ভ্রমণ

বরন্তি ভ্রমণ

রাঙা মাটির দেশ বরন্তি। বিভিন্ন ঋতুর পরিবর্তনের সাথে সাথে বরন্তির সৌন্দর্য্য নানা রঙে ধরা দেয়। এ যেন পৃথিবীর বুকে একটি স্বর্গ। নিবিড় অরণ্যের বুকে জনা বিশেক পরিবার নিয়ে এই গ্রাম। আর তার পাশেই ছোট ছোট টিলাকে সঙ্গী করে দাঁড়িয়ে এক আশ্চর্য হ্রদ মুরাডি। টিলা বলে তুচ্ছ করার মতো নয়। কারণ এদের সৌন্দর্য উচ্চতায় নয়, উপস্থিতিতে। পাহাড়গুলো ঘন সবুজ। বর্ষায় সবক’টার বুকেই ঝরনা। তাই অবিরাম ঝিরঝির শব্দ সুর শুনিয়ে যায়। চারদিকে শুধু শাল, সেগুন, শিশু, পলাশ ও মহুয়ার জঙ্গল। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে চলে গেছে লাল মাটির রাস্তা। প্রকৃতির এমন পরিচয় বহু গল্পে পেয়ে থাকবেন। সবুজে মাখা বরন্তি যেন শুদ্ধ অক্সিজেনের ঠিকানা। শহরের দূষণে যখন শ্বাস নেওয়া দায়, বরন্তির আকাশে বাতাসে পাবেন মন মাতানো পরিবেশ। সাঁওতালদের বাস এই গ্রামে। প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সেখানকার সাঁওতালদের নানা অনুষ্ঠানেরও স্বাদ নিতে পারেন। এমন অভিজ্ঞতা সারাজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

বরন্তির মেঠো পথ

বরন্তি হল পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুর সাবডিভিশনের একটি গ্রাম। গ্রামের নাম জীবনপুর তবে বরন্তি নামেই বেশি পরিচিতি। মুরাডি পাহাড়ের পথ ধরে লেককে ডান দিকে রেখে পৌঁছনো এই গ্রামে। সুন্দর এই লেকটির নাম বরন্তি লেক। অনেকে মুরাডি লেকও বলে। রামচন্দ্রপুর সেচ প্রকল্পের অন্তর্গত এই লেকটির পোশাকি নাম যদিও রামচন্দ্রপুর জলাধার। বরন্তি নদীতে বাঁধ দিয়ে তৈরি হয়েছে সুন্দর এই জলাধারটি।

এখানকার মানুষ অত্যন্ত সরল। পাহাড়ের কোলে জমিগুলিতে অল্প বিস্তর চাষাবাদ হয়। অনেক মানুষ জঙ্গলে কাঠ কেটে জীবিকা নির্বাহ করে। খেজুর গাছের রস থেকে খেজুর গুড় বানিয়ে অনেকেই জীবিকা নির্বাহ করে। রুটিরুজির টানে গ্রামের অনেক ছেলেই বাইরে রাজমিস্ত্রি, ডেকরেটর, কারখানা বা খনিতে মজুরের কাজ করেন। বর্তমানে পর্যটন শিল্পের উন্নতির ফলে অনেকেই পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভাবে এই শিল্পের উপর নির্ভরশীল।

বরন্তি খুব একটা উঁচু পাহাড়ের পর্যায়ে পড়ে না। তবে ঘন জঙ্গলে হাঁটাটার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অন্য রোমাঞ্চ। বর্ষাকালে এই বন ঘন সবুজ, সে এক মোহময়ী রূপ। আবার বসন্তকালে পলাশ ফুলের শোভায় বরন্তির বন লাল হয়ে ওঠে। মনে হয় যেন আগুনের ছোঁয়া। বসন্তকালে পূর্ণিমার রাতে বরন্তির রূপ বড়ই রোমাঞ্চকর। পূর্ণিমার চাঁদের মিষ্ট আলোয় পাহাড়, জলাশয়, রাঙা পলাশের জঙ্গল এক নৈস্বর্গিক শোভা পায়। । লেকেরও জলের রঙ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকম দেখতে লাগে। সকালে জলের রঙ ঘন নীল, আর বিকালে সূর্যাস্তের সময় সেই জলে সূর্যের আলোয় লাল রঙ ওঠে। পাহাড়টির চারপাশ বাঁশ, সাল, পিয়াল, আমলকী, বহরা, হরিতকী, নিম প্রভৃতি গাছে ঘেরা। গ্রামটিকে ছবির মতো সুন্দর করে তুলেছে সারি সারি খেজুর গাছ।

বাসে হোক বা ট্রেনে, প্রথমে আপনাকে আসতে হবে আসানসোল। হাওড়া, শিয়ালদহ কিংবা কলকাতা স্টেশন থেকে যে কোনও ট্রেনে আসানসোল আসা যায়। কলকাতার ধর্মতলা বা করুণাময়ী থেকে ভলভো, সি.এস.টি.সি, ডব্লু.বি.এস.টি.সি বাসে করে আসানসোল। তারপর আসানসোল থেকে আদ্রা লাইনে তিনটি স্টেশন পরেই মুরাডি স্টেশন। মুরাডি স্টেশন থেকে ৬ কি.মি দূরে বরন্তি গাড়িতে করে যেতে হবে। আসানসোল থেকেও সরাসরি গাড়িতে করে বরন্তি যাওয়া যায়। আসানসোল থেকে বরন্তির দূরত্ব প্রায় ৩৮ কিমি।

মুরাডি
ভোরবেলায় মুরাডি লেক। ছবি কৃষ্ণাশিষ রায়।

কলকাতা থেকে গাড়িতে করে আসতে হলে কলকাতা থেকে গাড়িতে করে ডানকুনি এক্সপ্রেস ধরে দুর্গাপুর। দুর্গাপুর থেকে আসানসোলের মধ্যে দিয়ে পুরানো জিটি রোড ধরে নিয়মতপুর। নিয়মতপুর থেকে বাঁদিকে বেঁকে ডিসেরগড় ব্রীজ পেরিয়ে সোজা বরাকর–পুরুলিয়া রোডে শর্বরি মোড়। শর্বরি মোড় থেকে রঘুনাথপুরের দিকে সুভাষ মোড়। মূল রাস্তা থেকে একটি রাস্তা বাঁদিকে গেছে, এই রাস্তা ধরে মুরাডি। মুরাডি গ্রামের শেষ প্রান্তে গ্রাম পঞ্চায়েত অফিসের কাছ থেকে রাস্তা দুভাগে ভাগ হয়ে গেছে। এক ভাগ গেছে সাঁতুরির দিকে আর এক ভাগ গেছে পাহাড়ের দিকে। ওই পাহাড়ের নীচ দিয়ে গিয়ে সামনে পড়বে বরন্তি বাঁধ। বাঁধ পেরিয়ে বাঁদিকের রাস্তা ধরে পড়ছে বরন্তি গ্রাম। এছাড়া দুর্গাপুর থেকে রানীগঞ্জ এসে বাঁদিকে ঢুকে মেজিয়া তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র। তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সোজা শালতোড়। শালতোড় থেকে রঘুনাথপুরের দিকে সাঁতুড়ি। সাঁতুড়ি ফরেস্ট অফিসের উল্টোদিকে ডানপাশে সুভাষ রোডের শুরু। এই পথ ধরে মূল রাস্তা থেকে ডানদিকে একটি রাস্তা ঢুকে গেছে তালবেড়িয়া গ্রামে। গ্রামের ভিতর দিয়ে রাস্তা চলে গেছে বরন্তি পাহাড়ের নীচ দিয়ে।

মুরাডি লেক এ সূর্যাস্ত। ছবি কৃষ্ণাশিষ রায়।

বরন্তিতে থাকার অনেক হোটেল বা রিসোর্ট রয়েছে। কলকাতা থেকেই বুক করে আসা যায়। হোটেল থেকে হাঁটা পথেই বরন্তি লেক। ২০১৬ সালের তথ্য অনুযায়ী এখানে থাকার জন্য প্রতিদিন ঘরভাড়া গড়ে ১০০০ থেকে ২৫০০ টাকা মত।

ভোরবেলায় লেকের পাশে হাঁটুন, মন জুড়িয়ে যাবে। বিকেলবেলায় সূর্যাস্ত দেখতেও দারুণ লাগবে। ফাঁকা লাল মাটির রাস্তার ওপর হেঁটে যেতে যেতে কানে পাখির কোলাহল মন জুড়িয়ে দেবে। তবে সূর্যাস্তের পর কিন্তু লেকের কাছে থাকা উচিত না। যেহেতু সেখানে আলোর অভাব, তাই বিকেলের পরই হোটেলে ফিরে আসুন। আর যখনই লেকের ধারে হাঁটতে যাবেন, বেশ কয়েকজন সঙ্গে থাকবেন।

কাছাকাছি বিভিন্ন জায়গা ঘুরে আসতে পারেন। বড়ন্তি থেকে গড়পঞ্চকোট ১২ কিলোমিটার, বিহারীনাথ মন্দির ২০ কিলোমিটার, জয়চন্ডী পাহাড় ২১ কিলোমিটার, পাঞ্চেত বাঁধ ২২ কিলোমিটার, মাইথন বাঁধ ৩৯ কিলোমিটার, কল্যাণেশ্বরী মন্দির ৪০ কিলোমিটার , শুশুনিয়া পাহাড় ৪২ কিলোমিটার। হোটেল থেকে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ুন, অথবা নিজে গাড়ি নিয়ে গেলে কথাই নেই।

জায়গাটি সারা বছর ঘুরে দেখা যায়। তবে ফেব্রুয়ারিতে পলাশ ফুলের শোভায় বরন্তির বন লাল হয়ে ওঠে। তখন সৌন্দর্য দেখার মত। অক্টোবর থেকে মার্চ মাস এখানে মনোরম পরিবেশ থাকে। গ্রীষ্মকালে ভীষণ গরম থাকে, তখন না যাওয়া ভালো।


ট্রিপ টিপস

  • কিভাবে যাবেনঃ  ট্রেনে করে হাওড়া, শিয়ালদহ কিংবা কলকাতা স্টেশন থেকে যে কোনও ট্রেনে আসানসোল। কলকাতা থেকে বাসে আসতে হলে ধর্মতলা বা করুণাময়ী থেকে ভলভো, সি.এস.টি.সি, ডব্লু.বি.এস.টি.সি বাসে করে আসানসোল। তারপর আসানসোল থেকে আদ্রা লাইনে তিনটি স্টেশন পরেই মুরাডি স্টেশন।মুরাডি থেকে ৬ কি.মি দূরে বরন্তি গাড়িতে করে যেতে হবে।
  • কোথায় থাকবেন – এখানে কিছু কিছু  রিসোর্ট আছে, যেগুলো কলকাতা থেকেই বুক করা যায়।
  • কি দেখবেন – এখানে বরন্তি লেক এবং রাঙামাটির সুন্দর পরিবেশ উপভোগ করুন। এছাড়াও কাছাকাছি জায়গা ঘুরে দেখতে চাইলে গড়পঞ্চকোটবিহারীনাথ, জয়চন্ডী পাহাড়, পাঞ্চেত বাঁধ, মাইথন বাঁধ, কল্যাণেশ্বরী মন্দির, শুশুনিয়া পাহাড় এগুলো যাওয়া যায়।
  • কখন যাবেন – জায়গাটি সারা বছর ঘুরে দেখা যায়। তবে ফেব্রুয়ারিতে পলাশ ফুলের শোভায় বরন্তির বন লাল হয়ে ওঠে। অক্টোবর থেকে মার্চ মাস এখানে মনোরম পরিবেশ থাকে।
  • সতর্কতা – 
    • সূর্যাস্তের পর কিন্তু লেকের কাছে থাকা উচিত না। যেহেতু সেখানে আলোর অভাব, তাই বিকেলের পরই হোটেলে ফিরে আসুন।
    • লেকের জলে নামার চেষ্টা করবেন না।

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

তথ্যসূত্র


  1. নিজস্ব প্রতিনিধি
  2. https://www.anandabazar.com/
  3. https://bangla.asianetnews.com/

2 Comments

2 Comments

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন