বিজ্ঞান

টাচ স্ক্রিন কাজ করে কীভাবে

আমরা আজকাল এই ইলেকট্রনিক্স ও টেকনোলজির যুগে বেশ কিছু ডিভাইস বা যন্ত্র ব্যবহার করি যেখানে কেবলমাত্র যন্ত্রটির স্ক্রিন স্পর্শ বা টাচ করলেই কাজ হয়ে যায়। বিভিন্ন স্মার্টফো্ন, ব্যাঙ্কের কিয়স্ক, অত্যাধুনিক ল্যাপটপ ইত্যাদিতে আমরা এমন কিছু স্ক্রিনে কাজ করি যেখানে স্পর্শ দ্বারাই সব কিছু করা যায়। এই স্ক্রিনগুলোকে বলা হয় ‘টাচ স্ক্রিন’। নিঃসন্দেহে এই টাচ স্ক্রিন প্রযুক্তির ফলে কীবোর্ড বা মাউসের ব্যবহার কমলেও, এর স্মার্টনেসের দরুণ এ যেন কাজ করার ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য ও প্রিয়তম অঙ্গ হয়ে উঠেছে। এক স্পর্শেই গোটা দুনিয়ার তথ্য হাতের মুঠোয়। হয়ত আপনি এই লেখাটিও পড়ছেন এমনই এক ‘টাচ স্ক্রিন’ যুক্ত যন্ত্রে। আমরা এই টাচ স্ক্রিন কাজ করে কীভাবে সে ব্যাপারে জানব। 

বিভিন্ন ধরণের টাচ স্ক্রিন বিভিন্ন উপায়ে কাজ করে। কিছু টাচ স্ক্রিন কোন এক মুহুর্তে একটি আঙুলের স্পর্শ অনুধাবন করতে পারে, ওই মুহুর্তে আঙুলের একাধিক জায়গায় স্পর্শ তাদের বিভ্রান্ত করে তুলতে পারে। আবার অন্যগুলো আমাদের স্পর্শের ধরণ লক্ষ্য করে সেগুলোকে আলাদা ভাবে বুঝে আমরা যা চাইছি সেটাই স্ক্রিনে দেখায়। টাচ স্ক্রিন প্রযুক্তিতে বিভিন্ন উপাদান ব্যবহৃত হয়ে থাকে। একটা সাধারণ টাচ স্ক্রিনে তিনটে মূল বা প্রধান উপাদান থাকে যথা টাচ সেন্সর, কন্ট্রোলার বা নিয়ামক এবং সফটওয়্যার ড্রাইভার।এই তিন উপাদানের দ্বারা আর ডিস্প্লে এবং ব্যক্তিগত কম্পিউটার বা পার্সোনাল কম্পিউটার(পিসি) বা স্মার্টফোনের সাথে সংযুক্ত হয়ে টাচ স্ক্রিন সিস্টেম কাজ করে।  

টাচ সেন্সর:- সাধারণত এই সেন্সরটিতে একটি বৈদ্যুতিক কারেন্ট বা সংকেত বা সিগনাল থাকে এবং স্ক্রিনে স্পর্শ করলে এই সংকেত বা সংকেতের একটা পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তনই স্ক্রিনে কোন জায়গায় টাচ হচ্ছে বা স্পর্শ করা হচ্ছে তা নির্ধারণ করতে পারে। 

টাচ সেন্সর সাধারণত তিন  ধরণের হয়ে থাকে- রেজিস্টিভ (resistive), ক্যাপাসিটিভ (capacitive), সারফেস অ্যাকস্টিক ওয়েভ (surface acoustic wave) এবং ইনফ্রারেড(Infrared) । এদের মধ্যে রেজিস্টিভ এবং ক্যাপাসিটিভ বেশি ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তার মধ্যে অবশ্য রেজিস্টিভ টাচ সেন্সর সব থেকে বেশি ব্যবহৃত হয়।

প্রতিরোধমূলক বা রেজিস্টিভ টাচ সেন্সরে দুটো বিদ্যুৎ প্রবাহী (conductor) স্তর থাকে যা সাধারণত ইন্ডিয়াম টিন অক্সাইড দিয়ে তৈরি হয় এবং এই স্তরদুটির মাঝে সামান্য ফাঁক রাখা হয়। যখন আমরা টাচ স্ক্রিনে স্পর্শ করি তখন সেই দুটো স্তরের মধ্যে যোগাযোগ ঘটে, ফলে তড়িত প্রবাহের সৃষ্টি হয়। আসলে ওই দুই স্তরের যোগাযোগ বৈদ্যুতিক প্রবাহে বা বলা ভালো ভোল্টেজে কিছু পরিবর্তন ঘটায় যা সেই টাচ স্ক্রিনে স্পর্শ করার ঘটনাটিকে চিহ্নিত করে কন্ট্রোলারের কাছে পাঠায় প্রসেসিং-এর জন্যে। এই সেন্সরটি ব্যবহার করতে আমাদের আঙুল বা স্টাইলাস কাজে লাগে। আমাদের স্পর্শের চাপেই এই রেজিস্টিভ টাচ সেন্সর কাজ করে। আমরা গ্লাভস পরেও এই রেজিস্টিভ টাচ সেন্সর ব্যবহার করতে পারি। এই প্রযুক্তিটি তুলনামূলকভাবে পুরনো। স্মার্টফোন, কী-প্যাড, ট্র্যাকপ্যাড ও ট্যাবলেট ইত্যাদিতে এই টাচ সেন্সর ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এই টাচ সেন্সর খুব সহজে পাওয়া গেলেও আর এর প্রস্তুত করার দাম কম হলেও, এটা প্রযুক্তিগত অতটা টেকসই নয় কারণ এই টাচ সেন্সর একটু আঘাতেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

ক্যাপাসিটিভ সেন্সর ক্যাপাসিটিভ (অর্থাৎ যা আধান বা চার্জকে ধরে রাখে, এক্ষেত্রে ইলেকট্রোস্ট্যাটিক আধান বা চার্জ) উপাদানের স্তর ব্যবহার করে থাকে যা যখন আমরা টাচ স্ক্রিনে স্পর্শ করি তখন ইলেকট্রোস্ট্যাটিক আধানের পরিমাণে পরিবর্তন ঘটায়।আসলে আমাদের আঙুলের ত্বকে থাকা স্থির বিদ্যুৎ কিংবা কোনো স্থির বিদ্যুৎ যুক্ত স্টাইলাসের সংযোগের ফলে এই টাচ সেন্সর কাজ করে। এই ক্যাপাসিটিভের ক্ষেত্রে একটা স্বচ্ছ ইলেকট্রোডের ফিল্ম স্ক্রিনের গ্লাস প্যানেলের ওপর দেওয়া থাকে। আমাদের আঙুলে থাকা স্থির বিদ্যুৎ ওই ইলেকট্রোডের ফিল্মের সংস্পর্শে এলে কিছু আধান স্ক্রিনের থেকে ব্যবহারকারীর দিকে চলে যায়। আধান কমে যাওয়ার ফলে যে ধারকত্বের হ্রাস তৈরি হয় তা স্ক্রিনের চার প্রান্তে থাকা সেন্সরগুলি নির্ণয় করে। আর এই নির্ণয়ের ফলেই কন্ট্রোলার স্পর্শের জায়গা বা টাচ পয়েন্ট নির্ধারণ করে। অর্থাৎ, এই ক্যাপাসিটিভ সেন্সরটি কাজ করে আমাদের চামড়ার স্পর্শে। অত্যাধুনিক মোবাইল বা স্মার্টফোন, আইপড, অটোমোটিভ ইত্যাদি জায়গায় ক্যাপাসিটিভ টাচ সেন্সর ব্যবহৃত হয়। যেহেতু এখানে চার্জের ব্যাপার আছে তাই গ্লাভস ব্যবহার করা যায় না। ক্যাপাসিটিভ কিন্তু বেশ টেকসই আর দামের দিক থেকেও রেজিস্টিভের থেকে বেশি। 

সারফেস অ্যাকস্টিক ওয়েভ টাচ স্ক্রিনের ক্ষেত্রে আলট্রাসনিক তরঙ্গ দিয়ে কোন স্থানে স্পর্শ করা হয়েছে তা বের করা হয়। একটি সারফেস অ্যাকস্টিক ওয়েভ টাচ স্ক্রিন প্রেরণকারী ট্রান্সডুসার, গ্রহণকারী ট্রান্সডুসার এবং প্রতিফলক দিয়ে তৈরি। প্রেরণকারী ট্রান্সডুসারগুলি আলট্রাসনিক তরঙ্গ তৈরি করে যা স্ক্রিনের পৃষ্ঠের উপরে ছড়িয়ে পড়ে, প্রতিফলিত হয় এবং গ্রহণকারী ট্রান্সডুসারদের দ্বারা গৃহীত হয়। যখন মানুষের ত্বকের মতো কোনও নরম পদার্থ পর্দা স্পর্শ করে, পৃষ্ঠের অ্যাকস্টিক তরঙ্গগুলি শোষিত হয় এবং গ্রহণকারী ট্রান্সডুসারগুলি কোনও ইনপুট পায় না। এই ইনপুট এর অভাবের ভিত্তিতে সেন্সরগুলি স্পর্শ স্থানের অবস্থান নির্ণয় করতে পারে।

বর্তমানে সব থেকে বেশি উন্নত প্রযুক্তি হল ইনফ্রারেড প্রযুক্তি। এটি ইনফ্রারেড আলো ব্যবহার করে কোন স্থানে ব্যবহারকারী স্পর্শ করেছে তা নির্ণয় করে। এই ক্ষেত্রে স্ক্রিন এর উপরে আনুভূমিক ও উল্লম্বভাবে বেশ কিছু এলইডি (LED) লাইট সেন্সর থাকে, যখন কোন স্থানে স্পর্শ হয় সেখানে আলোকরশ্মি গ্রিডে বাধার সৃষ্টি হয় এবং লাইট সেন্সর দ্বারা কোন স্থানে স্পর্শ হয়েছে তা নির্ণয় করে। এই পদ্ধতিটি খুব উন্নত হলেও অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় ব্যবহার কম হয়।

কন্ট্রোলার বা নিয়ামক:- এই কন্ট্রোলার বা নিয়ামক উপাদানটি টাচ সেন্সর এবং পার্সোনাল কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের মাঝে সংযুক্ত করা হয়ে থাকে। এই কন্ট্রোলার টাচ সেন্সরের থেকে তথ্য নিয়ে সেগুলো যাতে ব্যক্তিগত কম্পিউটার কিংবা স্মার্টফোন বুঝতে পারে তার জন্যে অনুবাদ করে পাঠায়।এই কন্ট্রোলার সেন্সরের থেকে তথ্য নিয়ে স্পর্শের সঠিক অবস্থান নির্ণয় করে এবং স্পর্শ অনুযায়ী পাওয়া তথ্যটি সফটওয়্যারে পাঠায় যা স্পর্শ অনুযায়ী কাঙ্খিত ফলাফল দেখায়। এই গোটা প্রক্রিয়াটি জটিল শোনালেও এক সেকেন্ডের একশো কোটি ভাগ যাকে ন্যানোসেকেন্ড বলা হয়, তার মধ্যেও ঘটে যেতে পারে! এছাড়াও, এই কন্ট্রোলার কি ধরণের সংযোগ লাগবে তা নির্ধারণ করে থাকে। এই কন্ট্রোলারের কাজটা কিছুটা কম্পিউটারের সিপিইউয়ের মতো।     

সফটওয়্যার ড্রাইভার:- এই সফটওয়্যার ড্রাইভার স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের সাথে টাচ স্ক্রিন কাজ একসাথে কাজ করতে সহায়তা করে। এটা কন্ট্রোলার থেকে প্রেরিত তথ্য নিয়ে কী করা হবে সে ব্যাপারে কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের অপারেটিং সিস্টেমকে (যেমন অ্যান্ড্রয়েড) জানান দেয়। 

টাচ স্ক্রিন কাজ করে কীভাবে বিষয়টি যথা সম্ভব সরলভাবে এখানে তুলে ধরা হল। আরও কম খরচে আরও কার্যকরী টাচ স্ক্রিন তৈরি করার নান গবেষণা চলছে, ভবিষ্যতে আরও নতুন প্রযুক্তি আসবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়।  

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়



তাঁর সম্বন্ধে জানতে এখানে ক্লিক করুন