সববাংলায়

সুকান্ত ভট্টাচার্য

বাংলা সাহিত্যের এক ক্ষণজন্মা প্রতিভাধর কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য (Sukanta Bhattacharya) আপামর বাঙালি পাঠকের কাছে ‘কিশোর কবি’ নামেই সুপরিচিত। ইংরেজি সাহিত্যের শেলি, কিটস প্রমুখদের মত তাঁরও জীবন ফুরিয়ে গিয়েছিল খুব অল্প বয়সেই। মাত্র ২১ বছরের জীবৎকালে বাংলা সাহিত্যকে যে অসামান্য অবদানে পরিপূর্ণ করেছেন সুকান্ত তা তুলনারহিত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, মন্বন্তর, ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা প্রভৃতির বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন তিনি। কৈশোর থেকেই তিনি যুক্ত হয়েছিলেন সাম্যবাদী রাজনীতির সঙ্গে। ‘ছাড়পত্র’, ‘ঘুম নেই’, ‘মিঠেকড়া’ ইত্যাদি তাঁর অন্যতম বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ। শুধু কবিতাই নয়, তার পাশাপাশি কয়েকটি প্রবন্ধ এবং ‘অভিযান’ নামে একটি নাটিকাও লিখেছিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণ সময়ের কর্মী হিসেবে প্রগতিশীল লেখক শিল্পী সঙ্ঘে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। বয়সের সীমাকে পেরিয়ে বাংলা সাহিত্যে কালজয়ী স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছেন সুকান্ত ভট্টাচার্য ।

সুকান্ত ভট্টাচার্য
সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনী ভিডিও আকারে দেখতে ছবিতে ক্লিক করুন

১৯২৬ সালের ১৫ আগস্ট কলকাতার কালীঘাটের ৪২ নং মহিম হালদার স্ট্রিটের বাড়িতে সুকান্ত ভট্টাচার্যের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম নিবারণ ভট্টাচার্য এবং মায়ের নাম সুনীতি দেবী। নিবারণ ভট্টাচার্যের দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী ছিলেন সুনীতি দেবী। তাঁর আগে প্রথম পক্ষের স্ত্রী মনমোহিনী দেবীরও এক পুত্র ছিল। নিবারণচন্দ্র বইয়ের ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে ১৯১৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সারস্বত লাইব্রেরি। সুকান্ত ভট্টাচার্যের দাদু ছিলেন সতীশচন্দ্র ভট্টাচার্য। তাঁদের পৈতৃক নিবাস ছিল ফরিদপুর জেলায় উনশিয়া গ্রামে। সুকান্তের শৈশব মামার বাড়িতে কাটলেও তাঁর জন্মের কিছু পরে বাগবাজারের নিবেদিতা লেনের একটি দোতলা বাড়িতে কিছুদিন কাটিয়েছিলেন সুকান্ত। সেখানে তাঁর জ্যাঠতুতো দিদি রাণীই মণীন্দ্রলাল বসুর ‘রমলা’ উপন্যাসের চরিত্রের নামে তাঁর নাম রাখেন সুকান্ত। সুকান্তর দাদু সতীশচন্দ্রের ইংরেজি সাহিত্য ও জ্যোতিষশাস্ত্রের চর্চার উপর গভীর দখল ছিল। মামার বাড়ির পরিবেশ থেকেই পরবর্তীকালে সুকান্তের লেখাপড়ার প্রতি অনুরাগ, কুসংস্কারকে অগ্রাহ্য করার সাহস, দরিদ্র মানুষের প্রতি অগাধ ভালবাসা ও দরদ এ সব প্রবৃত্তিগুলি চরিত্রে ফুটে উঠেছিল। ছোটবেলায় কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাঁর মা সুর করে কাশীদাসী মহাভারত আর রামায়ণ পড়তেন। সুকান্ত ভট্টাচার্যের ঠাকুরদাদা জগচ্চন্দ্র ভট্টাচার্য এবং জ্যাঠামশাই বিদ্যাভূষণ কৃষ্ণচন্দ্র ভট্টাচার্য। সুকান্তের অন্যান্য ভাইয়েরা হলেন যথাক্রমে সুশীল, প্রশান্ত, বিভাস, অশোক এবং অমিয়। ১৯৩৭ সালে সুকান্তের যখন মাত্র ১১ বছর বয়স, সেই সময়েই তাঁর মা মারা যান।

বৌদি সরযূদেবীর কাছেই পড়াশোনার হাতেখড়ি হয়েছিল সুকান্তের। সরযূদেবী সুকান্তের পছন্দমত ছড়া ও গল্পের বই পড়ে পড়ে শোনাতেন। খেলাধূলায় বিশেষ আগ্রহ ছিল না সুকান্তের। প্রায়ই একটা রেডিও কানে দিয়ে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে পছন্দ করতেন তিনি। কমলা বিদ্যামন্দিরে প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন তিনি। কমলা বিদ্যামন্দিরে পড়ার সময় ‘সঞ্চয়’ নামে তাঁর নিজের হাতে লেখা একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন সুকান্ত। এরপরে বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাই স্কুলে ভর্তি হন সুকান্ত ভট্টাচার্য। এই স্কুলেই পরিচয় হয় সুহৃদ অরুণাচল বসুর সঙ্গে। সুকান্ত ভট্টাচার্য এবং অরুণাচল বসু একত্রে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় ‘সপ্তমিকা’ নামের একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এই কাজে তাঁদের সহায়তা করেছিলেন বেলেঘাটা দেশবন্ধু হাই স্কুলের শিক্ষক নবদ্বীপচন্দ্র দেবনাথ। ১৯৪৫ সালে এই স্কুল থেকেই প্রবেশিকা পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন তিনি। পড়ার বইয়ের বাইরে অন্য বই পড়ার প্রতিই তাঁর বেশি আগ্রহ ছিল। তাঁর বৌদির ঘরে এক আলমারি ভর্তি নানাবিধ বই, পত্র-পত্রিকা ছিল। সেখান থেকেই শৈশবেই শরৎচন্দ্র, বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, টেকচাঁদ ঠাকুর প্রমুখের লেখা পড়ে বড় হয়েছেন সুকান্ত।

পাঁচ-ছয় বছর বয়স থেকেই মুখে মুখে ছড়া বানাতে পারতেন তিনি। তাই বাড়ির সকলেই তাঁকে ছোট থেকে কবি হিসেবে ডাকতে শুরু করে। একটা বাঁধানো খাতায় কবিতা লিখতেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। বিজনকুমার গঙ্গোপাধ্যায়ের সম্পাদনায় ‘শিখা’ পত্রিকায় প্রথম তাঁর লেখা বিবেকানন্দের জীবনী প্রকাশিত হয়। মাত্র ১১ বছর বয়সে ‘রাখাল ছেলে’ নামের একটি রূপক গীতিনাট্য রচনা করেন সুকান্ত। এছাড়াও ঐ বয়সে তাঁর লেখা দুটি নাটক হল ‘বিজয় সিংহের লঙ্কা বিজয়’ এবং ‘লঙ্কাকাণ্ড’। তাঁর সাহিত্যজীবনে শিক্ষক নবদ্বীপচন্দ্র দেবনাথ এবং তাঁর বন্ধু অরুণাচল বসুর মা সরলা দেবীর গভীর প্রভাব ছিল। মাতৃহারা সুকান্তকে মায়ের মতোই ভালবাসতেন ও স্নেহ করতেন সরলা দেবী। কৈশোরে ছাত্র আন্দোলন ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ায় সুকান্তের আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে।

সুকান্তের দাদা মনোমোহন ভট্টাচার্যের সৌজন্যে নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সুকান্তের সাক্ষাৎ হয় এবং তাঁর মাধ্যমেই ১৯৪১ সালে কলকাতা বেতারের ‘গল্পদাদুর আসর’-এ রবীন্দ্রনাথের লেখা ‘শীতের আহ্বান’ কবিতাটি আবৃত্তি করেন। রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর সেই আসরেই ১৯৪২ সালে নিজের লেখা ‘প্রথম বার্ষিকী’ নামের একটি কবিতা বেতারে পাঠ করে তাঁকে শ্রদ্ধা জানান সুকান্ত ভট্টাচার্য। ‘গল্পদাদুর আসর’-এর জন্য সেই বয়সেই তাঁর লেখা গানে সুর দিয়ে অন্যতম বিখ্যাত গায়ক পঙ্কজ কুমার মল্লিক বেতারে গেয়েছিলেন।

কয়েকজন বন্ধু মিলে বেলেঘাটায় তাঁর বাড়িতে বেলেঘাটা স্টুডেন্টস লাইব্রেরি খোলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। ১৯৩৯ সাল থেকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের নানাবিধ খবরাখবর বেতারে শুনে, কলকাতার পথে পথে মিছিল, ধর্মঘট ইত্যাদি দেখে সুকান্তের মনে গভীর প্রভাব পড়েছিল। ১৯৪১ সালের মধ্যে তাঁদের যৌথ পরিবারে একের পর এক সদস্যের মৃত্যু তাঁকে ক্রমশ শোকগ্রস্ত করে তোলে। তাঁর জীবনে রবীন্দ্রনাথের এক বিরাট প্রভাব ছিল। তাঁর হাতের লেখা পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের মত হয়ে উঠেছিল। আবার রবীন্দ্রনাথের মৃত্যু তাঁর কবিমনে গভীর ছাপ ফেলেছিল এবং ধীরে ধীরে ঐ সময় থেকেই তিনি রোমান্টিকতার জগত ছেড়ে বাস্তবের কঠিন-কঠোর মাটিতে নেমে আসেন। ১৯৪২ সালের গোড়ার দিকে কবিতার ক্ষেত্রে তাঁর আদর্শ হয়ে ওঠেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় এবং রাজনীতিতে তাঁর আদর্শ হয়ে ওঠেন অন্নদাশঙ্কর ভট্টাচার্য। এই বছরের শুরু থেকেই মার্কসবাদে দীক্ষিত হয়ে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির একনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন সুকান্ত। ঠিক ঐ সময়ই ঘটে যায় বাংলার পঞ্চাশের মন্বন্তর। এই সময় দুর্ভিক্ষ-পীড়িত নর-নারীর সেবায় আত্মনিয়োগ করেছিলেন তিনি। এই দুর্ভিক্ষের বিরোধিতা করে সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন ‘অভিযান’ নামে একটি বিখ্যাত নাটক। মোটামুটিভাবে ১৯৪১ থেকে ১৯৪৬ সালের মধ্যেই তাঁর সাহিত্যজীবন সীমায়িত ছিল।

সুকান্তের কবিতায় সাধারণ মানুষের কথাই স্থান পায় বেশি তাই অনেকে তাঁকে গণমানুষের কবি হিসেবেও আখ্যা দিয়ে থাকেন। অসহায়-নিপীড়িত সর্বহারা মানুষের সুখ, দুঃখ তার কবিতার প্রধান বিষয়। তিনি তাঁর লেখা কবিতার মধ্যে দিয়ে শ্রেণি বৈষম্য দূর করতে চেয়েছেন। মানবিক চেতনায় উদ্বুদ্ধ কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য বাংলা কাব্যধারার প্রচলিত প্রেক্ষাপটকে আমূল বদলে দিতে পেরেছিলেন। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টির পত্রিকা ‘দৈনিক স্বাধীনতা’র (১৯৪৫) ‘কিশোর সভা’ বিভাগের সম্পাদনার দায়িত্ব ছিল তাঁরই উপর। তাঁর বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থগুলির মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হল – ‘ছাড়পত্র’ (১৯৪৭), ‘পূর্বাভাস’ (১৯৫০), ‘মিঠেকড়া’ (১৯৫১), ‘অভিযান’ (১৯৫৩), ‘ঘুম নেই’ (১৯৫৪), ‘হরতাল’ (১৯৬২), ‘গীতিগুচ্ছ’ (১৯৬৫) প্রভৃতি। পরবর্তীকালে বাংলাদেশ এবং পশ্চিমবঙ্গ থেকে মিলিতভাবে ‘সুকান্ত সমগ্র’ নামে তাঁর রচনাবলি একত্রিত আকারে প্রকাশিত হয়। সুকান্ত ফ্যাসিবাদ-বিরোধী লেখক ও শিল্পী সঙ্ঘের পক্ষে ‘আকাল’ (১৯৪৪) নামে একটি কাব্যগ্রন্থ সম্পাদনা করেন। সুকান্তের কবিতা বিষয়বৈচিত্র্যে ও রচনা দক্ষতায় অনন্য। কখনও বাড়ির রেলিং ভাঙা সিঁড়ি, কখনও মোরগ, কখনও পথ ইত্যাদি বিষয় হিসেবে উঠে এসেছে তাঁর কবিতায়। ‘সিঁড়ি’, ‘একটি মোরগের কাহিনী’, ‘রবীন্দ্রনাথের প্রতি’, ‘দেশলাই কাঠি’, ‘ঘুম ভাঙার গান’, ‘রৌদ্রের গান’, ‘ফসলের ডাক : ১৩৫১’, ‘কৃষকের গান’, ‘আঠারো বছর বয়স’, ‘প্রিয়তমাসু’ ইত্যাদি সুকান্ত ভট্টাচার্যের বিখ্যাত সব কবিতা।  

পার্টি ও সংগঠনের কাজে অত্যধিক পরিশ্রমের ফলে দুরারোগ্য ক্ষয়রোগে আক্রান্ত হয়ে ১৯৪৭ সালের ১৩ মে মাত্র ২১ বছর বয়সে কলকাতায় সুকান্ত ভট্টাচার্যের মৃত্যু হয়।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading