট করে জানান, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান