ইতিহাস

মাইকেল মধুসূদন দত্ত

মাইকেল মধুসূদন দত্ত (Michael Madhusudan Dutt) উনবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি তথা নাট্যকার ও প্রহসন রচয়িতা। তাঁকে আধুনিক বাংলা নাটকের পুরোধাপুরুষ বলা হয়ে থাকে।

১৮২৪ সালে ২৫ জানুয়ারি অধুনা বাংলাদেশের যশোর জেলার কেশবপুরে কপোতাক্ষ নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামে মাইকেল মধুসূদন দত্তের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম রাজনারায়ণ দত্ত, এবং তাঁর মায়ের নাম জাহ্নবী দেবী। তাঁর বাবা সদর আদালতের একজন প্লীডার ছিলেন। হিন্দু বিবাহ পদ্ধতি সম্পর্কে তাঁর গভীর অনাস্থার কারণে মাইকেল তাঁর বাবার পছন্দ করা পাত্রীকে বিবাহ করতে অস্বীকার করেন। তিনি মুক্ত সম্পর্কে বিশ্বাসী ছিলেন। ইউরোপীয় বিবাহ রীতি অনুসারে তিনি নিজেই নিজের জীবনসঙ্গী বেছে নিতে চেয়েছিলেন। ১৮৪৮ সালের ৩১ জুলাই, মাদ্রাজে থাকাকালীন সতেরো বছর বয়সী রেবেকা থম্পসন ম্যাকতাভিসের সাথে তাঁর বিবাহ হয়। মাইকেল মধুসূদনই প্রথম ভারতীয় যিনি একজন অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান নারীর সাথে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁদের চার সন্তানের মধ্যে মাত্র দুজনই দীর্ঘকাল বেঁচে ছিলেন। এঁদের মধ্যে ছেলে ম্যাক তাভিশ দত্ত মাদ্রাজের একটি কোর্টের প্লীডার ছিলেন। ১৮৫৬ সালে মাইকেল মধুসূদন দত্ত এবং রেবেকার বিচ্ছেদ হয়ে যায় যদিও তাঁদের আইনত বিচ্ছেদের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। এই সময় তাঁর বাবার মৃত্যুর হলে মাইকেল মধুসূদন মাদ্রাজ থেকে কলকাতায় ফিরে আসেন। ১৮৫৯ সাল থেকে মাইকেল বাইশ বছর বয়সী ফরাসি তরুণী- এমিলিয়া হেনরিয়েটা সোফি হোয়াইট নামে এক তরুণীর সাথে প্রণয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং তাঁর সাথে সহবাস করতে শুরু করেন। মাদ্রাজে থাকাকালীন তাঁর এক সহকর্মীর কন্যা ছিলেন হেনরিয়েটা। মাইকেল মধুসূদন এবং হেনরিয়েটার দুটি পুত্র সন্তান ছিল যাঁদের নাম- ফ্রেডরিক মাইকেল মিল্টন এবং অ্যালবার্ট নেপোলিয়ান। মিল্টনের মাত্র চোদ্দ বছর এবং নেপোলিয়ান মাত্র চল্লিশ বছরের বেশি বাঁচেনি। তাঁদের হেনরিয়েটা এলিজাবেথ শর্মিষ্ঠা নামে একটি কন্যা সন্তানও ছিল যার মাত্র কুড়ি বছর বয়সে মৃত্যু হয়।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয় গ্রামের পাঠশালাতে যেখানে তিনি বাংলা এবং ফারসি ভাষায় শিক্ষা লাভ করেন। তিনি ছোট থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। ছোট থেকেই তিনি ইংরেজি ভাষায় দক্ষ ছিলেন এবং ইংরেজী সাহিত্যের একজন মনোযোগী পাঠক ছিলেন। ১৮৩৩ সালে তিনি কলকাতার হিন্দু কলেজে ভর্তি হন এবং সেখানে তাঁর অধ্যাপক ছিলেন কবি ডেভিড লেসটার রিচার্ডসন। তিনি তাঁর দ্বারা ভীষণভাবে প্রভাবিত হন এবং তাঁর অনুপ্রেরণায় ইংরেজি কবিতার প্রতি মাইকেলের প্রগাঢ় ভালোবাসা তৈরি হয় বিশেষ করে লর্ড বায়রনের কবিতার প্রতি তাঁর বিশেষ অনুরাগ ছিল।

খুব অল্প বয়স থেকে মধুসূদন ইংরেজি ভাষায় কবিতা লিখতে শুরু করেন। লেখক জীবনের শুরুতে ইংরেজিতেই কবিতা লিখতেন তিনি। এই সময় তাঁর কাব্য রচনার অন্যতম অনুপ্রেরণা ছিল উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ এবং জন মিল্টনের কবিতা। তাঁর লেখা কবিতা ইংল্যান্ডের “ব্ল্যাক উডস ম্যাগাজিন” (Blackwood’s Magazine) এবং “বেন্টলি’স মিসসেলানি” (Bentley’s Miscellany) পত্রিকায় প্রকাশ করার জন্য পাঠান যদিও তাঁর কবিতা কোনদিনও সেইসব পত্রিকায় প্রকাশিত হয়নি। মূলত এই সময় থেকেই তাঁর সাথে প্রখ্যাত সাহিত্যিক গৌর দাস বসাকের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। ১৮৪৩ সালে মধুসূদন খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেন এবং মাইকেল মধুসূদন নামে পরিচিত হন। বাবার অমতে খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করার জন্য তিনি তাঁকে ত্যাজ্যপুত্র করেন। ধর্মান্তরিত হওয়ার পর মাইকেল মধুসূদন কিছুদিন বিশপস কলেজে পড়াশোনা করেন।

১৮৪৯ সালে তাঁর প্রথম ইংরেজি কবিতার বই যেটি একটি দীর্ঘ কবিতার সংকলন ‘দ্য ক্যাপটিভ লেডি’ (The Captive Ladie) প্রকাশিত হয়। সেই সময় অনেক ইংরেজি পত্র পত্রিকায় তাঁর লেখা প্রকাশিত হতে থাকে।১৮৪৮ সালে মাইকেল মধুসূদন মাদ্রাজে যান এবং ১৮৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি সেখানেই ছিলেন। এখানে থাকাকালীন তিনি বেশ কিছু পত্র পত্রিকা সম্পাদনের কাজের সাথে যুক্ত ছিলেন।

মাইকেল প্রথমে হেডক্লার্ক এবং পরে প্রধান ইন্টারপ্রেটার হিসেবে কলকাতা হাইকোর্টের তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। মূলত এই সময় থেকে তাঁর বাংলা ভাষায় লেখালেখি শুরু হয়।তৎকালীন কলকাতায় শুরু হওয়া নতুন থিয়েটার দেখে মধুসূদনের তেমনভাবে মন ভরেনি তাই তিনি নাটক লিখতে উৎসাহিত বোধ করেন। তাঁর দুই বন্ধু জন এলিয়ট ড্রিংকিংওয়াটার বেথুন এবং গৌর দাস বসাক তাঁকে ইংরেজি ছেড়ে বাংলায় লেখার পরামর্শ দেন। ১৮৫৯ সাল থেকে ১৮৬২ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলায় “শর্মিষ্ঠা” (১৮৫৯), “পদ্মাবতী” (১৮৫৯), “কৃষ্ণকুমারী” (১৮৬০) নামে তিনটি নাটক এবং “একেই কি বলে সভ্যতা” (১৮৬০) ও “বুড়ো শালিকের ঘাড়ে রোঁ” (১৮৬০) নামে দুটি প্রহসন লেখেন। তাঁর লেখা দুটি প্রহসন মূলত বেলগাছিয়া নাট্যশালায় অভিনয়ের জন্য লেখা হয়েছিল। কিন্তু সেই প্রহসনের বিষয়বস্তু তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থাকে আক্রমণ করায় তা মঞ্চায়িত করতে দেওয়া হয়নি। এই ঘটনায় মধুসূদন বেশ আঘাত পেয়েছিলেন।

এরপর মধুসূদনের চারটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয় যেখানে তিনি প্রথমবার বাংলা কাব্য সাহিত্যে ‘অমিত্রাক্ষর ছন্দের’ আগমন ঘটান। তাঁর লেখা “মেঘনাদবদ কাব্য” ১৮৬১ সালে প্রকাশিত হয়। মেঘনাদবদ কাব্যকে বাংলা সাহিত্যের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি গ্রন্থ বলে মনে করা হয়। মেঘনাদবদ কাব্যের খ্যাতি সাহিত্য জগতে তাঁকে অমরত্ব প্রদান করে।

১৮৬২ সালে মধুসূদন ব্যারিস্টার হওয়ার উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ড যাত্রা করেন এবং লন্ডনের গ্রে’জ ইনে (Gray’s Inn) তিনি ভর্তি হন। তাঁর ইংল্যান্ড যাত্রা উপলক্ষে তিনি “ফরগেট মি নট, ও মাদার” (Forget me not, O Mother) নামক একটি কবিতা লেখেন। ১৮৬৩ সালে এমিলিয়া ইংল্যান্ডে তাঁর কাছে চলে যান। এখানে মধুসূদনকে খুবই আর্থিক সংকটে পড়তে হয় এবং একপ্রকার বাধ্য হয়েই তাঁদের সস্তার একটি বাসভবনে উঠে যেতে হয়। পরবর্তী সময়ে মধুসূদন বেশ কিছুদিন ফ্রান্সের ভার্সাইতে থাকতেন। এখানে থাকাকালীন তিনি বেশ কিছু বাংলা সনেট রচনা করেন যেগুলি পরবর্তীকালে “চতুর্দশপদী কবিতাবলী” নামে প্রকাশিত হয়। ইংল্যান্ডে তাঁর আর্থিক দুর্দশার সেই সময় থেকেই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁকে আর্থিক ভাবে সাহায্য করতে শুরু করেন। মূলত এই কারণেই মধুসূদন দত্ত বিদ্যাসাগরকে “দয়ার সাগর” নামে অভিহিত করতেন।

১৮৬৭ সালে মধুসূদন কলকাতায় ফিরে আসেন এবং কলকাতা হাইকোর্টে কাজ শুরু করেন। ১৮৬৯ সালে তাঁর পরিবারও কলকাতায় ফিরে আসে। দেশে ফিরে আসার পর তিনি খুব সামান্যই লেখালেখি করতে পেরেছিলেন। ১৮৭১ সালে তিনি হোমারের “ইলিয়াড” মহাকাব্যের কয়েকটি সর্গের অনুবাদ করেন, যার নাম দিয়েছিলেন “হেক্টর বধ”। এটি ছিল মধুসূদনের একমাত্র গদ্য আখ্যান। তাঁর সর্বশেষ রচনা “মায়াকানন” যেটি ১৮৭২ সালে প্রকাশিত হয়।

১৮৭৩ সালের ২৬ জুন অত্যন্ত শারীরিক কষ্ট এবং দারিদ্র্যের মধ্যে তাঁদের চতুর্থ সন্তানকে জন্ম দিতে গিয়ে হেনরিয়েটার মৃত্যু হয়। ১৮৭৩ সালের ২৯ জুন আলিপুর জেনারেল হাসপাতালে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে মাইকেল মধুসূদন দত্তের মৃত্যু হয়। কলকাতার আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু রোডে অবস্থিত সমাধি ক্ষেত্রে হেনরিয়েটার পাশে মধুসূদনকে সমাধিস্থ করা হয়। মাইকেল মধুসূদন দত্তকে মৃত্যুর পরে বহুদিন অবধি তিনি অবজ্ঞা পেয়েছেন। তাঁর প্রাপ্য সম্মানটুকু তিনি অনেক পরে পেয়েছিলেন যখন তাঁর সমাধিক্ষেত্রে একটি ফলক তৈরি করে তার ওপর তাঁর রচিত “দাঁড়াও পথিকবর” কবিতাটি যখন লিখে দেওয়া হয়েছিল।

  • এই ধরণের তথ্য লিখে আয় করতে চাইলে…

    আপনার নিজের একটি তথ্যমূলক লেখা আপনার নাম ও যোগাযোগ নম্বরসহ আমাদের ইমেল করুন contact@sobbanglay.com

  • সববাংলায় সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য আজই যোগাযোগ করুন
    contact@sobbanglay.com

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

শুধুমাত্র খাঁটি মধুই উপকারী, তাই বাংলার খাঁটি মধু খান


ফুড হাউস মধু

হোয়াটস্যাপের অর্ডার করতে এখানে ক্লিক করুন