ধর্ম

দেবী দুর্গার বাহন

আমরা দুর্গার যে রূপ দেখি, তাতে  সিংহবাহিনী দেবী মহিষ নামের অসুররাজকে নিধনে রত। কিন্তু যখন বাংলায় দুর্গাপূজা চালু হয়, তখন বাংলার মৃৎশিল্পীদের মধ্যে সিংহকে দেবীর বাহন করবার ধারণা ছিল না। কারণ তখনকার বাংলার মৃৎশিল্পীরা সিংহ দেখেননি। মহিষাসুরমর্দিনীর বাহন রূপে সিংহের আবির্ভাব একেবারে আধুনিক কালে মানে একশো থেকে দেড়শো বছরের মধ্যে। দেবীর বাহন হিসাবে এখন সিংহকে দেখতে পেলেও সেটা অনেক বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এসেছে।

গোড়ার দিকে তিনি দ্বিভুজা হলেও পরাক্রম দেখাবার জন্য তাঁকে চতুর্ভুজা, ষড়ভুজা, অষ্টভুজা, দশভুজা, দ্বাদশভুজা, ষোড়শভুজা বা অষ্টাদশভুজা রূপে দেখানো হয়েছে।  একদম প্রাচীন কালে তাঁর না ছিল বাহন সিংহ, না কোনও অনুচর, তিনি একাই বিশাল মহিষকে লেজ ধরে ঘুরিয়ে ছুঁড়ে ফেলেছেন।ক্রমশ পরিবারদেবতা হিসেবে তাঁর সঙ্গে সরস্বতী, লক্ষ্মী, গণেশ ও কার্তিক সন্নিহিত হলেন। মহাদেবও স্থান পেলেন, তবে পিছনের চালচিত্রে দুর্গার মাথার উপর। অর্থাৎ হিন্দুধর্মের প্রায় সব মুখ্য দেবদেবী একত্রিত হয়ে চলে এলেন পূর্ব ভারতে শরৎকালের দেবীপক্ষে। তবে দেবীর বাহন হিসাবে সিংহ ঠিক কবে থেকে এল, এই নিয়ে গবেষকদের মধ্যে ধোঁয়াশা এখনও রয়েছে।

দেবীর বাহন হিসাবে সিংহ। চিত্রসূত্রঃ ইন্টারনেট

ভারতবর্ষে এখন সিংহ গুজরাতের গির অভয়ারণ্যের বাইরে দেখা না গেলেও, উনিশ শতকেও রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, এমনকী ঝাড়খণ্ডের পলামৌ অঞ্চলে সিংহ পাওয়া যেত। কিন্তু প্রাচীন কালে সিন্ধু সভ্যতার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে (যার মধ্যে আছে গুজরাতের ধোলাবিরা, লোথাল ও রাজস্থানের বেশ ক’টি জনপদ) কোথাও সিংহের উপস্থিতির প্রমাণ নেই। অসংখ্য সিলমোহরে নানা জীবজন্তুর প্রতিকৃতি দেখা গেলেও সিংহ অনুপস্থিত। দিব্যভানু সিংহ তাঁর ‘দি স্টোরি অব এশিয়া’জ লায়ন্‌স’-এ লিখেছেন, পশ্চিম এশিয়া থেকে ইরান হয়ে পূর্ব-মধ্য ভারত পর্যন্ত বিস্তৃত তৃণারণ্যে যে সিংহ ছিল, আফ্রিকার তিনটি প্রজাতির সঙ্গে তার অনেক অমিল। আবহাওয়ার পরিবর্তন ও অন্যান্য কারণে পশ্চিম এশিয়া, ইরাক, ইরান ও সিন্ধু নদীর পশ্চিম অঞ্চল থেকে ক্রমশ তা বিলুপ্ত হয়ে যায়। ‘এক্সোটিক এলিয়েন্স: দি লায়ন অ্যান্ড দি চিতা ইন ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে রোমিলা থাপার প্রায় একই উপাদানের বিচার করে সিংহ আদপেই এ দেশের নয়, সুদূর অতীতে পশ্চিম এশিয়া, ইরান থেকে সিংহকে এ দেশে আনা হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন। আবার ঋগ্বেদে সিংহের, সিংহনাদের উল্লেখ আছে, বাঘের উল্লেখ নেই। অথর্ববেদে বাঘ, সিংহ দুই-ই আছে। 

দুর্গার বাহন হিসেবে সিংহ  শৌর্য-বীর্যের প্রতীক। তাঁর বাহন সিংহ এসেছিল পিতা হিমালয়ের কাছ থেকে, অথচ হিমাচল প্রদেশ, জম্মু-কাশ্মীর, উত্তর ভারতের কোনও কোনও জায়গায় দেবীর বাহন সিংহ নয়, বাঘ। আমাদের এখানে মহামায়া সিংহারূঢ়া হয়েই আসেন, কখনও সে থাকে শান্ত হয়ে। এখানে তো যুদ্ধ নয়, আনন্দের, শান্তির, উৎসবের বাতাবরণ।

বাংলার প্রাচীন মূর্তি গুলো খেয়াল করলে দেখা যায় যে, দেবীর বাহন ছিলো ড্রাগন জাতীয় পশুর মুখওয়ালা ঘোড়া সাদৃশ্য একটি পশু। যাকে গোধা বলা হয়। আসলে পশুটির মুখ হল গো-সাপের এবং দেহ হল ঘোড়ার।

দেবীর বাহন হিসাবে গাধা। চিত্রসূত্রঃ ইন্টারনেট

মহিষাসুরমর্দিনী প্রাচীন শস্যের দেবী। যাঁর আরাধনা বঙ্গভূমিতে ৪০০০ বছর ধরে হয়ে আসছে, সেই অস্ট্রিকদের সময় থেকে। বাঙালি সংস্কৃতির একটি বড় অংশ দখল করে রয়েছে অস্ট্রিকরা। কৃষি প্রধান বাঙালি জীবন ওই অস্ট্রিকদের থেকেই পাওয়া। অস্ট্রিকরা প্রকৃতি শক্তির আরাধনা করতেন। গাছ, শস্য, নুড়ি, শীলা ইত্যাদির আরাধনা হত। কিন্তু মনুষ্য বা পশু সাদৃশ্য মূর্তির পূজা করতেন না। নগর সভ্যতা ও স্থাপত্য, মূর্তি নির্মাণ এইসবই আদি দ্রাবিড়দের থেকে পাওয়া। অস্ট্রিকদের শস্যের দেবী কালক্রমে দ্রাবিড় প্রভাবে মহিষাসুরমর্দিনী হয়ে ওঠেন। লক্ষণীয়, এখনও দুর্গোৎসবে নবপত্রিকা আবশ্যিক। অস্ট্রিকরা এই নয়টি শষ্যকেই দেবীরূপে আরাধনা করতেন। আর দেবীর বাহন ছিল গো-সাপ। যাকে কিনা কৃষিকাজের উপকারী জীব হিসেবে ধরা হত। দ্রাবিড়রা নগর কেন্দ্রিক সভ্যতা গড়ে তোলার পর, যুদ্ধ বিগ্রহ ও রাজা, রাজত্বের ব্যাপার চলে আসে। রাজার রাজকীয়তা ও যুদ্ধবিগ্রহে সঙ্গী হলো ঘোড়া। যুদ্ধের দেবী ও শস্যের দেবী মিশে আজকের মহিষাসুরমর্দিনী। আর তাঁর বাহন গোঘোটক বা গোধাও উভয় সংস্কৃতির মিশ্রণ তৈরি। যা তৈরি হয়েছিলো খ্রিস্টপূর্বে। আজও বনেদি বাড়ি গুলো সেই ধারা বহন করে আসছে।

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

vdo contest

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


তথ্যসূত্র


  1. দুর্গোৎসবের উৎস সন্ধানে, অব্জ কেশব কর, দে'জ পাবলিশিং
  2. বাংলায় পটের দুর্গা, দীপঙ্কর ঘোষ, আনন্দ পাবলিশার্স (২০১৫)
  3. দুর্গা রূপে রূপান্তরে, পূর্বা সেনগুপ্ত,মিত্র ও ঘোষ পাবলিশার্স প্রাঃ লিঃ (২০১৬)
  4. আনন্দবাজার পত্রিকা, ২৪শে সেপ্টেম্বর ২০১৭ সাল
  5. আনন্দবাজার পত্রিকা, ৩রা অক্টোবর ২০০৭ সাল

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।