ইতিহাস

হুমায়ুন আজাদ

বাংলাদেশী কবি, ঔপন্যাসিক, ভাষাবিজ্ঞানী, সমালোচক, রাজনীতিক ভাষ্যকার, কিশোরসাহিত্যিক, গবেষক, এবং অধ্যাপক ছিলেন হুমায়ুন আজাদ। তাঁর প্রকৃত নাম হুমায়ুন কবীর। ১৯৮৮ সালে ২৮ সেপ্টেম্বর নাম পরিবর্তন করে তিনি হুমায়ুন আজাদ নাম রাখেন। 

১৯৪৭ সালের  ২৮ এপ্রিল বর্তমান বাংলাদেশে হুমায়ুন আজাদের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম আবদুর রাশেদ এবং মা ছিলেন জোবেদা খাতুন । তাঁর বাবা প্রথম জীবনে বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও পোস্টমাস্টারির চাকরি করতেন, পরে ব্যবসা শুরু করেন৷ তিন ভাই এবং দুই বোনের মধ্যে আজাদ ছিলেন বাবা মায়ের দ্বিতীয় পুত্রসন্তান।

হুমায়ুন আজাদ ১৯৬২ সালে স্যার জগদীশ চন্দ্র বসু ইন্সটিটিউট থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন৷ তারপর ১৯৬৪ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দেন৷ এরপর বাংলা সাহিত্য ও ভাষা নিয়ে তিনি বি.এ এবং এম.এ পাশ করেন ইউনিভার্সিটি অফ ঢাকা থেকে৷ ১৯৭৬ সালে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘Pronominalisation in Bangla’-এর ওপর পি.এইচ.ডি সম্পূর্ণ করেন৷ 

হুমায়ুন আজাদ তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন ১৯৬৯ সালে চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যাপক (Lecturer) হিসেবে৷ ১১ ফেব্রুয়ারী ১৯৭০ সালে ইউনিভার্সিটি অফ চট্টগ্রামে তিনি অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হন৷ এরপর ১৯৭২ সালে জাহাঙ্গীর নগর ইউনিভার্সিটিতে তিনি অধ্যাপনা করেন৷ ১৯৭৮ সালের ১ নভেম্বর হুমায়ুন আজাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসাবে যোগদান করেন৷ ১৯৮৬ সালে তিনি অধ্যাপক পদে উন্নীত হন৷ 

হুমায়ুন আজাদ বিশেষ ভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর সাহিত্যকর্মের জন্য৷ তিনি বাংলাদেশের অন্যতম প্রথাবিরোধী এবং বহুমাত্রিক লেখক হিসেবে চিহ্নিত৷  তিনি ধর্ম, মৌলবাদ, প্রতিষ্ঠান ও সংস্কারবিরোধিতা, যৌনতা, নারীবাদ ও রাজনীতি বিষয়ে তাঁর বক্তব্যের জন্য ১৯৮০-এর দশক থেকে পাঠকগোষ্ঠীর দৃষ্টি আর্কষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। হুমায়ুন আজাদের ৭টি কাব্যগ্রন্থ, ১২টি উপন্যাস ও ২২টি সমালোচনা গ্রন্থ, ৭টি ভাষাবিজ্ঞানবিষয়ক, ৮টি কিশোরসাহিত্য, ও অন্যান্য প্রবন্ধসংকলন মিলিয়ে ৬০টির বেশী বই তাঁর জীবদ্দশায় এবং মৃত্যুর পরে প্রকাশিত হয়। ১৯৯২ সালে তাঁর লেখা বই ‘নারী’ প্রকাশের পর বিতর্কের সৃষ্টি হয়৷ বইটি ছিল নারীবাদী গবেষণা-সংকলনমূলক বই। বিতর্কের কারণে ১৯৯৫ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত সাড়ে চার বছর ধরে বইটি বাংলাদেশ সরকার নিষিদ্ধ রেখেছিল। এই বইটি তাঁর বহুল আলোচিত গবেষণামূলক কাজ হিসাবেও স্বীকৃত। তাঁর লিখিত বইগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ‘অলৌকিক ইস্টিমার'( ১৯৭৩) যেটি  তাঁর রচিত প্রথম কবিতার বই। এই বইয়ের অনেক কবিতা হুমায়ুন আজাদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় লিখেছিলেন এবং কিছু কবিতা লিখেছিলেন ছাত্রাবস্থা শেষ করে কর্মজীবনে প্রবেশ করার পর। ইস্টিমারের অলৌকিকতা বলতে তিনি নিজের বাল্যজীবনের স্মৃতিচারণকে বুঝিয়েছিলেন।

‘সব কিছু ভেঙে পড়ে’ ( ১৯৯৫)  এই উপন্যাসটির প্লট এবং বুননের রচনাভঙ্গির দিক দিয়ে বাংলা সাহিত্যে একটি আধুনিক জীবনবাদী উপন্যাস। নারী-পুরুষের মধ্যেকার শারীরিক ও মানসিক সম্পর্কের নানা আবর্তন এবং পরিণতিকে তিনি সুনিপুণ ভাবে পরিবেশন করেছেন৷ তাঁর রচিত অপর একটি উপন্যাস ‘নিজের সঙ্গে নিজের জীবনের মধু’ (২০০০)। জলকদর নামের এক বালকের বেড়ে ওঠাই এই উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু। 

‘একটি খুনের স্বপ্ন'( ২০০৪) এটি হুমায়ুন আজাদ রচিত শেষ উপন্যাস। ১৯৬০-এর দশকের এক যুবকের প্রেমের মর্মান্তিক যন্ত্রণা নিয়ে রচিত অসামান্য একটি উপন্যাস। এই উপন্যাস উৎসর্গ করেছেন ১৯৬৪-১৯৬৮ পর্যন্ত কাটানো তাঁর অতীত-সময়কালকে। এছাড়া ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’, ‘হুমায়ুন আজাদের প্রবচনগুচ্ছ ‘, ‘আব্বুকে মনে পড়ে’ যেটি পরবর্তী কালে জাপানি ভাষায় অনূদিত হয়। শিশু কিশোর সাহিত্যে তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ ‘ফুলের গন্ধে ঘুম আসেনা ‘(১৯৮৫) বইটিও জাপানি ভাষায় অনূদিত হয়েছিল পরবর্তীকালে।  

১৯৮০-র দশকের শেষভাগ থেকে হুমায়ুন আজাদ সমসাময়িক রাজনীতি নিয়ে গণমাধ্যমে বক্তব্য রাখা শুরু করেন। এই সময় তিনি ‘খবরের কাগজ’ নামক সাপ্তাহিক পত্রিকায় সম্পাদকীয় নিবন্ধ লেখা শুরু করেন। ২০০৩ সালে ইত্তেফাক পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় হুমায়ুন আজাদের ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ উপন্যাসটি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়। তারপর ২০০৪-এর একুশে বইমেলাতে উপন্যাসটি বই আকারে প্রকাশ পায়৷ এই বইটিতে লেখক ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধীতাকারী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে ফ্যাসিবাদী সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করেন পরোক্ষভাবে এবং এর কঠোর সমালোচনা করেন। এই উপন্যাসটি পাঠকমহলে প্রবল বিতর্কের সৃষ্টি করে৷ তারই ফলস্বরূপ ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি বাংলা অ্যাকাডেমিতে অনুষ্ঠিত বইমেলা থেকে বেরিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে নিজের বাড়ির যাওয়ার সময় তাঁকে হত্যার চেষ্টা করা হয়৷ প্রথমে ঢাকায় তারপর থাইল্যান্ডে গিয়ে চিকিৎসার মাধ্যমে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন৷ জামাত-উল-মুজাহিদীন বাংলাদেশ (বা সংক্ষেপে জেএমবি) নামক ইসলামি জঙ্গী সংগঠনের একজন শীর্ষনেতা শায়খ আব্দুর রহমান পরবর্তীকালে হুমায়ুন আজাদ এবং একইসঙ্গে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম ইউনুসকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার কথা স্বীকার করেন৷ 

তাঁর সাহিত্যকীর্তির জন্য বেশ কিছু পুরস্কার তিনি পেয়েছেন৷ সামগ্রিক সাহিত্যকর্মের জন্য ১৯৮৬ সালে তিনি বাংলা অ্যাকাডেমি পুরস্কার পান৷ ভাষাবিজ্ঞানে বিশেষ অবদানের জন্য ২০১২ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়।

২০০৪ সালের ১২ আগস্ট জার্মানির মিউনিখে হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু হয়৷ 

স্বরচিত রচনা পাঠ প্রতিযোগিতা, আপনার রচনা পড়ুন আপনার মতো করে।

ভিডিও

বিশদে জানতে ছবিতে ক্লিক করুন। আমাদের সাইটে বিজ্ঞাপন দেওয়ার জন্য যোগাযোগ করুন। ইমেল – contact@sobbanglay.com

 


Click to comment

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

To Top
error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।