সববাংলায়

কোদিনহি: রহস্যময় যমজ গ্রাম

বিভাগঃ ,

সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে, বিশ্বের কোথাও না কোথাও নিজের মতো দেখতে আরেকজন মানুষ আছে। তবে বাস্তবে হুবহু একই রকম দেখতে মানুষ খুব একটা দেখা যায় না। কিন্তু আপনি শুনলে অবাক হবেন যে, ভারতের একটি ছোট্ট গ্রামে শুধু এক জোড়া নয়, কয়েকশো জোড়া যমজ ভাইবোন একসঙ্গে বসবাস করে। বর্তমানে কেরালার কোদিনহি গ্রামে কয়েকশো জোড়া যমজ মানুষের বাস রয়েছে বলে মনে করা হয়। প্রতি ১,০০০ জন্মে এখানে প্রায় ৪৫টি যমজ জন্মের ঘটনা দেখা যায়, যা ভারতের জাতীয় গড়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। রাস্তাঘাটে, খেলার মাঠে, স্কুলে—সর্বত্রই দেখা মেলে যমজদের। আরও আশ্চর্যের বিষয় হল, স্থানীয়দের মধ্যে অনেকেই দাবি করেন যে কোদিনহি গ্রামের মেয়েদের অন্যত্র বিয়ে হলেও তাঁদের যমজ সন্তান হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। আবার অন্য এলাকার নারীরা কোদিনহিতে বিয়ে করে এলে তাঁদের মধ্যেও যমজ সন্তানের জন্মের ঘটনা ঘটেছে বলে শোনা যায়। এর পেছনে জিনগত, পরিবেশগত নাকি অন্য কোনো জৈবিক কারণ কাজ করছে, তা এখনও নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। এই কারণেই ভারতের কোদিনহি গ্রাম আজও গবেষক ও সাধারণ মানুষের কাছে এক রহস্যময় স্থান হিসেবে পরিচিত।

দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ দেশ ভারতে ভাষা, ধর্ম কিংবা প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের কোনও অভাব নেই। ভারতের এই বৈচিত্র্যের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের রহস্য। এইরকম এক রহস্য লুকিয়ে রয়েছে কেরালার মালাপ্পুরম জেলার কোদিনহি (Kodinhi) গ্রামে। উত্তর কেরালার এই শান্ত গ্রাম মানব জীববিজ্ঞানের অনেক প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে। কোচি বন্দর থেকে প্রায় ১৫০ কিমি দূরত্বের এই গ্রাম অস্বাভাবিক উচ্চ যমজ সন্তানের জন্মহারের জন্য বিশ্বে ‘টুইন ভিলেজ’ বা ‘যমজ গ্রাম’ নামে পরিচিত। কোদিনহি ধানক্ষেত, নারকেল বাগান এবং সরু রাস্তা দ্বারা পরিবেষ্টিত একটি শান্ত, কৃষিভিত্তিক গ্রাম। এখানকার অধিকাংশ বাসিন্দা মুসলিম হলেও যমজ সন্তান জন্মের ক্ষেত্রে ধর্মভেদে কোনো উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায় না।

গবেষকদের ধারণা, এই গ্রামে অস্বাভাবিক হারে যমজ সন্তানের জন্ম শুরু হয়েছিল প্রায় ৬০ থেকে ৭০ বছর আগে। প্রথমদিকে যমজ শিশুর সংখ্যা স্বাভাবিক থাকলেও পরবর্তী সময়ে তা ক্রমশ বৃদ্ধি পায়। বর্তমানে এটি বিশ্বের অন্যতম উচ্চ যমজ জন্মহারের গ্রাম হিসেবে পরিচিত। গ্রামের বহু পরিবারেই যমজ সন্তান দেখা যায়। ২০০৮ সাল পর্যন্ত কোদিনহিতে আনুমানিক ২,০০০ পরিবার ছিল এবং তখন প্রায় ২৮০ জোড়া যমজ মানুষের উপস্থিতি নথিভুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে এই সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ধারণা করা হয়। কোদিনহিতে প্রতি ১,০০০ জন্মে প্রায় ৪৫টি যমজ জন্মের ঘটনা দেখা যায়, যেখানে সমগ্র ভারতে এই হার গড়ে প্রতি ১,০০০ জন্মে প্রায় ৯টি। বিশ্বব্যাপী এই হার সাধারণত প্রতি ১,০০০ জন্মে ৬ থেকে ১২টির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

২০০৬ সালে এই গ্রামের একটি স্কুলের অষ্টম শ্রেণির দুই যমজ ছাত্রী একটি অস্বাভাবিক বিষয় লক্ষ করেছিল। তারা দেখে যে, শুধু তাদের শ্রেণিকক্ষেই আট জোড়া যমজ ছাত্রছাত্রী রয়েছে। কৌতূহলবশত শিক্ষকদের সহায়তায় তারা আরও পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, ওই একটি স্কুলেই ২৪ জোড়া যমজ ছাত্রছাত্রী পড়াশোনা করছে।

এরপর ২০০৮ সালের দিকে একটি গ্রামভিত্তিক সমীক্ষায় দেখা যায় যে, কোদিনহিতে আনুমানিক ২৮০ জোড়া যমজ মানুষ রয়েছে। সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর কোদিনহি আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি লাভ করে। গ্রামের অনেক বাসিন্দাই তখন প্রথম উপলব্ধি করেন যে, তাঁদের গ্রামটি যমজ সন্তানের অস্বাভাবিক সংখ্যার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। এরপর তাঁরাও এই রহস্যের ব্যাখ্যা জানতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

কোদিনহির যমজ সন্তানদের কথা বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ার পর জেনেটিক বিশেষজ্ঞরা এই রহস্যের সমাধান খুঁজতে এগিয়ে আসেন। ২০১৬ সালে হায়দরাবাদের সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি, কোচির কেরালা ইউনিভার্সিটি অব ফিশারিজ অ্যান্ড ওশান স্টাডিজ, জার্মানির টিউবিনজেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ট্রপিক্যাল মেডিসিন এবং লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজের গবেষকদের সমন্বয়ে একটি আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দল কোদিনহির যমজদের নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করে। তাঁরা জিনগত পরীক্ষা, শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং স্থানীয় পরিবেশের বিভিন্ন দিক বিশ্লেষণ করেছিলেন।

এখানকার স্থানীয় লোকজন বিশ্বাস করেন যে, গ্রামের পরিবেশ, খাদ্যাভ্যাস কিংবা পানীয় জলের কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণেই এখানে এত বেশি যমজ সন্তানের জন্ম হয়। আবার অনেকের মতে, বিবাহসূত্রে কোদিনহিতে আসা নারীদের মধ্যেও যমজ সন্তানের জন্মের ঘটনা দেখা যাওয়ায় এর পিছনে জিনগত কোনও কারণ থাকতে পারে। তবে গবেষণায় কেরালার অন্যান্য গ্রামের সঙ্গে কোদিনহির খাদ্যাভ্যাস ও পরিবেশের উল্লেখযোগ্য কোন পার্থক্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। বিভিন্ন গবেষণা ও জিনগত বিশ্লেষণ সত্ত্বেও এখনও পর্যন্ত কোদিনহিতে অস্বাভাবিক হারে যমজ সন্তান জন্মের কোন সর্বজনস্বীকৃত বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ফলে গ্রামটি আজও গবেষণার এক আকর্ষণীয় বিষয় হয়ে রয়েছে।

শুধু ভারতের কোদিনহি নয়, নাইজেরিয়ার ইগবো-ওরা (Igbo-Ora) এবং ব্রাজিলের ক্যানডিডো গোডোই (Cândido Godói) শহরেও অস্বাভাবিক সংখ্যায় যমজ সন্তানের দেখা মেলে। নাইজেরিয়ার ইগবো-ওরায় যমজ সন্তানের উচ্চ হারের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে স্থানীয় খাদ্যাভ্যাসকে দায়ী করা হয়। বিশেষ করে সেখানে প্রচুর পরিমাণে ইয়াম (yam) বা এক ধরনের কন্দজাতীয় খাদ্য খাওয়া হয়, যা নারীদের ডিম্বস্ফোটনকে প্রভাবিত করতে পারে বলে কিছু গবেষক ধারণা করেছেন। আবার ব্রাজিলের ক্যানডিডো গোডোই অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে সীমিত জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিবাহ এবং কিছু নির্দিষ্ট জিনগত বৈশিষ্ট্যের প্রভাবকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তবে এসব ব্যাখ্যা নিয়েও গবেষকদের মধ্যে সম্পূর্ণ ঐকমত্য নেই। তবে অন্যান্য অঞ্চলের ক্ষেত্রে কিছু সম্ভাব্য ব্যাখ্যা পাওয়া গেলেও কোদিনহির রহস্য এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।

কোদিনহি গ্রামে বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির এক বিরল মেলবন্ধন দেখা যায়। এখানকার মানুষ মনে করেন, এত বেশি যমজ সন্তানের জন্ম তাঁদের জন্য এক বিশেষ আশীর্বাদ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই বৈশিষ্ট্যই গ্রামের পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। তাই গ্রামের প্রবেশপথে একটি ফলকে লেখা রয়েছে—‘ঈশ্বরের আপন যমজ গ্রাম – কোদিনহি’।

যমজ সন্তান ও তাঁদের পরিবারগুলোর সহায়তার জন্য ২০০৮ সালে এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় ভারতের প্রথম যমজ সংগঠন—‘দ্য টুইনস অ্যান্ড কিনস অ্যাসোসিয়েশন’ (The Twins and Kins Association বা TAKA)। একাধিক সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে আর্থিক সহায়তা, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং পারস্পরিক সহযোগিতার উদ্দেশ্যে এই সংগঠনটি কাজ করে।

কোদিনহির যমজ সন্তান হওয়ার রহস্য আজও পুরোপুরি উদ্ঘাটিত না হলেও এই বিশেষ বৈশিষ্ট্য গ্রামটিকে গবেষক, সাংবাদিক ও পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় করে তুলেছে। বার্ষিক সমাবেশ ও বিভিন্ন উৎসবে এখানে যমজত্বকে উদ্‌যাপন করা হয়। এসব অনুষ্ঠান কেরালা এবং ভারতের অন্যান্য অঞ্চল থেকে বহু দর্শনার্থীকে আকৃষ্ট করে। ফলে কোদিনহি আজ শুধু একটি গ্রাম নয়, বরং মানব জীববিজ্ঞানের এক অনন্য ও রহস্যময় অধ্যায়ে পরিণত হয়েছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading