ভ্রমণ

গড়পঞ্চকোট ভ্রমণ

লম্বা ছুটি না পেলেও ক্ষতি নেই | দিন দুই যথেষ্ট। তার মাঝেই দেখে আসতে পারা যায় যে কিভাবে নিসর্গ আর ইতিহাস একসঙ্গে বসত করে গড়পঞ্চকোটে। গড়পঞ্চকোট আছে পুরুলিয়া জেলায়, পাঞ্চেত পাহাড়ের পাদদেশে।

গড়পঞ্চকোটের পথে

আপনারা গড়পঞ্চকোটে বেড়াতে যান বর্ষায় বা শীতে। | কলকাতা থেকে ভলভো বাস এ করে আসানসোল পৌঁছে  যাবেন ঘন্টা তিনেকের মধ্যে , সেখান থেকে প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে বরাকর হয়ে গড়পঞ্চকোট আরো ৪৫ মিনিট | বরাকর-বেগুনিয়া মোড় থেকে বামদিকে ঢুকে যাচ্ছে দিশেরগড় রোড। এই রাস্তা ধরে পৌঁছতে হবে গড়পঞ্চকোটে। পাহাড়ের গা ঘেঁষে সবুজ বনানী চিরে চলে গেছে পিচ রাস্তা। বাঁ দিকে পঞ্চকোট পাহাড় ক্রমশ মাথা তুলেছে। ডান দিকে ধানক্ষেত। রেল পথে গড়পঞ্চকোটের নিকটবর্তী স্টেশন হলো বরাকর | সেখান থেকে সরাসরি গড়পঞ্চকোটে যাওয়ার গাড়ি পেয়ে যাবেন ।

দৈনন্দিন ব্যস্ততা

গড়পঞ্চকোটে থাকার মধ্যে আছে কিছু সরকারি বাংলো, লজ ও গুটি কয়েক প্রাইভেট লজ ।

কাছে একটি সাঁওতালি গ্রাম আছে | তাদের অকৃত্তিম আতিথেয়তা আপনাকে মুগ্ধ করবেই | সরকারি বাংলোতেই থাকুন বা বেসরকারি লজে, সেখানকার রান্নার ঠাকুরদের মধ্যে একটা সাঁওতালি ঘেঁষা রান্নার স্বাদ পাবেন। তাদের হাতে তৈরী দেশী মুরগির ঝোল আর কাঁকড়ার রসা যে কোনো খাদ্য রসিকের স্বপ্ন হতে পারে | খাওয়ার পর্ব শেষ করে দুপুরে একটু গড়িয়ে নিয়ে স্নিগ্ধ বিকেলের দিকে বেরিয়ে পড়ুন চারপাশের শোভা উপভোগ করতে |

আমরা সববাংলার টিম সেখানকার স্থানীয় বাসিন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে জানতে পেরেছি যে সেখানে পশ্চিমবঙ্গ পাবলিক হেলথ ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের অফিস থেকে মোটামুটি দেড় কিমি দূরে একটা জলাধার রয়েছে । সেখানে যেতে হলে কাছের একটি সাঁওতালি গ্রামের উপর দিয়ে যেতে হবে | সহজ সরল গ্রাম্য জীবন | কোথাও বাচ্চারা লাল মাটিতে বসে মার্বেল খেলছে কোথাও বা বুড়োর দল হুঁকো টানছে | তারই মাঝে যেতে যেতে একটি ছোট আলুর চপ ভাজার দোকান চোখে পড়তে পারে | মন্দ কি পা’ ও চললো, মুখ ও চললো।

জলাধারের পাশ দিয়ে রূপনারায়ণ নদীতে যাওয়ার রাস্তা

মিনিট চল্লিশেক হাঁটার পরে পৌঁছবেন সেই জলাধারে | রূপনারায়ণ নদীর উপরে তৈরী জলাধার। জলাধারটির পাশ দিয়ে ঘন ঘাসের মধ্যে দিয়ে সরু রাস্তা চলে গেছে | গ্রামের লোকজন সেই রাস্তাই ব্যবহার করে নৌকো থেকে নেমে গ্রামে আসার জন্য | সেখানে একটু দাঁড়িয়ে রূপনারায়ণের কোলে সূর্যের ঢোলে পড়ার দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতে পারেন।

ঘন সবুজের মাঝে গড়পঞ্চকোট গড়

তবে সন্ধ্যে ঘনিয়ে রাত নামার আগে যাতে লজে ফিরতে পারেন সেই বুঝে সেখান থেকে ফেরার পথ ধরাই ভালো। কেননা রাস্তায় কোনো বৈদ্যুতিক আলো নেই। রাতে লজে ফিরে রাতের খাওয়া সেরে যদি পারেন একটিবার ছাদে উঠে চারিপাশটায় একবার চেয়ে দেখার অনুরোধ রইলো । আমরা হলফ করে বলতে পারি সেই রোমাঞ্চ আপনার স্মৃতিতে চির অমলিন হয়ে থাকবে।

পরদিনের গন্তব্য গড়পঞ্চকোটের গড় | লজের থেকে ব্রেকফাস্ট করে বেরোনোই আমাদের মতে ভালো, কেননা রাস্তায় সেরকম রেস্টুরেন্ট কিছু পাবেন না। চপ, মুড়ি, শশা, বাদাম এই অব্দি পেতে পারেন ।

গড়পঞ্চকোট গড়

গড় এর দূরত্ব খুব একটা নয়, টুরিস্ট লজ গুলির এরিয়া থেকে মিনিট তিরিশেক | পিচ রাস্তা এক সময় শেষ হয়ে শুরু হয়েছে আদিবাসী গাঁয়ের লাল মাটির পথ। সেই পথ ধরে, আদিবাসী ঘরসংসার ছুঁয়ে, তাদের উঠোন দিয়ে বনবাংলো ১০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে এলে পৌঁছে যাবে এক বিশাল মাঠে। আছে একটি মন্দিরের ভগ্নাবশেষ। সামনে ৬৪৬ মিটার উঁচু ১৮ বর্গ কিলোমিটার ব্যাপ্ত জঙ্গলাকীর্ণ গড়পঞ্চকোট পাহাড়। এখানেই ছিল গড়। তার চিহ্ন এখনও রয়েছে পাহাড়ের গায়ে সবুজের খাঁজে খাঁজে। চোখে পড়বে গড়ের ধ্বংসাবশেষ, ভাঙাচোরা পুরনো বাড়ি। পাহাড়ের দক্ষিণ ঢালে খননে টেরাকোটা, জোড়বাংলো, পাঁচ চুড়োর ৯টি মন্দির, গোপন কুটুরি, সুড়ঙ্গ ছাড়াও নানান অতীত আবিষ্কৃত হয়েছে। এক সময় মাইকেল মধুসূদন এখানে চাকরি করতেন পঞ্চকোট রাজার এস্টেট ম্যানেজার হিসাবে। ইতিহাসবিদদের অনুমান রাজা দামোদর শেখর তার রাজ্যের পাঁচ প্রধান জাতিকে চিহ্নিত করতে রাজ্যের নাম রাখেন পঞ্চকোট |

ট্রিপ টিপস


কিভাবে যাবেন :  সড়ক পথ – কলকাতা থেকে ভলভো বাস এ করে আসানসোল | সেখান থেকে প্রাইভেট গাড়ি ভাড়া করে বরাকর হয়ে গড়পঞ্চকোট । বরাকর-বেগুনিয়া মোড় থেকে বামদিকে ঢুকে যাচ্ছে দিশেরগড় রোড। এই রাস্তা ধরে পৌঁছতে হবে গড়পঞ্চকোটে।

রেল পথ – রেল পথে গড়পঞ্চকোটের নিকটবর্তী স্টেশন হলো বরাকর । সেখান থেকে সরাসরি গড়পঞ্চকোটে যাওয়ার গাড়ি পেয়ে যাবেন ।

কোথায় থাকবেন : সরকারি ও বেসরকারি লজ দুইই পাবেন গড়পঞ্চকোটে । উল্লেখযোগ্য সরকারি লজ গুলি হল WBFDC গড়পঞ্চকোট নেচার রিসোর্ট, PHE গেস্ট হাউস, পাঞ্চেত রেসিডেন্সি, গড়পঞ্চকোট ইকো টুরিজম |

কি দেখবেন : গড়পঞ্চকোটের গড়, বিরিঞ্চিনাথের মন্দির, জয়চন্ডী পাহাড়, বড়ন্তি তে মুরারডি লেক, কল্যাণেশ্বরী মন্দির

কখন যাবেন : গরমকালে এই অঞ্চলে অত্যধিক গরম থাকে, সেই সময়ে না যাওয়ায় ভালো । বহু সংখ্যক টুরিস্ট এই অঞ্চলে শীতকালে এসে থাকে এই অঞ্চলের মনোরম দৃশ্য উপভোগ করতে । আমরা সববাংলার পক্ষ থেকে অনুরোধ করবো শীতকালে তো বটেই একবার বর্ষাকালে বেরিয়ে আসুন এই অঞ্চল থেকে । তুলনামূলক পর্যটকদের কম ভিড় সঙ্গে চারিদিকের ঘন সবুজ বর্ষাকালে গড়পঞ্চকোটকে আরো মোহময়ী করে তোলে । আমাদের মতে গড়পঞ্চকোটে আসার সেরা সময় হলো – নভেম্বর – মার্চ ও জুলাই – সেপ্টেম্বর ।

সতর্কতা : স্থানীয় বাসিন্দারা সন্ধ্যের পরে লজের বাইরে বেরোতে নিষেধ করে কারণ এই অঞ্চলে রাতের পর নানা প্রকার দুর্বৃত্তকারীদের উৎপাত আছে বলে শোনা যায় ।


 

তথ্যসূত্র


  1. নিজস্ব প্রতিনিধি

৪ Comments

৪ Comments

  1. অরবিন্দ বন্দ‍্যোপাধ্যায়

    আগস্ট ১২, ২০১৯ at ৪:১২ অপরাহ্ণ

    ভারী মনোরম লেখা। দয়া করে একটু শুদ্ধ বানান লেখার দিকটা দেখবেন?

  2. Pingback: বিরিঞ্চিনাথ মন্দির ভ্রমণ | সববাংলায়

  3. Pingback: জয়চন্ডী পাহাড় ভ্রমণ | সববাংলায়

  4. Pingback: বিহারীনাথ ভ্রমণ | সববাংলায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top

 পোস্টটি ভালো লাগলে শেয়ার করে সকলকে পড়ার সুযোগ করে দিন।  

error: Content is protected !!