ইতিহাস

অভিজিৎ রায়

অভিজিৎ রায় (Avijit Roy) ছিলেন একজন বাংলাদেশী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, লেখক, অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট এবং ব্লগার (blogger)। তিনি একজন মুক্তচিন্তক হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। তিনি ‘মুক্তমনা’ নামক স্বাধীনচেতা ও মুক্তচিন্তার ওয়েবসাইটটির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।

১৯৭২ সালের ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে অভিজিৎ রায়ের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম অজয় রায়। অজয় রায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন, যিনি তাঁর কৃতিত্বের জন্য একুশে পদক সম্মান পেয়েছিলেন।

বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি থেকে অভিজিৎ তাঁর ব্যাচেলার ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অফ সিঙ্গাপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং-এ ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন। অভিজিৎ-এর স্ত্রীয়ের নাম রাফিদা আহমেদ বন্যা।

২০০৬ সালে অভিজিৎ কর্মসূত্রে আমেরিকার আটলান্টা শহরে চলে যান। সেখানে তিনি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার এর কাজ শুরু করেন। ২০০১ সালের মে মাসে অভিজিৎ মুক্তমনা (freethinkers) নামে একটি ইয়াহু গ্রুপ (Yahoo group) তৈরি করেন।২০০২ সালে এটি একটি ওয়েবসাইটে (website) পরিণত করা হয়। এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে অভিজিৎ সারা পৃথিবীর মুক্তচিন্তকদের একত্র করতে চেয়েছিলেন। বাংলাদেশ তথা পৃথিবীর নানা জায়গায় হওয়া ধর্মীয় মৌলবাদ এবং সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার হত এই সংস্থা।

২০০৪ সালে বাংলাদেশের কবি হুমায়ুন আজাদের উপর হওয়া হামলার বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে মুক্তমনা। অভিজিৎ কেও এর জন্য নানা জায়গা থেকে হুমকি পেতে হয়। এমনকি তাঁকে খুন করার হুমকিও আসে। অভিজিৎ-এর লক্ষ্য ছিল একটি সুন্দর সমাজ গড়ে তোলার যেখানে মানুষ ধর্মীয় গোঁড়ামি, দম বন্ধ করা নিয়ম কানুন এবং জড়তা থেকে মুক্ত হয়ে সাম্যবাদ, মনুষ্যত্ব এবং বিজ্ঞানের দ্বারা চালিত হবে। ২০০৭ সালে কুসংস্কার ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে কাজের স্বীকৃতি হিসেবে জাহানারা ইমাম পদক পায় মুক্তমনা।
অভিজিৎ আটটি বই লিখেছেন যার মধ্যে অন্যতম “আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী”, “মহাবিশ্বে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার খোঁজে”,” বিশ্বের ভাইরাস”,” অবিশ্বাসের দর্শন” ইত্যাদি।

বাংলাদেশের ব্লগারদের একাংশ ২০১৩ সালে শাহবাগ আন্দোলন শুরু করে যেখানে ইসলামী নেতা এবং অপরাধী আবুল কাদের মোল্লার ফাঁসির দাবি করা হয় এবং জামাত- ই-ইসলামী দলটিকে অপসারণ করারও দাবি করা হয়। এই প্রতিবাদের বিরুদ্ধে ইসলামীয় দলগুলি একজোট হয়ে পথে নামে। সেখানে এই মুক্তচিন্তক ব্লগারদের ইসলাম ধর্মকে অসম্মান করার দাবিতে হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। এই সময় বহু ব্লগারদের আক্রমণ করা হয় এবং যাদের মধ্যে অনেককে হত্যাও করা হয় যার মধ্যে আহমেদ রাজীব হায়দারও ছিলেন। অভিজিৎও এই আক্রমণের শিকার হতে থাকেন। নানা ইসলামী প্রতিষ্ঠান থেকে খুনের হুমকিও আসতে থাকে তাঁর কাছে।

এই সময় বাংলাদেশে থাকা অনেক ব্লগারদের বিশেষ পুলিশী নিরাপত্তা দেওয়া শুরু হয়। কারও কারও ওয়েবসাইট সরকারি ভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়। অনেক বিদেশী সংস্থা যেমন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch), রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স (Reporters Without Borders), কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস (Committee to Protect Journalists) এই অরাজকতার বিরুদ্ধে তীব্র নিন্দা করে। এই সময় অভিজিৎ তাঁর ব্লগে এই  ঘটনার  তীব্র  প্রতিবাদ  করেন। তিনি এও দাবি তোলেন যে বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম ব্লগারদের ভুলভাবে মানুষের কাছে তুলে ধরছে। অভিজিৎকে নানান বিদেশি সংস্থা সমর্থন করে এবং পাশে এসে দাঁড়ায়। এইসব সংস্থাদের মধ্যে অন্যতম ছিল সেন্টার ফর ইনইকোয়ালিটি (Center for Inequality) এবং ইন্টারন্যাশনাল হিউম্যানিস্ট অ্যান্ড এথিকাল ইউনিয়ন (International Humanist and Ethical Union)।

অভিজিৎ পৃথিবীর নানা প্রান্তে বাংলাদেশে হওয়া সেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ  গড়ে তোলেন নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটন, লন্ডন, অটোয়া ও অন্যান্য জায়গায়। অভিজিতের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে ঢাকাতেও বহু মানুষ এই প্রতিবাদে শামিল হন। সারা পৃথিবী জুড়ে বহু সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী এবং উদারমনস্ক মানুষ অভিজিতের পাশে এসে দাঁড়ান যাঁদের মধ্যে ছিলেন তসলিমা নাসরিন, সালমান রুশদি, মহাম্মদ জাফার ইকবাল, রামেন্দু মজুমদার, অজয় রায়, হেমন্ত মেহতা ও আরো অনেকে।

২০১৫ সালে অভিজিৎ তাঁর স্ত্রীর সাথে একুশে বইমেলা চলাকালীন ঢাকায় যান। ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যেবেলা বইমেলা থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অভিজিৎ এবং তাঁর স্ত্রী চা পানের জন্য বিশ্রাম নিতে যাচ্ছেন ঠিক এই সময় দুষ্কৃতীরা অভিজিৎ-এর উপর হামলা করে। অভিজিৎকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে সাঙ্ঘাতিকভাবে কোপানো হয়। তাঁর স্ত্রী বাধা দিতে গেলে তাঁকেও গুরুতরভাবে আহত করা হয়। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পরে কয়েকজন সাংবাদিক তাঁদের রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানকা মস্তিষ্কে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণের জন্য চিকিৎসাধীন অবস্থায় অভিজিতের মৃত্যু হয়। অভিজিৎ যখন মারা যান তখন তাঁর বয়স মাত্র বিয়াল্লিশ। 

অভিজিতের মৃত্যুতে সব মহলেই শোকের ছায়া নেমে আসে। এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে সারা পৃথিবী জুড়ে নিন্দার ঝড় ওঠে। অভিজিৎ-এর দেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজে গবেষণার জন্য দান করা হয়। তাঁর মৃত্যুর তদন্ত বেশ অনেক দিন চলার পর তাঁর হত্যাকারীরা গ্রেপ্তার হয়। বাংলাদেশী জঙ্গী সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা এই ঘটনার দায় স্বীকার করে। এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করতে বাংলাদেশ সরকারকে আমেরিকার ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশন (Federal Bureau of Investigation) সাহায্য করে।

অভিজিৎ রায় চলে গেলেও তাঁর স্বপ্ন এবং আদর্শ তাঁর সমসাময়িক এবং উত্তরসূরিদের মধ্যে রয়ে গেছে এবং তা তাঁরা ভবিষ্যতের জন্য বয়ে নিয়ে যাবে।

সববাংলায় পড়ে ভালো লাগছে? এখানে ক্লিক করে সাবস্ক্রাইব করুন আমাদের ভিডিও চ্যানেলটিওবাঙালি পাঠকের কাছে আপনার বিজ্ঞাপন পৌঁছে দিতে যোগাযোগ করুন – contact@sobbanglay.com এ।


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।