ইতিহাস

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়

কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় আধুনিক বাংলা কাব্য জগতের একজন স্বনামধন্য কবি। কবিতার পাশাপাশি তিনি পদ্য, উপন্যাস, ভ্রমণসাহিত্য, শিশু ও কিশোর সাহিত্য  ইত্যাদি নানা বিষয়েও সমান সাবলীল। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় ১৯১৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে তাঁর মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ক্ষিতিশচন্দ্র মুখোপাধ্যায় ও মায়ের নাম জানকী বালা দেবী। বাবার বদলির চাকরি সূত্রে তাঁর প্রাথমিক স্কুল ছিল বর্তমান বাংলাদেশের রাজশাহীর নওগাঁয়ে। প্রাথমিক পড়াশোনা শেষে তিনি কলকাতার মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশন ও সত্যভামা ইনস্টিটিউশনে পড়াশোনা করেন এবং ভবানীপুর মিত্র স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিক পাস করেন। এই সময় থেকেই রাজনীতি করার উদ্দেশ্যে তিনি কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন। এরপর স্কটিশচার্চ কলেজ থেকে দর্শনে অনার্সসহ বি.এ পাস করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হলেও উনি এই সময় সক্রিয় ভাবে রাজনৈতিক কার্যকলাপের সাথে যুক্ত হয়ে যান।

স্কুলে পড়ার সময় থেকেই তিনি রাজনীতিতে আগ্রহী ছিলেন। কলেজ ও রাজনীতির সুবাদে তাঁর নানা ব্যক্তিত্বের সাথে পরিচয় হতে থাকে। এইসময় কবি সমর সেন সুভাষকে ‘হ্যান্ডবুক অব মার্ক্সিজম’ নামে একটি বই উপহার দিয়েছিলেন। এই বইটি পড়ে সুভাষ মার্ক্সবাদের প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৯৩৯ সালে তিনি লেবার পার্টির সাথে যুক্ত হন। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সাহিত্য যাত্রা শুরু হয় ১৯৪০ সালে ‘পদাতিক’ কাব্যগ্রন্থটি রচনার মধ্যে দিয়ে। এইসময় তিনি শ্রমজীবি মানুষদের কাছে মুক্তিপ্রয়াসী কবিরূপে পরিচিতি পেয়েছিলেন। ১৯৪২ সালে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লেবার পার্টি ত্যাগ করে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। ‘জনযুদ্ধ পত্রিকায়’ মাসিক ১৫ টাকা বেতনে কাজ করতে শুরু করেন।

‘দৈনিক স্বাধীনতা’ পত্রিকায় তিনি সাংবাদিক হিসাবেও কাজ করতেন। ১৯৪৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির কার্যকলাপ নিষিদ্ধ হলে পার্টির অন্যান্য সদস্যদের সাথে কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ও গ্রেপ্তার হন। ১৯৫০ সালে তিনি কারাগার থেকে মুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে একটি প্রকাশনা সংস্থার সাব-এডিটর হয়েছিলেন। ১৯৫১ সালে তিনি ‘পরিচয় পত্রিকার’ সম্পাদনার কাজে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫১ সালে বিবাহ সূত্রে আবদ্ধ হন লেখিকা গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে।

১৯৫২ সালে সস্ত্রীক বজবজ এলাকার ব্যঞ্জনহেড়িয়ায় শ্রমিক বস্তির মাটির ঘরে বসবাস শুরু করেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। এখান থেকেই তিনি আত্মনিয়োগ করেন চটকল মজুর সংগঠনের কাজে। পরে কলকাতা বন্দর অঞ্চলে ট্রেড ইউনিয়ন সংগঠনেরও কাজ করেন। ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হলে তিনি থেকে যান পুরনো পার্টিতেই। ১৯৬৭ সালে যুক্তফ্রন্ট সরকার ভেঙ্গে দেওয়া হলে ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে তিনি দ্বিতীয়বার কারাবরণ করেন। এই দফায় তিনি তেরো দিন কারারুদ্ধ ছিলেন। লোথার লুৎসেকে একটি সাক্ষাৎকারে একবার বলেছিলেন, ‘‘আমি জেলখানায় কিছু লিখিনি। বরং আন্দোলন করেছি, রাজনীতির বই পড়েছি। লেখা আমি শুরু করলাম এর পর জেল থেকে বেরিয়ে— যখন চটকল শ্রমিকদের গ্রামে গিয়ে থাকলাম। শ্রমিক আন্দোলন করতে করতেই আমার চারপাশের জীবন আমাকে লেখার দিকে ঠেলে দিল।’’

রাজনীতি জীবনের লড়াইযের পাশে কবি সুভাষ লেখালিখির কাজও চালিয়ে গিয়েছেন। তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ ‘অগ্নিকোণ’,  ‘চিরকুট'(১৯৫০), ‘ফুল ফুটুক'(১৯৫৭),  ‘যত দূরেই যাই'(১৯৬২), ‘কাল মধুমাস'(১৯৬৬) বিশেষ উল্লেখযোগ্য। ১৯৪০-এর দশক থেকে তাঁর অকপট কাব্যভঙ্গী পরবর্তীকালের কবিদের কাছেও অনুসরণীয় হয়ে ওঠে। তিনি কবিতাকে কখনও রসহীন ও সৌন্দর্যহীন করে ফেলেননি এবং এখানেই কবির কৃতিত্ব। কবিতা ছাড়াও ‘হাৎরাস’, ‘অন্তরীপ’, ‘হ্যানসেনের অসুখ’ প্রভৃতি গদ্য রচনা করেছেন। তাঁর লেখা ”প্রিয় ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য/এসে গেছে ধ্বংসের বার্তা” বা “ফুল ফুটুক না ফুটুক/আজ বসন্ত’’ প্রভৃতি অমর পঙক্তি আজ বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে আছে। তিনি কবিতা লিখেছেন মূলত দেশকে ভালোবেসে, ভাষাকে ভালোবেসে, জীবনকে ভালোবেসে।

সুভাষের লেখা ভ্রমণ সাহিত্যের মধ্যে ‘আমার বাংলা’, ‘ডাক বাংলোর ডায়েরী’ উল্লেখযোগ্য।

দরিদ্র পরিবারের সন্তান কবি সুভাষ সমাজের কষ্টকে অনুভব করেছিলেন। ১৯৬৪ সালে কমিউনিস্ট পার্টি বিভক্ত হয়ে গেলে তিনি পুরোনো দলেই ছিলেন। তিনি ‘সন্দেশ পত্রিকায়’ সত্যজিৎ রায়ের সাথে কিছুকাল সম্পাদনার কাজও করেছিলেন। আজীবন বামপন্থী ও ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সাথে থাকলেও উনিশশো সত্তরের দশক থেকে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলন থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন।

জীবনে অসংখ্য পুরস্কার পেয়েছিলেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ১৯৬৪ সালে সাহিত্য একাডেমি, ১৯৮২ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন প্রদত্ত মিজো টারসান জেড পুরস্কার, ১৯৮৪ সালে আনন্দ পুরস্কার, ১৯৯৬ সালে ভারতের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মাননা সাহিত্য একাডেমি ফেলোশিপ। ১৯৮৭ সাল থেকে তিনি সাহিত্য একাডেমির একজিকিউটিভ বোর্ডের সদস্য ছিলেন। কলকাতা মেট্রো নিউ গড়িয়া স্টেশনটিকে কবি সুভাষের নামে উৎসর্গ করে ২০১০ সালে এই স্টেশনের নাম হয় ‘কবি সুভাষ মেট্রো স্টেশন’।

জীবনের শেষের দিকে প্রাইমার লেখায় মন দিয়েছিলেন। এই প্রাইমারে তিনি জোর দিয়েছিলেন চলিত আটপৌরে শব্দের ওপর। চেষ্টা করেছিলেন যাতে পড়ুয়াদের চেনা পরিচয়ের সীমা বাড়ানো যায়। ‘কাজের বাংলা’ নামে চটি একখানি বই লিখেছিলেন তিনি। বাংলা ভাষার ব্যবহারিক দিক নিয়ে নানা কথাবার্তা ছিল তাতে। কিংবদন্তি এই লেখকের ২০০৩ সালের ৮ জুলাই ৮৪ বছর বয়সে মৃত্যু হয়।

Click to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

To Top
error: Content is protected !!

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন