ইতিহাস

মারিয়া মন্টেসরি

মারিয়া  মন্টেসরি  (Maria  Montessori) ছিলেন একজন ইতালীয় চিকিৎসক এবং শিক্ষাবিদ। তাঁর উদ্ভাবিত ‘মন্টেসরি শিক্ষাপদ্ধতি’ বর্তমানে পৃথিবীর অনেক সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যালয়ে  প্রচলিত রয়েছে। শিশুদের উপযোগী এই শিক্ষা পদ্ধতির জন্যই তিনি শিক্ষার ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য স্থান অধিকার করেছেন।

মারিয়া মন্টেসরির পুরো নাম মারিয়া ত্যাকলা আর্তেমেজ্যিয়া মন্টেসরি। ১৮৭০ সালে  ৩১ আগস্ট ইতালির ক্যারাভ্যেলে মারিয়া মন্টেসরির জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম আলসেন্দ্রো মন্টেসরি এবং মা রেনিলদ্যে স্টপ্যানি। বাবা ছিলেন স্থানীয় রাষ্ট্রায়ত্ত তামাক কারখানায় কর্মরত অর্থ মন্ত্রকের একজন কর্মকর্তা।  তাঁর মা ছিলেন সেই সময়ের নিরিখে সুশিক্ষিত একজন মহিলা এবং   ইতালীয় ভূতাত্ত্বিক এবং জীবাশ্মবিদ আন্তোনিও স্টপ্যানির ভাগ্নী। নির্দিষ্ট কোন শিক্ষক না থাকায় মারিয়া মন্টেসরির শিক্ষাজীবন শুরু হয় তাঁর মায়ের কাছে। তিনিই শিক্ষা বিষয়ে তাঁকে সবসময় উৎসাহিত করতেন। বাবার সাথে তাঁর ছিল স্নেহের সম্পর্ক যদিও শিক্ষা বিষয়ে দুজনের মতপার্থক্য ছিল।

মন্টেসরির বাবার কর্মস্থলের জন্য তাঁরা প্রথমে ১৮৭৩ সালে ফ্লোরেন্স আসেন এবং পরে  ১৮৭৫ সালে রোমে বসবাস করতে শুরু করেন। ১৮৭৬ সালে  ছয় বছর বয়সে তিনি একটি সরকারি প্রাথমিক স্কুলে ভর্তি হন। স্কুল রেকর্ডে তাঁর বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য কোনো কৃতিত্ব ছিলনা। তবে তিনি যখন প্রথম শ্রেণীতে পড়তেন তখন ভাল ব্যবহারের জন্য এবং ‘মেয়েদের কাজ’-এর জন্য। ১৮৮১ সালে অথবা ১৮৮৪ সালে ১৩ বছর বয়সে মন্টেসরি প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য একটি কারিগরি বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এই বিদ্যালয়ে তিনি ইতালীয় ভাষা, গণিত, বীজগনিত, জ্যামিতি, হিসাবশাস্ত্র, ইতিহাস, ভূগোল এবং বিজ্ঞান বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন। ১৮৮৬ সালে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করেন। একই বছরে তিনি রেজিও ইন্সটিটিউট টেকনিও লিওনার্দো দা ভিনচি-তে গণিত, বনবিদ্যা, ইতালীয় ভাষা, জ্যামিতি, ইতিহাস, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন এবং দুটি বিদেশি ভাষা শিক্ষার জন্য ভর্তি হন। তিনি বিজ্ঞান এবং  গণিত বিষয়ে পারদর্শী‌ ছিলেন। প্রথম দিকে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার জন্য আগ্রহী ছিলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে, তিনি চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করবেন।

১৮৯০ সালে তিনি রোম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের একটি ডিগ্রি কোর্সে ভর্তি হন। এখানে তিনি উদ্ভিদ বিজ্ঞান, প্রাণীবিজ্ঞান, পরীক্ষামূলক পদার্থবিজ্ঞান, হিস্টোলজি, শারীরবিদ্যা এবং সাধারণ ও জৈব রসায়ন বিষয়ে পাস করেন এবং ১৮৯২ সালে ডিপ্লোমা ডি লাইসেনজা অর্জন করেন। ইতালীয় এবং লাতিন ভাষাতে দক্ষতা এবং এই ডিগ্রীর ফলে ১৮৯৩ সালে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের চিকিৎসা বিষয়ে পাঠ গ্রহণের অধিকার অর্জন করেন।

তবে মহিলা হওয়ার দরুন তাঁকে কিছু মেডিকেল শিক্ষার্থী এবং অধ্যাপকদের কাছ থেকে বৈরিতা ও হয়রানির  সম্মুখীন হতে হয়েছিল।  প্রথম বছরেই তিনি অ্যাকাডেমিক পুরস্কার জিতেছিলেন এবং ১৮৯৫ সালে  একটি হাসপাতালের সহকারী হিসাবে কাজ শুরু করেছিলেন। তাঁর শেষ দুই বছরে তিনি শিশু বিশেষজ্ঞ এবং মনোবিদ্যা  অধ্যয়ন করেছেন। শিশু বিশেষজ্ঞ হিসেবে তিনি যথেষ্ট দক্ষ হয়ে ওঠেন। ১৮৯৬ সালে তিনি মেডিসিনের একজন ডাক্তার হিসাবে রোম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক হন। তিনি ছিলেন ইতালির প্রথম মহিলা ডাক্তার। তাঁর থিসিসটি পলিক্লিনিকো জার্নালে ১৮৯৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে সহকারী হিসাবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং  ব্যক্তিগত ভাবে প্র্যাকটিস করতেন। ১৮৯৬ সাল থেকে ১৯০১ সাল অবধি, মন্টেসরি তথাকথিত ‘ফ্রেসনাথেনিক'(phrenasthenic) বাচ্চাদের সাথে কাজ করেছেন এবং গবেষণা করেছেন।‌ এছাড়াও তিনি মানসিকভাবে প্রতিবন্ধী শিশুদের এবং মহিলাদের অধিকার ও শিক্ষার পক্ষে একজন বক্তা হিসাবে বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ করেছিলেন এবং এ বিষয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে নিজস্ব মতামত প্রকাশ করেছিলেন।

১৮৯৮ সালের ৩১ মার্চ  তাঁর একমাত্র পুত্রসন্তান  মারিও মন্টেসরির জন্ম হয়। রোমের অর্থোফ্রেনিক স্কুল-এর সহ-পরিচালক এবং তাঁর সহকর্মী জিউসেপ মন্টেসানোর সঙ্গে তাঁর প্রেমের পরিণতি এই সন্তান। তাঁদের সামাজিক ভাবে বিয়ে হয়নি মন্টেসরির কর্ম জীবন অনিশ্চিত হয়ে পড়ার আশঙ্কায়। বিয়ের পরিবর্তে মন্টেসরি তাঁর কাজ এবং পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। মন্টেসরি জিউসেপ মন্টেসানোর সাথে সম্পর্কটি এই শর্তে গোপন রাখতে চেয়েছিলেন যে, তাঁরা দুজনেই অন্য কাউকে বিয়ে করবেন না। কিন্তু পারিবারিক চাপে জিউসেপ মন্টেসানো পরবর্তীকালে বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হন। মন্টেসরির কাছে এটি ছিল বিশ্বাসঘাতকতা। তাই তিনি বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি  ছেলেকে তাঁর জীবনের প্রথম কয়েক বছর  গ্রামাঞ্চলে বসবাসরত একজন ধাত্রীর পরিচর্যায় রাখতে বাধ্য হয়েছিলেন। পরে কৈশোরে  ছেলের সাথে পুনরায় একত্র হন।

পরবর্তী সময়ে এই সন্তান তাঁর গবেষণায় একজন দুর্দান্ত সহকারী হিসাবে নিজেকে প্রমাণ করে। রোম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পর মন্টেসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোচিকিৎসক হিসেবে  তাঁর গবেষণা চালিয়ে যান। এইসময় পরিদর্শক হিসাবে তিনি রোমের কিছু মানসিক আশ্রম পরিদর্শন করেন যেখানে তিনি মানসিক প্রতিবন্ধী শিশুদের পর্যবেক্ষণ করেন। এই পর্যবেক্ষণ তাঁর ভবিষ্যতের শিক্ষামূলক কাজের জন্য মৌলিক বিষয় ছিল।  উনিশ শতকের চিকিত্সক এবং শিক্ষাবিদ জাঁ মার্ক গ্যাস্পার্ড ইটার্ড এবং অ্যাডওয়ার্ড সাগুইন  তাঁর কাজকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করেছিলেন। ইন্টার্ডের ধারণাগুলিতে মন্টেসরি আগ্রহী ছিলেন এবং প্রতিবন্ধী শিশুদের প্রতিদিনের শিক্ষায় সেই ধারণাগুলি প্রয়োগের জন্য আরও বেশি নির্দিষ্ট এবং সংগঠিত ব্যবস্থা তৈরি করেছিলেন।  

১৯০৭ সালে মন্টেসরি রোমের সান লোরেঞ্জো বস্তি অঞ্চলে তিন থেকে ছয় বছর বয়সী শিশুদের জন্য প্রথম স্কুল ‘ক্যাসা দেই বাঁবিনী’ বা ‘চিলড্রেনস হাউস’ খোলেন। প্রথমে ৫০ থেকে ৬০ জন শিশু এখানে ভর্তি হয়। সাধারণ বুদ্ধিমত্তার শিশুদের জন্য তিনি তাঁর শিক্ষা পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। তাঁর এই সাফল্যের ফলে অন্যান্য মন্টেসরি স্কুল চালু হয়েছিল এবং পরবর্তী ৪০ বছর ধরে তিনি সমগ্র ইউরোপ, ভারত এবং আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে বক্তৃতা, রচনা ও শিক্ষক-প্রশিক্ষণ কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯২২ সালে তিনি ইতালির বিদ্যালয়ের সরকারী পরিদর্শক নিযুক্ত হন। তবে ফ্যাসিস্ট শাসনের কারণে ১৯৩৪ সালে তিনি দেশ ত্যাগ করেন। স্পেন এবং সিলোন (বর্তমানে শ্রীলঙ্কা) থাকার পরে তিনি নেদারল্যান্ডসে স্থায়ী ভাবে বসবাস করতে শুরু করেন। 

মন্টেসরি শিক্ষা পদ্ধতি প্রচলিত শিক্ষাধারার বাইরে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম ও অভিনব একটি শিক্ষা পদ্ধতি। শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক গঠন বিবেচনা করে  এই শিক্ষা পদ্ধতিতে শিশুদের পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়। ইতালির খ্যাতনামা চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদ মারিয়া মন্টেসরির  নামে ‘মন্টেসরি এডুকেশন’ নামক এই শিক্ষা পদ্ধতি চালু হয়। বর্তমানে মন্টেসরি শিক্ষা শিশুদের জন্য সারা বিশ্বে সর্বাধিক প্রচলিত শিক্ষা পদ্ধতি। মন্টেসরি ক্লাসরুম সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের হয়। ক্লাসের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ, পাঠদান পদ্ধতি প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় সম্পূর্ণ অন্য ধরনের। মন্টেসরি পদ্ধতিতে একটি শ্রেণীকক্ষে তিন থেকে সাত বছর বয়সী বিভিন্ন শিশুদের মধ্যে কেউ ছবি আঁকে, কেউ অংক কষে, কেউ চেয়ারে বসে, আবার কেউ মাটিতে বসে। প্রত্যেকে  স্বাধীনভাবে নিজের পছন্দমত  কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকে।  মন্টেসরি শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশুদের কার্যক্রমে শিক্ষকের উপস্থিতিকে যথাসম্ভব কম গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এখানে শিশুরা নিজেরাই নিজেদের শিক্ষক। শিক্ষকের দায়িত্ব কেবল যথাযথ গাইড করা। তাই মন্টেসরি শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষককে ‘গাইড’ বলে সম্বোধন করা হয়। শিশুদের সৃজনশীলতা ও আগ্রহকে সমান গুরুত্ব প্রদান করা হয় মন্টেসরি শিক্ষা পদ্ধতিতে। শিক্ষক শিশুদের কার্যালাপের প্রতি পূর্ণ মনোযোগ রাখেন। তাদের নিজস্ব আগ্রহের ওপর ভিত্তি করে তাদের মধ্যে থাকা সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ সাধন করা হয় এই পদ্ধতিতে।

মন্টেসরি শিক্ষা পদ্ধতির ওপর তিনি বহু বই ও প্রবন্ধ লিখেছেন। এগুলো বেশিরভাগই ইতালীয় ভাষায় রচিত হয়েছে তবে ইংরেজি ভাষাতেও অনেক গ্রন্থ অনূদিত হয়েছে। মারিয়া মন্টেসরি এবং মন্টেসরি স্কুলগুলির ছবি ইতালির মুদ্রা এবং ব্যাংকনোটে স্থান পেয়েছে। এছাড়া নেদারল্যান্ডস, ভারত, ইতালি, মালদ্বীপ, পাকিস্তান এবং শ্রীলঙ্কার স্ট্যাম্পগুলিতেও তাঁর ছবি রয়েছে। ২০২০ সালে টাইম পত্রিকা মন্টেসরিকে বছরের সেরা ১০০ জন মহিলা হিসাবে মনোনীত করেছে।

১৯৫২ সালের ৬ মে নেদারল্যান্ডসের নুরডউইজক শহরে ৮১ বছর বয়সে মারিয়া মন্টেসরির মৃত্যু হয় ।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।