ধর্ম

হালদার বাড়ির পূজা

কলকাতার দুর্গাপূজার কথা হবে আর বনেদি বাড়ির বিখ্যাত সব পুজোর কথা উঠবে না তা হতেই পারে না। বনেদি বাড়ি বলতেই সেই বিখ্যাত লাটুবাবু-ছাতুবাবুদের বাড়ি, সাবর্ণ রায়চৌধুরী বাড়ি, শোভাবাজার রাজবাড়ির কথা যেমন সবার আগে মনে পড়ে, তেমনি বাগবাজারের হালদারবাড়ির পুজোও কিন্তু কম মাহাত্ম্যপূর্ণ নয়। প্রায় চারশো বছরেররও বেশি প্রাচীন হালদার বাড়ির দুর্গাপূজা কলকাতার মধ্যে অন্যতম প্রাচীন এবং ঐতিহাসিকভাবে প্রসিদ্ধ। মাটির বদলে কষ্টিপাথরের দুর্গামূর্তিতে এখানে পূজা হয় যা হালদার বাড়ির পূজার (haldar barir puja)স্বাতন্ত্র্যের অন্যতম নিদর্শন।

জনশ্রুতি রয়েছে, হালদারবাড়ির কোনো এক পূর্বপুরুষ চন্দননগরের ন’পাড়ায় থাকতেন। একবার নিছক ভ্রমণের জন্যেই তিনি ওড়িশার বালাসোরের কাছে সাহেবপুর প্রাসাদে গিয়ে ওঠেন। সেখানে থাকার সময়েই তিনি এবং তাঁর কয়েকজন সঙ্গী-সাথী স্বপ্নাদেশ পান এক মুসলিম জেলের বাড়িতে মাটির নীচে প্রায় ১৪ ফুট গভীরে দেবীর মূর্তি রয়েছে যা খুঁড়ে বের করতে হবে। শুধু তাই নয় সেই মূর্তিকে প্রতিষ্ঠা দিয়ে নিত্য পূজা করতে আদেশ করেন দেবী। স্বপ্নাদেশ মতো হালদার পরিবার মাটি খুঁড়ে দেবীর মহিষাসুরমর্দিনী মূর্তি বের করে আনে। শোনা যায়, মাটির নীচে থাকলেও ঐ মূর্তির বাঁ হাতের আংটিটি পর্যন্ত অক্ষত ছিল এবং তাতে আরো সূক্ষ্ম কারুকার্য করা ছিল। কষ্টিপাথরের সেই মূর্তিটিই আজও পূজিত হয়ে চলেছে। দেবী মূর্তির মাথার দিকে দেখা যায় মহাকালের মুখ আর দেবীর পায়ের নীচে বসে আছেন জয়া এবং বিজয়া। সমগ্র মূর্তি একটি পদ্মের উপর অধিষ্ঠিত। মূর্তির গায়ের কারুকার্য দেখে অনুমান করা হয় যে এটি পাল যুগের নিদর্শন যার ফলে সহজেই বলা যেতে পারে আজ থেকে প্রায় ৬০০-৭০০ বছর আগে মূর্তিটি নির্মিত হয়েছিল। এমনটাও হতে পারে বলে মনে করেন ঐতিহাসিকরা যে কোনো হিন্দু ভক্ত সেই সময়ের বাংলায় তুর্কি আক্রমণের ভয়ে বা সুলতানি শাসনে ইসলামি আগ্রাসন থেকে বাঁচাতে দেবীর মূর্তিকে মাটির নীচে পুঁতে দিয়েছিল। ক্রমেই মুসলিম শাসন অন্তর্হিত হয়েছে এবং ব্রিটিশরা বাংলার ক্ষমতা দখল করেছে। সেই হালদারবাড়ির উত্তরসূরি প্রাণকৃষ্ণ হালদারের সময়েই এই দেবীমূর্তি পুনরায় চর্চার আলোয় উঠে আসে। জমিদার প্রাণকৃষ্ণ হালদারের এক বিশাল প্রাসাদ ছিল চুচূঁড়ায় যা পরে স্কুলে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে কলকাতার বাগবাজারে আরেকটি প্রাসাদোপম বাড়ি তৈরি করেন তিনি, এই বাড়িটিই এখনকার বিখ্যাত হালদারবাড়ি। সেকালের বিখ্যাত পত্রিকা ‘ক্যালকাটা গেজেট’-এর ১৮০৭ সালের ২০ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় প্রাণকৃষ্ণ হালদারকে চূঁচুড়ার এক বিখ্যাত জমিদার বলে পরিচয় দেওয়া হয়েছে। আবার অন্যদিকে ‘সমাচারদর্পণ’ পত্রিকায় তাঁকে ‘বাবুদের বাবু’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। তা সেই প্রাণকৃষ্ণ হালদারের বাড়িতে দুর্গাপূজা উপলক্ষে নৃত্য পরিবেশনায় আমন্ত্রণপত্রটিও প্রকাশিত হয়েছিল ‘ক্যালকাটা গেজেট’ পত্রিকায়। প্রাণকৃষ্ণ হালদারের পরবর্তী উত্তরসূরিরা যারা জীবিত আছেন আজও তাঁরা সকলেই দুর্গাপূজা উপলক্ষে এই হালদারবাড়িতে এসে জমায়েত হন।

হালদার বাড়ির দুর্গাপূজার রীতি একেবারে স্বতন্ত্র। অন্যান্য বাড়িতে যেমন পুজোর দিন অষ্টমী পর্যন্ত বাড়ির সকলে বিশেষত মহিলারা নিরামিষ খেয়ে থাকেন তা এখানে মানা হয় না। পঞ্চমীতে বিধিসম্মতভাবে বোধন হয় এবং সেদিন বিকালে আমন্ত্রণ এবং অধিবাসের অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। এইদিন পূজামণ্ডপে একটি জাগপ্রদীপ জ্বালানো হয়। অনির্বাণ এই প্রদীপ পরিবারের শুভ-অশুভের নির্ণায়ক বলে ধরা হয়। তবে মহাষষ্ঠীর দিন হালদার বাড়ির মহিলারা মাছ-ভাত খেয়ে পান চিবোতে চিবোতে দেবীকে বরণ করেন। উপবাস কিংবা নিরামিষ আহার মানেন না হালদাররা। হালদারবাড়ির অন্য একটি শাখা-পরিবার বাগবাজারেই থাকায় মহাসপ্তমীর দিন এই দুই পরিবারের পক্ষ থেকে দুটি আলাদা নবপত্রিকা স্নান করানো হয়, বিশাল কারুকার্যখচিত ছাতার নীচে সেই নবপত্রিকাকে নিয়ে যাওয়া হয় মায়ের ঘাটে স্নান করাতে। মহাঅষ্টমীর দিন সবথেকে বড়ো অনুষ্ঠান এখানকার সন্ধিপূজা। একশো আটটা পদ্ম আর ঐ একই সংখ্যক প্রদীপ জ্বালিয়ে সন্ধিপূজায় দেবীর আরাধনা করা হয় হালদারবাড়িতে। এই প্রদীপগুলি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন আকারে সাজানো হয় – ত্রিনয়ন, প্রজাপতি, ত্রিশূল, কল্পতরু গাছ বিভিন্ন রকম আকারে সাজানো হয়ে থাকে প্রদীপগুলি। সন্ধিপূজার সব কাজে মহিলারা অংশগ্রহণ করেন না এই হালদার বাড়িতে। পরেরদিন অর্থাৎ মহানবমীতে মহাসমারোহে কুমারী পূজা হয়ে থাকে এখানে। পুজোর পরে কুমারীকে কোলে নিয়ে নিকটবর্তী বাগবাজারের গৌড়ীয় মঠে যাওয়া হয়। সেখানে মূর্তি বিসর্জনের মতো কুমারীকে তিনবার ঘুরিয়ে তারপর মাটিতে নামানোর বিশেষ রীতি পালন করে আসছে হালদার বাড়ির মানুষ। এখানে একটা বিষয় খুবই উল্লেখযোগ্য তেরো বছর বয়সী কুমারীকে মহালক্ষ্মীরূপে এবং ষোলো বছর বয়সী কুমারীকে অম্বিকারূপে পূজা করা হয়ে থাকে। দেবীপুরাণে ব্রাহ্মণ কন্যার উল্লেখ থাকলেও বিভিন্ন সময় পূজার উদ্দেশ্যভেদে কখনো জয়লাভের উদ্দেশে ক্ষত্রিয়কন্যা এবং কখনো ব্যবসায়িক সমৃদ্ধির উদ্দেশে বৈশ্য কন্যাকে কুমারীরূপে পূজা করা হয়ে থাকে। সবশেষে আসে মহাদশমীর বিসর্জনের পালা। হালদারবাড়ির দুর্গামূর্তি কখনো বিসর্জন হয় না বলে শুধুমাত্র ঘটের গঙ্গাজল পরিবর্তনের মধ্য দিয়েই বিসর্জনের রীতি পালিত হয়ে থাকে। সাধারণভাবে নিত্যপূজার জন্য দেবীর মুখ পশ্চিমদিকে ঘোরানো থাকলেও, পঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত দেবীর মুখ দক্ষিণদিকে ঘোরানো থাকে। কারণ হালদার বাড়ির মানুষ বিশ্বাস করেন যে দেবী এইসময় উত্তরের কৈলাস ছেড়ে দক্ষিণে মর্ত্যে আসেন।

দশমীর দিন মাছ-ভাত খেয়ে বাড়ির মহিলারা মুখে পান দিয়ে ঢাক বিসর্জন করাতে যান ঘাটে। সবমিলিয়ে বনেদি বাড়ির পুজো হলেও স্বাতন্ত্র্য নিয়েই আজও হালদার বাড়ির বিখ্যাত পুজো হয়ে চলেছে।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।