মানুষের দ্বিতীয় মস্তিষ্ক

মানুষের দ্বিতীয় মস্তিষ্ক

মানুষের শরীরে ক’টি মস্তিষ্ক রয়েছে? ভাবছেন নিশ্চয়ই এরকম বোকা বোকা প্রশ্ন করার অর্থ কি? একটা ছোট বাচ্চাও জানে মানুষের একটি মাত্রই মস্তিষ্ক রয়েছে যেটি থাকে তার করোটি অর্থাৎ খুলির ভেতর। একদম ঠিক কথা। কিন্তু অসংখ্য নিউরনের সমাহার শরীরের যে অংশে থাকে সেটাই মস্তিস্ক এটাই যদি আপনার মস্তিষ্কের সংজ্ঞা নির্ধারণের অন্যতম একটি কারণ হয় তাহলে আপনাকে সগর্বে জানাই এরকম মস্তিষ্ক আমাদের দেহে আরও একটি আছে যেটি থাকে আবার আমার আপনার পেটের মধ্যে। তাকে আমরা অবশ্য অন্ত্র বা পৌষ্টিকতন্ত্র নামে চিনি। এই পৌষ্টিক তন্ত্র বা অন্ত্রকেই মানুষের দ্বিতীয় মস্তিষ্ক (second brain) বলা হয়ে থাকে।

সম্প্রতি মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির একদল বিজ্ঞানীদের করা গবেষণায় জানতে পারা গেছে মানুষের অন্ত্রে(Gut) অবস্থিত এন্টেরিক স্নায়ুতন্ত্র (Enteric Nervous System) আসলে অনেকটা স্বতন্ত্র মস্তিষ্কের মতোই কাজ করে। গোটা অন্ত্র জুড়েই জালের মত ছড়িয়ে রয়েছে স্নায়ুকোষ বা নিউরন। এই এন্টেরিক স্নায়ুতন্ত্র আসলে দুটি পাতলা স্তর যা প্রায় ১০০ মিলিয়ন স্নায়ুকোষ দ্বারা গঠিত। এন্টেরিক স্নায়ুতন্ত্র এসোফ্যাগাস (esophagus) থেকে মলদ্বার (rectum) পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে এটি।

মস্তিষ্ক যখন তখন নিশ্চয়ই চিন্তা ভাবনাও নিয়ন্ত্রণ করে – এমন ধারণা যদি আপনার হয়ে থাকে তাহলে শুরুতেই আপনার ভুল ভেঙে দেওয়া দরকার। এই দ্বিতীয় মস্তিষ্কের কাজ হল – পরিপাক নিয়ন্ত্রণ। খাবার গিলে নেওয়ার পর থেকে সেই খাবারকে পরিপাক উপযোগী করবার জন্য বিভিন্ন উৎসেচকের ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে রক্তে সেই খাদ্য থেকে প্রাপ্ত পুষ্টি মিশিয়ে দেওয়া ও অপাচ্য খাদ্যকে মলের মাধ্যমে শরীরের বাইরে বের করে দেওয়া – এই সব কিছুই নিয়ন্ত্রিত হয় এই পেটের মধ্যে থাকা আমাদের দ্বিতীয় মস্তিস্ক দ্বারা। এই দ্বিতীয় মস্তিস্ক কিন্তু ভীষণ ভাবে মাথায় থাকা প্রথম মস্তিষ্কের সাথে যোগাযোগ রেখে চলে। শারীরবিজ্ঞানের পরিভাষায় একে গাট ব্রেন লিংক (Gut brain link) বলা হয়।

খুব দুশ্চিন্তায় আমাদের পেটে যে গুড়গুড় আওয়াজ হয়, তা কিন্তু এই দ্বিতীয় মস্তিষ্কের কারসাজি। বিজ্ঞানীরা লক্ষ করে দেখেছেন এন্টেরিক স্নায়ুতন্ত্রে অবস্থিত প্রায় নব্বই শতাংশ স্নায়ুই যাদের ভেগাস (vagus) বলে তারা সরাসরি প্রথম মস্তিষ্কের সাথে সংযোগ স্থাপন করে এবং তথ্য আদান প্রদান করে। মূলত সেই কারণেই আমরা দেখি পেট ব্যাথা হলে আমাদের মেজাজ বিগড়ে যায়। মেজাজ নিয়ন্ত্রিত হয় মূল মস্তিষ্ক দ্বারা কিন্তু মেজাজ হারানোর মত বা খুশির মেজাজের পরিস্থিতি তৈরী করে এই দ্বিতীয় মস্তিষ্ক। মাথায় থাকা এবং পেটে থাকা মস্তিষ্কের এই অদ্ভুত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে বিভিন্ন মানসিক বিষণ্নতার চিকিৎসা করতে গিয়ে দেখা যায় স্নায়ুরোগের ওষুধগুলি অনিচ্ছাকৃতভাবে অন্ত্রকে প্রভাবিত করে। মস্তিষ্কের মতোই অন্ত্রের স্নায়ুতন্ত্র ৩০টিরও বেশি নিউরোট্রান্সমিটার ব্যবহার করে এবং প্রকৃতপক্ষে শরীরের ৯৫ শতাংশ সেরোটোনিন এই অন্ত্রে পাওয়া যায়। যেহেতু সিলেক্টিভ সেরোটোনিন রিউপটেক ইনহিবিটরস (SSRIs) নামক অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট ওষুধগুলি সেরোটোনিনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এই ওষুধগুলি মনের মধ্যে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটাতে প্রায়ই গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল সমস্যাগুলিকে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসাবে প্রকট করে। এর সবথেকে ভালো উদাহরণ হল – ইরিটেবল বাওয়েল সিন্ড্রোম (Irritable bowel syndrome/IBS)। রোগটি আমাদের অন্ত্রে অত্যধিক সেরোটোনিন ক্ষরনের কারণে হয়ে থাকে কিন্তু রোগটি ধরলে আমাদের মেজাজ কিন্তু বিগড়ে যায়। অন্ত্রে থাকা বিভিন্ন উপকারী ব্যাকটেরিয়া শুধু আমাদের খিদে নিয়ন্ত্রণ করে না, একই সাথে আমাদের মানসিক অবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে। যেমন দইয়ে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ক্রিয়াকলাপের কারণে দই খেলে মানসিক বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগ কম হয়।

আপনার মতামত জানান