গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া (Gateway of India) হল মুম্বাইয়ের একটি বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্মৃতিস্তম্ভ। আরব সাগরের তীরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্মৃতিস্তম্ভ হল শহরের অন্যতম প্রধান পর্যটন ক্ষেত্র। ভারত সফরকারী প্রথম এবং একমাত্র ব্রিটিশ রাজ-দম্পতি পঞ্চম জর্জ ও রানি মেরির ভারত আগমন স্মরণণীয় করে রাখতে গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া তৈরি করা হয়েছিল। ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রতীক হিসেবে নির্মিত হলেও, পরবর্তীকালে এই স্থাপত্য ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়। এই তোরণের মধ্যে দিয়ে শেষ ব্রিটিশ সামরিক ইউনিট ভারত ত্যাগ করেছিল। এই রাজকীয় গেটওয়ে পর্যটন ও ঐতিহাসিক তাৎপর্যের পাশাপাশি স্থানীয় ইহুদি সম্প্রদায়ের ‘হানুক্কা’ উদযাপনের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া কোথায়
গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া মুম্বাইয়ের কোলাবা এলাকায় আরব সাগরের তীরে অবস্থিত। এই স্থাপত্যের উল্টো দিকে রয়েছে মুম্বাইয়ের বিখ্যাত তাজমহল প্যালেস।
গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার ইতিহাস
ব্রিটিশ শাসিত ভারতবর্ষে ব্রিটিশরা রাজা-রানিদের আগমন বা মৃত্যুকে স্মরণীয় করে রাখতে বিভিন্ন স্মৃতিস্তম্ভ নির্মাণ করত। ১৯১১ সালের ডিসেম্বর মাসে ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ ও রানি মেরির প্রথম ভারত ভ্রমণের ঘটনাকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। তাঁরা ছিলেন ভারত সফরকারী প্রথম ব্রিটিশ রাজ-দম্পতি। সেই সময় ব্রিটিশ কর্মকর্তারা তৎকালীন ওয়েলিংটন ফাউন্টেনের কাছে স্ট্র্যান্ড রোডে আরব সাগরের দিকে মুখ করে একটি বিশাল তোরণ নির্মাণের প্রস্তাব দেন। তবে ভারতে অবতরণের সময় এই রাজ দম্পতি কার্ডবোর্ডে কেবল এই স্থাপত্যটির একটি মডেল দেখেছিলেন। কার্ডবোর্ডের একটি প্রতিরূপ রাজপরিবারকে উপহার দেওয়া হয়। গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার নির্মাণের কাজ শুরু হয় অনেক পরে ১৯১৩ সালে।
আসলে এই সময় ব্রিটিশরা ভারতে একটি জমকালো প্রবেশদ্বার তৈরি করতে চেয়েছিল। আরব সাগরের তীরে অবস্থিত এই স্থাপত্য দেখে যাতে সমুদ্র থেকে আসা যে কেউ ব্রিটিশদের ঔপনিবেশিক শক্তির বিশালত্ব অনুভব করতে পারে।
১৯১৩ সালে তৎকালীন বোম্বের গভর্নর স্যার জর্জ সিডেনহ্যাম ক্লার্ক গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৯১৪ সালে স্থপতি জর্জ উইটেট এই স্থাপত্যের চূড়ান্ত নকশা তৈরি করেন। শোনা যায় যে, এই স্থাপত্য নির্মাণ করার আগে ওই স্থান ছিল স্থানীয় মৎসজীবীদের মাছ ধরার একটি জায়গা ও মাছের বাজার। স্থপতি জর্জ উইটেটের নকশা অনুসারে গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার নির্মাণকাজ সম্পন্ন করে গ্যামন ইন্ডিয়া। আর এই স্থাপত্য নির্মাণের পর ১৯২৪ সালে তা সর্বসাধারণের জন্য খুলে দেন তৎকালীন ভাইসরয় রুফাস আইজ্যাকস।
গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া নির্মাণের পর এই গেটওয়েটি ব্রিটিশ রাজ কর্মকর্তাদের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ ভারতের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা, গভর্নর, ভাইসরয় এবং বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সমুদ্রপথে বোম্বেতে আসার সময় এর মধ্যে দিয়েই ভারতে প্রবেশ করতেন।
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর শেষ ব্রিটিশ সামরিক ইউনিট সমারসেট লাইট ইনফ্যান্ট্রির ১ ব্যাটালিয়নের অফিসার ও সৈন্যরা গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার মধ্যে দিয়ে ভারত ত্যাগ করে। তারপর থেকে এই স্থাপত্য ভারতে ঔপনিবেশিক শাসনের সমাপ্তির প্রতীক হয়ে ওঠেছে। সেই সময় এই স্থানে এক জমকালো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এই অনুষ্ঠানে নবগঠিত ভারতীয় সেনাবাহিনীর সদস্যরা ওই ব্রিটিশ সেনাদের গার্ড অফ অনার দেয় এবং অস্ত্র প্রদর্শন করে সামরিক অভিবাদন জানায়। এছাড়া ভারতীয় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে রেজিমেন্টটিকে গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার একটি রৌপ্য প্রতিরূপ উপহার দেওয়া হয়। এইভাবে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য অস্তমিত হয়।
পরবর্তীকালে এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যের পাথরের অনেক অংশ শ্যাওলা পড়ে কালো হয়ে গেছে। আবার এই স্থাপত্যের উপরিভাগের কোন কোন অংশে ফাটল দেখা গেছে। তাই মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকার এই স্মৃতিস্তম্ভে পাথরের ক্ষয় রক্ষা করার জন্য ২০১৯ সালে একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে। বর্তমানে গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার রক্ষণাবেক্ষণ ও সংরক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে মহারাষ্ট্র সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগ ও মুম্বাই পোর্ট অথোরিটি।
গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার গঠনশৈলী
গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া বর্তমানে ছত্রপতি শিবাজী মহারাজ মার্গের শেষ প্রান্তে অবস্থিত। এই স্থাপত্য প্রধান রাস্তার একেবারে সামনে নির্মাণ করার পরিকল্পনা ছিল। তবে কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে এটি মূল রাস্তা থেকে কিছুটা সরিয়ে আরব সাগরের মুখোমুখি তৈরি করা হয়। গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার উচ্চতা প্রায় ২৬ মিটার বা ৮৫ ফুট উঁচু। এই আয়তাকার কাঠামোটি হলুদ ব্যাসল্ট পাথর ও কংক্রিট দিয়ে তৈরি করা হয়। এই পাথরগুলি স্থানীয় এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হয় আর এখানকার জালিগুলি গোয়ালিয়র থেকে আনানো হয়। ষোড়শ শতাব্দীর গুজরাটি স্থাপত্যের উপাদান দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ইন্দো-সারাসেনিক শৈলীতে নির্মাণ করা হয়েছিল এই গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া। এখানে হিন্দু, ইসলামিক এবং ইউরোপীয় শৈলীর সংমিশ্রণ দেখা যায়। এখানকার শীর্ষে থাকা বিশাল গম্বুজটি ইসলামী স্থাপত্যের প্রতীক হিসাবে বিদ্যমান। এই গম্বুজের ব্যাস প্রায় ১৫ মিটার বা ৪৯ ফুট। এছাড়া প্যারিসের আর্ক দ্য ট্রিয়াম্ফ দ্যু ক্যারোসেল (Arc de Triomphe du Carrousel)-এর আদর্শে এই স্থাপত্যের তোরণটি তৈরি করা হয়।
গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার মূল খিলানটি সবচেয়ে উঁচু ও প্রশস্ত। এই খিলানের উপরের তলায় রয়েছে চারটি বুরুজ। এখানকার বড় ও ছোট সব খিলানে একই রকম নকশা দেখতে পাওয়া যায়। এই স্থাপত্যের বাইরের দিকে ভারতীয় ঘরানার বিভিন্ন সূক্ষ্ম কারুকার্য, সুন্দর অলঙ্করণ ও ছোট খিলানগুলোর চারপাশে জালি পর্দা দেখা যায়। এই স্থাপত্যের ভিতরের দিকের সিঁড়ি বুরুজগুলোর ছাদে যাওয়ার জন্য ব্যবহার করা হয়। এছাড়া এই স্থাপত্যের পিছনের দিকে আরব সাগরে যাওয়ার জন্য সিঁড়ি রয়েছে। এই বিশাল স্থাপত্যটি তৈরি করার সময় সরকারি তহবিল থেকে প্রায় ২১ লক্ষ টাকা ব্যয় করা হয়।
গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার প্রাঙ্গণে সম্রাট পঞ্চম জর্জের একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি প্রতিস্থাপন করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে ১৯৬১ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে ওই মূর্তি সরিয়ে মারাঠা সম্রাট শিবাজীর একটি মূর্তি উন্মোচন করা হয়। এছাড়া এই চত্বরে রয়েছে ভারতীয় সন্ন্যাসী স্বামী বিবেকানন্দের একটি মূর্তি। ব্রোঞ্জের এই মূর্তিটি ভারতীয় সংস্কৃতি ও হিন্দু দর্শনকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার জন্য স্বামী বিবেকানন্দের অবদানকে সম্মান জানিয়ে স্থাপন করা হয়।
জনজীবনে গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার প্রভাব
বর্তমানে গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া মুম্বাই শহরের সমার্থকে পরিণত হয়েছে। এখন এই স্থাপত্য মুম্বাইয়ের সর্বশ্রেষ্ঠ পর্যটন ক্ষেত্র। এখান থেকে সমুদ্রের এক দীর্ঘ বিস্তৃত রূপ দেখা যায়, যা এই স্থানটিকে প্রতিদিন সৌন্দর্যে ভরিয়ে তোলে। সকাল-সন্ধ্যা মনোরম আবহাওয়া এবং আরব সাগরের এই অবিস্মরণীয় রূপ উপভোগ করতে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ায় ভ্রমণ করতে যায়। এখানে ভ্রমণকারীদের জন্য সমুদ্রের ধারে বসে মনোরম দৃশ্য উপভোগ করার ব্যবস্থা আছে। গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া ভ্রমণের সেরা সময় হল শীতকাল বা বর্ষাকাল। অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার তাপমাত্রা মনোরম থাকায় এই সময় সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীর সমাগম হয়। বড়দিনের সময় ও নববর্ষের প্রাক্কালে এই এলাকা বিভিন্ন রঙে সেজে ওঠে। আর বর্ষাকালে আকাশের রঙের সাথে আরব সাগরের ঢেউয়ের মিলনের এক স্বর্গীয় মিলনের সাক্ষী হওয়ার জন্য মানুষ এখানে যায়। প্রকৃতির এই জাদু মুম্বাইবাসী তথা সকল দর্শনার্থীর কাছেই অবিস্মরণীয় অনুভূতি। এখানকার অপরূপ প্রাকৃতিক মহিমার পাশাপাশি এই স্থাপত্যশৈলীর সৌন্দর্য মানুষ এখানে উপভোগ করতে পারে।
২০০৩ সাল থেকে প্রতি বছর গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার সামনে ইহুদিরা আট দিনব্যাপী আলোর উৎসব ‘হানুক্কা’ পালন করে। এই অনুষ্ঠানে একটি বিশাল মেনোরাহ বা নয়টি শাখাবিশিষ্ট মোমবাতিদানিতে আলো জ্বালানো হয়। এটি অন্ধকারের বিরুদ্ধে আলো এবং শান্তির প্রতীক হিসেবে পালন করা হয়। এখানে মুম্বাইয়ের ইহুদি সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি ও শহরের ইতিহাসের এক মিলন দেখা যায় । ২০১২ সালে বোটের অভাব ও দর্শক সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে মহারাষ্ট্র পর্যটন উন্নয়ন কর্পোরেশন এলিফ্যান্টা গুহা থেকে এলিফ্যান্টা সঙ্গীত ও নৃত্য উৎসবকে গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়ার প্রাঙ্গণে স্থানান্তরিত করে। তারপর থেকে এই স্থানেই প্রতি বছর ওই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।
গেটওয়ে অফ ইন্ডিয়া সপ্তাহের সব দিন খোলা থাকে। এই স্মৃতিস্তম্ভটিতে শনিবার ও রবিবার রাতে লাইট অ্যান্ড সাউন্ড শো চালু করা হয়েছে। এই শোয়ের মাধ্যমে মহারাষ্ট্রের ইতিহাস, বীরত্ব এবং ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে রাজ্যের অবদান তুলে ধরা হয়। বর্তমানে বিভিন্ন সিনেমার শুটিংয়ের মাধ্যমে এই স্থানটি আরও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান