ইতিহাস

ইভিএম

ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম (EVM) হল এমন একটি যন্ত্র যেটি ভোটদানের চিরাচরিত ব্যালট পদ্ধতির বিকল্প হিসেবে গৃহীত একটি পদ্ধতি। ১৯৭৭ সালে ভারতের নির্বাচন কমিশন প্রথম ভোটপ্রদানে স্বচ্ছতার নিরিখে ব্যালট থেকে যান্ত্রিক পদ্ধতিতে ভোটপ্রদানের কথা ভাবতে শুরু করে এবং হায়দ্রাবাদে অবস্থিত ইলেক্ট্রনিকস কর্পোরেশন অব ইন্ডিয়া লিমিটেড (ই.সি.আই.এল)কে এরকম একটি যন্ত্র বানানোর বরাত দেয়। ১৯৭৯ সাল নাগাদ মূল যন্ত্রের একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করে ই.সি.আই.এল যা ৬ আগস্ট ১৯৮০ সালে নির্বাচন কমিশনের তরফ ভারতের সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলির সামনে পরীক্ষামূলকভাবে উপস্থাপন করা হয়। সমস্ত দলগুলির থেকে পূর্ণ সমর্থন পাওয়ার পর বেঙ্গালুরুতে অবস্থিত ভারত ইলেক্ট্রনিকস লিমিটেডকে ই.সি.আই.এল এর সাথে যুগ্মভাবে এই যন্ত্র তৈরির বরাত দেয় কমিশন।

১৯৮২ সালের মে মাসে কেরালা বিধানসভা নির্বাচনে কমিশন প্রথম  ইভিএম ব্যবহার শুরু করে। কিন্তু কংগ্রেস প্রার্থী এ.সি. জোস, ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টির সিভান পিল্লাইয়ের কাছে নির্বাচনে হেরে গিয়ে ইভিএমের কার্যকারিতাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে মামলা করেন। আদালতের কাছে তাঁর আবেদনে হোস যুক্তি দিয়েছিলেন যে ইভিএম ব্যবহারের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোন আইন নেই – বস্তুত সুপ্রিম কোর্ট যা মেনে নিয়েছিল। ইভিএম প্রসঙ্গে কোন আইনী বিধান চালু না করা পর্যন্ত নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা যাবে না বলে মন্তব্য করে আদালত ভারতের নির্বাচন কমিশনকে ভোটগ্রহণের পদ্ধতি পরিবর্তন করে তার কর্তৃত্বকে অতিক্রম করার অভিযোগ তোলে। ফলস্বরূপ সংসদ ১৯৮৮ সালের ডিসেম্বরে জনগণের প্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫১ সংশোধন করে ধারা ৬১-ক (61-A) প্রবর্তনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনকে ইভিএম ব্যবহারের ক্ষমতা দেয়।

ইভিএমের কার্যকারিতা নিয়ে এই সংশয়ের মধ্যেই সরকার ১৯৯০ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি নির্বাচনী সংস্কার কমিটি  গঠন করে যা বেশ কয়েকটি জাতীয় এবং রাজ্য পর্যায়ের রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত হয়েছিল। কমিটি সুপারিশ করে যে ইভিএমগুলি প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল দ্বারা পরীক্ষা করাতে হবে। এই প্যানেলটিতে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ছাড়াও প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থা (DRDO) এবং আইআইটি-দিল্লির বিশেষজ্ঞরাও ছিলেন। ১৯৯০ সালের এপ্রিলের প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞ কমিটি সর্বসম্মতিক্রমে ইভিএমকে প্রযুক্তিগতভাবে সুরক্ষিত এবং স্বচ্ছ বলে অভিহিত করে ও তা ব্যবহারের পরামর্শ দেয়। ২০০৩ সালে সমস্ত উপ-নির্বাচন এবং রাজ্যগুলির নির্বাচন ইভিএম ব্যবহার করে অনুষ্ঠিত হয়। পরের বছর ২০০৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে সমগ্র দেশ জুড়ে ইভিএম ব্যবহার শুরু হয়।

একটি ইভিএমে দুটি ইউনিট থাকে যথা- কন্ট্রোল ইউনিট (সিইউ) এবং ব্যালটিং ইউনিট (বিইউ)। এই দুই ইউনিটকে যুক্ত করে ৫ মিটার লম্বা একটি তার। একটি ব্যালটিং ইউনিটে সর্বোচ্চ ১৬ জন প্রার্থীকে (NOTA সহ)  ভোট দানের ব্যবস্থা থাকে।  সময়ে সময়ে এই ইভিএমকে আরও উন্নত করা হয়েছে।

কোন নির্বাচনী কেন্দ্র / ভোটকেন্দ্রে কোন ইভিএম বরাদ্দ হবে তা আগে থেকে যাতে কেউ জানতে না পারে তা সুনিশ্চিত করতে কমিশন দুটি-পর্যায়ে র ্যানডমাইজেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সাবধানতা অবলম্বন করে থাকে। জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার এক্তিয়ারাধীন সমস্ত ইভিএমের ক্রমিক নম্বর তালিকাভুক্ত করে কমিশন। প্রদত্ত আসনের জন্য ইভিএমগুলি প্রথমে প্রথম স্তরের ্যানডমাইজেশন হিসাবে কম্পিউটারাইজড প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এলোমেলোভাবে নির্বাচন করা হয়। রিটার্নিং অফিসার এবার দ্বিতীয় স্তরের ্যানডমাইজেশনের মাধ্যমে কোন ভোটকেন্দ্রে ব্যবহারের জন্য নির্দিষ্ট ইভিএম নির্বাচন করে।

তবে ইভিএম নিয়ে কিন্তু এরপরও বিতর্কের অবসান হয়নি। বরঞ্চ তা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে।  বিতর্কের আঁচ ভারত ছাড়িয়ে অন্য দেশেও গিয়ে পড়েছে। আফ্রিকা মহাদেশের বটসোয়ানা নির্বাচনে ভারতে-তৈরি ইভিএমগুলির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন ঊঠে যায়। ভারত থেকে আমদানিকৃত ইভিএম নিয়ে ২০১৮ সালে বটসোয়ানায় যথেষ্ট উত্তপ্ত রাজনৈতিক বিতর্ক হয়েছিল সেবার।

সম্প্রতি মূল ইভিএম-এর সাথে আরও একটি যন্ত্র ভোটদানে স্বচ্ছতার জন্য কমিশনের তরফ থেকে প্রকাশ করা হয়েছে যেটি ভোটার ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রেইল (ভিভিপ্যাট) নামে পরিচিত। মূল ইভিএম এর সঙ্গে তারের মাধ্যমে যুক্ত থাকে ভিভিপ্যাট যন্ত্রটি।  কোন ভোটার ইভিএম-এ থাকা পছন্দসই প্রার্থীর নামের পাশে থাকা বোতামে চাপ দিলে সঙ্গে সঙ্গে একটি স্লিপ বেরিয়ে পাশে থাকা একটি বাক্সে জমা হয়ে যায়। এই স্লিপে ছাপা প্রতীক দেখে ভোটার বুঝতে পারবে তাঁর পছন্দের প্রার্থী তাঁর ভোটটি পেল  কিনা।

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

রচনাপাঠ প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে চান?



এখানে ক্লিক করুন

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন