সববাংলায়

গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য

বিভাগঃ ,

গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য (Gopal Chandra Bhattacharya) একজন বাঙালি পতঙ্গবিদ ও  প্রকৃতিবিদ, যিনি কীটপতঙ্গের উপর তাঁর যুগান্তকারী গবেষণার জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন। ‘বাংলার কীটপতঙ্গ’ তাঁর লেখা একটি কালজয়ী গ্রন্থ।

১৮৯৫ সালের ১ আগস্ট তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত লোনসিংহ গ্রামে এক দরিদ্র  ব্রাহ্মণ পরিবারে গোপালচন্দ্রের জন্ম হয়। তাঁর বাবা অম্বিকাচরণ ভট্টাচার্য পেশায়  পুরোহিত ও মা শশীমুখী দেবী একজন গৃহবধূ ছিলেন। গোপালচন্দ্রের যখন পাঁচ বছর বয়স তাঁর বাবা অম্বিকাচরণের মৃত্যু হয়। ফলে পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ না থাকায় চরম দারিদ্র্যে তাঁর শৈশব কাটে।

গোপালচন্দ্র ১৯১৩ সালে গ্রামের লোনসিংহ বিদ্যালয় থেকে জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ নম্বর নিয়ে ম্যাট্রিকুলেশনে প্রথম বিভাগে পাশ করেন। এরপর  কলেজে আই.এ. পড়ার জন্য ভর্তি হয়েও শেষ পর্যন্ত আর্থিক অনটনে সমগ্র পাঠ্যক্রম শেষ হওয়ার আগেই পড়া ছাড়তে বাধ্য হন।

এক নজরে গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের জীবনী:

  • জন্ম: ১ আগস্ট, ১৮৯৫
  • মৃত্যু: ৮ এপ্রিল, ১৯৮১
  • কেন বিখ্যাত: প্রখ্যাত পতঙ্গবিদ ও প্রকৃতিবিজ্ঞানী। তিনি ‘বাংলার কীটপতঙ্গ’ গ্রন্থের রচয়িতা এবং সামাজিক পতঙ্গ ও মাকড়সার ওপর মৌলিক গবেষণার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত।
  • পুরস্কার: ১৯৭৫ সালে তিনি ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ লাভ করেন। এছাড়া ১৯৮১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ‘ডি.এসসি’ (D.Sc.) ডিগ্রিতে ভূষিত করে।

এরপর তিনি একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। শিক্ষকতা করার সময় তাঁর সাহিত্যের প্রতিও আগ্রহ সৃষ্টি হয়। তিনি পালা গান, জারি গান লেখা শুরু করেন। জারি ও পালা গান লেখার পাশাপাশি তিনি ১৯১৭ সালে ‘শতদল’ নামে একটি মাসিক পত্রিকা প্রকাশ করা শুরু করেছিলেন। তিনি বিজ্ঞান ক্লাব গড়ে তুলেছিলেন হাতেকলমে বিজ্ঞানের বিভিন্ন সৃষ্টিকে উপলব্ধি করার জন্য। ‘সনাতন’ নামের একটি পত্রিকা’র সম্পাদনার দায়িত্বও সামলেছেন তিনি।

আর্থিক অনটনের কারণে কলেজের পড়াশোনা শেষ করতে না পারলেও নিজের প্রচেষ্টা ও পর্যবেক্ষণশক্তির জোরে তিনি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন প্রকৃতিবিদ হয়ে ওঠেন। প্রকৃতি পর্যবেক্ষণে তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ও গবেষণার প্রতি আগ্রহ জগদীশচন্দ্র বসুর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরবর্তীকালে বসু বিজ্ঞান মন্দিরে যোগ দিয়ে তিনি দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে পতঙ্গ ও অন্যান্য অমেরুদণ্ডী প্রাণীর ওপর মৌলিক গবেষণা চালিয়ে যান। ‘বাংলার কীটপতঙ্গ’ তাঁর লেখা অন্যতম সেরা গ্রন্থ। ১৯৩০ সালে বাংলার মাছ শিকারি মাকড়সা (Fishing Spider) সম্বন্ধে তাঁর পর্যবেক্ষণ বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর বিশেষ প্রশংসা লাভ করে এবং বসু বিজ্ঞান মন্দিরে তাঁর গবেষক হিসেবে পরিচিতি আরও সুদৃঢ় হয়।

পিঁপড়ে অনুসারী মাকড়সা, টিকটিকি, শিকারি মাকড়সা সম্পর্কে জার্নাল অফ দ্য বোম্বে ন্যাচারাল হিস্ট্রি সোসাইটি, আমেরিকার সায়েন্টিফিক মান্থলি, কলকাতার সায়েন্স অ্যান্ড কালচার-এ তাঁর গবেষণা প্রকাশিত হয়। সেই সময় তাঁর মোট ২২টি গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয়েছিল।

তিনি প্রকৃতই মেধা এবং মানসিকতায় একজন যুক্তিবাদী এবং কুসংস্কারবিরোধী ব্যক্তি ছিলেন একথা তিনি তাঁর জীবন কথাতেই লিখে গেছেন –  “পূজার্চনা সামাজিক রীতিনীতি নিয়ে মায়ের সঙ্গে প্রায়ই বাদানুবাদ হতো। একবার ভাইয়ের  ভয়ানক অসুখ হয়। ডাক্তার কবরেজ যখন আশা ছাড়লেন তখন একদিন স্বপ্ন দেখার ভান করে একটা ওষুধ মাকে দিলাম, ওষুধ ধারণ করার পর রোগী ধীরে ধীরে আরোগ্যলাভ করে। এই ব্যাপারটাকে উপলক্ষ (করে) পদ্যছন্দে একটি ব্রতকথা লিখে ছাপিয়ে দিলাম। নাম ‘আপদ বিনাশিনীর ব্রতকথা’ বইটি ঘরে ঘরে প্রচারিত হলো। এমন কি আজও বোধ হয় এই ব্রতকথা কোনও কোনও স্থানে প্রচলিত আছে, প্রচারের পর মাকে সমস্ত বিষয়টা যে মিথ্যা তা খুলে বলি, এগুলির অসারতার কথা বুঝিয়ে দিলাম, অন্য লোকেদেরও বললাম, কিন্তু কেউ আমার এই সত্য কথা মানতে রাজি হননি।”

গোপালচন্দ্র প্রথম গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন ১৯৩২ সালে। ১৯৩৬ সালে তাঁর জলচর মাকড়সার উপর কাজটি প্রকাশিত হয় বুলেটিন অফ দ্য আমেরিকান মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি-তে এবং ১৯৫১ সালে আমন্ত্রিত হন ইন্টারন্যাশানাল ইউনিয়ন ফর দ্য স্টাডি অফ সোশ্যাল ইনসেক্টস ( International Union for the Study of Social Insects) -এর সম্মেলনে। তাঁর অনেক কাজের মধ্যে পিঁপড়ের প্রজনন ও বংশবিস্তারের জৈবিক প্রক্রিয়া এবং তার ভিতরে লুকিয়ে থাকা বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা নিঃসন্দেহে তাঁর অন্যতম কৃতিত্ব।

তিনি দলবদ্ধ পতঙ্গ যেমন পিঁপড়ে, মৌমাছি প্রভৃতির প্রজনন, রূপান্তর,পূর্ণতা পাওয়া ইত্যাদি নিখুঁতভাবে লক্ষ করেছিলেন। তাঁর প্রকাশিত রচনাগুলিতে তাঁর এই পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যবেক্ষণ দক্ষতার পরিচয় মেলে। গবেষণার সময় অনেক ক্ষেত্রে নিজেই জীবজন্তুর ছবি ও চিত্র এঁকে নথিভুক্ত করতেন। এটি তাঁর গবেষণার একটি বৈশিষ্ট্য।

ব্যাঙাচি থেকে ব্যাঙের রূপান্তরে পেনিসিলিনের ভূমিকা নিয়ে তাঁর গবেষণা এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে তাঁকে অবসরের পরেও বসু বিজ্ঞান মন্দিরে গবেষণা চালিয়ে যাবার অনুমতি দেওয়া হয়। তিনি ‘ভারতকোষ’ নামক বাংলা এনসাইক্লোপিডিয়া তৈরির সময় সহযোগী ভূমিকা পালন করেছিলেন।

১৯৪৮ সালে তিনি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে ‘বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদ’ নামে একটি বিজ্ঞান গবেষণা সমিতি গঠন করায় বিশেষ ভূমিকা নেন। ১৯৫০ সালে বঙ্গীয় বিজ্ঞান পরিষদের পত্রিকা ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’-এর প্রধান সম্পাদক নিযুক্ত হন এবং ১৯৭৭ সালে তিনি এই পত্রিকার প্রধান উপদেষ্টা নিযুক্ত হন।

তিনি শুধু গবেষক ছিলেন না, সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রকৃতিবিজ্ঞান জনপ্রিয় করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। তাঁর কর্মজীবনে তিনি প্রায় এক হাজারের মতো বিজ্ঞান বিষয়ক প্রবন্ধ লিখেছিলেন যার বেশির ভাগই বাংলায়। প্রবাসী, আনন্দবাজার পত্রিকা, যুগান্তর, মন্দিরা, সাধনা, জ্ঞান ও বিজ্ঞান, বঙ্গশ্রী, শিশুসাথী, সন্দেশ, নবারুণ, প্রকৃতি, নতুনপত্র, অন্বেষা, দেশ প্রভৃতি পত্রিকায় পতঙ্গ নিয়ে তাঁর প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে।

গোপালচন্দ্র প্রথমে জগদীশচন্দ্র বসুর সহকারী হিসাবে, পরে ‘স্যার জগদীশচন্দ্র বোস স্কলারশিপ’ এর সাহায্যে এবং গবেষক হিসেবে ১৯২০-র দশকের গোড়ার থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত একটানা বসু বিজ্ঞান মন্দিরেই গবেষণা করে গেছেন।

তাঁর লেখা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য বই হল — ‘আধুনিক আবিষ্কার’, ‘মহাশূন্যের রহস্য’, ‘বাংলার কীটপতঙ্গ’, ‘মনে পড়ে’, ‘প্রকৃতি পর্যবেক্ষণ’, ‘করে দেখ’, ‘রোমাঞ্চকর জীবজগৎ’, ‘জীবন নিয়ে যে বিজ্ঞান’, ‘জীববিদ্যা’, ‘বিস্ময় উদ্ভিদ’, ‘চেনা অচেনা পোকামাকড়’ প্রভৃতি।

রবীন্দ্র পুরস্কার (১৯৭৫), আনন্দ পুরস্কারের (১৯৬৮) মতো উল্লেখযোগ্য পুরস্কার ছাড়াও সারাজীবনে তিনি বহু সম্মানে সম্মানিত হয়েছিলেন।  তাঁর মৃত্যুর কয়েকদিন আগে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডি. এসসি. সম্মানে ভূষিত করে। ২০০৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁর স্মৃতিতে “গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য স্মৃতি পুরস্কার” চালু করে।

১৯৮১ সালের এপ্রিল বিজ্ঞানী গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্যের মৃত্যু হয়। 


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. আনন্দবাজার পত্রিকা, ১২ই এপ্রিল, ২০১৫ সাল
  2. বর্তমান পত্রিকা, ৯ই জুন ২০১৯ সাল
  3. কলকাতা পুরশ্রী – ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ – পৃষ্ঠা ২৩-২৪
  4. https://www.bongodorshon.com/
  5. https://bigganblog.org/
  6. https://en.wikipedia.org/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading