সববাংলায়

জারি গান ও নাচ

বিভাগঃ , ,

বাংলার সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতির ধারায় লোকনৃত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান রয়েছে। হিন্দুদের মতোই মুসলিম ধর্মের সঙ্গেও জড়িত কিছু লোকনৃত্য আজও বাংলার কয়েকটি স্থানে প্রচলিত রয়েছে। তারমধ্যে একটি হল জারি গান ও নাচ (Jari Song and Dance)। জারি নাচের সঙ্গে অবশ্য জারি গানও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেই গানের সঙ্গেই এই নৃত্য পরিবেশিত হয়ে থাকে। মূলত শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানেরা মহরমের সময়ে এই গান ও নাচ ঘুরে ঘুরে পরিবেশন করেন। মহরম উৎসবটির পিছনে যে দুঃখের ইতিহাস জড়িত আছে এই নাচের মধ্যেও রয়েছে তার প্রভাব। জারি নাচকে এককথায় একটি ধর্মীয় ও সামাজিক লোকনৃত্য বলা যেতে পারে। শহুরে এলাকায় জারি নাচের খুব একটা প্রচলন নেই, বরং গ্রামের দিকেই আজও মহরমের সময় এই লোকগান ও নৃত্য চোখে পড়ে। আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে এই ধরনের লোকনৃত্যগুলির জনপ্রিয়তা কমে গেলেও, সম্পূর্ণরূপে এদের অস্তিত্ব আজও বিলীন হয়ে যায়নি।

জারি শব্দটি হল একটি ফরাসি শব্দ, যার অর্থ শোকপ্রকাশ। শব্দটি আরবিতেও রয়েছে, যার অর্থ প্রচলিত বা প্রচারিত। ফরাসি অর্থটিই এই জারি গান এবং নাচের ক্ষেত্রে যথোপযুক্ত। আসলে শিয়া সম্প্রদায়ের মুসলমানেরা মহরমের সময় এই জারি নাচ ও গানের অনুষ্ঠান করে থাকে। মহরমের সঙ্গে কারবালায় ইমাম হোসেনের মৃত্যুর যে বিষাদময় কাহিনি জড়িত রয়েছে জারি গানের মধ্যে যেমন সেই বিষাদের সুর ধ্বনিত হয় তেমনি জারি নাচের প্রত্যেকটি পদবিক্ষেপ এবং অঙ্গভঙ্গিতেও শোকের প্রকাশ ঘটে থাকে। মহরম পালনকে মুসলিমরা যেহেতু তাদের ধর্মেরই একটি অঙ্গ বলে মনে করে, সেইজন্য এই জারি নাচকেও একটি ধর্মীয় লোকনৃত্য হিসেবল ব্যাখা করা যেতে পারে। ইসলামী শাস্ত্রেও মহরমের সময়ে শোকপ্রকাশের নির্দেশ রয়েছে। সেই কারণে মুসলমানেরা মিছিল বের করা, মর্সিয়া গাওয়া ইত্যাদি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এই জারি গান ও নৃত্য পরিবেশন করে তার মাধ্যমে শোকপ্রকাশ করে।

মহরমের চাঁদ দেখার রাত থেকেই এই জারি গান ও নাচ শুরু হয়ে যায়। জারি নাচে সাধারণত তরুণ ও কিশোরদেরই অংশগ্রহণ করতে দেখা যায়। জারি গানের সঙ্গে সঙ্গেই জারি নাচ হয়, তা বিচ্ছিন্নভাবে পরিবেশিত হয় না। জারি গান ও নাচে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে আবার বিশেষ ভাগ রয়েছে। এই জারি গান ও নাচ করা দল সাধারণত জারিয়াল দল নামে পরিচিত। এই দলের একজন দলপতি বা প্রধান থাকেন৷ তিনি কেবল গান করেন কিন্তু নাচেন না। এই দলপতির আবার অঞ্চলভেদে বিভিন্ন নাম রয়েছে, যেমন রংপুরে তাকে বলা হয় ‘হাদি’, রাজশাহীতে ‘ওস্তাদ’, ময়মনসিংহে ‘বয়াতি’ আবার কুমিল্লায় বলে ‘জোগালি’। দলের মধ্যে যারা গানে ও নাচে অংশগ্রহণ করে রংপুরে তাদের বলে ‘পাইল’ এবং ময়মনসিংহে বলে ‘দোহার’।

মূলত একটি বৃত্তাকার রেখায় এই নাচ অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। মূল গায়েন কারবালার করুণরসের বিষাদগাথা গায় এবং দোহাররা দিশা বা গড়ান গেয়ে নাচতে থাকে। স্থানভেদে আবার এই নাচগানের ধরনে কিছু তফাত রয়েছে। রংপুরে দু-তিনজন মাত্র পাইল নাচে এবং বাকিরা তাদের ঘিরে বসে হাততালি দিতে থাকে বিশেষ ছন্দে, সেই ছন্দেই নৃত্য হতে থাকে। এই ঘিরে বসারও একটি বিশেষ ভঙ্গি রয়েছে। বাম পায়ের হাঁটু মুড়ে এবং ডান পায়ের হাঁটু আধভাঙা অবস্থায় রেখে তারা বসে এবং হাদি (প্রধান গায়ক, দলপতি) থাকে বৃত্তের বাইরে। অন্যদিকে, মুর্শিদাবাদে আবার প্রধান গায়েন বা ওস্তাদ ছাড়া সকলেই নৃত্য করে। দোহাররা তাঁকে কেন্দ্রে রেখে বৃত্তাকারে নাচতে থাকে এবং ওস্তাদ যে মর্সিয়া গায়, দোহাররা তারই দিশা অংশটুকু গাইতে থাকে আর নাচে।

জারি গানে যেসব দুঃখের কাহিনি বিবৃত করা হয়, তার ভাবার্থ অনুযায়ী নৃত্য করবার প্রয়াস জারি নাচে নেই। আসলে হস্তপদচালনার সাহায্যে নানা শারীরিক অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে শোকপ্রকাশ করাই হল মুখ্য। জারিয়াল দলের লোকসংখ্যার নির্দিষ্ট কোন সীমা হয় না। কখনও আট-দশ জন, কখনও আবার পনের-কুড়ি জন মিলে দল তৈরি করে।

জারি গান ও নাচের সঙ্গে যেসব বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করা হয় অঞ্চলভেদে তারও বদল ঘটে। কোন কোন অঞ্চলে দেখা যায় জারি নর্তকরা পায়ে নুপুর বেঁধে নৃত্য পরিবেশন করে। ময়মনসিংহের কোন কোন জারিয়াল দলের বয়াতি আবার ‘চটি’ নামক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে থাকে এবং দোহাররা সেক্ষেত্রে ছন্দে ছন্দে হাততালি দেয়। মুর্শিদাবাদে আবার ‘ঝারনি’ নামে বাঁশের তৈরি একরকম বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার লক্ষ করা যায়। সরু বাঁশের একটি প্রান্ত একেবারে মিহি করে চিরে এই বাদ্য তৈরি হয়। দুহাতের দুটি ঝারনিকে পরস্পরের সঙ্গে আঘাত করলে ঝনঝন করে একরকম সুর ধ্বনিত হয়।

জারি নাচের নর্তকদের পোশাকেও আবার একটু বিশিষ্টতা রয়েছে। সাধারণত নিত্য ব্যবহার্য লুঙ্গি, গেঞ্জি বা শার্ট পরতে দেখা যায় জারিয়ালদের, এবং প্রত্যেকের হাতে ও মাথায় লাল রুমাল বাঁধা থাকে।

বাড়ি বাড়ি ঘুরে এই জারিয়াল দল নাচগান করে। ময়মনসিংহে গৃহস্থরা আবার জারিয়ালদের চিড়ে-খই খাওয়ায়। উত্তরবঙ্গে আবার খিচুড়ি খাওয়ানোর রেওয়াজ রয়েছে। উৎসবের শেষদিনে যে স্থানটিকে কারবালা হিসেবে কল্পনা করা হয় সেই স্থানে এই জারি গান ও নাচের চূড়ান্ত রূপ দেখা যায়।

এই আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে জারি গান ও নাচের দলের সংখ্যা অনেক কমে এলেও একেবারে বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। বাংলাদেশের বেশ কিছু স্থানে এমনকি পশ্চিমবঙ্গেরও কয়েকটি স্থানে জারি নাচ ও গানের প্রচলন রয়েছে। জারিয়াল দলের একজন বয়াতি আব্দুল হেলিম আজও তাঁর দলের সঙ্গে জারি গান ও নাচের অনুষ্ঠান করেন। অন্যদিকে ২০১৫ সাল থেকে কেন্দ্রীয় সংস্কৃতি মন্ত্রক যে রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতি মহোৎসবের আয়োজন করে আসছে, ২০২১-এ মুর্শিদাবাদে তা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বাউল গান, লাঠি খেলা, রণপা নৃত্য ইত্যাদির পাশাপাশি জারি গান ও নাচও পরিবেশিত হয়েছিল।


সববাংলায়-এর উদ্যোগ ভাল লাগলে আপনার সাধ্য মতো অনুদান দিয়ে সাহায্য করুন।  যেকোন অর্থমূল্য দিয়ে সাহায্য করতে এখানে ক্লিক করুন। 


 

তথ্যসূত্র


  1. ‘বাংলার লোক-সংস্কৃতি’, ডক্টর ওয়াকিল আহমদ, বাংলা একাডেমী, ঢাকা, অক্টোবর, ১৯৬৫।
  2. https://www.thisday.app/
  3. https://dailysangram.com/
  4. https://pib.gov.in/

error: লেখা নয়, লিঙ্কটি কপি করে শেয়ার করুন।

Discover more from সববাংলায়

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading