সববাংলায়

সাপের বিষের প্রতিষেধক তৈরি করা হয় কীভাবে

বিভাগঃ ,

সাপের বিষের একমাত্র ওষুধ হল এর  অ্যান্টিভেনম (antivenom)। ১৮৯৪ সালে আলবার্ট ক্যালমেট (Albert Calmette) নামে এক ফরাসি বিজ্ঞানী বিশ্ব বিখ্যাত পাস্তুর ইনস্টিটিউটে কোবরা সাপের বিষের বিরুদ্ধে এই প্রতিষেধক আবিষ্কার করেন। সেই থেকে সারা পৃথিবী জুড়ে সাপের কামড়ের ওষুধ হিসাবে এর বহুল ব্যবহার হয়ে চলেছে। এখানে সাপের বিষের প্রতিষেধক তৈরি করা হয় কীভাবে সেই বিষয়ে জানব।

সাপের বিষের প্রতিষেধক নিয়ে জানতে গেলে আমাদের প্রথমে দেহের রোগ প্রতিরোধ তন্ত্র সম্পর্কে জানতে হবে। আমাদের দেহে যখন বাইরে থেকে কোন জিনিস প্রবেশ করে (যেকোন প্রোটিন, পরজীবী বা ভাইরাস ব্যাকটেরিয়ার মত অণুজীব), তখন দেহের রোগপ্রতিরোধতন্ত্র (immune system) সক্রিয় হয়ে ওঠে, এবং সেই বহিরাগত বস্তুর বিরুদ্ধে এন্টিবডি (antibody) তৈরি করে। এই এন্টিবডি বহিরাগত বস্তুর সাথে বিক্রিয়া করে তাকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়।

সাপের বিষ বিভিন্ন ধরনের জৈব যৌগ, প্রোটিন, উৎসেচকের সমাহার, এগুলি আমাদের দেহের জন্য বহিরাগত বস্তু। সাপের কামড়ের ফলে দেহে যদি বিষ ঢোকে তাহলে তার জন্য দেহে এন্টিবডিও তৈরী হয়। কিন্তু এরকম এন্টিবডি তৈরিতে বেশ কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস সময় লেগে যেতে পারে, ততদিন সাপে কাটা রোগী বাঁচবে না। সেজন্য সাপে কামড়ালেই আগে থেকে অন্য কারোর দেহে তৈরি হওয়া এন্টিবডি যতটা তাড়াতাড়ি সম্ভব সাপে কাটা রোগীকে দেওয়া হয়। এবার প্রশ্ন হল, অন্য কারোর দেহে সেই সাপের বিষের এন্টিবডি কীভাবে তৈরি হবে?

সাধারণত যেকোন স্তন্যপায়ী প্রাণীর দেহে একটু একটু করে সাপের বিষ ইঞ্জেকশন দিয়ে তার মধ্যে এন্টিবডি তৈরি করা যায়। পরীক্ষাগারে ইঁদুর, খরগোশ ইত্যাদি ছোট ছোট প্রাণীর দেহে কয়েক মাস ধরে একটু একটু করে সাপের বিষ প্রবেশ করানো হয়, এবং শেষে একটু বেশি পরিমান (booster dose) বিষ দিয়ে এন্টিবডি উৎপন্ন করা হয়। তারপর সেই এন্টিবডি বিভিন্ন উপায়ে রক্ত থেকে আলাদা করে রাখা থাকে। পরীক্ষাগারে ছোট প্রাণীদেহে তৈরি এই এন্টিবডির সবথেকে বড় অসুবিধা হল এদের দেহে কম পরিমাণে রক্ত থাকার কারণে কম পরিমাণে এন্টিবডি পাওয়া যায়। ফলে ওষুধ কোম্পানিগুলোর কাছে এভাবে এন্টিবডি উৎপাদন লাভজনক হয়না।

ওষুধ কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসার সুবিধার্থে একসাথে বেশি এন্টিবডি পাওয়ার জন্য বড় বড় জীবের সাহায্য নেয়। এইকাজে ঘোড়া, ভেড়ার ব্যবহার সারা পৃথিবীজুড়ে প্রচলিত। অর্থাৎ ঘোড়া বা ভেড়াকে বেশ কয়েকমাস ধরে সাপের বিষের ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়, এবং তারপর তার দেহে এন্টিবডি তৈরি হলে তার রক্ত সংগ্রহ করে সেখান থেকে এন্টিবডি আলাদা করে সংরক্ষণ করা হয়। কাউকে সাপে কামড়ালে হাসপাতালে সেই এন্টিবডি দেওয়া হয়।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, যদি শুধুমাত্র একটা সাপের বিষ কোন প্রাণীকে ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়, তবে তার মধ্যে মনোভ্যালেন্ট (monovalent) এন্টিবডি বা প্রতিষেধক তৈরি হবে, এবং সেটি শুধুমাত্র সেই নির্দিষ্ট সাপের বিষের বিরুদ্ধেই কাজ করবে। তবে সাধারণত অনেকগুলো সাপের বিষ একসাথে মিশিয়ে ব্যবসায়িক ব্যবহারের প্রতিষেধক তৈরি করা হয়, এটি পলিভ্যালেন্ট (polyvalent) এন্টিবডি। ভারতে তৈরি সাপের বিষের প্রতিষেধক সাধারণত চারটে সাপের (কালাচ, চন্দ্রবোড়া, ফুরসাবোড়া এবং কোবরা) বিষ দিয়ে তৈরি হয়, অর্থাৎ এই চারটে সাপের যেকোন একটা কামড়ালেই সেই প্রতিষেধকটা কার্যক্ষম হবে। তাই সাপে কামড়ালে যদি সাপটি নাও চিনতে পারেন ক্ষতি নেই, প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর যত দ্রুত সম্ভব নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া দরকার যেখানে সাপের বিষের প্রতিষেধকের ব্যবস্থা আছে।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading