ইতিহাস

জন কিট্‌স

জন কিট্‌স

ইংরেজি সাহিত্যের রোমান্টিক কাব্য আন্দোলনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি জন কিট্‌স (John Keats)। তাঁকে ইংরেজি সাহিত্যের ইতিহাসে ‘চিরসুন্দরের কবি’ বলা হয়। মাত্র ২৫ বছরের জীবৎকালে অসাধারণ কল্পনাশক্তি, সৌন্দর্যবোধ আর চিরতারুণ্যের মায়ায় শ্রেষ্ঠ রোম্যাণ্টিক কবিতাগুলি লিখে গিয়েছেন তিনি। সত্য আর সুন্দরের উপাসনার আগ্রহ ঝরে পড়েছে তাঁর লেখায়। লর্ড বায়রন এবং পি.বি.শেলির পরে তিনিই রোমান্টিক ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি। জন কিট্‌স রচিত ‘এণ্ডিমিয়ন’, ‘ওড অন এ গ্রেসিয়ান আর্ন’, ‘ওড টু এ নাইটিঙ্গেল’, ‘ওড অন ইণ্ডোলেন্স’, ‘ওড অন মেলাঙ্কলি’, ‘হাইপেরিয়ন’, ‘ওড টু সাইকি’ ইত্যাদি বিখ্যাত সব কাব্যগ্রন্থ। এছাড়াও কিট্‌স অনেকগুলি সনেটও লিখেছেন যার মধ্যে ‘অন ফার্স্ট লুকিং ইনটু চ্যাপম্যানস হোমার’ উল্লেখযোগ্য। বিস্তৃত চিত্রকল্প, রহস্যময়তা, প্রকৃতিপ্রেম, সৌন্দর্যচেতনার পাশাপাশি তাঁর কবিতায় ফুটে উঠতো গ্রিক সংস্কৃতি প্রভাবিত এক গভীর দর্শন যাকে সাহিত্য-তাত্ত্বিকরা ‘হেলেনিজ্‌ম’ বলে থাকেন। তাছাড়া ঋণাত্মক সক্ষমতা (Negetive Capability)-র তাত্ত্বিক কাঠামোটিও গড়ে উঠেছে কিট্‌সেরই কবিতাকে ঘিরে।

১৭৯৫ সালের ৩১ অক্টোবর লণ্ডনের মুরফিল্ডসে জন কিট্‌স এর জন্ম হয়। তাঁর বাবা টমাস কিট্‌স পেশায় ঘোড়ার আস্তাবলের কর্মচারী ছিলেন এবং তাঁর মায়ের নাম ছিল ফ্রান্সিস জেনিংস। তাঁদের চারটি পুত্র ও একটি কন্যা সন্তান জন্মগ্রহণ করে। বাল্যকালে কিট্‌সকে তাঁর বাবা এনফিল্ডের একটি স্কুলে ভর্তি করান যেখানে প্রধান শিক্ষকের পুত্র চার্লস ক্লার্কের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। এই ক্লার্কই কাব্যজগতের সঙ্গে কিট্‌সকে পরিচয় করান। বাল্যকালে চঞ্চলমতি কিট্‌সের প্রথাগত পড়াশোনায় মন বসতো না। কিন্তু ক্লার্কের সান্নিধ্যে স্কুলজীবনেই এলিজাবেথীয় যুগের কবি স্পেন্সার ও শেক্সপীয়ারের কাব্য, নাটক ইত্যাদি পড়তে শুরু করেন এবং সেইসব লেখাগুলি দ্বারা গভীরভাবে অনুপ্রাণিত হন। গ্রিক পুরাণের প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন তিনি। এই সময়েই হোমারের ‘ইলিয়াড’ মহাকাব্যটি পড়তে শুরু করেন তিনি যদিও তা ছিল চ্যাপম্যানের ইংরেজি অনুবাদ। বলা হয় স্পেন্সারের লেখা ‘দ্য ফেয়ারি কুইন’ বইটি পড়েই কাব্যসৃষ্টির প্রধান অনুপ্রেরণা পান কিট্‌স।

১৮০৪ সালে ঘোড়ার পিঠ থেকে পড়ে মারা যান কিট্‌সের বাবা। কিট্‌সের তখন মাত্র ৮ বছর বয়স। দুই মাস পরেই তাঁর মা ফ্রান্সিস দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন কিন্তু অসুখী দাম্পত্যের কারণে নিজের বাড়িতে মায়ের কাছে চলে আসেন ফ্রান্সিস। চার সন্তানের লালন-পালনের ভার ছিল তাঁর উপর। ১৮১০ সালে কিট্‌সের মা ফ্রান্সিসও যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। এডমান্টনে নিঃসঙ্গ কিট্‌সকে ১৮১১ সালে তাঁর দিদা এক চিকিৎসকের শিক্ষানবিশ হিসেবে কাজে নিযুক্ত করে দেন। স্কুলের পড়াশোনায় সেখানেই ইতি ঘটে তাঁর। ডাক্তার হ্যামণ্ডের সেই শিক্ষানবিশি ছেড়ে লণ্ডনে ফিরে এসে সেন্ট টমাস হাসপাতালে নিজেই ডাক্তারি শিখতে ও প্রায়োগিক জ্ঞান অর্জন করতে শুরু করেন তিনি। ১৮১৩ সালে কিট্‌স তাঁর জীবনের প্রথম কবিতাটি লেখেন ‘লাইনস ইন ইমিটেশন অফ স্পেন্সার’ নামে। চিকিৎসাকেই তাঁর পেশা হিসেবে বেছে নেওয়া কিট্‌সের পক্ষে সম্ভব ছিল না। তাই ১৮১৬ সালে চিকিৎসাশাস্ত্রে ডিপ্লোমা অর্জন করলেও ১৮১৭ সালে শুধুমাত্র কাব্য রচনার তাগিদেই পুরোপুরি ডাক্তারি ছেড়ে দেন তিনি। এর আগে ১৮১৫ সালে কিট্‌স লেখেন ‘টু হোপ’ এবং ‘টু অ্যাপোলো’ নামের দুটি ওড অর্থাৎ স্তোত্র কবিতা এবং অনেকগুলি সনেট। ঠিক এই সময়েই বন্ধু চার্লস ক্লার্কের সহায়তায় কিট্‌স পরিচিত হন হ্যামিল্টন রেনর্ল্ড, হ্যাজলিট, কোলরিজ, ল্যাম্ব, শেলি প্রমুখ বিখ্যাত সব কবি ও সমালোচকদের সঙ্গে। বিখ্যাত চিত্রকর সেভার্নের সঙ্গেও তাঁর পরিচয় হয় এই সময়। ওয়ার্ডসওয়ার্থের কবিতার প্রেমে পড়েন কিট্‌স যা তাঁর নিজের কবিতাকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল। ‘ও সলিচিউড’ সনেটটিতে এই ওয়ার্ডসওয়ার্থের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ক্লার্কের মাধ্যমে লেই হান্টের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার সুবাদে কিটসের এই কবিতাটি লেই হান্ট সম্পাদিত ‘দ্য এক্সামিনার’ পত্রিকায় প্রকাশ পায় ১৮১৬ সালে। ঐ বছরই নভেম্বর মাসে কিট্‌সের লেখা বিখ্যাত কবিতা ‘অন ফার্স্ট লুকিং ইনটু চ্যাপম্যান্স হোমার’ প্রকাশিত হয় ‘দ্য এক্সামিনার’ পত্রিকায়। ১৮১৭ সালের মার্চ মাসে প্রকাশ পায় কিট্‌সের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘পোয়েমস’ যেখানে ‘আই স্টুড টিপটো অন এ লিটল হিল’ এবং ‘স্লিপ অ্যাণ্ড পোয়েট্রি’ নামের দুটি বিখ্যাত কবিতা অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। ‘স্লিপ অ্যাণ্ড পোয়েট্রি’ কবিতাটির মধ্যে ওয়ার্ডসওয়ার্থের লেখা ‘টিন্টার্ণ অ্যাবে’ কবিতাটির প্রভাব লক্ষ করা যায়। ১৮১৬ থেকে ১৮১৮ সালের মধ্যেই দীর্ঘ একটি আখ্যানকাব্য রচনা করেন কিট্‌স ‘এণ্ডিমিয়ন’ নামে। ১৮১৮ সালে প্রকাশিত এই কাব্যগ্রন্থটিতে চারটি খণ্ডে গ্রিক পুরাণে বর্ণিত মেষপালক এণ্ডিমিয়ন ও চাঁদের প্রেম-প্রণয়ঘটিত রূপক আখ্যান বর্ণিত। কিট্‌সের কাব্যে কোনো অপূর্ণতার হাহাকার নেই, বরং আদর্শ প্রেম ও সৌন্দর্যের সন্ধানই তাঁর কাব্যের মূল সুর। কিন্তু ১৮১৮ সালেই ‘কোয়াটার্লি রিভিউ’ পত্রিকায় উইলসন ক্রোকার এই কাব্যের বিরূপ সমালোচনা করেন, কিন্তু এতে ক্ষুণ্ণ হননি কিট্‌স। এরপরেই বোকাচ্চিওর করুণ প্রেমকাহিনি অবলম্বনে তিনি লেখেন ‘ইসাবেলা, অর দ্য পট অফ বেসিল’। এই বছরেরই শেষ দিকে ‘হাইপেরিয়ন’ নামে একটি কাব্য লেখা শুরু করেন তিনি। এই কাব্যে মিলটনের ‘প্যারাডাইস লস্ট’ মহাকাব্যের মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

এই সময়ে হ্যাম্পস্টেডে কিট্‌স তাঁর দুই ভাই টম ও জর্জকে নিয়ে আসেন। ইতিমধ্যে তাঁর ছোটোভাই টম যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে ১৮১৮ সালে বাল্যকালেই মারা যায়। ভাইয়ের মৃত্যুশয্যায় পাশে ছিলেন কিট্‌স নিজে আর এই কারণেই সেবা করার দরুণ কিট্‌সের মধ্যেও যক্ষ্মা রোগের জীবাণু প্রবেশ করেছিল যা পরে তাঁরও মৃত্যুর কারণ হবে। টমের মৃত্যুর পরে ওয়েন্টওয়ার্থ প্লেসে নতুন বাড়িতে এসে ওঠেন জন কিট্‌স। এই বাড়িতে থাকার সময়েই কিট্‌সের সঙ্গে ফ্যানি ব্রাউনের ঘনিষ্ঠতা ও প্রেমের সূত্রপাত ঘটে। ফ্যানিকে কিট্‌স তাঁর লেখা ‘ব্রাইট স্টার’ কাব্যটি উপহার দেন। আমৃত্যু কিট্‌স ফ্যানির বাগদত্ত থাকলেও এই সম্পর্ক স্থায়িত্ব পায়নি। যক্ষ্মায় আক্রান্ত হওয়ার কারণে ফ্যানির সঙ্গে শারীরিক দূরত্ব গড়ে ওঠে কিটসের। একদিকে অসুস্থতা, আর্থিক অসচ্ছলতা আর প্রেমের ব্যর্থতা কবি কিট্‌সকে হতাশাগ্রস্ত করে তোলে। ১৮১৯ সালেই তাঁর লেখা বিখ্যাত সব ওডগুলি প্রকাশ পেতে থাকে। তাঁর কবিজীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ এই ওডগুলি। এই বছরের মার্চ মাস থেকে মে মাসের মধ্যে পরপর তিনি লেখেন ‘ওড টু এ নাইটিঙ্গেল’, ‘ওড অন এ গ্রেসিয়ান আর্ন’, ‘ওড অন ইণ্ডোলেন্স’ ইত্যাদি। হ্যাম্পস্টেডে থাকাকালীন একটি নাইটিঙ্গেল পাখির গান কবিকে আনন্দ দিতো। ‘ওড টু এ নাইটিঙ্গেল’-এ কিট্‌স যেন সেই পাখির গানকেই মনে করলেন আনন্দের চিরকালীন গান, অমর্ত্যলোকের বাণী। মৃত্যুহীন সেই পাখিকে কোনো এক অপ্সরারূপে কল্পনা করে সেই পাখির সঙ্গে কল্পনায় মিলিত হয়েছেন কবি। আবার অন্যদিকে ‘ওড অন এ গ্রেসিয়ান আর্ন’ কবিতায় মূল উপাদান গ্রিক স্থাপত্যকলায় নির্মিত একটি ভস্মাধার যাকে কিট্‌স এক ক্ষয়হীন, মৃত্যুহীন সৌন্দর্যের আধার বলে কল্পনা করেছিলেন। এই কাব্যেই কিট্‌সের সেই বিখ্যাত পংক্তিটি রয়েছে – ‘Beauty is truth, truth beauty’। এর আগে ‘এণ্ডিমিয়ন’ কাব্যে কিট্‌স উচ্চারণ করেছিলেন ‘A thing of beauty is a joy forever’। সত্য ও সুন্দরের দ্বৈত সম্পর্কের খতিয়ান হয়তো এই দুটি পংক্তির মধ্যেই পাওয়া যায়। বলা হয় এই দুটি পংক্তিই কিট্‌সের সমগ্র কবিজীবনের মূল দর্শন। মানব মনের প্রতিরূপ গ্রিক দেবী সাইকিকে নিয়ে কিট্‌স লেখেন ‘ওড টু সাইকি’। এছাড়া ‘ওড টু অটাম’ কবিতায় শরৎকালকে গ্রীষ্মকালের পূর্ণরূপ হিসেবে দেখেছেন কবি। লর্ড বায়রন এবং পি.বি.শেলির পরে তিনিই রোমান্টিক ধারার অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি।

তাঁর অন্যান্য সাহিত্যকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘লামিয়া’, ‘দ্য ইভ অফ সেন্ট অ্যাগনেস’ ইত্যাদি। কিট্‌স মোট ৬১টি সনেট লিখেছেন। তাঁর সমস্ত কাব্য-কবিতার মধ্যে লক্ষ করা যায় ইন্দ্রিয়পরতা, প্রকৃতিপ্রেম এবং অপার সৌন্দর্যচেতনা। কিট্‌সের কাছে কবিধর্ম ছিল আত্মবিলোপের নামান্তর। কবির নিজস্ব ব্যক্তিত্বের অবলুপ্তি ঘটে যেতো কবিতার বিষয়ের মধ্যে। এই বিষয়টিকে তাত্ত্বিক প্রতিষ্ঠা দিয়ে কিট্‌স নাম দেন ‘ঋণাত্মক সক্ষমতা’ বা নেগেটিভ কেপেবিলিটি হিসেবে। বাংলা কবিতার জগতেও জীবনানন্দ দাশ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্যেও কিট্‌সের প্রভাব লক্ষণীয়।

১৮২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে জন কিট্‌সের মৃত্যু হয়।

  • অফিস ও হোম রিলোকেশন

     

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

  • প্যাকার্স ও মুভার্স এর বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান 

    বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন

3 Comments

3 Comments

  1. Pingback: উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থ | সববাংলায়

  2. Pingback: সুকান্ত ভট্টাচার্য

  3. Pingback: উইলিয়াম ব্লেক | সববাংলায়

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

সববাংলায় তথ্যভিত্তিক ইউটিউব চ্যানেল - যা জানব সব বাংলায়