ইতিহাস

অবলা বসু

উনিশ শতকের বাংলায় নারীশিক্ষা বিস্তারের প্রচেষ্টার পাশাপাশি বিধবাদের সামগ্রিক সহায়তাদানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন যে বিখ্যাত বাঙালি সমাজসেবী, তিনি অবলা বসু ( Abala Bose)। অবলা বসু সারা দেশে মেয়েদের স্বাবলম্বী ও তাদের শিক্ষার প্রসার ঘটাতে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একাধিক বিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, নারীশিক্ষা সমিতি, নারী শিল্প সমবায় আবাসস্থল। একজন সুযোগ্য শিক্ষিকা হওয়ার সুবাদে শিক্ষাক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের কিছু নতুন ধারাও প্রবর্তন করেন তিনি। এককথায় নারী স্বাধীনতা এবং নারীশিক্ষার পাশাপাশি নারীর সার্বিক উন্নতিসাধনে অবলা বসুর ভূমিকা অতুলনীয়।

১৮৬৫ সালের ৮ আগষ্ট বরিশালের কীর্তনখোলা নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকায় ঢাকার তেলিরবাগের বিখ্যাত দাস পরিবারে অবলা বসুর জন্ম হয়। তাঁর বাবা ছিলেন সুবিদিত ব্রাহ্ম সংস্কারক দুর্গামোহন দাস এবং মা ছিলেন ব্রহ্মময়ী দেবী। ১৮৭৫ সালে মাত্র দশ বছর বয়সে তাঁর মা মারা যান। তাঁর ভাইয়ের নাম সতীশ রঞ্জন দাস, দিদির নাম সরলা রায়। ‘দেশবন্ধু’ চিত্তরঞ্জন দাশ ও ভারতের পঞ্চম প্রধান বিচারপতি সুধীরঞ্জন দাস ছিলেন তাঁর দূরসম্পর্কের আত্মীয়। অবলা বসুর যখন পাঁচ বছর বয়স তখন জনসমাজ তাঁদের পরিবারকে বিধবা বিবাহের পক্ষে থাকার কারণে একঘরে করে দেয়। ১৮৮৭ সালে মাত্র ২৩ বছর বয়সে বিখ্যাত বিজ্ঞানী ও পদার্থবিদ আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসুর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়।

 ১৮৮১ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় বৃত্তি অর্জন করে তিনি বঙ্গমহিলা বিদ্যালয় (Banga Mahila Vidyalaya) ও বেথুন স্কুলে (Bethune School) তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করেন। তিনি প্রথমে বেথুন স্কুলে ও পরবর্তীকালে বেথুন কলেজে (Bethune College) পড়ার সময় নিজের পারিবারিক ব্রাহ্ম ঐতিহ্যকে সর্বতোভাবে রক্ষা করেন। মহিলা হওয়ার কারণে অবলা কলকাতা মেডিকেল কলেজে চিকিৎসাবিদ্যায় ভর্তি হতে পারেননি। তিনি ১৮৮২ সালে বেঙ্গল গভর্নমেন্ট বৃত্তি পেয়ে মাদ্রাজে ঔষধীবিদ্যা (Pharmacology) পড়তে যান। তিনি ঔষধীবিদ্যা শিক্ষাকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করার বিষয়ে কাদম্বিনী গাঙ্গুলির পদক্ষেপ অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নিলেও পরীক্ষার ফলপ্রকাশের আগেই অসুস্থতার জন্য তাঁকে দেশে ফিরে আসতে হয়। তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও পরে তার সাফল্যের কথা কখনও জানতে পারেননি। 

১৮৯৬ থেকে ১৯৩৩  সালের মধ্যে তিনি বেশ কয়েকবার ইউরোপ ভ্রমণ করেন। ইউরোপের বিভিন্ন বিদ্যালয় পরিদর্শন করে তিনি সেখানকার শিক্ষার পদ্ধতি ও শৃঙ্খলাকে ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করতে চেয়েছিলেন। মাত্র ২৬ বছর বয়সে ব্রাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়ের সম্পাদক হিসাবে নিযুক্ত হয়ে তিনি শিক্ষা সংস্কারক রূপে মেয়েদের আত্ম-প্রতিরক্ষামূলক শিক্ষাব্যবস্থাকে পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি মারিয়া মন্টেসরির(Maria Montessori) শিক্ষারীতিকেও মান্যতা দিয়েছিলেন। ১৯১৯ সালে তিনি সারা দেশে নারী শিক্ষার প্রসারে সহায়তা দানের জন্য ‘নারী শিক্ষা সমিতি’ চালু করেন। এই সংস্থাটি মূলত নারী অধিকার ও লিঙ্গগত প্রাধান্য নির্বিশেষে পাঠ্যক্রম তৈরিতে আগ্রহ দেখিয়েছিল। বিবাহ পরবর্তী বাস্তুচ্যুত মহিলা এবং অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত মেয়েদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রেও তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে। 

তাঁর স্বামীর মৃত্যুর আগে তিনি সিস্টার নিবেদিতা ফান্ড (Sister Nivedita Fund) নামে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য একটি শিক্ষা-তহবিল প্রতিষ্ঠা করেন এবং নিজে সেখানে দশ লক্ষ টাকা দান করেন। তবে ভারতের নারীদের অবস্থান নিয়ে তাঁর উদ্বেগ ছিল নারীশিক্ষার থেকেও বেশি। সেইজন্যই ১৯২৫ সালে তিনি  বিধবাদের জন্য একটি স্বতন্ত্র আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৩৫ সালে তিনি কলকাতায় মেয়েদের জন্য শিল্প সমবায় আবাসস্থল গড়ে তোলেন যা পরবর্তীকালে বাংলাদেশের মেয়েদের স্বাধীনতা ও পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসাবে পরিচিত হয়। অবলা বসু ব্রিটিশ শাসিত ভারতে প্রায় ৮৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য ১৪টি শিক্ষা কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। মুরলীধর গার্লস কলেজ (Muralidhar Girl’s College) অবলা বসু ও কৃষ্ণপ্রসাদ বসাকের (Krishnaprasad Basak) যৌথ উদ্যোগে স্থাপিত হয়। ভবানীপুরে বেলতলা বালিকা বিদ্যালয় (Beltala Girl’s School) প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও এই দুজনের নামই পাওয়া যায়। শুধু তাই নয়, অবহেলিত নারী এবং বিধবাদের প্রতি গভীর সহানুভূতির কারণে তিনি ১৯২৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘বিদ্যাসাগর বাণী ভবন’ (Vidyasagar Bani Bhavan)। এটি স্থাপনের মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষাব্যবস্থা ও শিক্ষক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মেয়েদের অবস্থার উন্নতি যাতে তারা ‘নারী শিক্ষা সমিতি’ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিযুক্ত হতে পারে। ‘বসু বিজ্ঞান মন্দির’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্যও ছিলেন অবলা। 

ইংরেজি পত্রিকা ‘মর্ডান রিভিউ’তে (Modern Review) নারী-স্বাধীনতা বিষয়ক তাঁর একাধিক প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলা সাময়িক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর বেশ কিছু প্রবন্ধ এবং ভ্রমণ কাহিনি। 

১৯১৬ সালে তাঁর স্বামীর ‘নাইটহুড’ (Knighthood) উপাধি লাভের পর তিনিও ‘লেডি অবলা বসু’ (Lady Abala Bose) সম্মান অর্জন করেন।

১৯৫১ সালের ২৫ এপ্রিল কলকাতায় ‘সাধনা আশ্রম’  প্রতিষ্ঠার কিছুকালের মধ্যেই ৮৭ বছর বয়সে শিক্ষাব্রতী ও সমাজসেবী অবলা বসুর  মৃত্যু হয়। 

  • telegram sobbanglay

Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

বুনো রামনাথ - এক ভুলে যাওয়া প্রতিভা



এখানে ক্লিক করে দেখুন ইউটিউব ভিডিও

বাংলাভাষায় তথ্যের চর্চা ও তার প্রসারের জন্য আমাদের ফেসবুক পেজটি লাইক করুন