রান্নাঘরে পেঁয়াজ কাটতে বসে চোখে জল আসেনি, এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। অনেকেই মজা করে বলেন, “পেঁয়াজ কাটতে কাটতে কাঁদতে হয়!” কিন্তু সত্যিই কি পেঁয়াজ আমাদের দুঃখ দেয়? আসলে এর পেছনে রয়েছে এক চমৎকার রাসায়নিক প্রক্রিয়া এবং মানবদেহের স্বাভাবিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
সাম্প্রতিক পোস্ট
পেঁয়াজের ভিতরে রাসায়নিক কারখানা
পেঁয়াজ একটি কন্দজাতীয় উদ্ভিদ। মাটির নিচে বেড়ে ওঠার সময় এটি নিজেকে পোকামাকড়, প্রাণী ও বিভিন্ন ক্ষতিকর জীবের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য বিশেষ ধরনের সালফার-যুক্ত যৌগ তৈরি করে। এই যৌগগুলো সাধারণ অবস্থায় পেঁয়াজের কোষের মধ্যে নিরাপদে সঞ্চিত থাকে। এর মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হল —সালফার-যুক্ত অ্যামাইনো অ্যাসিড এবং অ্যালিনেজ (Alliinase) নামের একটি এনজাইম।
যতক্ষণ পেঁয়াজ অক্ষত থাকে, ততক্ষণ এই দুটি পদার্থ আলাদা আলাদা থাকে। ফলে কোনও সমস্যা হয় না।
পেঁয়াজ কাটলে কী হয়?
যখন আমরা পেঁয়াজ কাটতে শুরু করি, তখন এর কোষগুলো ভেঙে যায়। ফলে আগে আলাদা থাকা রাসায়নিক পদার্থগুলো একে অপরের সংস্পর্শে আসে। তখন অ্যালিনেজ এনজাইম সালফার-যুক্ত যৌগগুলোর ওপর কাজ করে এবং একাধিক নতুন রাসায়নিক তৈরি হয়।
এই প্রক্রিয়ার ফলে তৈরি হয় একটি বিশেষ উদ্বায়ী (volatile) গ্যাস, যার নাম সিন-প্রোপানেথিয়াল-এস-অক্সাইড (Syn-Propanethial-S-oxide)।
এই গ্যাসই পেঁয়াজ কাটার সময় চোখে জ্বালা এবং জল পড়ার জন্য মূলত দায়ী।
গ্যাসটি চোখে পৌঁছালে কী হয়?
পেঁয়াজ কাটার সময় উৎপন্ন হওয়া উদ্বায়ী গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে এবং আমাদের চোখে পৌঁছায়। আমাদের চোখ সবসময় সামান্য আর্দ্র থাকে। গ্যাসটি চোখের জলের সঙ্গে বিক্রিয়া করে অতি সামান্য পরিমাণে সালফিউরিক-জাতীয় অম্লীয় পদার্থ তৈরি করে। এর ফলে চোখের স্নায়ু বুঝতে পারে যে চোখে কোনও উত্তেজক বা ক্ষতিকর পদার্থ প্রবেশ করেছে যা একটি জরূরী অবস্থা সৃষ্টি করে। এর ফলে চোখের অশ্রুগ্রন্থি (Lacrimal Gland) দ্রুত বেশি পরিমাণে জল তৈরি করতে শুরু করে। এই অতিরিক্ত জল চোখ থেকে ক্ষতিকর পদার্থকে ধুয়ে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করে।
অর্থাৎ, পেঁয়াজের কারণে যে জল পড়ে, তা আসলে কান্না নয়; বরং চোখের আত্মরক্ষামূলক ব্যবস্থা।
সব পেঁয়াজ কি সমানভাবে চোখে জল আনে?
সব পেঁয়াজের ক্ষেত্রে একই রকম অল পড়ে না। যে পেঁয়াজে সালফার-যুক্ত যৌগের পরিমাণ যত বেশি, সেই পেঁয়াজ কাটলে চোখে জ্বালা তত বেশি হবে। সাধারণত —সাদা পেঁয়াজে ঝাঁঝ বেশি হতে পারে, হলুদ বা বাদামি পেঁয়াজ মাঝারি ঝাঁঝালো এবং মিষ্টি বা Sweet Onion-এ তুলনামূলক কম সালফার থাকে, তাই চোখে কম জল আসে।
এছাড়া মাটির গুণাগুণ, সার, জলবায়ু এবং সংরক্ষণের পদ্ধতির ওপরও পেঁয়াজের রাসায়নিক গঠন নির্ভর করে।
পেঁয়াজ কাটার সময় চোখের জল কমানোর উপায়
এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, পেঁয়াজ কাটার সময় কান্না কমানোর উপায় কী? বিজ্ঞানীরা এবং রাঁধুনিরা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন উপায় ব্যবহার করে আসছেন। কিছু পদ্ধতি সত্যিই কার্যকর, তারই কয়েকটি এখানে দেওয়া হল –
১. পেঁয়াজ ঠান্ডা করে নিন – পেঁয়াজ ফ্রিজে ৩০ মিনিট থেকে ১ ঘণ্টা রেখে কাটলে রাসায়নিক বিক্রিয়ার গতি কিছুটা কমে যায়। ফলে কম গ্যাস উৎপন্ন হয়।
২. ধারালো ছুরি ব্যবহার করুন – ভোঁতা ছুরি পেঁয়াজের বেশি পরিমাণ কোষের ক্ষতি করে। এতে বেশি পরিমাণ গ্যাস বের হয়। ধারালো ছুরি কোষকে তুলনামূলকভাবে পরিষ্কারভাবে কাটে।
৩. চলমান বাতাসের কাছে কাটুন – একটি ছোট ফ্যান বা রান্নাঘরের এক্সহস্ট ফ্যান চালু থাকলে গ্যাস চোখে পৌঁছানোর আগেই দূরে সরে যায়।
৪. মূল অংশটি শেষে কাটুন – পেঁয়াজের মূল (root) অংশে সালফার-জাতীয় যৌগের ঘনত্ব বেশি থাকে। তাই অনেকেই এই অংশটি একেবারে শেষে কাটার পরামর্শ দেন।৫. সুরক্ষাচশমা ব্যবহার করুন – শুনতে অদ্ভুত লাগলেও এটি সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলোর একটি। গ্যাস চোখে পৌঁছাতে না পারলে জলও পড়বে না।
এখানে একটি মজার তথ্য উল্লেখ করছি। ২০১৩ সালে বিজ্ঞানী শিনজি ইনোয়ে পেঁয়াজের সেই এনজাইম নিয়ে গবেষণার জন্য বিখ্যাত হন, যা চোখে জল আনা রাসায়নিক তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাঁর গবেষণা কৃষিবিজ্ঞান এবং খাদ্যবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেয়।
আরও মজার বিষয় হল, বিজ্ঞানীরা এমন পেঁয়াজের জাতও তৈরি করার চেষ্টা করেছেন, যেগুলো কাটলেও খুব কম চোখে জল আসে। এগুলোকে অনেক সময় “tearless onion” বলা হয়।
পেঁয়াজ কাটলে চোখ দিয়ে জল পড়া কোনও রহস্যময় ঘটনা নয়; এটি প্রকৃতির এক অসাধারণ প্রতিরক্ষা কৌশল। পেঁয়াজ নিজেকে রক্ষা করার জন্য যে সালফার-যুক্ত রাসায়নিক তৈরি করে, সেটিই কোষ ভাঙার পর গ্যাসে পরিণত হয়ে আমাদের চোখে পৌঁছায়। আর চোখ সেই গ্যাসকে দূর করার জন্য অতিরিক্ত জল তৈরি করে।
বিজ্ঞানের এই ধরণের কার্য-কারণ সম্পর্ক বা “কেন” বিষয়ক প্রশ্নের উত্তর জানতে এখানে দেখুন। আর আপনার মাথায় এরকম কোন প্রশ্ন থাকলে কমেন্ট করে জানান, আমরা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব।
সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন। যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন।


আপনার মতামত জানান