ইতিহাস

সৌমেন্দু রায়

সৌমেন্দু রায়

সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্রের কথা বললে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে সর্বাগ্রে যার নাম মনে আসে তিনি সৌমেন্দু রায় (Soumendu Roy)। তাঁর আলোক-পরিকল্পনা আর ডিটেলিং-এর নিখুঁত দৃষ্টি ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মাইলফলক হয়ে আছে। মোট তিনবার শ্রেষ্ঠ সিনেমাটোগ্রাফির জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি। তাঁর সিনেমাটোগ্রাফির যাদুতেই নির্মিত হয়েছে ‘গুপী গায়েন বাঘা বায়েন’, ‘তিন কন্যা’, ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’, ‘অশনি সংকেত’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’র মতো সত্যজিৎ রায়ের শ্রেষ্ঠ ছবিগুলি। সত্যজিৎ রায়ের পাশাপাশি তপন সিন্‌হা, তরুণ মজুমদার প্রমুখ বিখ্যাত সব পরিচালকের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। ২০০৬ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সৌমেন্দু রায়ের জীবন নিয়ে একটি তিরিশ মিনিট দৈর্ঘ্যের তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয় ‘পোর্ট্রেট অফ এ সিনেমাটোগ্রাফার’ নামে।

১৯৩৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি উত্তর কলকাতায় একটি বনেদি পরিবারে সৌমেন্দু রায়ের জন্ম হয়।প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে ১৯৪২ সালে সৌমেন্দু রায় ভর্তি হন তীর্থপতি ইন্সটিটিউশনে। এই স্কুলেই অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় আশিস রাহা নামে একটি ছেলের যার দাদার একটি স্টুডিও ছিল ‘পলুফোটো অ্যাভিনিউ’ নামে। আশিস রাহার সঙ্গে প্রায়ই ঐ স্টুডিওতে যাওয়া শুরু করেন সৌমেন্দু এবং ধীরে ধীরে ছবি তোলার প্রাথমিক খুঁটিনাটি সম্বন্ধে জানতে-শিখতে শুরু করেন তিনি। বন্ধু অসিতের ক্যামেরা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতে করতেই ছবি তোলা শিখতে থাকেন তিনি। ঠিক এই সময়েই সৌমেন্দু রায়ের দিদি তাঁকে একটি ক্যামেরা কিনে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন যদি ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় তিনি ভালোভাবে উত্তীর্ণ হন। যথারীতি মন দিয়ে পড়াশোনা করার ফলে অনায়াসেই ভালো ফলাফলের সঙ্গে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষা পাশ করেন সৌমেন্দু রায়। ফলে উপহারস্বরূপ দিদির কাছ থেকে তিনি পেয়ে যান ‘কোডাক ব্রাউনি’ ক্যামেরা যেটা সৌমেন্দু রায়ের প্রথম ক্যামেরা ছিল। খুড়তুতো ভাইয়ের বিবাহ অনুষ্ঠানে সৌমেন্দু রায়ের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় পরিচালক হিরণ্ময় সেনের এবং তাঁর সূত্রেই বর্ষীয়ান সিনেমাটোগ্রাফার রামানন্দ দাশগুপ্তের সঙ্গে পরিচয় ঘটে সৌমেন্দু রায়ের।


বাংলায় শিখুন ওয়েব কন্টেন্ট রাইটিং ও আরও অনেক কিছু

ইন্টার্নশিপ

আগ্রহী হলে ছবিতে ক্লিক করে ফর্ম জমা করুন 


 

১৯৫৩ সাল থেকে নিয়মিত টেকনিশিয়ান্স স্টুডিওতে যাতায়াত শুরু হয় তাঁর। পরিচালক দীনেন গুপ্তের অধীনে তিনি শিক্ষানবিশ হিসেবে তিনি কাজে যোগ দেন। এই দীনেন গুপ্তই তখন সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ‘পথের পাঁচালী’ ছবিতে ক্যামেরা-পরিচারকের কাজ করছিলেন। সময়টা ১৯৫৫ সাল। পথের পাঁচালী-র সেটে চলচ্চিত্র জগতের তিন মহারথী সত্যজিৎ রায়, সুব্রত মিত্র এবং বংশী চন্দ্রগুপ্তের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় সৌমেন্দু রায়ের যাঁরা পরে তাঁর জীবনে গুরুর স্থান নেবেন। ১৯৫৮ সালে ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’, ১৯৬০ সালে ‘দেবী’ এবং ১৯৬২ সালে ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবিতে সহকারী সিনেমাটোগ্রাফারের ভূমিকায় কাজের সূত্রে কিংবদন্তী অভিনেতা ছবি বিশ্বাসের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েন সৌমেন্দু। স্বতন্ত্র একজন সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে প্রথম তিনি কাজের সুযোগ পান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপর নির্মীয়মান তথ্যচিত্রে, পরিচালক ছিলেন সত্যজিৎ রায়। সেইসময় রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্প নিয়ে আরেকটি ছবি করছিলেন তিনি ‘তিনকন্যা’ নামে, তার সিনেমাটোগ্রাফি করার কথা ছিল সুব্রত মিত্রের। কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত চোখের সমস্যার কারণে সুব্রত মিত্রকে অব্যাহতি নিতে হলে সত্যজিৎ রায়ের পরামর্শে ঐ তথ্যচিত্রের পাশাপাশি ‘তিন কন্যা’ (১৯৬১) ছবিতেও সিনেমাটোগ্রাফির সুযোগ পান সৌমেন্দু রায়। তিন কন্যা ছবিতে তিনটি আলাদা আলাদা কাহিনী ছিল – পোস্টমাস্টার, মণিহারা আর সমাপ্তি। এই তিনটি পৃথক ছবির জন্য তিন রকমের আলোক-পরিকল্পনা করেছিলেন সৌমেন্দু রায়। ‘পোস্টমাস্টার’ ছবিতে বিয়োগান্তক পরিবেশ রচনা করতে মেঘলা আলো ব্যবহার করেছিলেন তিনি। ‘মণিহারা’ গল্পের শ্যুটিং-এর সময় রহস্যঘন পরিবেশের সঙ্গে মানানসই আলো আর ‘সমাপ্তি’ ছবিতে মজার আবহে ঝকঝকে উজ্জ্বল আলোর ব্যবহার করেছিলেন তিনি। এই ছবিতে সাফল্যের পর তাঁর সুযোগ আসে সত্যজিৎ রায়ের ‘অভিযান’ (১৯৬২) ছবিতে সিনেমাটোগ্রাফি করার। এই ছবিতে রাত্রে গাড়ির মধ্যে বেশ কিছু শ্যুটিং-এর অংশ ছিল। এর জন্য সৌমেন্দু সাধারণ আলো এবং ২০০ এএসএ ফিল্ম ব্যবহার করেছিলেন যা একেবারে নিখুঁত আলোক-পরিবেশ তৈরি করেছিল ছবিতে। খুব কম বাজেটে, অনুন্নত পরিকাঠামোয়, যন্ত্রপাতির অভাবের মধ্যেও উদ্ভাবনী শক্তির অসীম দক্ষতায় সৌমেন্দু রায়ের সিনেমাটোগ্রাফি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। ‘চারুলতা’ ছবিতে সুব্রত মিত্র একটি কৌশলে ছায়াহীন আলোক ব্যবহার করেছিলেন আর সেই কৌশলটিই কাজে লাগিয়েছিলেন সৌমেন্দু রায়, ১৯৬৯ সালে ‘গুপী গায়েন বাঘা বায়েন’ ছবিতে শুণ্ডি রাজার দৃশ্যটি শ্যুট করার জন্য। ভূতের দৃশ্যগুলিতে একটি ত্রিভুজের পিছনে আলো দিয়ে অনবদ্য চিত্র রচনা করতে সমর্থ হন তিনি। সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় এরপর একে একে ১৯৬৫ সালে ‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’, ১৯৬৭-তে ‘চিড়িয়াখানা’, ১৯৭০ সালে ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ এবং তারপরে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ (১৯৭১), ‘সীমাবদ্ধ’ (১৯৭২), ‘অশনি সংকেত’ (১৯৭৩) ছবিতে সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে সৌমেন্দু রায় হয়ে ওঠেন একমেবাদ্বিতীয়ম। চিড়িয়াখানা ছবিতে কাজ করার সময় রাত্রে দীর্ঘ শট নেবার ক্ষেত্রে সমস্যা ছিল অনেক। সেকালে জেনারেটর ব্যবহৃত হতো না আউটডোরে, ফলে মাঝে মাঝেই বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে কাজে অসুবিধে হতো। এত প্রতিবন্ধকতা সামলে কাজ করতে হয়েছে সৌমেন্দু রায়কে। এতদিন পর্যন্ত সাদা-কালো ছবিতে কাজ করলেও ‘অশনি সংকেত’ ছবিতে প্রথম রঙিন ফিল্মে কাজ করেন সৌমেন্দু রায় আর এই ছবিতে অসামান্য কাজের জন্য শ্রেষ্ঠ সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি। তারপরে দ্বিতীয়বার জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হন সৌমেন্দু রায় ১৯৭৪ সালে ‘সোনার কেল্লা’ ছবির জন্য। এর পাশাপাশি ১৯৭৫ সালে ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ছবিতেও তাঁর কৌশলী চিত্রগ্রহণের দক্ষতা প্রশংসিত হয়েছিল। হিন্দি ভাষায় সত্যজিৎ রায়ের অন্যতম সেরা ছবি ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’তে সিনেমাটোগ্রাফির জন্য তৃতীয়বার জাতীয় পুরস্কার পান সৌমেন্দু রায়। সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় শেষবারের মতো ১৯৮৪ সালে ‘ঘরে বাইরে’ ছবিতে কাজ করেন তিনি। এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানাচ্ছেন যে সাদা-কালো ছবিতে কাজ করা সবথেকে কঠিন, রঙিন ছবির তুলনায়। কারণ সাদা-কালো ছবিতে শুধুমাত্র আলোকে নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমেই রঙের পার্থক্য তৈরি করা সম্ভব।

শুধু বাংলা ছবিই নয়, বহু দক্ষিণী চলচ্চিত্রেও সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন সৌমেন্দু রায়। ১৯৮৩ সালে দক্ষিণী পরিচালক শ্রীধর রাজনের ছবি ‘কান সিভান্থাল মন সিভাক্কুম’-এ প্রথম কাজ করেন তিনি। আর প্রথম কাজেই বাজিমাত। ঐ ছবিতে শ্রেষ্ঠ সিনেমাটোগ্রাফির জন্য তামিলনাড়ু স্টেট ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হন তিনি। রবি ঘোষের নির্দেশিত ছবি ‘সাধু যুধিষ্ঠিরের কড়চা’ (১৯৭৪) এবং ১৯৭৬ সালে ‘নিধিরাম সর্দার’ ছবি দুটিতেও সিনেমাটোগ্রাফির কাজ করেছিলেন সৌমেন্দু রায়। সত্যজিৎ রায়ের পরিমণ্ডলের বাইরে আরো অনেক বাঙালি পরিচালকের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা ছিল তাঁর। তপন সিন্‌হার পরিচালনায় মোট তিনটি ছবিতে কাজ করেন সৌমেন্দু। ১৯৯০ সালে ‘এক ডক্টর কি মউত’, ১৯৯৬ সালে ‘শতাব্দীর কান্না’ এবং সবশেষে ১৯৯৮ সালে ‘আজব গাঁয়ের আজব কথা’ ছবিতে সিনেমাটোগ্রাফি করেছেন তিনি। অন্য ধারার চিত্র-পরিচালক উৎপলেন্দু চক্রবর্তীর সঙ্গে ‘দেবশিশু’ (১৯৮৩) ছবিতে এবং বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের সঙ্গে ‘চরাচর’ (১৯৯৩) ছবিতেও তিনি কাজ করেছেন। তবে পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবির বাইরেও অনেকগুলি তথ্যচিত্রের সিনেমাটোগ্রাফিতেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন সৌমেন্দু রায় যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ‘সিকিম’, ‘বালা’, ‘দ্য ইনার আই’, বংশী চন্দ্র গুপ্তের পরিচালনায় ‘গ্লিম্পসেস অফ ওয়েস্ট বেঙ্গল অ্যাণ্ড ডেস্টিনেশন ক্যালকাটা’ ইত্যাদি। ‘টাইগারস অফ মাউন্টেনস’ তথ্যচিত্রে অভিযাত্রী এডমণ্ড হিলারিকে সহায়তা করেছিলেন সৌমেন্দু যা তাঁর জীবনের এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। ১৯৯৩ সালে রাজা সেনের নির্দেশনায় ‘সুচিত্রা মিত্র’ তথ্যচিত্রে সিনেমাটোগ্রাফির জন্য তিনি ‘বেস্ট নন-ফিচার ফিল্ম সিনেমাটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড’ পান। ২০২০ সালে পশ্চিমবঙ্গের ফিল্ম-জার্নালিজম অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বর্ষীয়ান সিনেমাটোগ্রাফার হিসেবে লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট পুরস্কার পেয়েছেন সৌমেন্দু রায়।

সিনেমাটোগ্রাফির ক্ষেত্রে তিনি অন্যান্য যে সব ছবিতে কাজ করেছেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল – ‘আলোর পিপাসা’, ‘অভয়া ও শ্রীকান্ত’, তরুণ মজুমদারের পরিচালনায় ‘পলাতক’, ‘বালিকা বধূ’, তপন সিন্‌হার পরিচালনায় ‘অন্তর্ধান’, ‘হুইল চেয়ার’ ইত্যাদি।

গোয়ায় আয়োজিত ভারতের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ২০০৬ সালে সৌমেন্দু রায়ের জীবনকে কেন্দ্র করে ৩০ মিনিট দৈর্ঘ্যের একটি তথ্যচিত্র ‘পোর্ট্রেট অফ এ সিনেমাটোগ্রাফার’ প্রদর্শিত হয় পাপিয়া রায়ের নির্দেশনায় এবং একইসঙ্গে ৭০ মিনিট দৈর্ঘ্যের আরেকটি তথ্যচিত্র প্রদর্শিত হয় ‘সৌমেন্দু রায়’ নামে অরিন্দম সাহা সর্দারের পরিচালনায়।


প্রাকৃতিক খাঁটি মধু ঘরে বসেই পেতে চান?

ফুড হাউস মধু

তাহলে যোগাযোগ করুন – +91-99030 06475


 


বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের তথ্য-সম্প্রচার মন্ত্রকের অধীনে ‘রূপকলা কেন্দ্র’-এর সিনেমাটোগ্রাফি বিভাগের পরামর্শদাতা হিসেবে যুক্ত রয়েছেন সৌমেন্দু রায়।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

-
এই পোস্টটি ভাল লেগে থাকলে আমাদের
ফেসবুক পেজ লাইক করে সঙ্গে থাকুন

শ্রীচৈতন্যের মৃত্যু আজও এক ঘনীভূত রহস্য



সেই রহস্য নিয়ে বিস্তারিত জানতে ছবিতে ক্লিক করুন